‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দল’ ও ‘আমরা সুন্দরের অতন্দ্র প্রহরী’

Mon, Jan 20, 2020 11:17 PM

‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দল’  ও ‘আমরা সুন্দরের অতন্দ্র প্রহরী’

(ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দল। দেশের রাজনীতিকে উল্টোমুখো করে দেওয়ার প্রক্রিয়ার প্রতিরোধ হিসেবেই জন্ম নিয়েছিলো সংগঠনটি। না, রাজনৈতিক দল হিসেবে নয়, সংস্কৃতি দিয়ে দেশ এবং রাজনীতিকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পথে ধরে রাখার প্রত্যয় নিয়ে এই সংগঠনের যাত্রা। তার পর তো ইতিহাস। স্বৈরাচারী এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে তো এই সংগঠনটি হয়ে উঠেছিলো অপরিহার্য্য শক্তি।

সেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দলকে যারা গড়ে তুলেছেন, বিভিন্ন সময়ে এই সংগঠনটির সাথে সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে ছিলেন, তাদের ভাবনাগুলো, স্মৃতিকথাগুলোকে গ্রন্থিত করার উদ্যোগ নিয়েছেন সংগঠনের পক্ষে  আহমেদ হোসেন। টরন্টোতে বসবাসরত সাংস্কৃতিক সংগঠক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দলের প্রতিষ্ঠালগ্নের উদ্যোগের সাথে ছিলেন, এখনো চেতনায় সেই স্পিরিটকেই ধারন করেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দল নিয়ে বিভিন্নজনের স্মৃতিগাঁথাগুলো গ্রন্থিত হয়ে পাঠকের হাতে যাবার আগে সেগুলো ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশ করবে নতুনদেশ । আপনাদের মতামতকেও আমরাও সাদরে গ্রহন করবো।– বিভাগীয় সম্পাদক, নতুনদেশ।)

মোঃ নূর ইসলাম খান অসি : ১৯৮১ সাল। সদরঘাট হতে একটি রিক্সা নিয়ে সরাসরি হল গেটে নামলাম। গেটে দারোয়ান জিজ্ঞাসা করলেন কার কাছে যাব ? গোলাপ ভাইয়ের নাম বললাম। আব্দুস ছোবাহান গোলাপ, সূর্যসেন হল ছাত্র সংসদের নির্বাচিত সহসভাপতি (ভিপি)। অনেক আন্তরিকতা ও দরদের সাথে আমাকে যথাস্থানে পৌঁছে দিলেন। বর্তমান ড. আব্দুস ছোবাহান গোলাপ এমপি, বাংলাদেশ  আওয়ামী লীগ এর  প্রচার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

১৯৮১ সাল হতে ১৯৮৭ সালের ১১ নভেম্বর পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ছয় বছর প্রিয় ঐতিহাসিক মাস্টার’দা সূর্য সেন হলের দু’টি কক্ষে পর্যায়ক্রমে (৩০২ ও ৩০৯) আমার থাকার সৌভাগ্য হয়েছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের কিছু ঘটনা,কাজ, স্মৃতি স্মরণ থেকে সুধি পাঠকের সামনে তুলে ধরছি। আমি গদ্য লেখক বা ঐতিহাসিক নই। আশা করি সম্মানিত পাঠক আমাকে সে বিষয়ে সুদৃষ্টি রেখে নিজগুণে ক্ষমা করবেন।

 

বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে আমি আর বাড়ি যাইনি। দিনের বেলায় বিশ্ববিদ্যালয়ের এখানে সেখানে ঘোরাঘুরি করি, মিছিল-মিটিংয়ে যাই, টিএসসিতে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আর বটতলা/অপরাজেয় বাংলা/মধুর কেন্টিন/টিএসসি চত্ত্বরে ছাত্রনেতাদের বক্তৃতা শুনি। হলের ক্যান্টিন বা ক্যাফেটেরিয়ার খাই। রাত্রে টিভি দেখে ৩০২ নং কক্ষে ঘুমাই। ঐ কক্ষে এম.এ শেষ পর্বের একজন বড় ভাই থাকেন। গোলাপ ভাইয়ের খুবই অনুগত।

 

সূর্য সেন হল ছাত্র সংসদের নির্বাচিত  ভিপি আব্দুস ছোবাহান গোলাপ ভাইয়ের মাধ্যমে ডাকসু’র সাংস্কৃতিক ও সামাজিক আপ্যায়ন সম্পাদক তৎকালীন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদের সাংস্কৃতিক সম্পাদক জনাব লিয়াকত আলী লাকী (বর্তমানে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীর সুযোগ্য মহাপরিচালক) ভাইয়ের সাথে পরিচিত হই। তখন তিনি ডাকসু’র সহযোগী সংগঠন ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দল’ (ঢাবিসাদ) গঠন করেন। টিএসসিতে ২/৪ দিন যাওয়া আসার পর আমার আগ্রহ ও অনুরোধে আমার মত মফস্বল হতে আসা একজন বাঙালকে ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দল’ এর সদস্য করে নিলেন।  আমি সাংস্কৃতিক দল ও পরবর্তীতে তারই প্রতিষ্ঠিত  লোকনাট্য দলে অংশগ্রহণের পর হতেই লাকী ভাইয়ের স্নেহ ও ভালবাসায় সিক্ত । তাঁর দিকনির্দেশনায় প্রতিনিয়ত সমৃদ্ধ হয়েছি। তার কাছ থেকেই অভিনয়, অনুষ্ঠান গ্রন্থনা, পরিচালনা ইত্যাদি হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ লাভ করি। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে দীর্ঘ সাড়ে ৬ বছর ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র (টিএসসি) অর্থাৎ ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দল’ (ঢাবিসাদ) এর কার্যালয়  ছিল আমার দ্বিতীয় আবাসস্থল।

 

আমি ১৯৭০ সাল হতে ছাত্রলীগ এর রাজনীতির সাথে সক্রিয়ভাবে সংশ্লিষ্ট । তাই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে ছাত্র রাজনীতির সাথে সাথে নতুন করে সমান তালে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও জড়িয়ে পড়ি। বাংলাদেশের গ্রুপ থিয়েটার আন্দোলনের প্রতিষ্ঠালগ্নে অন্যতম সংগঠন ’লোকনাট্য দল’ এর লাকী ভাই ও খেলন ভাইয়ের (প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ মরহুম আব্দুল মালেক উকিলের ছেলে জনাব বাহার উদ্দিন খেলন) বদান্যতায় একজন নাট্যকর্মী হিসেবে কাজ করার সুযোগ লাভ করি।

 

লাকী ভাই একদিন ডেকে বললেন, অসি আজ বিকেলে আপা (শেখ হাসিনা) ৩২ নং যেতে বলেছেন (আপা তখন সেখানে থাকতেন)। আমাদের সাথে তুমিও থাকবে। আপা যেতে বলেছেন আর ৩২ নং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর বাস ভবনে যাব এর চেয়ে সৌভাগ্য ও আনন্দের সংবাদ আর কি হতে পারে!  যথাসময়ে ৩২ নম্বর ধানমন্ডিতে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে গেলাম। দুপুরে আপা আমাদের নিজ হাতে নানা উপাদেয় সুস্বাদু খাবার খেতে দিলেন। এমন সুস্বাদু খাবার বাড়ি হতে ঢাকা আসার পর যা খাইনি।

তারপর আপা অনেক কথার পর লাকী ভাইকে বললেন, লাকী সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে আমাদের ছাত্র সংগঠন খুবই দুর্বল, এ দিকটি তোমাকে দেখতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ও নাট্যাঙ্গনে বাঙ্গালি  সংস্কৃতি চর্চা  লালন করতে হবে। আর সে ক্ষেত্রে মুজিবাদর্শের সৈনিকেরা থাকবে সামনের কাতারে। এজন্য তুমি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ কর। আমাদের সকলের কুশলাদি জিজ্ঞাসার পর মাথায় হাত বুলিয়ে আদর ও দোয়া করে দিলেন। বিকেলে খাঁটি ঘি ও চিনি দিয়ে ভাজা মুড়ি ও আদা চা খেয়ে বিদায় গ্রহণ করি। এরপর ফুল টাইম রাজনৈতিক কর্মী হতে ফুল টাইম সাংস্কৃতিক কর্মী হয়ে গেলাম। লাকী ভাইও সেভাবে আমাদের প্রস্তুত করেছিলেন । ৮০ দশকে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক আন্দোলনের একজন অগ্রসেনা ছিলেন লিয়াকত আলী লাকী। তাঁর পাশে আমরা কজনা কাজ করতে পেরে আজও নিজেকে ধন্য মনে করছি। ছাত্র জীবনের আপার সে নির্দেশ ৩৭ বছর পর আজও পালন করার চেষ্টা করছি।

 

‘পঁচাত্তর পরবর্তী’ দুঃসময়ে বাংলাদেশে উল্টো হাওয়া বইছিল । পঁচাত্তরে স্বাধীনতাবিরোধী চক্র জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করে। জাতির পিতাকে হত্যা করেই, তারা বাঙালির ইতিহাস ঐতিহ্য আর মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে নির্বাসনে পাঠায়। বঙ্গবন্ধু, শেখ মুজিব, জয় বাংলা, মুক্তিযোদ্ধা, স্বাধীন বাংলা– এ শব্দগুলোর নাম নেয়াও তখন নিষিদ্ধ ছিলো। বঙ্গবন্ধু, জাতির পিতা বা শেখ মুজিব নাম উচ্চারণ করা ছিলো অনেক ঝুঁকিপূর্ণ। বাঙালির প্রকৃত ইতিহাসের পাতায় কালিমালেপন করে ইতিহাস বিকৃতির মাধ্যমে  নতুন প্রজন্ম কে বিভ্রান্ত করা হয়েছিল। নতুন প্রজন্ম আর মহান মুক্তিযুদ্ধের মাঝে সুকৌশলে তৈরি করা হচ্ছিল অদৃশ্য এক অন্ধকার দেয়াল, বন্দুকের নলের মাথায় স্বাধীনতার ইতিহাসকে করেছিল ভূলুণ্ঠিত।

 

তখন শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসেই নয়, সারা দেশেই বাঙালি সংস্কৃতি ও কৃষ্টিকে বিদেশী অপসংস্কৃতি প্রায় গ্রাস করে ফেলেছে। সেই নষ্ট সময়ে, শুধুমাত্র দেশপ্রেম, সততা আর মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সম্বল করে ১৯৮২ সালের ৭ সেপ্টেম্বর এক ক্রান্তিকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দল (ঢাবিসাদ) এর বন্ধুর পথচলা শুরু। নিজেদের সংস্কৃতি ও কৃষ্টিকে রক্ষা করা, স্বাধীনতার মূল্যবোধকে টিকিয়ে রাখা, স্বৈরাচারি কর্মকান্ডকে প্রতিহত করাসহ মানবিক মূল্যবোধকে জাগিয়ে তুলে আলোকিত মানুষ হিসেবে নিজেদের গড়ে তুলতেই এই সংগঠনটির জন্ম। এজন্য দলের প্রধান লিয়াকত আলী লাকী ভাই অন্যান্যদের সাথে আলাপ আলোচনান্তে বছরব্যাপী বিষয় ভিত্তিক ১০০টি সেমিনার করার পরিকল্পনা ও তা যথাসময়ে সঠিকভাবে  বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। সেমিনারে বাঙালি সংস্কৃতি ও কৃষ্টি, মহান ভাষা আন্দোলন, মহান স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধ, বাঙালি জাতীয়তাবাদ, দেশপ্রেম প্রভৃতি বিষয়ে সেকালের দেশসেরা শিক্ষাবিদ, বুদ্ধিজীবী, কবি-সাহিত্যিক, বীর মুক্তিযোদ্ধাগণ জ্ঞানগর্ব আলোচনা করতেন।

 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দল (ঢাবিসাদ)  হলো ৮০’র দশকে বাংলাদেশে আঁধারের ‘বতিঘর’। আর এই ‘বতিঘর’ এর অভিভাবক হলেন ডাকসু’র সাংস্কৃতিক ও সামাজিক আপ্যায়ন সম্পাদক তৎকালীন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সাংস্কৃতিক সম্পাদক জনাব লিয়াকত আলী লাকী ভাই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দল (ঢাবিসাদ) এর শ্লোগান ছিলো ‘আমরা সুন্দরের অতন্দ্র প্রহরী’ । ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সকল র‍্যালীর অগ্রভাগে থেকে এ শ্লোগান লেখা ব্যানার নিয়ে দলের ছেলেমেয়েরা সাদা পোষাক পরে গান গেয়ে নেতৃত্ব দিয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দল (ঢাবিসাদ) এর শান্তি ও সুন্দরের মিছিল সকল পত্র-পত্রিকার সাংবাদিক, সকল শিক্ষার্থি, পথচারীর নজর কেড়েছে । প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ প্রফেসর ড. আবু হেনা মোস্তফা কামাল স্যারের কাছে একাধারে ১৫/২০ দিন লেগে থেকে এই শ্লোগানটি আমি সংগ্রহ করেছিলাম।

লাকী ভাইয়ের একান্ত প্রচেষ্টায় ১৯৮৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন অপসংস্কৃতির প্রতীক ‘র‌্যাগ ডে’র পরিবর্তে নবীন-প্রবীনের মিলনমেলা ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দিবস’ আয়োজনের সিদ্ধান্ত নিলো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দল (ঢাবিসাদ) এ দিবসের অনুষ্ঠান ব্যবস্থাপনা ও দিনব্যাপী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানমালা প্রদর্শনের দায়িত্ব নিলো।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দল (ঢাবিসাদ)  স্বৈরাচারি এরশাদ সরকারের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসসহ বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন ও রাজনৈতিক দলের সভায় আন্দোলনের চেতনা-জাগানো গণসংগীত, বৃন্দ-আবৃত্তি, পথ-নাটক প্রদর্শনী, রাজপথ কাঁপানো মিছিল   অব্যাহত রাখে। অমর একুশের র‍্যালী, মহান স্বাধীনতা দিবস, মহান বিজয় দিবস, নববর্ষ, রবীন্দ্র-নজরুল জয়ন্তীসহ সকল অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দলের অংশগ্রহণ ছিলো চেখে পড়ার মত। মহানস্বাধীনতা দিবস ও বিজয় দিবসে সাভারের মহান স্মৃতি সৌধে, রায়ের বাজার বদ্ধভূমিতে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে প্রচারিত সেই মুক্তিযুদ্ধের গান যা ছিলো অলিখিতভাবে নিষিদ্ধ ও দেশাত্মবোধক গান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দল (ঢাবিসাদ)  সদস্যবৃন্দ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পরিবেশন করতো।

 

আশির দশকের স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন তখন তুঙ্গে। তারই অংশ হিসাবে আমরা নিয়মিত অনুষ্ঠানের পাশাপাশি ১৫ দলের স্বৈরাচার বিরোধী জনসভায় প্রচুর অনুষ্ঠান করেছি । তখন রক্তে এক অন্য রকম উন্মাদনা। সাংস্কৃতিক দলের গান, নৃত্য, আবৃত্তি, নাটক স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে অনন্য ভূমিকা রেখেছিলো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দল (ঢাবিসাদ) ময়মনসিংহ গীতিকা অবলম্বনে গীতিনৃত্যনাট্য ‘সোনাই মাধব’ মঞ্চস্থ করে, যা দর্শক-শ্রোতাকে বিমোহিত করেছিল।

 

মহান মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত শক্তি জামাত, মুসলিম লীগ, রাজাকার-আলবদর এবং তাদের দোসর ক্ষমতাসীন স্বৈরাচারি এরশাদ সরকার এর বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিবাদী পথ-নাটক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দল (ঢাবিসাদ) এর দুঃসাহসিক প্রযোজনা ‘রয়েল বেঙ্গল টাইগার’ । সারাদেশে ‘রয়েল বেঙ্গল টাইগার’ বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছিল।  ম্যাক্সিম গোর্কির রূপকধর্মী পথ-নাটক ‘অবিরাম পাউরুটি ভক্ষণ’ যা বোদ্ধা দর্শক মহলে খুবই প্রশংসিত হয়। দলের নিরীক্ষাধর্মী প্রযোজনা মনস্তাত্ত্বিক নাটক ‘সেই মেয়ে’ প্রচুর প্রশংসা কুড়িয়েছিল। সাংস্কৃতিক দলের বৃন্দ-আবৃত্তি ‘বিস্ফোরণের বৃন্দগান’ মানুষকে আন্দোলনের পথে আহ্বান জানালো।

 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দল (ঢাবিসাদ) এর গঠনতন্ত্র অনুসারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদাধিকারবলে প্রধান পৃষ্ঠপোষক। তখনকার নব নির্বাচিত ভিসি প্রফেসর ড. আব্দুল মান্নান স্যারকে টিএসসি’র গেমস্ রুমে ঢাবিসাদ এর পক্ষ হতে সংবর্ধনা দেবার প্রাক্কালে ছাত্রদল নামধারী কিছু দুর্বৃত্তের  আকষ্মিক হামলায় সেই অনুষ্ঠানটি পণ্ড হয়ে যায়। আমরা সবাই কমবেশী এতে আহত হই। কেউ কেউ নিরাপদ আশ্রয় গ্রহণ করে। কিছু দুর্বৃত্ত সাংস্কৃতিক দলের মেয়ে সদস্যদের অপমান করে। সেই দিন সেই গভীর রাতে লাকী ভাইয়ের নির্দেশে সাবিনা লাকীকে তার বাসায় পৌঁছে দিয়ে আসি ।

 

অচিরেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দল (ঢাবিসাদ) এর সুনাম সারাদেশে ছড়িয়ে পড়লো। দেশের প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং বিভিন্ন জেলায় আয়োজিত বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দল নির্ভয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার গান, কবিতা, নাটক, কথিকা প্রচার করেছে। বিশেষ করে বঙ্গবন্ধু পরিষদের অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দল (ঢাবিসাদ) এর সরব উপস্থিতি ও সহযোগিতা স্মরণীয়। বিভিন্ন স্থানে অনুষ্ঠান করতে গিয়ে অনেক সময় হামলারও শিকার হতে হয়েছে।

 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দল (ঢাবিসাদ) প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই দাবী করে আসছিলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পৃথক  নাট্যতত্ত্ব বিভাগ ও সংগীত বিভাগ চাই। লিয়াকত আলী লাকী ভাইয়ের নেতৃত্বে এই বিভাগসমূহ খোলার দাবীতে আন্দোলন করেছে, তৎকালীন উপাচার্যদের কাছে স্মারক লিপি দিয়েছে। বর্তমানে  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নাট্যতত্ত্ব বিভাগ ও সংগীত বিভাগ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দলেই প্রচেষ্টার ফসল।সাংস্কৃতিক দল বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ‘মুক্ত মঞ্চ’ নির্মাণ করার জন্য এবং অভিনয় নিয়ন্ত্রণ আইন বাতিলের দাবীতে আন্দোলন করেছিল। যা আজ কমবেশি বাস্তবায়ন হয়েছে।

 

 

বিশেষ করে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর শাহাদৎ বার্ষিকী  ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবস ও তাঁর জন্মদিন পালন সে সময়ে নিষিদ্ধ ছিলো। ডাকসু’র সাংস্কৃতিক ও সামাজিক আপ্যায়ন সম্পাদক তৎকালীন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সাংস্কৃতিক সম্পাদক জনাব লিয়াকত আলী লাকী ভাইয়ের নেতৃত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দল (ঢাবিসাদ) অকুতোভয় মুজিবাদর্শের সন্তানেরা জীবনকে বাজি রেখে সেই সময় ট্রাকে করে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর শাহাদৎ বার্ষিকী পালন মুজিব হত্যার বিচার দাবী করেছি। এরূপ একদিন অনুষ্ঠান করার সময় ফ্রিডম পার্টির সন্ত্রাসীরা সরকারের ছত্রছায়ায় আমাদের ট্রাকের দিকে ককটেল ছুঁড়ে মারে।

 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দল (ঢাবিসাদ) এ দেশের সাংস্কৃতিক ও গণ আন্দোলনের ইতিহাসে একটি মাইলস্টোন। লাকী ভাইয়ের নেতৃত্বে সকল সাংস্কৃতিক কর্মী ও সংগঠন ঐক্যবদ্ধ হয়ে স্বৈরাচারী সামরিক শাষকের পতনের লক্ষ্যে ‘সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট’ ও ‘আবৃত্তি ফেডারেশন’ গঠন করে , যার প্রধান চালিকা শক্তি ছিলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দল (ঢাবিসাদ)। নব্বইয়ের গণআন্দোলনের পটভূমি রচনায় ও স্বৈরাচারের পতন নিশ্চিত করতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দল ও লাকী ভাইয়ের ভূমিকা ছিলো অবিস্মরণীয়।

 

১৯৮৫ সালের ১৫ অক্টোবর টিএসসি’র দোতলায় প্রখ্যাত নাট্যকার সেক্সপিয়ারের ‘এ মিড সামার নাইটস ড্রিম’ নাটকের মহড়া হচ্ছে। নাটকের নিদের্শক জনাব বাহার উদ্দিন খেলন (বাংলাদেশ টেলিভিশনের সাবেক বার্তা সম্পাদক/উপ-মহাব্যবস্থাপক) তখন রাত আনুমানিক ১০ টা হবে, নাটকের চূড়ান্ত মহড়ায় একান্তভাবে মনোনিবেশ, বাদ্যযন্ত্রের শব্দ, মুষলধারে বৃষ্টি, ঝড়োহাওয়া প্রভৃতি কারণে বাহিরের কিছুই আমরা উপলদ্ধি করতে পারিনি।

 

একটু বৃষ্টি থামতেই যার যার গন্তব্যস্থলে যাওয়ার জন্য নীচে নামলেই জগন্নাথ হলের প্রান্ত হতে গগন বিদারী আর্তনাদ ভেসে আসে। আমরা দৌঁড়ে সকলেই ঐদিকে চলে যাই। গিয়ে দেখি পূর্ব বাড়ির টিভি রুমের (সাবেক এ্যাসেম্বলী হাউজ) ছাদ ধ্বসে পড়েছে । প্রথমে হলে অবস্থানরত বন্ধুদের খোঁজ খবর নিলাম। তখন অনেককেই খুঁজে পাচ্ছিলামনা। যুব রেড ক্রসের সাথে সংশ্লিষ্ট থাকার সুবাদে ফাস্ট এইড ও রেসকিউ সম্পর্কে ধারণা ও দক্ষতা ছিল সেই সম্বল নিয়েই কাজ শুরু করলাম। ইতোমধ্যে তৎকালীন যুব রেড ক্রস প্রধান ও নাট্যকর্মী  (নাট্যচক্র) সৈয়দ আব্দুল আজিজ ভাই, তুহিন ভাই, বাবু ভাই, তাজ ভাইসহ অনেকেই এসে পড়েছে। তৎকালীন বাংলাদেশ রেড ক্রস সোসাইটির মহাসচিব মেজর (অবঃ) আলী হাসান কোরেশী স্যারের সাথে যোগাযোগ করলে তিনি রাত্রেই ১০/১২ টি বিভিন্ন ধরণের গাড়ী এবং বিপুল সংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারীকে এ উদ্ধার কার্যক্রমে আমাদেরকে  সার্বিক সহযোগিতা করার নির্দেশ দান করেন।

 

ঐ রাত্রেই প্রচুর পরিমাণে বরফ, চা পাতা, কর্পুর ও মরদেহ বহনের জন্য কাঠের বক্স সংগ্রহের দায়িত্ব পালন করি। হাসপাতালে আহতদের জন্য সকালে টিএসসি’তে রেড ক্রসের মোহাম্মদপুরস্থ ব্লাড ব্যাংকের সহযোগিতায় স্বেচ্ছায় রক্তদান সংগ্রহের ব্যবস্থা করি। ঐ দিনই (১৬/১০/৮৫) জীবনে প্রথম সকালে ও একই দিন বিকেলে  ২ বার (এ বিষয়ে তখন-জানতামনা) রক্ত প্রদান করি । ঐ সময়ে আর্ত মানবতায় সেবায় রেড ক্রস কর্তৃপক্ষের ভূমিকা এবং সহযোগিতাই পরবর্তীতে আমাকে এ প্রতিষ্ঠানের সাথে সংশ্লিষ্ট হতে অনুপ্রাণিত করেছে। ঐ সময়ে আমার গৌরনদী এলাকার ৩ জন ছাত্র মৃত্যুবরণ করে। ঢাকা মেডিকেল ও তৎকালীন পিজি হাসপাতালে এক নাগারে একাধিক দিন আহত ছাত্রদের পাশে থেকে সেবা প্রদান করেছি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. এম. এ. মান্নান এবং জগন্নাথ হল কর্তৃপক্ষ  আমার স্বেচ্ছাসেবার স্বীকৃতি স্বরূপ সনদপত্র প্রদান করেন।

 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দল (ঢাবিসাদ) এর সদস্যগণ স্বেচ্ছায় রক্তদান, বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আহত ছাত্রদের পাশে থেকে সেবা প্রদান এবং ১৬ অক্টোবর ১৯৮৫ সালের সকাল বেলায় তাৎক্ষণিকভাবে রচিত ও সুরারোপিত ‘অবহেলায় আর মৃত্যু নয়’ শোক সঙ্গীত লিয়াকত আলী লাকী ভাইয়ের নেতৃত্বে গেয়ে সমবেদনা জ্ঞাপন করেন।

 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দল (ঢাবিসাদ) এর সদস্যগণ অনেকেই আজ দেশে বিদেশে সুপ্রতিষ্ঠিত। স্ব স্ব অবস্থান থেকে তারা দেশ ও জাতির কল্যাণে ও মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সমুন্নত রাখতে ‘আমরা সুন্দরের অতন্দ্র প্রহরী’ হয়ে নীরবে নিভৃতে কাজ করে যাচ্ছে।

 

জয়তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দল (ঢাবিসাদ) । জয়তু লিয়াকত আলী লাকী ভাই ।

 

লেখক: মোঃ নূর ইসলাম খান অসি । নাট্যকার, প্রবন্ধকার ও সংগঠক । ছাত্র জীবনে দির্ঘদিন (১৯৭০-১৯৮৭) মুজিবাদর্শের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের সাথে সক্রিয়ভাবে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। পরিচালক- ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচি (সিপিপি), দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার ।

সভাপতি- বঙ্গবন্ধু পরিষদ, বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি। মোবা: ০১৮১১-৪৫৮৫০৭


Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান