স্মৃতিতে সাংস্কৃতিক দল -আমরা সুন্দরের অতন্দ্র প্রহরী

Sun, Jan 26, 2020 11:34 PM

স্মৃতিতে সাংস্কৃতিক দল -আমরা সুন্দরের অতন্দ্র প্রহরী

(ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দল। দেশের রাজনীতিকে উল্টোমুখো করে দেওয়ার প্রক্রিয়ার প্রতিরোধ হিসেবেই জন্ম নিয়েছিলো সংগঠনটি। না, রাজনৈতিক দল হিসেবে নয়, সংস্কৃতি দিয়ে দেশ এবং রাজনীতিকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পথে ধরে রাখার প্রত্যয় নিয়ে এই সংগঠনের যাত্রা। তার পর তো ইতিহাস। স্বৈরাচারী এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে তো এই সংগঠনটি হয়ে উঠেছিলো অপরিহার্য্য শক্তি।

সেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দলকে যারা গড়ে তুলেছেন, বিভিন্ন সময়ে এই সংগঠনটির সাথে সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে ছিলেন, তাদের ভাবনাগুলো, স্মৃতিকথাগুলোকে গ্রন্থিত করার উদ্যোগ নিয়েছেন সংগঠনের পক্ষে  আহমেদ হোসেন। টরন্টোতে বসবাসরত সাংস্কৃতিক সংগঠক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দলের প্রতিষ্ঠালগ্নের উদ্যোগের সাথে ছিলেন, এখনো চেতনায় সেই স্পিরিটকেই ধারন করেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দল নিয়ে বিভিন্নজনের স্মৃতিগাঁথাগুলো গ্রন্থিত হয়ে পাঠকের হাতে যাবার আগে সেগুলো ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশ করবে নতুনদেশ । আপনাদের মতামতকেও আমরাও সাদরে গ্রহন করবো। বিভাগীয় সম্পাদক, নতুনদেশ।)

লিপি আলমাজী : সেদিন বৃষ্টি হচ্ছিল। আকাশ জুড়ে মেঘ থাকলেও আমার মন ছিল উচাটন। সামনে বিচারকের আসনে রবীন্দ্র সঙ্গীত বিশেষজ্ঞ শ্রদ্ধেয় সানজিদা খাতুন। তখন দুরু দুরু বক্ষে কন্ঠে নিলেম " মেঘের পরে মেঘ জমছে "। ভালোই গাইলাম মনে হলো।

দু'দিন আগে কার্জন হল থেকে আসতে আসতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় সাহস করে নাম দিয়েছিলাম রবীন্দ্র সঙ্গীত বিভাগে। তার টানেই আজ অগ্নি পরীক্ষা হয়ে গেল। গান শেষে পরিচয় হলো তৎকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের সাংস্কৃতিক সম্পাদক লিয়াকত আলী লাকীর ভাইয়ের সাথে। তিনি তাঁর সদ্য প্রতিষ্ঠিত " ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দল" এ যোগদানের সাদর আমন্ত্রণ জানালেন। আমি সেই  আমন্ত্রনে  প্রাণ পেলাম। গান পেলাম। অনেক অনেক বয়সের ছোটবড় বন্ধু পেলাম। সেই পরিচয়, সেই আমন্ত্রণ সেই দল করা আজ আমার জীবনের এক পরম পাওয়া। অসাধারণ কেটেছে আমার সেই উত্তাল দিনগুলো। শামসুন্নাহার হলের বন্ধুরা টিএসসিতে যাবার অনুৎসাহিত করলেও আমার মন পড়ে থাকতো টিএসসিতে। মহড়ায় আড্ডায় মিছিলে মিছিলে কেটেছে সময়।

 

পরিচয়ের প্রথম দিন লাকী ভাই দেখিয়ে দিলেন এই হচ্ছে রহিম, এই হচ্ছে এ্যানি। হেসে নিজেই পরিচয় দিলেন আমি মুনীর বলে একজন। সেই থেকে শুরু দিন বদলের পালা। ওরা আমার স্বজন। বন্ধু -কেউ অগ্রজ, কেউবা অনুজ।

পরের দিন আর মন বসে না ক্লাসে কখন যাব টিএসসিতে।বিকেলে সাইন্স ফ্যাকাল্টি থেকে হেঁটে হেঁটে টিএসসিতে এসে দোতলায় গিয়েই জানতে পারলাম হাকিম চত্বরে মেহনতী মানুষের প্রাণপ্রিয় নেতা নেলসন মেন্ডেলার মুক্তির জন্যে একটি অনুষ্ঠান। আমিও গাইবো। আমার প্রথম অনুষ্ঠান দলের হয়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরীর মাঠের সেই অনুষ্ঠানে লাকি ভাই লিড দিয়েছিলেন। গান করেছিল লেমন ভাই ,বেনজু, শামলু ভাই ,বেলী আপা, মিন্টু ভাই। মেয়ের অংশে লিড দিয়েছিলো শাকিলা জাফর। মজার কথাটা হলো, পরবর্তীতে আমার জীবনের আশ্রয়, চাকরি, বেঁচে থাকা, সন্তান পরিবার সবকিছু আমার সেই নেলসন ম্যান্ডেলার দেশে। এই দক্ষিণ আফ্রিকাই এখন দ্বিতীয় ভূমি।

তারপর অভ্যাস হয়ে গেল, সুযোগ পেলেই দলের অফিস। একদিন টিএসসিতে দলের অফিসে বসে দেখি নিচে প্রচন্ড গন্ডগোল। রুমে লাকি ভাই ছাড়াও ছিলাম ইমামুল হক কিসলু, রহিম ভাই, ফাহিমা।

ভয় লাগলেও অভয় ছিলো আশা জাগানিয়া। হেসে খেলেই হট্টগোলের মধ্যে লাকি ভাইসহ আমরা বেরিয়ে আসি।

আর একদিনের কথা খুব মনে পড়ে। দল থেকে ঠিক হলো আমরা রবীন্দ্রজয়ন্তী করতে আমরা শিলাইদাহ যাব, আম্রকানন যাব। আমাদের সাথে ব্যারিস্টার আমিরুল ইসলাম এবং বিচারপতি কে এম সোবহান যাবেন পথে আমাদের বাসায় দুপুরের খাবারও খাবেন। আমরা প্রায় ৩০-৩৫ জন। আমার বাবা প্রথমে হয়তো সামাজিক কারণে একটু আপত্তি করেছিলেন,,পরে পত্রিকায় খবর দেখে, দল সম্পর্কে খোঁজখবর নিয়ে উনার ধারনা পাল্টে যায়। উনি অতিথিদের সবাইকে খুব যত্ন করে আপ্যায়ন করেন। আমার বাবা ছিলেন বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিক। উনি এখন আর দুনিয়াতে নেই। উনি পাবনার একজন খুব পরিচিত অংকের প্রফেসার ছিলেন। ২০১৬ সালে স্বাধীনতা পদক (মরনোত্তর) পেয়েছিলেন।

 

ইতিহাসের পাতায় জ্বলজ্বলে মুজিবনগর সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানস্থলে, আম্রকাননে আমাদের অনুষ্ঠান যেমন সুন্দর ছিলো আবার ছোট্ট একটা ঝামেলাও হয়েছিলো। সুনীতার নৃত্য একটু এগুলেই কুষ্টিয়ার তৎকালীন এমপি আর অন্যান্য নেতাদের চেচামেচি, হইচই এর মধ্যে লোকজন স্টেজে চলে এলে নাচ বন্ধ করতে হয়। আবার শুরু হলে আবার বন্ধ করতে হয়। প্রায় দুইবার বন্ধ হবার পর সুনীতা তার নাচটি শেষ করতে পারে। আশ্চর্যের বিষয় তখন আমরা কেউই ভয় পাইনি। কত শত বাধাবিপত্তি পেরিয়ে আমরা যে প্রতিনিয়ত অনুষ্ঠান করতাম এইটি ছিলো তার একটি নমুনা।

সেই যাত্রায় আমরা অনেক মজা করেছিলাম। আমঝুপিতে রাজার বাড়ি ভ্রমণ, আসলাম শিহির এর বাড়িতে আড্ডা, সারাটা পথ হাহাহিহি সেই স্মৃতি জাগানিয়া দৃশ্যাদি আজও চোখের কোনায় ভেসে বেড়ায়।

 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দলের শুরু তখনকার রাজনৈতিক উল্টো স্রোতের বিরুদ্ধে- স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে। কোন রাজনীতিক দল হিসেবে নয় , সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান দিয়ে দেশ এবং রাজনীতিকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পথে ধরে রাখার দৃঢ় সংকল্প নিয়ে এই সংগঠনের যাত্রা ।তারপর তো ইতিহাস। স্বৈরাচারী এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে এই সংগঠনটি হয়ে উঠেছিল অপরিহার্য শক্তি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এর অনভিপ্রেত পরিস্থিতির সূতিকাগার তথাকথিত "র‍্যাগ ডে" এর খোল নলচে পাল্টিয়ে লিয়াকত আলী পরামর্শে, নেতৃত্বে বিশ্ববিদ্যালয় দিবস চালু হয়। মনে পড়ে সারা ক্যাম্পাস জুড়ে প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় দিবস পালন করা হয়।

 

ছোটবেলা থেকেই পাবনা শহরে সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলে বেড়ে উঠা বাসায় গানের টিচার আসত। ইফা নামে এক সংগীত বিদ্যালয়ে গান শিখতাম আবার বাসাতেও ওস্তাদ নারায়ণ'দার কাছে তালিম নিতাম। সেই আমার উজ্জ্বলতম সময়টা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দলের সাথের সকাল সন্ধ্যা।

 

প্রিয় সাংস্কৃতিক দলের প্রযোজনা বলি আর দল করা বলি সাংস্কৃতিক দলের সবচেয়ে বড় চোখে পরার মত বিষয় ছিল তা'হলো দলের সদস্যদের পরস্পরের মধুরতম বন্ধুপ্রীতি সম্পর্ক। ব্যক্তিগতভাবে আমি একদিকে ইংরেজী ভাষায় বইয়ে ভরা এপ্লাইড ক্যামিস্ট্রি বিভাগে পড়াশুনার চাপ অন্যদিকে প্রাকটিক্যাল এর মধ্যে বাকিটা সময় দলে কাটাতাম । জীবনের হিসাব নিকাশে সেই সময়টা ছিল সবচেয়ে সোনালী সময় ।

কি শুভক্ষণে যে আমি সেই সময়ে লাকি ভাই সান্নিধ্য পেয়েছিলাম তা আমার মত ক্ষুদ্র মানুষের জন্যে সৌভাগ্য , বিস্তর শিক্ষাগ্রহন করেছি সেই সময়, পেয়েছি পরম আত্মীয়দের দেখা। আলোকিত মানুষ এর ঈর্ষনীয় ভালবাসা মধুরতম দিনগুলো।

দলে বিভিন্ন বিভাগ ছিল সংগীত, আবৃত্তি , নৃত্য এবং নাটকের বিভাগ. সব বিভাগে সাজসাজ রব উঠতো কোন অনুষ্ঠানের আগে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দলের অনুষ্ঠান মানেই এলাহী কান্ড, টিএসসি যেনবা নুতন সাজে সাজত।

আজ মনে পড়ে, একবার প্রেসক্লাবের সামনে আমাদের প্রোগ্রাম চলছিল সেই প্রোগ্রামে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী, বর্তমানের প্রধানমন্ত্রী প্রানপ্রিয় হাসিনা আপা আমাদের সাথে ছিলেন অনেকক্ষণ। সেই স্মৃতি জীবনে কোনদিন ভুলার নয়।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এখনো অনেকের সাথে কথা হয়। সম্পর্ক জিইয়ে রাখি। বাংলাদেশে প্রাক্তনী মিলনমেলা হয়। প্রবাসে থাকি বলে সব দেখে খুশিতে বলি, সত্যি আমরা সুন্দরের অতন্দ্র প্রহরী। ছিলাম, আছি এবং থাকবো।


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান