সোলাইমানি হত্যার প্রতিশোধ নিতে কতোটা সক্ষম ইরান?

Sat, Jan 4, 2020 12:17 PM

সোলাইমানি হত্যার প্রতিশোধ নিতে কতোটা সক্ষম ইরান?

মার্কিন বিমান হামলায় শুক্রবার ইরানের অভিজাত কুদস ফোর্সের কমান্ডার জেনারেল কাসেম সোলাইমানি নিহত হওয়ার পর দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি 'চরম প্রতিশোধ' নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। তবে এই 'চরম প্রতিশোধ' নেওয়ার জন্য আসলে কতোটা সক্ষম ইরান? ইরানের সামরিক বাহিনীর শক্তিই বা কতটুকু?

এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করা হয়েছে বিবিসির এক প্রতিবেদনে।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল ইন্সটিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের সামরিক বাহিনীর বিভিন্ন স্তরে প্রায় ৫ লাখ ২৩ হাজার সক্রিয় সদস্য আছে। এর মধ্যে ৩ লাখ ৫০ হাজার নিয়মিত সেনা সদস্য এবং কমপক্ষে এক লাখ ৫০ হাজার ইসলামিক রিভলিউশানারি গার্ড কর্পস বা আইআরজিসি।

এ ছাড়া আরও ২০ হাজার সদস্য আছে আইআরজিসির নৌবাহিনীতে। এরা হরমুজ প্রণালিতে আর্মড পেট্রল বোট পরিচালনা করে। আইআরজিসি বাসিজ ইউনিটও নিয়ন্ত্রণ করে, যারা মূলত স্বেচ্ছাসেবী ফোর্স। মূলত অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ মোকাবেলায় তারা কাজ করে। এরা দ্রুত হাজার হাজার মানুষকে জমায়েত করতে পারে।

 

আইআরজিসি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ৪০ বছর আগে, যা পরবর্তী সময়ে বড় সামরিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়। একে ইরানের সবচেয়ে প্রভাবশালী বাহিনী বলে মনে করা হয়।

 

আইআরজিসির অভিজাত বাহিনী হচ্ছে কুদস ফোর্স, যার নেতৃত্বে ছিলেন জেনারেল কাসেম সোলাইমানি। এই কুদস ফোর্স ইরানের বাইরে অনেক গোপন অভিযান পরিচালনা করে এবং তারা সরাসরি দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির কাছে জবাবদিহি করে। এই ইউনিটকেই সিরিয়াতে মোতায়েন করা হয়েছিল, যারা সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ ও সশস্ত্র শিয়া মিলিশিয়াদের সঙ্গ একত্রে যুদ্ধ করেছে। ইরাকে তারা শিয়া নিয়ন্ত্রিত একটি প্যারা মিলিটারি ফোর্সকে সমর্থন করতো যারা ইসলামিক স্টেট গ্রুপের পরাজয়ে সহায়তা করেছে।

 

যদিও যুক্তরাষ্ট্র বলছে কুদস ফোর্স অর্থ, প্রশিক্ষণ, অস্ত্র ও উপকরণ দিয়েছে এমন সংগঠনকে যাদের যুক্তরাষ্ট্র সন্ত্রাসী গ্রুপ হিসেবে মনে করে। এর মধ্যে লেবাননের হিযবুল্লাহ আন্দোলন এবং ফিলিস্তিনের ইসলামিক জিহাদও রয়েছে।

 

তবে অর্থনৈতিক সমস্যা ও অবরোধ ইরানের অস্ত্র আমদানিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। দেশটির প্রতিরক্ষা খাতে ২০০৯ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে যে পরিমাণ অস্ত্র আমদানি হয়েছে তা সৌদি আরবের মোট সামরিক আমদানির মাত্র ৩ দশমিক ৫ শতাংশ। অস্ত্র আমদানি কম হলেও ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা যথেষ্ট ভালো বলে মনে করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগের মতে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র শক্তি মধ্যপ্রাচ্যে সবচেয়ে বড়, বিশেষ করে স্বল্প ও মাঝারি পাল্লার। তারা আরও বলছে, ইরান স্পেস টেকনোলজি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছে, যাতে করে আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করা যায়।

 

তবে রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিস ইন্সটিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালের পরমাণু চুক্তির পর ইরান দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি স্থগিত করেছিল। অবশ্য তারা এও বলছে যে, ওই চুক্তির অনিশ্চয়তার কারণে ইরানের দূরপাল্লার এই ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি আবার শুরু হয়ে যেতে পারে।

 

অনেক ক্ষেত্রেই সৌদি আরব ও উপসাগরীয় এলাকার অনেক দেশ বা স্থাপনা ইরানের স্বল্প বা মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের আওতার মধ্যেই রয়েছে, বিশেষ করে ইসরায়েলে সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুগুলো। এ ছাড়া আরও প্রমাণ আছে যে, তেহরানের আঞ্চলিক মিত্ররাও ইরানের সরবরাহ করা ক্ষেপণাস্ত্র ও গাইডেন্স সিস্টেম ব্যবহার করে, বিশেষ করে সৌদি আরব, ইসরায়েল ও আরব আমিরাতের টার্গেটগুলোর ক্ষেত্রে।

 

গত বছরের মে মাসে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে প্যাট্রিয়ট অ্যান্টি মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেম মোতায়েন করে, যা ইরানের সঙ্গে উত্তেজনা বাড়িয়ে দেয়। এর মানে হলো, পাল্টা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ক্রুজ মিসাইল ও অগ্রবর্তী এয়ারক্রাফট।

ইরানের ড্রোন সক্ষমতাও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেশ বেড়েছে। ইসলামিক স্টেটের (আইএস) বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ২০১৬ সাল থেকেই ইরাকে ড্রোন ব্যবহার করে ইরান। ২০১৯ সালের জুনে ইরানের আকাশসীমা লঙ্ঘনের অভিযোগে তারা যুক্তরাষ্ট্রের একটি ড্রোন ভূপাতিত করে। এর বাইরে তারা ড্রোন প্রযুক্তি তাদের মিত্রদের কাছেও স্থানান্তর বা বিক্রিও করেছে বলে দাবি সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের। ২০১৯ সালে সৌদি তেল ক্ষেত্রে ড্রোন হামলার জন্যও দেশটির পক্ষ থেকে ইরানকেই দায়ী করা হয়। যদিও তেহরান এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে। বরং তারা ইয়েমেনের বিদ্রোহীদের দায় স্বীকারের দিকে ইঙ্গিত করেছে।

 

ড্রোনের মতো সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরানের সাইবার সক্ষমতাও বেড়েছে বলে মনে করা হয়। ২০১০ সালে ইরানের পরমাণু কর্মসূচির ওপর বড় ধরনের সাইবার অ্যাটাকের পর তারা সাইবার স্পেস সক্ষমতায় জোর দেয়। বর্তমানে আইআরজিসির নিজস্ব সাইবার কমান্ড আছে বলে মনে করা হয়।

 

যুক্তরাষ্ট্রের ২০১৯ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরান অ্যারোস্পেস কোম্পানি, প্রতিরক্ষা ঠিকাদার, এনার্জি ও ন্যাচারাল রিসোর্সেস কোম্পানি ও টেলিকম ফার্মগুলোকে তাদের বিশ্বব্যাপী সাইবার অপারেশনের কাজে টার্গেট করেছে। এ ছাড়া শীর্ষস্থানীয় মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান মাইক্রোসফটের পক্ষ থেকে গত বছর দাবি করা হয়, ইরানভিত্তিক একটি হ্যাকার গ্রুপ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারণাকে টার্গেট করেছিল এবং তারা যুক্তরাষ্ট্র সরকারের অ্যাকাউন্টগুলোর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করেছিল।

সূত্র: সমকাল


Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান