আসুন ধর্মান্ধতা ও গুজব'কে না বলি

Thu, Jul 25, 2019 7:26 PM

আসুন ধর্মান্ধতা ও গুজব'কে না বলি

হিমাদ্রী রয় সঞ্জীব : দীর্ঘ সময় একটি বিষয় আমাদের জীবন থেকে অনুপস্থিত আর তা হলো লজ্জাসেই কবে তসলিমার লজ্জা নিষিদ্ধ হয়েছিলো দেশে,তারপর তাঁর উপর নেমে এলো হুলিয়া, সে দেশ ছাড়লো ;লজ্জাও হলো নির্বাসিতাশত খোঁজাখুঁজিতে ও মেলেনি লজ্জা,আমাদের আসেনা লাজফাঁস হয়ে যাওয়া পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে,টেন্ডারবাজীর দৌড়াত্বে,মন্ত্রীর অতিকথনে, 'আমি বীর, মূর্তি  ভাঙার জন্য আমার জন্ম'মৌলানার এমন বয়ানে,চামচাদের তোষণে,সুশিল সভার নিরবতায় রাষ্ট্র যখন অন্যায় সায় দিয়ে যায়, লজ্জা তখনো আসেনা আমাদের আঙিনায়

যে শিশু জানেনা কোনটা যৌন লাঞ্চনা সেও হয় হায়েনাদের নিশানা,  'বাবারা আমার মেয়েটা ছোট একজন -একজন করে যাও' অসহায় মায়ের আর্তচিৎকারে ও লজ্জার ঘুম ভাঙে'না;ব্রম্মার বরে কুম্ভকর্ণের পাশে শুয়ে থাকে তখনোকোথায় কোথায় না, আমরা খুঁজেছি তাকেমধ্যরাতের টকশোর আঁতলামিতে,বিরোধীদের মাতলামিতে,রাজাকারদের দেশপ্রেমে,মুক্তিযোদ্ধাদের চেতনার ঝুড়িতে,ভেবেছিলাম ঠিক পেয়ে যাবো বিচারালয়ে কিংবা দূর্নীতি দমন কমিশনের কাছে, তাদের ও মাথা বন্ধক রাজার কাছেতবে যে তারা সরকারি লোক আর 'রাজার কথাই তোমার কথা,তুমি যখন রাজার লোক'বছর-বছর ধরে যাকে পাইনি খোঁজাখুঁজিতে,সেই লজ্জাকে অবশেষে পাওয়াগেল ওয়াসিংটন ডিসিতেকোথায়?? প্রিয়া সাহা আর ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাত বন্দিতে

ধন্যবাদ প্রিয়া সাহা অযৌক্তিক ভাবে উপস্থাপন হলেও লজ্জা এনে দিয়েছেন সংখ্যালঘুদের হয়ে নালিশ করেআমাদের ভাবের ঘরে, চুপটি করে বসা লজ্জাবতী নেড়েচেড়ে উঠেছে সুশিলসভায়কারো কাছে ভাবমূর্তি হয়েছে ক্ষুন্ন এটা ভারি জঘন্য আর কেউ বলছেন তুমি বীর তুমি ধন্যমাঠে নির্যাতিত মানুষের পাশে না থেকে শুধু সভা সেমিনার,দাতাদের দুয়ারে থেকে পরাক্রমশালী দেশের প্রেসিডেন্টের কাছে বিচারে, সংখ্যালঘু মানুষের প্রতি প্রিয়া সাহার এই দরদ সংখ্যালঘুরাও আবেগী হয়ে উঠবেন এটাই স্বাভাবিক

তবে সংখ্যা গুরুরা দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হওয়াতে ভিষণ লজ্জা পেয়েছেনআর যারা সাধারণ জনগন যাদের একটি ভোট সম্বল,অত্যাচার আর নির্যাতিত হয়ে সংগী শুধু লজ্জা,মোমবাতি আর চোখের জলতাঁরা ঠিকিই লজ্জা পাচ্ছিকোন পরিস্থিতি আসলে, কেন? তসলিমা নাসরিন কে লজ্জা লেখে লজ্জা পেতে হয়?দেশ না স্বাধীন? তবু কেন পদবীর কারনে কাউকে থাকতে হয় ভীত, নিজের রাজ্যপাট ছেড়ে কেন নির্বাসনে যেতে হয়,রাতের আঁধারে চৌদ্দপুরুষের ভীটা ছেড়ে? কেন সন্ত্রস্থ থাকতে হবে সারাক্ষণকবির ভাষায় 'কেবল এই জন্যে? যে তোমার নাম চন্দ্রমোহন'।

দেশের সংখ্যালঘু আশংকাজনক হারে কমে যাওয়া এবং এদের উপর জুলুম নির্যাতনের উপর গবেষণা করে যারা তথ্য দিচ্ছেন তাঁরা কিন্তু মসুলমান আর সেটি কোন প্রতিষ্ঠান হলেও তা মসুলমান দ্বারা নিয়ন্ত্রিত তবে তারা আগে মানুষ;তাদের বিবেকের ধমনিতে এখনো মনুষত্বের রক্ত সঞ্চালন প্রবাহমান

১৯৬৪ সাল থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত  ৫ দশকে মোট ১ কোটি ১৩ লাখ হিন্দু ধর্মাবলম্বি বাংলাদেশ ত্যাগে বাধ্য হয়েছেনঅর্থাৎ প্রতি বছর গড়ে ২ লাখ ৩০ হাজার ৬১২ জন হিন্দু ধর্মাবলম্বি মানুষ নিরুদ্দিষ্ট বা দেশ ত্যাগে বাধ্য হয়েছেনআর প্রতিদিন দেশ ছেড়েছেন গড়ে ৬৩২ জন হিন্দু

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবুল বারকাতের ‘বাংলাদেশে কৃষি-ভূমি-জলা সংস্কারের রাজনৈতিক অর্থনীতি’ শীর্ষক এক গবেষণায় এই তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণাটিতে উল্লেখ করা হয়েছে, এই নিরুদ্দেশ প্রক্রিয়ার প্রবণতা বজায় থাকলে আগামী দু’তিন দশক পরে এদেশে হিন্দু ধর্মাবলম্বি কোনও মানুষ আর খুঁজে পাওয়া যাবে না।

এই তথ্যটিই প্রিয়া সাহা সংখ্যার মারপ্যেচে গুলিয়ে ফেলেছেনএই গবেষণা গত পাঁচ বছরে, মূর্তিমান সংখ্যাগুরুদের ভাবের ঘরে অক্ষুন্ন ছিলো,কোন আঁতেল ব্যারিস্টার এই তথ্যকে চ্যেলেঞ্জ করে লাইভে আসার প্রয়োজন মনে করেননিবর্তমানের প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দলীয় নেত্রী থাকা অবস্থায় ২০০১ এর নির্বাচন পরবর্তী সংখ্যালঘু নির্যাতন নিয়ে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতদের কাছে দেনদরবার করেছেনক্ষোভের জায়গাটা হলো তিনি বলতেই পারেন,তিনি মাইবাপপ্রিয়া সাহা কেন বলবে এইতো?

হ্যাঁ তিনি কাজটি ঠিক করেননি,এটা অত্যন্ত নিন্দনীয়সাহার পক্ষ হয়ে সাফাই গাইলে, মেনে নিলাম উনার ইনটেনশন পিওর ছিলো কিন্তু যথাযথ শব্দচয়ন নাহলে,তথ্যের অসংগতিতে অনেককিছুর অর্থই পালটে যেতে পারে,প্রিয়া সাহার বাগাড়ম্বরই এর প্রমাণএর জন্য যোগসূত্রতা খোঁজা উচিৎ, তাকে আত্মপক্ষ সমর্থন করার সুযোগ দেওয়া যা প্রধানমন্ত্রী তাকে দিয়েছেনকিন্তু তার বক্তব্য কে কেন্দ্র করে পুরো সম্প্রদায়কে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো,হিন্দু নাম নিয়ে অশ্লীল কথাবার্তা কিংবা ঘটে যাওয়া সংখ্যালঘু নিপিড়ন নির্যাতনে নিরব থেকে দখলদারিত্বের সায় দিয়ে যাওয়াকে অস্বীকার করলে, লজ্জা আমার অনেক কিছুরতা বুঝতে হলে সংখ্যালঘুর জুতা পড়ে আপনাকে হাটতে হবেব্যাতিক্রম আছে তবে, অনেক খারাপ লাগায় কিছু-কিছু ভালো লাগা চাপা পড়ে যায়

১৯৯২ সালে আমি তখন কুমিল্লা সরকারি কলেজের ছাত্রভারতে বাবরি মসজিদ ভাঙা কেন্দ্র করে,বাংলাদেশের অনেক জায়গার মতো ধর্মান্ধরা, কুমিল্লার শুভপুরে হামলা করে হিন্দুদের মারধর,লুটপাট, আর মেয়েদের শ্লিলতাহানী করে

আমাদের বাসা ছিলো কালিয়াজুড়ি পি,টি,আই সংলগ্ন, হিন্দু বাড়ি হাতে গোনার মত দশ থেকে বারো ঘরসেদিন কালিয়াজুড়িতেও বিশাল মিছিল হয়েছিলো, বাড়িঘর ও ভাংচুর হলোখবর পেয়ে, ভয়ে লজ্জায় কাচুমাচু হয়ে রিক্সা থেকে বাসার সামনে নামতেই দেখি এক হুজুর বাসার সামনে দাড়িয়ে ;মিছিল চলে গেছে প্রায় ঘন্টার উপরদীর্ঘদেহী, লম্বা আলখেল্লা পড়া,মেহেদী করা দাড়ি বাড়ি বদরপুর কোন এক মসজিদের ইমামআসা যাওয়ার পথে আদাব সালাম আর ভালোমন্দ যোগ জিজ্ঞাসার মধ্যেই পরিচয় টুকুদেখা হওয়া মাত্র কোলাকুলি করলেন, বাসায় ঢুকতেই বৌদি বললে, ঐ হুজুর দুই হাত প্রসারিত করে মিছিলের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন  লাঞ্চিত হয়েছেন মিছিলকারীদের দ্বারা তবু প্রবেশপথ আগলে ছিলেন সেদিন শুভপুরের ঘটনায় যে ক্ষত,ক্ষোভ আর লজ্জা মাথার ভেতরে আঘাত করছিলো, নিজের পরিবারের অভিজ্ঞতায়, সে ক্ষোভ আর লজ্জা গিলে ফেলেছিলাম এই ভেবে এখনো মানুষের পাশে দাঁড়ায় মানুষকতিপয় দুস্কৃতিকারীর দায় পুরো সম্প্রদায়কে নিতে হবে কেন?আবার আমার পরিবার অক্ষত ছিলো তাই বলে শুভপুরের আক্রান্ত পরিবারদের আহাজারিতো আর মিথ্যে হয়ে যায় নাতাদের দূর্ভাগ্য ছিলো,হাজারো উগ্র ধর্মান্ধ মিছিলকারীদের মধ্যে অন্তত একজন মসুলমান ছিলেন না,যিনি সাহস করে বদরপুরের ইমামের প্রতি দাঁড়াতে পারতেন

স্যোসাল মিডিয়ায় কেউ সংখ্যালঘূদের উপর হামলা-মামলা নিয়ে কথা বললে,অনেক সুশিলদের বলতে শোনা যায় ভারতে মসুলমান নির্যাতন নিয়ে কথা বলেন না কেন? আরে ভাই নালিশ হচ্ছে আপনার ছেলে গাঁজা খাচ্ছে, ছেলেকে শাসন কিংবা সংশোধন না করে আপনি কি বলতে পারেন? যাও দেখো যেয়ে রাম বাবুর ছেলেতো চুলাই মদ খাচ্ছে,আমার ছেলতো ভালো শুকনার উপর চালিয়ে দিচ্ছেসভ্য মানুষ, সম্প্রীতি গাছ থেকে টুক করে পরে না, একে অন্যের প্রতি সহনশীল আর সমব্যাথি হলেই সম্প্রীতির ডাল পালা আবারো বিস্তার করবে

বিদ্যাবোঝাই  বুদ্ধিজীবীদের আরেকটা অংশ আছে যারা বলেন, বাংলাদেশ হচ্ছে স্বাধীনভাবে ধর্ম পালনের উজ্জ্বলতম দৃষ্টান্তকোন সন্দেহ নাই, যে দেশে ২৮ হাজার পুজা হয়,সেখানে ধর্ম পালনের অপার স্বাধীনতা তা নিয়ে হিন্দুরা ও গদগদবুদ্ধির ঢেঁকিরা নাগরিকদের জন্য স্বাধীনতা যেমন জরুরী, মর্যাদাপূর্ণ সহাবস্থান তারচেয়ে বেশি জরুরিউত্তর আমেরিকায় মসজিদে মাইকে আজান করা যায় নামাইকের আওয়াজে যেখানে ঢাকা কিংবা কলকাতা শহর প্রকম্পিত হয়ে উঠে সেখানে কানাডায় মাইকে আজান নিষিদ্ধতাতে করে কি স্বাধীনতা খর্ব হলোনা?? কিন্ত তাই বলে এই খৃষ্টান, ম্লেচ্ছ, নাসারার দেশে(এভাবেই গালিগালাজ করা হয়) সাদাদের পাশে আমি হিন্দু আপনি মসুলমান এর সহাবস্থান নিয়ে কি আমরা কিঞ্চিৎ শংকিত হই??? না এর একটি উদাহরণ ও আমাদের কাছে নেইকারণ এখানে মর্যাদাপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিতএখানে সহকর্মীকে ইয়ো ব্রাউন গাই বললে চাকরি চলে যায় আর দেশে এখন সরকারের মন্ত্রী এম,পি রাও মালাউন বলে চেঁচান

সংখ্যালঘু আর সংখ্যাগুরু না হয়ে বাংলদেশের নাগরিক হয়ে দেখুন আরো অনেক কিছুতে ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন নয়,বরং মৃত নজরে আসবেপাহাড়ি কিশোরীর যোনি পথে ঢুকিয়ে রাখা ডালে ভাবমূর্তির পতাকা মাথা নত করা আজোরেনুকে যখন ছেলেধরা সন্ধেহে পিটিয়ে মারা হয়,আর সচেতন নাগরিকেরা তা মুঠোফোনে ধারণ করেন, আপনার আমার ভাবমূর্তি তখন চলমান যন্ত্রটিতে বন্দীএম,পি দেবনাথ আর তার ছেলের প্রভাবে যখন কোন উকিল অসহায় নারীকে আইনি সহায়তা দিতে অপারগতা প্রকাশ করে ভাবমূর্তির চোখ তখন কালো কাপড়ে ঢেকে দেওয়া হয়মাইকে ঘোষণা দিয়ে যখন হিন্দু গ্রাম পুড়ানো হয়, প্রশাসনের ভাবের ঘরে ভাবমূর্তিকে তখন খিল দিয়ে রাখাহয়

ভাবের ঘরে চুর ঢুকেছে সেই কবে, আখের ঘোচানোতে লঘূ তত্ত্ব আর গুরু তত্ত্ব সবাই একাত্তএদের পরিবার কেউ বেগমপাড়ায় কেউ বাবু পাড়ায় বহাল তবিয়তেদেশের সর্বোচ্চ সুযোগ সুবিধা নিয়ে দূর্নীতির পয়সায় আমেরিকায় কানাডায় ছেলেমেয়ে পড়ায়, প্যাচে পড়লেই একপক্ষ নেয় বিরোধী রাজনীতির স্ট্যাম্প আর এক পক্ষের প্রোডাক্ট হচ্ছে ধর্মহাজারো নিপিড়ীত সংখ্যালঘুদের কথা,না শুনেন প্রধানমন্ত্রী না শুনাতে পারেন বিশ্বনেতাদের, না পারেন বারো হাজার মাইল দূরে এসে রাজনৈতিক আশ্রয় চাইতেভিক্টিম মানুষেরা সেই আছে, তাঁরা দেশে থেকে সুবিচার চায়,আর আমার আপনার সহমর্মিতা

রাষ্ট্রপ্রধান ধৃতরাষ্ট্রের ভূমিকায়,সঞ্জয় যা শোনান তিনি তাই করেনরোহিঙ্গাদের দেখার তাঁর সময় আছে কিন্তু গংগাচড়ায় যাওয়ার সময় নেইখারাপতো লাগতেই পারেহাটি-হাটি ছেলে কে পাশে বসিয়ে কোলের ছেলেকে বুকের দুধ খাওয়ালে সেই ভাইটির ও খারাপ লাগেমা'হলে সবকিছু বিবেচনায় রাখতে হয়

প্রিয়া সাহার ভীনদেশী রাষ্ট্রপ্রধানের কাছে নালিশ করা সমর্থনযোগ্য নয়কিন্তু তাঁর তথ্যের গড়মিল কিংবা তার বাচনিক দূর্বলতাকে ঢাল করে যদি প্রমাণ করতে যান যে সংখ্যালঘুরা আক্রান্ত নয়,ভূমিদস্যুরা ভয় ভীতি দেখিয়ে তাদের ভীটমাটি ছাড়া করছে না, তা হবে আপনার বিবেকের সঙ্গে প্রতারণা

প্রিয়া সাহার বক্তব্য বাংলাদেশের দুইকোটি সংখ্যালঘুর বক্তব্য ভিডিও করে যারা প্রচার করে এবং যে অতি উৎসাহী হয়ে সাহার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা করে সম্প্রদায়কে নিয়ে কটুক্তি করে এরা উভয়েই খল শকুনি'বস্তত এরা ধংস চায়,ঘরের মাটি লাল হয়ে যাক দেশ বিভাগের যন্ত্রণায়

আসুন ধর্মান্ধতা ও গুজব'কে না বলি,প্রতিরোধ করতে না পারি অন্তত অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে চেষ্টা করি

 

হিমাদ্রী রয় সঞ্জীব,টরন্টো

 

 


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান