বই নিয়েও যত বাধা বিপত্তি এবং একুশে বইমেলা

Sun, Dec 29, 2019 9:12 PM

বই নিয়েও যত বাধা বিপত্তি এবং একুশে বইমেলা

ভজন সরকার: বই আমার সবচেয়ে প্রিয়, আগে ছিল, এখনও। ঘন্টার পর ঘন্টা, দিনের পর দিন একা কাটানো যায়, যদি কিছু বই থাকে। যখন অন-লাইন ছিল না, কতো সময় যে কাটিয়েছি পাঠাগারে। বাংলাদেশে বইয়ের দোকানকে লাইব্রেরি বলে, অথচ বাংলাদেশের কোনো বইয়ের দোকানে বইপড়ার সুবিধে নেই। এখন কয়েকটি দোকানে সীমিত ব্যবস্থা আছে, শুনেছি।

বিদেশে বইয়ের চেইন-শপগুলোতে ( যেমন কানাডার ইন্ডিগো, কোল, এপিক বুকস ইত্যাদি) বই পড়ার জায়গা আছে, অনেক দোকানের সাথে কফি-চায়ের দোকানও আছে। ই-বুক ও অন-লাইনে বই কেনার ব্যবস্থা পাঠাগার এবং বইয়ের দোকানকে সীমিত ক'রে দিচ্ছে। কিন্ত এখনও আমি ডিজিটাল সময়ে বসে সেই এনালগ ব্যবস্থাতেই স্বস্তি খুঁজি।

আমি চাই বা না-চাই, যুগের দাবীকে অস্বীকার করি কোন্ মূর্খতায়! তাই বই যেমন প্রকাশ ও বিপণনে এনালগ থেকে ডিজিটাল হচ্ছে, তেমনি বইয়ের জগতও দেশের সীমা ছাড়িয়ে বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ছে।

এক সময় দাবি উঠেছিল, এখনো আছে; ওপার বাংলার (ভারতের পশ্চিমবংগের) বাংলা বই- পত্রিকা বন্ধ করতে হবে। কেন? আমরা গুনগত মানে কুলিয়ে উঠতে পারছি না সেই অক্ষমতায়? ভ্যাট ট্যাক্স দিয়ে যদি ইংরেজি সাহিত্য আসে তবে পশ্চিমবংগ থেকে ভ্যাট ট্যাক্স দিয়ে বাংলা সাহিত্য এলে অসুবিধে কোথায়?

উদ্দেশ্য কি এটা যে, আমাদের তথাকথিত সর্বাধিক পঠিত লেখকগন নিম্ন ও মাঝারি মার্কা সাহিত্যের নামে যা প্রসব করছেন, সেই বাজার ধরে রাখতে বাংলাদেশের পাঠককে বুঝাতে হবে যে, এখানে যা লেখা হচ্ছে সেগুলোই শ্রেষ্ঠ বাংলাসাহিত্য?

বাংলাদেশের অন্য লেখকদের কিংবা ওপার বাংলার লেখকদের রচনার সাথে যেন কিছুতেই পাঠক পরিচিত হ’তে না পারে, সেই অপচেষ্টায় অচলায়তন বানানোই কি সাহিত্য জগতের বেনিয়াদের উদ্দেশ্য? অথচ বাংলাদেশে অনেক লেখক আছেন, যাঁদের বই পাশের দেশ ভারতের পশ্চিমবংগের বাংলা ভাষাভাষী পাঠকদের কাছে অসম্ভব জনপ্রিয়। ওপার বাংলায় বাংলাদেশের অনেক লেখকের বই সর্বাধিক বিক্রির তালিকাতেও নিয়মিত স্থান পায়। তা হ’লে পশ্চিমবংগের লেখকদের বই বাংলাদেশে বিক্রি হ’তে অসুবিধে কোথায়? শিল্প-সাহিত্য নিয়ে অর্থনীতির আপাত লাভ-ক্ষতির এ সংকীর্ণ ধারণা অপরিণামদর্শীই শুধু নয়, আগামী প্রজন্মের জন্য ভয়ঙ্করও বটে।

তবে অসুবিধেটা কি এটা যে,শক্তি চট্রোপাধায়, বিনয় মজুমদার কিংবা জয় গোস্বামীদের কবিতা পড়ে আমাদের তথাকথিত নন্দিতের নামাবলি মার্কা কবিদের কবিতার মান পাঠক যেন বুঝতে না পারেন সে-ই চেষ্টা এখনো অব্যাহত আছে?

অথচ এখন যেখানে অনলাইনে ঘরে বসেই যে কেউ সারা বিশ্বের সকল ভাষার বই পড়তে পারেন, সেখানে বাজারে মলাটবদ্ধ বই পড়তে সমস্যার কারণটি কোথায়? এটা কি তবে সমাজের অন্যান্য ক্ষেত্রে মতো সাম্প্রদায়িকতারই অন্য নাম? তাই যদি হয়ে থাকে, তবে যারা রবীন্দ্রনাথকে হিন্দু ব’লে একসময় নিষিদ্ধ করতে চেয়েছিল, তাদের সে প্রয়াসের সাথে এদের কোনো পার্থক্য আছে কি?

আগে সাহিত্য সংস্কৃতি জগতের দুঃশাসনদের চেনা যেতো সহজেই। আল মাহমুদ আর যাই করেছেন, ভনিতা করেননি। তিনি জামাত সমর্থক মৌলবাদী এটা তার মুখ; মুখোশ নয়। কিন্তু কত ডজন আল মাহমুদ মুখোশের আড়ালে আছে, সেটার খবর কি আছে আমাদের কাছে? সুবেশ সফেদ পাঞ্জাবি গায়ে পান-জর্দায় ঠোঁট লাল করে ঘাড়ে চটের ব্যাগ নিয়ে আল মাহমুদের স্মশ্রুমন্ডিত যে সাগরেদরা ঢাকার সাহিত্য-সংস্কৃতি অংগনে-কবিতা-নাটক পাড়ায় ঘুরছে, তারা আল মাহমুদদের চেয়েও কি ভয়ঙ্কর নয়?

সাহিত্য-শিল্প-সংগীতকে সীমান্তের বাতাবরণে আবদ্ধ করা আত্মঘাতি প্রয়াস। এমনিতেই বই প্রকাশনার বিষয়টি মলাটের সীমাবদ্ধতা থেকে মুক্ত হয়ে ইলেকট্রনিক মাধ্যমে ঢুকে পড়েছে। বিশ্বের বিখ্যাত বিখ্যাত সব প্রকাশনা সংস্থা বন্ধ হ'তে চলেছে। বাংলাদেশেও এ নিয়ে চিন্তাভাবনা করা উচিত।

প্রকাশকসহ বাংলা একাডেমি এবং সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় কী উদ্যোগ নিচ্ছেন জানি না। তবে আপাতত দাবী জানাচ্ছি, " অমর একুশে বইমেলা"কে আগামী বছর থেকে পশ্চিমবংগের বাংলা বইসহ বিশ্বসাহিত্যের সকল বইয়ের জন্য উন্মুক্ত করে দে'য়া হোক।


Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান