রাইজ অব বাংলাদেশ: শেখ হাসিনা ফ্যাক্টর- একটি পর্যালোচনা

Sat, Nov 23, 2019 9:19 PM

রাইজ অব বাংলাদেশ: শেখ হাসিনা ফ্যাক্টর- একটি পর্যালোচনা

লতিফুল কবির : বলা যায়, অনেকটা অপ্রত্যাশিতভাবে একটি বই বাজারে এসেছে। অপ্রত্যাশিত বলার পেছনে কারন অতি সাধারণ শেখ হাসিনা বাংলাদেশে অতি সাধারণভাবে ব্যবহৃত একটি নাম এবং সম্ভবত শেখ হাসিনা নিজেই সে সম্পর্কে বেশি অবহিত; ফলে যখন তাঁর কাছে আত্মজীবনী লিখবেন কি-না জানতে চাওয়া, তখন তিনি তাঁর স্বভাবসুলভ হাসিতে প্রশ্নকারিকে জানিয়ে দেন: না, কখনোই না।

হয়তো তাঁর অন্তরের অনেক গভীরে লুকিয়ে আছে গভীর এক ব্যথা, হতে পারে সেটার জন্ম ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টে অথবা পরবর্তী কয়েক দশকে বয়ে চলা বিরুদ্ধ ¯্রােতের অভিঘাত। বিশেষকরে, যখন এক সন্ধ্যায় জার্মানি কি বেলজিয়ামের এক বাসায় আগের দিন সন্ধ্যায় উদযাপিত ক্যা-েল নাইটের উচ্ছ্বাসকে ম্লান করে দিয়ে কেউ সেই নির্মম সত্যটিকে তাঁর কাছে উন্মোচিত করে এবং বলে যে, তাঁর বাবা সামরিক অভ্যুত্থানে নিহত; তখন তিনি হয়তো অবিশ^াস্য চোখে সেই সংবাদ সরবরাহকারীর দিকে তাকিয়ে থাকেন, তখন তিনি হয়তো ভাবেন যে, এ এক দুঃস্বপ্ন ছাড়া কিছুই না; কারন তখন হয়তো তাঁর চোখের সামনে বিগত এক কি দুই কি তিন দশকধরে তাঁর বাবার রাজনৈতিক উত্থানের ছবিগুলো ভেসে ওঠে কীভাবে টুঙ্গিপাড়ার এক গ্রাম্যসন্তান, বাবা-মা যাঁকে মজিবর বা খোকা বলে ডাকে, সেই মানুষটা পুরো একটা জাতির কা-ারি হয়ে ওঠে; তাঁর চোখের সামনে তখন হয়তো সেই মানুষটার জেলজীবন কিংবা আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার বিবরণ, অথবা ৭ই মার্চ বা ১০ই জানুয়ারি ভেসে ওঠে, ফলে জার্মানি কি বেলজিয়ামের সেই বাড়িতে যখন তাঁকে বলা হয় যে, তাঁর বাবা নিহত, তখন হয়তো সামনে বসে থাকা ছোটবোন শেখ রেহানাকেও তাঁর জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করে না, বাংলাদেশে কীভাবে ৭ই মার্চ বা ১০ই জানুয়ারি সম্ভব হয়েছিল, অথবা বাংলাদেশই বা কীভাবে সম্ভব হয়েছিল! তারপর যখন তাঁকে বেলজিয়ামের সেই বাসা থেকে চলে যেতে বলা হয়, তিনি হয়তো আগেরদিনের অতি পরিচিত মানুষটার মাঝে এক অপরিচিত মানুষকে খুঁজে পান, তখন তিনি হয়তো আর বিস্ময়বোধ করেন না এবং আরও পরে যখন তাঁকে বলা হবে যে, সেই কালোরাতে কেবল বাবা একা না, তাঁর সাথে সাথে মা, তিন ভাই, দুই ভাবিসহ ২০ জন মানুষকে হত্যা করেছে ঘাতকের দল, তখন তিনি হয়তো বিস্মিত হওয়াটা ভুলে যাবেন, তাঁর হয়তো মনে হবে যে, যে খুনিদের দল একটা দেশের জাতির পিতাকে হত্যা করতে পারে, সেই খুনিদের কাছে নারী ও শিশু কীভাবে অক্ষত থাকে? তারপর যখন আরও দিন গড়াবে, তখন তিনি হয়তো জানবেন যে, খুনিদের হোতাদের মধ্যে তাঁদের প্রিয় মোশতাক চাচা বা সেনাবাহিনীর উপ-প্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান কিংবা একেবারে বাসায় এসে গড়াগড়ি খাওয়া মেজর ডালিম বা মেজর নূর চৌধুরীও আছে এবং তখন তিনি হয়তো প্রবাসের কোনো এক দুই কামড়ার বাসায় বসে মোশতাকের রাষ্ট্রপতি হওয়া, জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্রপতি হওয়া কিংবা ডালিম বা নূর চৌধুরীদের বাংলাদেশের দূতাবাসে পদায়ন হওয়া প্রত্যক্ষ করবেন। তখন তিনি হয়তো ভেঙে পড়বেন, অথবা পড়বেন না; কারন, তাঁর স্বপ্নে তখন হয়তো স্বয়ং বঙ্গবন্ধু এসে উপস্থিত হবেন, তিনি হয়তো বলবেন যে, তুই আমার মাইয়া, হাসু? তখন তিনি হয়তো সংকল্পবদ্ধ হবেন; ফলে ১৯৮১ সালের মে মাসের ১৭ তারিখে বাংলাদেশের মানুষ এক আশ্চর্যজনক ঘটনা ঘটতে দেখবে, তারা দেখবে যে, সপরিবারে জাতির পিতার হত্যাকান্ডের ৬ বছরের মাথায় তাঁর কন্যা শেখ হাসিনা বৃষ্টি¯œাত হয়ে বাংলার সবুজ জমিনে পদার্পন করছে। তাঁর বয়স তখন হয়তো ২৮; কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ তখন হয়তো তাঁর মাঝে রূপকথার সেই রাজপূত্রকে কল্পনা করে, ফলে অবিশ^াস্য প্রত্যাশা নিয়ে লক্ষ লক্ষ জনতা তখন হয়তো তাঁর দিকে ছুটে যায়। বিমান থেকে নেমে এসে যখন তিনি সেই লক্ষ জনতাকে প্রত্যক্ষ করেন, তখন তাঁর মধ্যে হয়তো ১০ই জানুয়ারির স্মৃতি জেগে ওঠে, ফলে ভালোবাসার শক্তি সম্পর্কে তাঁর মধ্যে হয়তো নতুন উপলব্ধির জন্ম নেয়; আর খুনিদের মধ্যে জন্ম নেয় আতঙ্কের, তারা হয়তো ভয় পায় অথবা পায় না, তারা হয়তো নতুন নতুন ষড়যন্ত্র করে, আর তাতে হয়তো তাঁর দলের কেউ কেউ জড়িয়ে পড়ে, ফলে তিনি হয়তো ক্রমশ নিঃসঙ্গ হয়ে ওঠেন।

এরকম এক মনস্তত্ত্ব নিয়ে একজন মানুষ কতদূর যেতে পারে? ধরা যাক, এক গল্প লেখা হলো, সেখানে কেবল নামধাম পাল্টে যদু-মধু রাখা হলো, তখন পাঠক হয়তো এটাকে গাঁজাখুরি বলে উড়িয়ে দেবে, কিংবা লেখকের মস্তিষ্কের সুস্থতা নিয়ে প্রশ্ন করবে, তখন পাঠক হয়তো বলবে যে, বাপ-মা-ভাই-ভাবিসহ পরিবারের সকলকে হত্যা করা হয়েছে আর মাত্র দুই বোন জীবিত আছে এবং সেই মেয়ে রাজার স্বপ্ন পুরণে এগিয়ে এসেছে এমন কোনো গল্প মহাভারতে নাই। ছেলে হলে তবু কথা ছিল, একজন মেয়ে! তারপর যখন পাঠকের কাছে হাজির করা হবে সেই মেয়ের আমলনামা এবং বলা হবে যে, তিনি কেবল স্বপ্নপুরণই করেন নি, তিনি পিতার স্বপ্নকে অতিক্রম করে গেছেন, তখন পাঠক হয়তো সেই বইটিকে পাশে রেখে অন্য বইয়ের মলাট খুলবেন। তো রুদ্র সাইফুলের সম্পাদনায় সদ্য প্রকাশিত ”রাইজ অব বাংলাদেশ: শেখ হাসিনা ফ্যাক্টর” তেমনই এক বই। বইটিতে ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট থেকে বিগত ৪৪ বছরধরে শেখ হাসিনার সংগ্রাম হয়তো উপস্থিত নাই; কিন্তু জাতির পিতার যে বাংলাদেশ, যে সোনার বাংলার প্রত্যয়, তার অভিযাত্রা ফুটে উঠেছে। আর তা উঠে এসেছে বিশে^র নানা দেশের নামি-দামি লেখকদের লেখায়। এখানে যেমন যুক্ত হয়েছে সজীব ওয়াজেদ জয়ের লেখা, তেমনকরে ওয়ার্ল্ড ইকনমিক ফোরাম, বিশ^ব্যাংক, জাতিসংঘ, ব্লুমবার্গ, দ্যা ডিপ্লোম্যাট, হাফিংটন পোস্ট, ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল, রয়টার্স, ফিন্যান্সিয়াল টাইমস, বিজনেজ স্ট্যা-ার্ড কিংবা ভারত বা পাকিস্তানের মিডিয়ায় প্রকাশিত লেখাও যুক্ত হয়েছে। ফলে ৪৮০ পৃষ্ঠার বইটিতে বিগত কয়েক বছরধরে, বিশেষকরে ২০০৯ সালের পরে বিশে^র নামিদামি মিডিয়া বা প্রতিষ্ঠানে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিয়ে যে বিস্তর লেখালেখি হচ্ছে, তার একটা নমূনা নিখুঁতভাবে উঠে এসেছে।

বিষয়বস্তু হিসাবে ৮ শতাংশের উপরে জিডিপি বৃদ্ধির হার তো আছেই, তাছাড়া শিক্ষার সম্প্রসারণ, বিদ্যুতায়ন, শিশুমৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসা, মাথাপিছু গড় আয় বৃদ্ধি পেয়ে ২ হাজার ডলারের কাছাকাছি পৌঁছা, ইণ্টারনেট ও মোবাইল ব্যাংকিং থেকে শুরু করে মোবাইল টেলিফোন সেবা দেশের সর্বত্র পৌঁছে যাওয়া পাশাপাশি বাংলাদেশের পাশের দেশ, বিশেষ করে ভারত বা পাকিস্তান অর্থনৈতিকভাবে কেমন করছে, এবং আরও ভালো করে বললে, বাংলাদেশ কীভাবে অতিদ্রুত ভারতের মতো ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক শক্তির দেশকে অতিক্রম করে যাচ্ছে, সেই গল্পও আছে। তাছাড়া, এশিয়ার উদীয়মান ভারত ও চীনের মতো অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক শক্তির মোকাবেলায় বাংলাদেশ কীভাবে সফল হচ্ছে, কিংবা চীনের শিল্পকারখানা ভারতমূখী না হয়ে কেন বাংলাদেশমূখী হচ্ছে, তার কারন নিয়ে নানা গল্প আছে। আসলে এগুলো কোনো গল্প না, এগুলো বিশে^র নানাদেশের মানুষের বাংলাদেশ নিয়ে ভাবনাচিত্র। সেখানে অর্থনীতিবিদ যেমন আছেন, তেমন আছেন উদ্যোক্তা, পেশাজীবী এবং সাংবাদিক।

পাঠক যখন নানাদেশের লেখকদের লেখা আগ্রহ নিয়ে পড়বে, তখন পাকিস্তানি কোনো কোনো লেখকের লেখা পড়তে গিয়ে তাদের হয়তো কৌতুহল বাড়বে, কারন, সেখানে কেবল বাংলাদেশের স্তুতি না, পাকিস্তানের ক্রমশ পিছিয়ে পড়ার কারনগুলো তারা দেখতে পাবে; তারা দেখবে যে, পাকিস্তানি লেখক হয়তো লিখছে, কোনো খনিজ সম্পদ নাই, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মতো কোনো তেল নাই, কোনো পারমানবিক বোমা নাই, কেবল মাছ আর ভাত খায়, তারা কীভাবে দেশ চালায়? আর এই কালো রঙের আদম সন্তানদের মুসলমানিত্ব নিয়ে বহুবছর আগে পাকিস্তানিরা যখন সন্দেহ করতো এবং তারা বলতো যে, উর্দু বলতে পারে না, তারা কীভাবে মুসলমান হয়? সেই বাঙালির কাছে তারা ১৯৭১ সালে পরাজয় মানে; তা সত্ত্বেও তারা ভাবে যে, মাত্র তো কয়েকদিন, তারপর বাপবাপ করে বাছাধনেরা পাকিস্তানে ফিরে যাবে; কিন্তু তা হয় না। বস্তুতপক্ষে, এসব লেখা পড়ে বাঙালি এখন মজা পায়। কারন, পাকিস্তানি লেখক যত হতাশ হয়, তারা যত বলে যে, এই বাংলাদেশকে তো আমরা আর কখনোই অতিক্রম করতে পারবো না, তখন মজা না পেয়ে উপায় থাকে না। কিন্তু যাদের স্মৃতিশক্তি ততটা দূর্বল না, পাকিস্তানি লেখকের লেখা পড়ার পরে পচাত্তর পরবরর্তী বাংলাদেশের কথা হয়তো তাদের স্মরণে আসে, তারা তখন মনে করতে পারে যে, বাংলাদেশ তখন ক্রমশ ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছিল এবং সেখানে জঙ্গিবাদ মাথাচারা দিয়ে উঠেছিল, গণতন্ত্র নির্বাসনে গিয়েছিল, অথবা গণতান্ত্রিক শক্তির আড়ালে জনবিরোধী শক্তি দেশ শাসন করছিল; ফলে দেশ এগুচ্ছিল না, জিডিপি খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছিল এবং কোনোভাবেই তা পাকিস্তানকে অতিক্রম করতে পারছিল না। বিদ্যুতের অভাবে কলকারখানা বন্ধ হচ্ছিল বা নতুন কোনো কারখানা গড়ে উঠছিল না। তখন বিশে^র মিডিয়া বাংলাদেশকে বলতো ব্যর্থরাষ্ট্র আর বাংলাদেশের সবুজ পাসপোর্ট দেখে বিশে^র নানাদেশের বিমান বন্দরের ইমিগ্রেশন অফিসারগণ ভুরু কুঁচকে তাকাতো। তখন স্মৃতির মধ্য থেকে সেই পাঠক হয়তো জেগে ওঠে এবং নিজের দিকে তাকায়, ফলে তার বুকের ছাতি হয়তো ফুলে ওঠে, তখন তার হয়তো জাতির পিতার কথা মনে পড়ে, অথবা শেখ হাসিনার, ফলে তখন সে হয়তো কৃতজ্ঞ হয়।

বিষয়বস্তুতে বৈচিত্রতা তেমনটা দেখা যায় না, এর একটা কারন এটাই হতে পারে যে, লেখাগুলো বেশিরভাগই অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতি নিয়ে লেখকদের ভাবনার প্রকাশ। আর শেখ হাসিনাকে বুঝতে, কিংবা তাঁর মনোজগত সম্পর্কে ধারণা পেতে এগুলো হয়তো কোনো সাহায্যই করবে না; কিন্তু, বাংলাদেশের সম্ভাবনা নিয়ে যাদের মাঝে সন্দেহ বা হতাশা ছিল বা আছে এবং যারা মাঝেমধ্যেই সেই হতাশাগুলোকে জনমানসে ছড়িয়ে দিয়ে পুলক অনুভব করেন, তাঁরা হয়তো বইটি পড়ে উপকৃত হবেন।

ক্যালগারি, কানাডা। নভেম্বর ২০, ২০১৯।


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান