উপমহাদেশে গণতন্ত্র সফল হতে পারছে না কেন

Fri, Jan 3, 2020 9:58 PM

উপমহাদেশে গণতন্ত্র সফল হতে পারছে না কেন

আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী: লরা জনসন নামে এক স্কটিশ তরুণীর সঙ্গে বছর খানেক আগে আমার পরিচয় হয়। তিনি লন্ডনে বাস করেন এবং খণ্ডকালীন সাংবাদিকতার সঙ্গে জড়িত। একই সঙ্গে তিনি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় রাজনীতি নিয়ে লন্ডনেরই এক ইউনিভার্সিটিতে গবেষণারত। তিনি পিএইচডি করছেন। তার সঙ্গে আমার পরিচয় আকস্মিকভাবে। গার্ডিয়ানের এশিয়াবিষয়ক ডেস্কে গিয়েছিলাম এক বন্ধুর সঙ্গে দেখা করার জন্য। সেখানেই লরার সঙ্গে আমার পরিচয়।

 

তিনি আমাকে হুইলচেয়ারে বসে গার্ডিয়ান অফিসে আসতে দেখে বিস্মিত হয়েছিলেন। যখন জানলেন, আমার বয়স ৯০-এর কাছাকাছি এবং আমি এখনও লেখালেখি করি। পরিচয় হতেই বললেন, আপনি হুইলচেয়ারে বসেও লেখালেখি করেন! বললাম, ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্ট যুবা বয়স থেকেই পঙ্গু থাকা সত্ত্বেও যদি তিন দফা আমেরিকার প্রেসিডেন্টগিরি করতে পারেন, তাহলে আমার সামান্য লেখালেখিতে অসুবিধা কোথায়?

 

লরা জনসন আমার যুক্তি মেনে নিলেন। যে কোনো বয়সে, যে কোনো অবস্থায় লেখালেখি সম্ভব, যদি ইচ্ছা ও আগ্রহ থাকে। সেই থেকে তার সঙ্গে আমার পরিচয়। এই অল্প বয়সী তরুণীর রাজনৈতিক মতামতের খবর জেনে বিস্মিত হয়েছি। তিনি মনে করেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হওয়ায় বিশ্বের উপকার হয়েছে। ট্রাম্প যুদ্ধের হুমকি দেন; কিন্তু কৌশলে যুদ্ধ থেকে সরে আসেন। হিলারি ক্লিনটন দেখতে সফিসটিকেটেড ওম্যান। চরিত্রে নীতিহীন নিষ্ঠুর নারী। তিনি প্রেসিডেন্ট হলে বিশ্বে যুদ্ধ আরও সম্প্রসারিত হতো। নতুন নতুন যুদ্ধ বাধত। পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকাকালে মধ্যপ্রাচ্যে তার নির্দেশেই ইসলামী জঙ্গি গোষ্ঠী (আইএস) তৈরি করা হয়েছিল।

 

লরা মনে করেন, রাশিয়ায় পুতিন ক্ষমতায় আসায় এবং দীর্ঘকাল ক্ষমতায় থাকতে পারায় রাশিয়ার সঙ্গে সারাবিশ্বের উপকার হয়েছে। পুতিন ক্ষমতায় না এলে আমেরিকা এতদিনে রাশিয়াকে তার নতুন স্লেভ স্টেট বানিয়ে ফেলত। মস্কোতে মার্কিন তাঁবেদার গভর্মেন্ট ক্ষমতায় বসত। পুতিন ক্ষমতায় এসে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নে মার্কিন আগ্রাসন রুখে দিয়েছেন এবং চীন ও ইরানের সঙ্গে মিলে সিরিয়ায় মার্কিন হামলা ব্যর্থ করেছেন। বিশ্বশান্তির নিরাপত্তা অনেকটা নিশ্চিত করেছেন।

 

বরিস জনসন ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী হওয়ায় লরা বেজায় খুশি। বললেন, লেবার পার্টির বিদায়ী নেতা করবিন একজন সৎ সমাজতান্ত্রিক নেতা এবং ভালো মানুষ। কিন্তু বিগ মিডিয়া ও বিগ বিজনেসের কবলে পড়ে ব্রিটিশ সোসাইটি আপার এবং লোয়ার যে কট্টর রক্ষণশীল হয়ে গেছে, অতি জাতীয়তাবাদী হয়ে নিজের ভালোমন্দ বুঝতে পারছে না- এটা করবিনের চিন্তা-ভাবনায় হয়তো আসেনি।

 

তাই বরিসের মতো এক বিগহেডেড এবং বিগ মাউথ ব্যক্তির কাছে তাকে হারতে হয়েছে। করবিন খাঁটি বামপন্থি হয়েও ইল্যুশনে ভুগছেন। বার্নার্ড শর ফেবিয়ান সোসাইটি গড়ার স্বপ্ন যেখানে ব্যর্থ হয়েছে, হ্যারল্ড লাস্‌ফির সমাজতান্ত্রিক চিন্তা-ভাবনা এককালে এত প্রভাব বিস্তার করেও এখন যে দেশে কর্পূরের মতো উবে গেছে, সে দেশে করবিন সংসদীয় পদ্ধতিতে বাম সরকার প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখছিলেন। ব্রিটেনের যুবশক্তির মধ্যে তার প্রতি সমর্থনের ব্যাপকতা সত্ত্বেও তার স্বপ্ন এবারের নির্বাচনে ভেঙে তুলার মতো উড়ে গেছে।

করবিন হয়তো ভেবেছিলেন, লেবার পার্টিকে নিয়ে এবং ট্রেড ইউনিয়নগুলোর সমর্থনে তিনি ব্রিটেনে ক্ষমতা থেকে শক্তিশালী ব্রিটিশ এস্টাবলিশমেন্ট ও ব্রিটিশ পুঁজিবাদকে হটাতে পারবেন। কিন্তু ব্রিটেনে পরিস্থিতির বাস্তবতা তার ইল্যুশন সম্ভবত ভেঙে দিয়েছে। করবিন হয়তো বুঝতে পারেননি, ব্রিটিশ ক্যাপিটালিস্ট এস্টাবলিশমেন্টের মুখোশ পরা সেবাদাস টনি ব্লেয়ারের নেতৃত্ব থেকে লেবার পার্টি মুক্ত হলেও এবং ব্লেয়ারপন্থিরা দলে সংখ্যালঘুতে পরিণত হলেও লেবার পার্টি ১০০ বছর আগের শ্রমিক স্বার্থ আদায়ে কমিটেড ওল্ড লেবারে ফিরে যায়নি।

 

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর ব্রিটিশ লেবার পার্টি ও ট্রেড ইউনিয়নগুলোতে উচ্চশিক্ষিত সুবিধাবাদী মধ্যবিত্ত শ্রেণির এক কথায় হোয়াইটকালার শ্রমিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। টনি ব্লেয়ার, গর্ডন ব্রাউন ছিলেন এদের নেতা। লেবার পার্টিতে এদের নেতৃত্বের দিন ফুরিয়ে গেলেও এদের প্রভাব ফুরিয়ে যায়নি। ব্রিটিশ এস্টাবলিশমেন্ট এদের সহায়। ফলে করবিন তার আন্তরিক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও 'ইহুদিবিদ্বেষী', 'রাশিয়ার গোপন চর,' 'ব্রিটিশ স্বার্থবিরোধী' এসব খেতাব নিয়ে লেবার পার্টির নেতৃত্ব ছাড়তে যাচ্ছেন।

 

লরা বললেন, বরিস জনসন ব্রিটেনের নেতা হওয়ায় তিনি আরও আনন্দিত যে, ইংল্যান্ডের আত্মকেন্দ্রিক অতি জাতীয়তাবাদ স্কটল্যান্ড ও আয়ারল্যান্ডকে তার কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দেবে। দুটি দেশই স্বাধীনতার পথ ধরবে। গ্রেট ব্রিটেন তার গ্রেটনেস হারিয়ে আবার লিটল ইংল্যান্ডে পরিণত হবে। ব্রিটেন আগে কমনওয়েলথ হারিয়েছে। এখন ইউরোপীয় ইউনিয়ন হারিয়ে অস্তিত্ব রক্ষার জন্য আমেরিকার কলোনিতে পরিণত হবে। আমেরিকার বর্তমান প্রেসিডেন্ট তা চান এবং বরিস জনসন জেনে অথবা না জেনে ব্রিটিশ রাজনীতিতে ট্রাম্পের এজেন্টের ভূমিকাটি পালন করছেন। ভবিষ্যতে ব্রিটিশ ইতিহাসে তিনি দ্বিতীয় চেম্বারলেন নামে আখ্যাত হতে পারেন।

 

লরাকে বলেছি, আপনি তো দক্ষিণ এশিয়া সম্পর্কে ডক্টরেট করছেন। কিন্তু কথা বলছেন ইউরোপ-আমেরিকা সম্পর্কে। ভারত ও বাংলাদেশ সম্পর্কে আপনার মতামত কী? লরা বললেন, আমার লেখাপড়া দক্ষিণ এশিয়া সম্পর্কে। কিন্তু ভারত ছাড়া উপমহাদেশের আর কোনো দেশ ঘুরে আসার সুযোগ আমার হয়নি। ভারত বৃহৎ দেশ। সেখানে আমি তিনবার গেছি। বিজেপি ও কংগ্রেসের অনেক নেতা, পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল কংগ্রেসের নেতাসহ অন্য রাজ্যগুলোর আঞ্চলিক দলগুলোর সঙ্গেও কথা বলেছি। কিন্তু বাংলাদেশ, পাকিস্তান, শ্রীলংকা, মিয়ানমার, সিকিম, ভুটান- এ দেশগুলো সম্পর্কে পড়াশোনা করেছি, দেশগুলো ঘুরে দেখার আগে কোনো স্পষ্ট মতামত গড়ে তুলতে পারিনি।

 

বলেছি, ভারত সম্পর্কে আপনার অভিমত কী হতে পারে?

 

তিনি আরও বললেন, আমি কোনো খ্যাতনামা লেখক বা সাংবাদিক নই। আমার বয়স ৩০। কিন্তু এখনও একজন শিক্ষার্থীমাত্র। আমার মতামত আপনি গুরুত্বের সঙ্গে নেবেন না। ভবিষ্যতে লেখাপড়া শেষ হলে আমার বর্তমান মতামত বদলে যেতে পারে।

 

বললাম, আপনার অনেক অভিমতের সঙ্গে আমি সহমত পোষণ করি। সে জন্য ভারত সম্পর্কে আপনার মত পরখ করে দেখতে চাই। বুঝতে চাই আমার অভিমতও ঠিক তাই কিনা। ২০২০ সালের প্রথম দিন। অর্থাৎ আরেকটি ইংরেজি নববর্ষের শুরু। লন্ডনে দিনটা শুরুতে ভালোই ছিল। দুপুরের দিকে আমার এলাকা কুয়াশার মতো অন্ধকারে ছেয়ে গেছে। লরা সকালে আমার বাসায় এসেছেন। ছুটির দিন তাকে নিয়ে ভালোই লাগছিল।

 

লরা তিন পেয়ালা কফি শেষ করার পর বললেন, আমার ধারণা কি জানেন (বাংলায় অর্থ করলে যা দাঁড়ায়), মোদি বিজেপি সাম্রাজ্যের শেষ সম্রাট। ইন্ডিয়া অতীতে কখনও অভিন্ন ছিল না। প্রাচীন ভারতের আর্য্যাবর্তই বর্তমানের হিন্দিভাষী উত্তর ভারত। এই উত্তর ভারত কখনও ভারতের অন্যান্য অঞ্চলকে সমমর্যাদাসম্পন্ন বা সমমর্যাদার দেশ ভাবেনি। আর্য্যাবর্তের ছিল সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের নীতি। ব্রিটিশ শাসন ভারতবর্ষকে অখণ্ড করেছিল। স্বাধীনতা লাভের পর গান্ধী-নেহরু ব্রিটিশ গণতন্ত্রের ধারা অনুসরণ করে ভারতের এই অখণ্ডতা রক্ষা করতে চেয়েছিলেন।

 

কিন্তু তাদের আচরণ ও নীতিতে ছিল দ্বিচারিতা। গান্ধীর রাম রাজত্বের দর্শন এবং আশ্রম রাজনীতি ও গণতান্ত্রিক নেহরুর অচেতন মনে প্রাচীন আর্য্যাবর্তের সাম্রাজ্যবাদী নেশা এবং চার্চিল হওয়ার প্রবণতা, ধর্মের ভিত্তিতে ভারত-ভাগ মেনে নেওয়া থেকে হিন্দুত্ববাদের বীজ অঙ্কুরিত হয়ে এখন মহাবৃক্ষ হয়েছে। নেহরুকে বলা হয় গান্ধীর অহিংসনীতির অনুসারী নেতা। আসলে তিনি ছিলেন ওপরে ব্রিটেনের উদার গণতান্ত্রিক ধারার অনুসারী। কিন্তু ভেতরে ছিলেন আর্য্যাবর্ত বা উত্তর ভারতের সাম্রাজ্যবাদী মনোভাবের একজন কট্টর কাশ্মীরি ব্রাহ্মণ।

একটি স্বাধীন দেশের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরই তিনি শান্তিপূর্ণ আলোচনার দ্বারা দেশ ভাগ-পরবর্তী সমস্যাগুলো মীমাংসার চেষ্টা না করে বল প্রয়োগের নীতি গ্রহণ করেন। সামরিক শক্তি প্রয়োগে কাশ্মীর, হায়দরাবাদ, জুনাগড়, মানভাদর প্রভৃতি রাজ্যগুলো দখল এবং ভারতের অঙ্গীভূত করেন। ভারতের বল প্রয়োগের এই নীতিতে ভীত হয়ে পাকিস্তান আমেরিকার আশ্রয় গ্রহণ করে। পাকিস্তানের জিন্নাহও গণতান্ত্রিক মনোভাবের নেতা ছিলেন না। তিনি মুখে বলেছেন ভারতের সংখ্যালঘু মুসলমানদের জন্য একটি হোমল্যান্ড প্রতিষ্ঠাই তার লক্ষ্য। কিন্তু প্রথমেই তিনি পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেলের পদ গ্রহণ করে অতীতের মোগলে আজমের মতো ব্যবহার করতে শুরু করেন।

লরা জনসন বললেন, ভারতে এখন উগ্র হিন্দুত্ববাদের অভ্যুদয়ের জন্য নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহকে দোষারোপ করে লাভ নেই। পাকিস্তানেও চরমপন্থি তালেবানদের শক্তিশালী হওয়ার জন্য উগ্র ধর্মান্ধ দলগুলোকে দায়ী করে লাভ নেই। এটা ছিল দুই দেশেই একটিতে গান্ধী-নেহরুর এবং অন্যটিতে জিন্নাহ-লিয়াকত আলীর অনুসৃত নীতির স্বাভাবিক পরিণতি। হাঁসের ডিম থেকে মুরগি জন্ম নিতে পারে না। এই ব্যাপারে অবিভক্ত ভারতের সমাজতন্ত্রী দলের নেতা ইউসুফ মেহের আলী জিন্নাহকে এবং আমেরিকার দার্শনিক রাজনীতিক ওয়েন্ডেল উইলকি ভারতকে সাবধান করে দিয়েছিলেন।

সূত্র: সমকাল


Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান