ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দল - শুরুর কথা

Mon, Feb 3, 2020 1:48 PM

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দল - শুরুর কথা

(ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দল। দেশের রাজনীতিকে উল্টোমুখো করে দেওয়ার প্রক্রিয়ার প্রতিরোধ হিসেবেই জন্ম নিয়েছিলো সংগঠনটি। না, রাজনৈতিক দল হিসেবে নয়, সংস্কৃতি দিয়ে দেশ এবং রাজনীতিকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পথে ধরে রাখার প্রত্যয় নিয়ে এই সংগঠনের যাত্রা। তার পর তো ইতিহাস। স্বৈরাচারী এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে তো এই সংগঠনটি হয়ে উঠেছিলো অপরিহার্য্য শক্তি।

সেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দলকে যারা গড়ে তুলেছেন, বিভিন্ন সময়ে এই সংগঠনটির সাথে সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে ছিলেন, তাদের ভাবনাগুলো, স্মৃতিকথাগুলোকে গ্রন্থিত করার উদ্যোগ নিয়েছেন সংগঠনের পক্ষে  আহমেদ হোসেন। টরন্টোতে বসবাসরত সাংস্কৃতিক সংগঠক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দলের প্রতিষ্ঠালগ্নের উদ্যোগের সাথে ছিলেন, এখনো চেতনায় সেই স্পিরিটকেই ধারন করেন।

 ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দল নিয়ে বিভিন্নজনের স্মৃতিগাঁথাগুলো গ্রন্থিত হয়ে পাঠকের হাতে যাবার আগে সেগুলো ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশ করবে নতুনদেশ । আপনাদের মতামতকেও আমরাও সাদরে গ্রহন করবো। বিভাগীয় সম্পাদক, নতুনদেশ।)

মুনির উদ্দিন আহমেদ: ১৯৮১ সালের ৬ই আগষ্ট অপরাহ্নে তেজগাঁও কলেজের মাঠে লোক নাট্যদলের “অন্ধের নগরী চৌপাট রাজা” নাটকের মহড়ায় বন্ধু নাসিম আনোয়ার যে ব্যক্তিত্বের সাথে আমার পরিচয় করিয়ে দিল, তা যে আমার এবং আরো অনেকের অবশিষ্ট জীবনকে সূর্যের আলোর মত প্রভাবিত করবে তা উপলব্ধি করার মত মানসিক পরিপক্কতা তখনো আমার আসেনি । এ জানা বোঝার প্রাথমিক লগ্নে, তৎকালীন সামরিক সরকারের আওতায় “ডাকসু” নির্বাচন !

মুজিব উত্তর ৩য় নির্বাচন ।

নির্বাচনে একজন প্রার্থী !

সামাজিক আপ্যায়ন ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক

প্রার্থী — লিয়াকত আলী লাকী !একটি স্লোগান "আমার কন্ঠ, আমার একোরডিয়ান যেন,

দেশে দেশে মানুষের গান গায় "।

একজন নির্বাচনী সহকর্মী-মনির আহমেদ !

সেই থেকে শুরু !!!!

দিনরাত্রি, সপ্তাহ, মাস, বছর ,যুগ প্রায় চার দশক- খুব কাছ থেকে দেখা,একজন পূর্নাঙ্গ সাংস্কৃতিক কর্মী , নেতা, সংগঠক,বন্ধু,ভাই, আত্বীয় যার সার্বক্ষণিক চিন্তা, পরিকল্পনা-সুস্থ সংস্কৃতির বিকাশ, প্রসার ও অগ্রগতি ।

মান্না-আকতারের প্রবল জনপ্রিয়তার স্রোতে যে ভেলাটি ভেসে রইল, সে মুজিব-সৈনিক

লিয়ীকত আলী লাকী ।

সকাল ১০টায় কার্জন হলে- মুজিব মানে আর কিছু না- দিয়ে শুরু রাত ১টায়

মানুষ মানুষের জন্যে দিয়ে সে দিনের মত প্রচারণা শেষ ।

পরের দিন - অপরাজেয় বাংলায়-

মাগো আমরা তোমার শান্তি প্রিয় শান্ত ছেলে

দিয়ে শুরু,

রাত ১টায় শহীদুল্লাহ্ হলে-

শরৎ বাবুর খোলা চিঠি -

প্রচার অভিযানের প্রচন্ডতার মাঝেও নির্বাচন উত্তর কর্মকান্ডের পরিকল্পনা প্রণয়ন, তা বাস্তবায়নের পদ্ধতি নির্ধারণে সময় অপচয়ের অবকাশ ছিল না।

পরিকল্পনার প্রথমেই -(১) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় সাংস্কৃতিক দল গঠন

(২) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নাটক, সঙ্গীত ও তুলনা মূলক সাহিত্য বিভাগ চালুর প্রস্তাব ।

(৩) মুক্ত মঞ্চ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব।

(৪) নিয়মিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করার প্রয়োজনে, বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগার মিলনায়তনের প্রয়োজনীয় সংস্কারের প্রস্তাব।

ডাকসু নির্বাচনের পরপরই শুরু হয় সাংস্কৃতিক দল গঠনের প্রক্রিয়া। সম্পাদক সাহেবের দফতরে যা পরবর্তীতে সাংস্কৃতিক দলের কার্যালয়ে রুপান্তরিত হয় । যে কক্ষ ছিল দেশের সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের প্রাণকেন্দ্র ।যেখানে ছিল সদ্য ভর্তি হওয়া ছাত্র/ছাত্রী থেকে শুরু করে শ্রদ্ধেয় ফয়েজ আহমেদ, গাজীউল হক, রামেন্দ্র মজুমদার , মামুনুর রশীদ সহ সকল সাংস্কৃতিক কর্মীর অবাধ বিচরণ । সে কক্ষেই বাছাই করা হল, দলমত নির্বিশেষে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্দীপ্ত সুস্থ সংস্কৃতি চর্চায় বিশ্বাসী ১ম ব্যাচে ৬৪জন শিল্পী তথা সাংস্কৃতিক কর্মী ।

আনুষ্ঠানিক ভাবে ৭ই সেপ্টেম্বর দলের প্রতিষ্ঠাদিবস পালিত হলেও সাংস্কৃতিক দলের কর্মকান্ড অব্যাহত ছিল এর অনেক আগে থেকে । নৃত্য, আবৃত্তি ও ফটোগ্রাফীর উপর প্রশিক্ষণ এবং সংস্কৃতির বিভিন্ন শাখা উপশাখার উপর সেমিনারের আয়োজন করা হয় । এতে নবীণ-প্রবীণ প্রশিক্ষকদের অন্তর্ভূক্ত করা হয় ।

১০ই মে ১৯৮২, প্রথম ব্যাচের প্রায় সকল সদস্যদের নিয়ে নৃত্য, সঙ্গীত এবং রথযাত্রা নাটক মঞ্চস্থ হয় ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের মূল মিলনায়তনে ।

১০ই মের অনুষ্ঠান শেষ হতে না হতেই শুরু হয় “ডাকসু নাট্য উৎসব ‘৮২ “ এর প্রস্তুতি । সে এক বিশাল কর্মকান্ড । সম্পাদক সাহেব সংকল্পবদ্ধ, সবকটি হলের অংশগ্রহণ অবশ্যই নিশ্চিত হতে হবে । সে প্রয়োজনে সবধরণের সহযোগিতার আশ্বাসেই সীমাবদ্ধ থাকেন নি, সক্রিয়ভাবে প্রতিটি হলের নাটকের নির্দেশক নির্বাচন সহ অন্যান্য কারিগরি সহায়তা প্রদান করেন । এখানে উল্লেখ্য এ সময় মহসীন হলের সাংস্কৃতিক সম্পাদক ছিলেন ছাত্র শিবিরের সদস্য । সে এসে লাকী ভাইকে বল্লেন, “ভাই আমি জীবনে কখনো কোন গান বাজনা করিনি আমার দ্বারা এ সব সম্ভব নয় । আমার হল অংশগ্রহণ করতে পারবে না ।”

লাকী ভাই তাকে আশ্বস্থ করে হলে গিয়ে আগ্রহী অংশগ্রহণকারী ছাত্রদের নোটিশ দিতে বলেন । লাকী ভাই সহ আমরা কজন হলের প্রভোষ্ট শ্রদ্ধেয় অধ্যাপক আবু হেনা মোস্তফা কামাল স্যারের সাথে দেখা করি । উনি তৎক্ষণাৎ নাটকের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ অনুমোদনের আশ্বস্থ দেন ।NSD থেকে সদ্য প্রত্যাগত কর্ম-উন্মুখ ১১জন নাট্য প্রশিক্ষকের ৭জন এ সময় বিভিন্ন হলে নাট্য নির্দেশনা দিয়ে উৎসবকে সমৃদ্ধ করেন এবং বাংলাদেশে নাটক মঞ্চায়নে আধুনিকতার সূচনা করেন । খেলন ভাই, কামাল ভাই, ভাস্বর'দা সহ এঁদের আরো অনেকের সাথে কাজ করার সুযোগ হয়েছিল আমার সাংস্কৃতিক দলে । যতটুকু নাট্যকর্মী হয়েছি এর সবটুকুই ওঁদের মায়া-মমতা স্নেহ ভরা আন্তরিক প্রশিক্ষণ । এঁদেরই একজন সারোয়ার ভাইকে লাকী ভাই অনুরোধ করেন মহসীন হলের নাট্য নির্দেশনার দায়িত্ব নিতে। সাংস্কৃতিক দলের আহমেদ সিদ্দীকী ভাই দায়িত্ব নেন সলিমুল্লাহ হলের নাট্য নির্দেশনার । এ ভাবে নিশ্চিত হয় সকল হলের অংশগ্রহণ । নাট্য উৎসব ও সাংস্কৃতিক সপ্তাহের ব্যাপক কর্মসূচীর সফল বাস্তবায়ন সম্ভব হয়ে ছিল, সাংস্কৃতিক দলের নিস্বার্থ সদস্যদের অক্লান্ত পরিশ্রম, অভূতপূর্ব পারষ্পরিক সহযোগিতা এবং ভাল কিছু করার প্রবল ইচ্ছা ।

নাট্য উৎসব সফলে যে তিন ব্যক্তিত্বের সার্বিক সহযোগিতা শ্রদ্ধার সাথে স্মরনীয় এঁরা হলেন আমার শিক্ষক শ্রদ্ধেয় অধ্যাপক ড. নরেন বিশ্বাস, নাট্যকার আসকার ইবনে শাইখ এবং অভিনেতা মোহাম্মদ জাকারিয়া। ছাত্রদের প্রতি অসীম ভালবাসা এবং নাটকের প্রতি গভীর প্রেমই তাঁদেরকে সহায়তা করেছে বিচারকমন্ডলীর দূরুহ কাজটি সমাপন করা । এ নাট্য উৎসবের মধ্য দিয়েই শুরু হয় খুব ধীরে অথচ স্থায়ী ভাবে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অপসংস্কৃতির চিরস্থায়ী অবসানের প্রক্রিয়া।

এ সাফল্যের কিছু সংবাদ পত্রিকায় ছাপা হলেও তা ছিল অনুপাতে নগন্য । যদিও বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টারদের অনেকেই ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়েরই ছাত্র/ছাত্রী। রোকেয়া হলের নাটক মঞ্চায়িত হয়েছিল নির্ধারিত সময়ের কিছু আগে । সে সময় উপাচার্য ফজলুল হালীম স্যার, TSC এর পরিচালক জামান স্যার, রোকেয়া হলের প্রভোষ্ট সহ আরো কয়েকজন শিক্ষক/ কর্মকর্তা কেন্দ্রের মূল দ্বারের দাঁড়িয়ে শৃংখলা রক্ষাকারী সাংস্কৃতিক দলের সদস্যদের সহায়তা করছিলেন ।

এ এক বিরল টীম ওয়ার্ক ।

পরদিন পত্রিকায় লিখা হলো—“দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষার পরও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য রোকেয়া হলের নাট্য প্রদর্শনীতে মিলনাতনে প্রবেশ করতে পারেনি !”

উৎসবান্তে পুরষ্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে উপাচার্য ফজলুল হালিম স্যারের সম্বোধন—

“লাকী দূঃখ করোনা, কিছু কিছু পত্রিকার আগ্রহ Negative News এর প্রতি, এরা সময় ব্যয় করে Fake news এর পেছনে । বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাল কাজ হয়, ভাল কাজ হচ্ছে । জাতীয় যে গুরু দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয়ের উপর অর্পিত এ থেকে এরা বিমুখ নয়। বিশ্ববিদ্যালয় আজ অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে শুধু সোচ্চারই নয়, নিজস্ব সংস্কৃতি বিস্তারে একনিষ্ঠ বটে ।”

“নাট্য উৎসব” ও ”সাংস্কৃতিক সপ্তাহ” এর উল্লেখ করলাম এজন্য যে এর সফল বাস্তবায়নের মাঝেই প্রতিষ্ঠিত হয় সাংস্কৃতিক দলের সুদৃঢ় ভিত্তির। আস্থা অর্জন করে প্রগতীশীল সকলের। এর ফলশ্রুতিতেই সাংস্কৃতিক দলের উপর অর্পিত হয়, দলের পরিচালক প্রস্তাবিত “অপসংস্কৃতি মূলক Rag day এর পরিবর্তে বিশ্ববিদ্যালয় দিবস” উৎযাপনের গুরু দায়িত্ব ।মুষ্টিমেয় কজনার সন্দেহ প্রকাশ, সারাদিনব্যাপী বিশাল বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় অনুষ্ঠান পরিকল্পনা ও পরিচালনায় সাংস্কৃতিক দলের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার ! সদস্যদের অক্লান্ত পরিশ্রম, একনিষ্ঠা,অনুশীলন,শৃংখলা পারষ্পরিক সহযোগিতা এবং পরিচালকের দক্ষ পরিকল্পনা সকলের প্রশংসা অর্জন করে।

১ম “বিশ্ববিদ্যালয় দিবস” ৮ই জানুয়ারী ১৯৮৩—

সকাল ৮:০০ বিশ্ববিদ্যালয় মল-জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দল।

সকাল ১০:০০ TSC ত্রিকোণ চত্তর , নাটক।

-অবিরাম পাউরুটি ভক্ষণ-

-ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দল।

দুপুর ১২:০০ এনেক্স বিল্ডিং।

-আবৃত্তি ও সঙ্গীত-

-ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দল।

বেলা ২:০০ কলা ক্যাফেটেরিয়া চত্ত্বর।

— অবিরাম পাউরুটি ভক্ষণ

-ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দল-

বেলা ৪:০০ কার্জন হল মল ।

— অবিরাম পাউরুটি ভক্ষণ

- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দল-

সন্ধ্যায় বিশ্ববিদ্যালয় মল।সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা।

প্রাক্তন আর নতুনের মেলা।

-নতুনের প্রতিনিধি- —ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দল—

আবৃত্তি, নৃত্য আর গান ভরে দিল উপস্থিত সকলের প্রণ ।

২য় পর্বে-আনোয়ারউদ্দীন, নিলুফার ইয়াসমিন, ফেরদৌসী রহমান, মোস্তফা জামান আব্বাসী সহ আরো অনেকে।সর্বোপরি খান আতা তাঁর উপস্থাপনার শেষান্তে বলেন “আজ বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দলের কর্মকান্ডে আমি গর্বিত, আনন্দিত এবং আশান্বিত।” এভাবেই তিনি করেন দলের জয়গান।

দলের উপদেষ্টা লিখলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে দীর্ঘদিনের বন্ধ্যাত্ব কাটিয়ে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দল। বহুদিন যাবৎ বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন সুসংগঠিত এবং ঐতিহ্য সচেতন ছাত্র-ছাত্রীর সমাবেশ দেখা যায় নি।তাদের একক সাহসী ভূমিকায় আজ সবার মনে সাংস্কৃতিক দলের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস ও প্রত্যাশা তৈরী হয়েছে ।

এ পর্যন্ত আমিই একক ভাবে পরিচালকের সহকারীর দায়িত্ব পালন করছিলাম।

সাংগঠনিকতার কতটুকু শিখেছি জানিনা, তবে এর পুরোটাই পাওয়া দেশের শ্রেষ্ঠ সাংস্কৃতিক কর্মী,আমার শিক্ষক,গুরু,বন্ধু, আমার ভাই,”লাকী ভাই”থেকে ।

দলের অবয়ব বৃদ্ধি পেল।কাজের পরিধি বিস্তৃত হল।গঠনতন্ত্র প্রনয়ন হল। আমরা ৭জন সহকারীর তত্বাবধানে ৪৬০ জন সদস্যপুষ্ট সাংস্কৃতিক দল,লাকী ভাই এর

নেত্রীতে জয়েরধারা অব্যাহত রইল——

সোনাই-মাধব,চন্ডালিকা,বৃন্দআবৃত্তি,সঙ্গীত সেই মেয়ে, রয়েল বেঙ্গল টাইগার ও সৃষ্টি এর মাধ্যমে ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের সহকারী পরিচালক পদে আমার নিয়োগে আমিও আরো ২ডজন আগ্রহী প্রার্থীর মত আশ্চর্যান্বিত !! সাংস্কৃতিক দল গঠনে যে সাংগঠনিক প্রশিক্ষণ পেয়েছি তা কেন্দ্রের পরিচালক শ্রদ্ধেয় জামান স্যারের দৃষ্টি এড়ায় নি।আজ এত বছর পরও তা NYC-DOC এর দৃষ্টির অন্তরালে চলে যায় নি !!!

রাজনীতিতে ও ব্যক্তিগত জীবনে আদর্শহীন চরিত্রহীন, দেউলিয়া মৌলবাদীদের দিয়ে প্রভাবিত বেআইনি সামরিক সরকার প্রধান এরশাদের ফতোয়া- একুশে আল্পনা আঁকা অধর্মীয়। তাইএকুশে আল্পনা আঁকা নিষিদ্ধ। এ অন্যায়!এ মেনে নেয়া যায়না। তখন বিশ্ববিদ্যালয় উত্তাল । TSCএর প্রবেশপথে উত্তোলিত হয়, অধ্যাপক আবুহেনা স্যারের নির্বাচিত, অধ্যাপক আবুল ফজলের লেখা, "একুশ মানে মাথা নত না করা”- সাংস্কৃতিক দলের সাদা অক্ষরে কালো ব্যানার।

 

সাংস্কৃতিক দলের কক্ষে লাকী ভাই, রুদ্র'দাসহ আমরা কয়েকজন , কী করনীয় এ পরিস্থিতিতে ! রুদ্রদা এবং লাকী ভাই এক মত সকল সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর সংঘবদ্ধ হওয়া দরকার । দু'দিন পর TSC এর মহড়া কক্ষে ফয়েজ ভাই, গাজী ভাই, রামেন্দু দা, বাচ্চুভাই, মামুন ভাই, মফিদুল হক ভাই সহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর শতাধিক সাংস্কৃতিক কর্মী সমবেত। এখানে সাংস্কৃতিক জোট গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ফয়েজ ভাই ও গাজী ভাইকে আহব্বায়ক করে মূল কমিটি এবং ৫টি উপ কমিটি গঠন করা হয়। লাকী ভাই মূল কমিটিতে, নাটক উপ-কমিটিতে ঢাকা পদাতিকের স্বপন'দা, সাংস্কৃতিক দল ও লোক নাট্যদল থেকে আমাকে ও সাইফুলকে অন্তর্ভূক্ত করা হয়।এখানে উল্লেখ্য মূল কমিটি বেতার ও টিভি শিল্পী সংগঠনের জনাব হাসান ইমাম ও এহসান(সিডনি) এর সাথে যোগাযোগ করে জোট অন্তর্ভুক্ত হতে আহ্বান জানালেও এঁরা জোটে যোগ দেন নি। বেতার টিভি এর অনেক শিল্পী ও সংবাদ পাঠক স্বতস্ফূর্ত ভাবে বেতার টিভি বর্জন করলেও কিছু সংবাদ পাঠক এরশাদের মিথ্যা প্রচারণার মূল মূখপাত্র হতে উঠে।এদের প্রতিহতের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। পরিকল্পনা অনুসারে টিভি সন্ধ্যাকালীন সংবাদ প্রচারের ঘন্টাখানেক আগে, সময়ের মন্টু ভাই, সাংস্কৃতিক দলের ইশতিয়াক হোসাইন টিটো, সাইফুল, আহমেদ, জাকির, জুয়েলসহ আমরা কজন রামপুরা রেল ক্রসিংয়ের কাছে অপেক্ষা করতে থাকি। যথাসময়ে সংবাদ পাঠক এহসান টিভির উদ্দেশ্যে রিকশায় রেলক্রসিং পার হওয়ার সময় জোটের কর্মীরা তাকে যথাযথ শারীরিক সন্মানীয় দিয়ে ফিরিয়ে দেয়। সে রাত্রে এহসানকে সংবাদ পড়তে দেখা যায় নি।

১৪ই ফেব্রুয়ারি ১৯৮৩–জয়নাল হত্যা এবং এরশাদের ছাত্র নির্যাতক বাহিনী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি সংলগ্ন চত্ত্বরে জোটের সপ্তাহ ব্যাপী একুশের অনুষ্ঠান মঞ্চকে ভেঙ্গে দেয় এবং কয়েক শতাধিক ছাত্রকে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা থেকে গ্রেফতার করে ক্যান্টনমেন্টের মাঠে খোলা আকাশের নীচে তিনদিন তিনরাত্র বিনা আহারে মৃত্যুর পথে ঠেলে দেয়। সাংস্কৃতিক দলের ফরিদ অহমেদ রটি(সূর্যসেন হলের সাংস্কৃতিক সম্পাদক) সহ দলের অনেক সদস্যই এ নির্যাতনের শিকার হল।

১৯৮৩ সালের ২৬শে মার্চ সাংস্কৃতিক দলের লাকী ভাই, নাসিম ভাই, এ্যানী, ডালিয়া, বাকী সহ আমরা কজন এবং ভাস্বরদা অপরাজেয় বাংলা এবং সাভার স্মৃতি সৌধে জোটের পক্ষে পুষ্প অর্পণ করি। এরশাদ সরকার যখন জোটকে নিস্তব্ধ করে দিতে সচেষ্ট তখন সাংস্কৃতিক দল এভাবে জোটের প্রদীপটিকে জ্বালিয়ে রাখতে বদ্ধপরিকর ছিল ।

আমার শিক্ষক আবু হেনা স্যারের দেয়া, “আমরা সুন্দরের অতন্দ্র প্রহরী” তে যথার্থ ভাবেই প্রতিফলিত দল ও এর প্রতিটি সদস্যের আত্ম পরিচিতি।সালাউদ্দিনের লেখা, লাকী ভাইয়ের সুরে দলীয় সঙ্গীতের এ প্রথম লাইন আজ দলের প্রতিটি সদস্যের মনে প্রাণে।

আহমেদ বলেছে ৫০০/১০০০ শব্দের মধ্যে লেখা হতে হবে। হাজার শব্দে কি সাংস্কৃতিক দলের সব কথা বলা সম্ভব। তবুও ওর কথা মানতেই হবে, মাঝ পথে থামাতেই হবে।

লাকী ভাই যে ভালবাসা দিয়েছেন দলের প্রতিটি সদস্যকে তা আজ বিস্তৃত ৫টি মহাদেশের আনাচে-কানাচে। তাইতো যখন ৩৩বছর পর দেখা হীরার সাথে, আবেগে কেঁদে ফেলি এক সাথে। মন কাঁদে ইস্তেকবালের অসুস্থতাতে ।সাইফুল,কিসলু,আহমেদ, জিয়া,জাকীর, জুয়েল, রহিম, অসি,সামলু, জাহাঙ্গীর , অরিজিৎ,অভিজিৎ, শ্যামল, পাখীকে ‘তুমি’ বলে সম্বোধনে ওরা সমস্বরে বলে উঠে,” এ কি হচ্ছে “। আসলেই তো শান্তনু আর সুজিত ছাড়া এদের তুমি বলিনি কখনো। কতটুকু সাংস্কৃতিক দলকে দিয়েছি জানিনা ! লক্ষকোটি গুণ ফেরত পেয়েছি। তাইতো আহমেদ,কিসলু,জিয়া, বিরূ,লেমন,অরিজিৎ,অভিজিৎ,শ্যামল, জন, রটি, শাহীন, ডালিয়া,সুনিতা, ইয়াসমীন যখনই নিউইর্য়কে দেখে যায় মনির ভাইকে।এ্যানীর পরিবারে আমি তার বাল্যবন্ধু। নিয়মিত যোগাযোগ বেলী ও ডানার সাথে ঈদে বা ১লা বৈশাখে।প্রধানমন্ত্রীর সাথে সরকারী সফরে ব্যস্ত লাকী ভাই সময় দেন মনিরকে ।কৃষ্টি,সুবর্ণা,শিমু, লতা,নাদিরা,বিপা,বাকী, অশোক, মিজান, লিপি ভুলে নি আমাকে !!

এ কি মন্ত্রণা লাকী ভাই ? সারা বিশ্ব জুড়ে ৪৬০টি দেহ একটি প্রাণ, গেয়ে যায় সুন্দরের অতন্দ্র প্রহরীর গান !

৩৩ বছর প্রবাস জীবনের এমন একটি দিন নেই যে দিন সাংস্কৃতিক দলকে মনে হয়নি। এমন রাত্রি নেই সাংস্কৃতিক দলকে স্বপ্নে দেখিনি। কাজে বের হই যখন প্রতি ভোরে, দেখা হয় ছয়টি তারার সাথে ঐ সুদূরে।

কথা বলি আনিস, সাজু, শিবাজি, সম্রাট, লায়লা আর রাসেলের সাথে ।আমারও সময় হয়েছে! আমিও আসব, থাকব একসাথে অনন্তকাল ধরে তোদের তারার দেশে !


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান