ইসলাম কেন সহজ শিকার

Sat, Jan 4, 2020 1:01 PM

ইসলাম কেন সহজ শিকার

স্নেহাশীষ রয়: ১.গত সপ্তাহে শ্রীলংকায়, মুসলিমদের বাড়ী-ঘর জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে। ভারতে, মুসলিম-বিদ্বেষের সরাসরি ফলাফল বিজেপির উত্থান। বার্মায় রোহিঙ্গা মুসলিমরা দেশ থেকে বিতাড়িত। চীনে উইঘুর মুসলিমদের অবস্থা আরো শোচনীয়।

পাশ্চাত্যে মুসলিম বিদ্বেষ যদিও এতোটা প্রকট নয়। কিন্তু ইয়োরোপে আমেরিকায়, ক্রমশ: মুসলিম বিদ্বেষ দানা বেঁধে উঠছে।

এই ধরণের বর্ণবাদ যখন দেশে দেশে দানা বাঁধে, তা মূলত: ভূপৃষ্ঠের তলে লাভার সঞ্চয় হয়, শুধু অগ্নুৎপাতের অপেক্ষা। দু:খজনক হলো, অগ্নুপাত হলে, লাভার আগুন সম্প্রদায় দেখে পুড়াবে না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে, ইহুদী মারা যায় ষাট লাখ, কিন্তু সাথে সাথে, এক কোটি জার্মান নাগরিকও প্রাণ হারায়।

তাই বর্ণবাদের ঘৃত, গায়ে মাখিয়ে, হয়তো ,আনন্দ লাভ করা যায়, কিন্তু জতুগৃহে আগুন লাগলে, কেউ বাঁচবে না।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর, পৃথিবীতে ছিল মিলনের সুর। ধর্মবাদ, বর্ণবাদ, ফ্যাসিবাদের বিপরীতে বৃহত্তর মানবতার ঐক্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল পৃথিবী। শুধু পাশ্চাত্যে নয়, এমনকি ধর্ম-অন্ত:প্রাণ বিশ্বেও, ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র গড়ে উঠেছিল, যেমন তুরষ্ক , বাংলাদেশ, ভারত । কিন্তু দু:খজনক হলো, তুর্কী, বাংলাদেশের মতো, রাষ্ট্রগুলো যখন ইসলামী বিশ্বের মডেল হয়ে উঠার কথা, তখন এরাদোয়ান, মোদীর মতো নেতৃত্বের উত্থান ঘটেছে। পৃথিবীর মিলনের সুর, ১৮০ ডিগ্রী ঘুরে , উল্টো দিকে রওনা হয়েছে।

 

হিন্দুদের প্রধানতম দেশটি হিন্দুত্ববাদী রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। প্রায় অর্ধশতাধিক মুসলিম দেশের প্রায় সবক'টিই ধর্মীয় রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। আমেরিকা-ব্রিটেনে ট্রাম্প , জনসনের উত্থান ঘটেছে। মোটামুটি ভাবে, পুরো পৃথিবীতেই ডান পন্থার উত্থান ঘটেছে।

 

পুরো বিষয়টিই ঘটেছে, ইসলামকে কেন্দ্র করে।

 

দ্বিতীয় বিশ্বের পর, উপনিবেশিক পৃথিবীর পতন ঘটেছে। কিন্তু উপনিবেশবাদের যে মূল বিষয়, বাণিজ্য, তা বন্ধ হয় নি। বরং বাণিজ্যের আধিপত্যের জন্য, নব্য উপনিবেশবাদী শক্তিগুলোর উত্থান ঘটেছে। পাশ্চাত্যের তেল ও অস্ত্র বাণিজ্যের জন্য, যুদ্ধ এক অপরিহার্য বিষয়। মধ্যপ্রাচ্য তেলের উপর ভাসছিল। আপন-মাংসে হরিণ বাঘের শত্রু। মধ্য প্রাচ্যের তেল না থাকতো, অথবা তেল বিক্রি করে অস্ত্র কেনার সঙ্গতি না থাকতো, তবে হয়তো, এই আকারের ইসলামোফোবিয়ার সৃষ্টি হতো না।

তাই পাশ্চাত্যে বাণিজ্য-নীতির সবচেয়ে সহজ শিকার হলো, ইসলাম। পাশ্চাত্যে প্রধান শত্রু হলো, চীন , রাশিয়া। পাশ্চাত্য কি চাইলে, চীন-রাশিয়াকে নিয়ে খেলাটি খেলতে পারবে?

ইসলাম কেন সহজ শিকার বলছি, তার কারণও আছে। পৃথিবীর প্রতিটি ধর্মই, সময়ের সাথে সাথে বিবর্তিত হয়েছে। পৃথিবীর প্রধানতম ধর্ম খ্রীষ্টধর্ম, এতোটাই পরিবর্তিত হয়েছে, আমার ভাবতেই অবাক লাগে। হিন্দু ধর্মও তাই। হিন্দুদের সেই বর্ণবাদ নেই, ভারত হিন্দু আইনকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে, সিভিল আইনে চলছে। এমনকি বিজেপিও হিন্দু আইন ফিরিয়ে আনার কথা বলে না।

 

কিন্তু ইসলামের ব্যাপারটি ভীষণ ভিন্ন। পিউ রিসার্চের এক জরিপে দেখা গেছে, ওভারহুয়েলমিং মেজরিটি মুসলিম, মধ্যযুগীয় ইসলামিক নিয়ম কানুনে চলতে চায়। ওহাবিজমের মতো পিরিটান মতবাদ, দিনের পর দিন, আরো বেশী জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।

 

যেখানেই কট্টর অপরর্তিনীয় মতবাদ, সেখানেই বিভাজনের সুর। ১৪০০ বছর আগের কারবালার ক্ষতটি, এখনো ইসলাম সারিয়ে তুলতে পারে নি। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘর্ষের মূলে রয়েছে, শিয়া-সুন্নীর বিভাজন। পাশ্চাত্য শুধু এটি ব্যবহার করে, দেধারছে, অস্ত্র আর তেলে বাণিজ্য করছে। শিয়া-সুন্নীর বিভাজন কোন দিনই শেষ হবে না, যতদিন না পর্যন্ত এই অপরিবর্তনীয় মানসিক কারগার থেকে, ইসলাম বেরিয়ে আসবে। ডিম কিভাবে ভাঙ্গা হবে, তা নিয়ে যুদ্ধটি চলতেই থাকবে। আর ফায়দাটি লুটবে, নব্য উপনিবেশিক শক্তিগুলো।

 

বাণিজ্য কখনোই মানবতার কথা ভাবে না। নব্য উপনিবেশিক শক্তিগুলো তা ভাববেও না। নিজেকে রক্ষা নিজেকেই করতে হবে। কিন্তু ইসলাম নিজেকে রক্ষা করতে পরিপূর্ণভাবে ব্যর্থ।

 

আরেকটি বিষয় হলো, সাংস্কৃতিক বিভাজন। নারী-স্বাধীনতা, যৌনতা, শরীয়া প্রভৃতি বিষয় নিয়ে ইসলামের দৃষ্টি ভঙ্গি, আমার মনে হয়, সমগ্র পৃথিবীর মানুষ থেকে ভীষণ রকম আলাদা হয়ে যাচ্ছে। এমনকি পাশ্চাত্যের দেশে বহুদিন বাস করে, অনেক মুসলিম , এই সাংস্কৃতিক বিভাজনটি বিন্দুমাত্র কমাতে সক্ষম হয় না। এই যে সাংস্কৃতিক ভাবে, ইসলামের সংস্কৃতির যে বিচ্ছিন্নতা, সেটিও ধীরে ধীরে প্রকট হচ্ছে, ইদানিংকালে, পিউরিটান ধর্মচর্চার জনপ্রিয়তার কারণে।

 

অবশ্যই, ইসলামের অধিকার আছে, নিজস্ব ধর্ম পালনের। তাঁরা কিভাবে, ধর্ম-সমাজ-রাষ্ট্রকে সাজাবে , এটা তাঁদের নিজস্ব অধিকার। কিন্তু তাঁদের সুপ্রাচীন ফান্ডামেন্টালকে আঁকড়ে ধরতে গিয়ে, ইসলাম কি পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে না? প্রাচীন মূল্যবোধ-নিয়ম-নীতির চর্চা হয়তো, তাঁদের সৃষ্টিকর্তার সন্ধান দেবে, কিন্তু পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষেরাই তো পার্থিব। তাই পৃথিবীকে শান্তিপূর্ণ করার জন্য, ধর্মের উর্ধ্বে উঠে মানব প্রজাতির একতার বিষয়টি মূখ্য বিষয়। এই ইসলামের সাংস্কৃতিক বিভাজনটি কি সত্যিই শান্তিপূর্ণ পৃথিবীর জন্য পরিপূরক?


Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান