জানা শাম্মীর ‘আনটায়িং দ্যা নট’  প্রদর্শিত

Sat, Jun 22, 2019 4:28 PM

জানা শাম্মীর ‘আনটায়িং দ্যা নট’  প্রদর্শিত

নাজমা কাজী : ১৭ ই জুন প্রদর্শিত হয়ে গেলো টরন্টোর Hot Docs Ted Rogers সিনেমায় পরিচালক জানা শাম্মীর প্রথম ডকুমেন্টারী Untying the Knot। প্রায় ছয় বছর ধরে কাজ করে বাংলাদেশী বংশোদ্ভুত কানাডিয়ান জানা বাংলাদেশের নারীদের উপর পারিবারিক সহিংসতা এবং নিপীড়নের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর চিত্র তুলে ধরেছেন তার ডকুমেন্টারী Untying the Knot এ, যাকে বাংলায় বলা যেতে পারে শেকল ছেঁড়ার গল্প।

টরন্টোর বাস্কেটবল দল রাপটর্সের এনবিএ চ্যাম্পিয়নশীপের আনন্দ উদযাপনের উন্মত্ততায় পুরো শহর মাতাল থাকলেও সেদিন টেড রজার্স হল ছিলো দর্শকে পরিপূর্ণ। ডকুমেন্টারী প্রদর্শনের প্রারম্ভেই  বাংলাদেশী কানাডিয়ান এমপি ডলি বেগম পরিচালক জানা শাম্মীকে অভিনন্দন জানিয়ে তার বক্তব্য রাখেন এবং জানাকে সার্টিফিকেট প্রদান করেন। এরপর মণ্চে আসেন ডকুফিল্মটির প্রডিউসার ললিতা কৃষ্ণা, কেটি সোয়েলিস এবং পরিচালক জানা শাম্মী। পরিচিতি পর্বের পর শুরু হয় প্রতিক্ষিত ডকুফিল্ম “Untying the Knot “, চারজন অসাধারণ নারীদের  নিয়ে তৈরী।

শুরুতেই দেখা যায় রুমানা মন্জুর একটি আনন্দঘন পরিবেশে তার গ্র্যাজুয়েশনের পোশাক পছন্দ করতে থাকে, তৈরী হতে থাকে তার জীবনের সবচে বড় দিনটির জন্যে। গ্র্যাজুয়েশন অনুষ্ঠানে তার অসাধারণ বক্তব্য থেকে শুরু করে পরিচালক জানা শাম্মী একটু একটু করে উন্মোচন করতে থাকেন রুমানার জীবনের নিপীড়ন, লক্ষ্যে পৌছানোর অদম্য ইচ্ছা, আশা ও ভালবাসার গল্প। পাশাপাশি চলতে থাকে শারমিন নামের একজন  রেডিও জকির সংগ্রামের কাহিনী। শারমিনের রোমান্টিক মন খুঁজে বেড়ায় একজন সঙ্গী, শুধু স্বামী নয়। ডিভোর্সি শারমিনের জন্যে ছোট দুই বোনের বিয়ে আটকে থাকবে, এই কারনে পরিবার থেকে চাপ আসতে থাকে আবারো বিয়ে করবার তা শারমিনের অপছন্দে এবং অনিচ্ছাসত্বেও। এরই মধ্যে আমরা পেয়ে যাই নাইমাকে। নাইমা খুব স্বাধীনচেতা, আধুনিকা, শিক্ষিতা, ধনীর দুলালী। বিয়ে নামক সামাজিক বন্ধনে সে থাকতে চায়নি, কিন্তু শেষপর্যন্ত সমাজ ও পরিবারকেও উপেক্ষা করতে না পেরে সাদমান নামক বন্ধুটিকে বিয়ে করে কারন সাদমান তার স্বাধীনতাকে প্রাধান্য দিতো। বিয়ের পরে নাইমা আবিষ্কার করে সাদমানও আর বন্ধু থাকে নি, কর্তৃত্বপরায়ণ স্বামী হয়ে গিয়েছিলো। নাইমার মতাদর্শ এবং কথা বলা ডকুমেন্টারীতে নারী নির্যাতনের ভয়াবহতা থেকে দর্শকদের কিছুটা স্বস্তি দিয়েছে।

Untying the knot এর সর্বশেষ সাবজেক্ট জেসমিন, একজন স্কুলশিক্ষিকা ব্যাংকের চাকুরি পেয়েও ছেড়ে দেয় স্বামীর ইচ্ছাকে প্রাধান্য দিয়ে। স্কুল থেকে ফিরে সংসার, সন্তান, শাশুড়ী সবকিছু সুন্দরমতো সামলে রেখেও তটস্থ সারাক্ষণ বদরাগী স্বামী আজমলের ভয়ে। এভাবেই এগিয়ে যেতে থাকে Untying The Knot এর বিন্যাস চারজন নারীর হাত ধরে যারা তাদের স্বপ্নের পিছনে ছুটে বেড়ায়, খুঁজে ফেরে যা হারিয়ে ফেলেছিল বিয়ে নামক সামাজিক বন্ধনে। Untying the Knot শুধু নিপিড়নের চিত্র নয়, এটি একটি ঘুরে দাঁড়াবার গল্পও বটে। সারা ডকুমেন্টারী জুড়ে রুমানা, শারমিন, নাইমা এবং জেসমিন বলেছে নারীর মূল্য বৈবাহিক অবস্থার দ্বারা সঙ্গায়িত করা যাবে না, আর সেখান থেকেই উত্তরণের চেস্টা প্রতিটি নারী চরিত্রের যার যার অবস্খান থেকে।

 

ডকুমেন্টারী প্রদর্শনের পর দর্শকদের জন্য উন্মুক্ত প্রশ্নোত্তর পর্ব রাখা হয়েছিলো। ডকুফিল্মে দেখানো হয়েছে ২০১১ সালে বাংলাদেশে নারী নির্যাতনের হার ছিলো ৭২%। এই তথ্যটি কি সঠিক? যদি তাই হয়ে থাকে তাহলে নারী নির্যাতন প্রতিরোধে কি ধরনের পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে? প্রশ্ন এসেছিলো বাংলাদেশে নির্যাতিত নারীদের নিরাপত্তার জন্য কোন শেল্টারের ব্যবস্থা রয়েছে কিনা? এগুলোর জবাবে তেমন কোন সদুত্তর মেলেনি। বাংলাদেশ মানবাধিকার সংস্থার মিডিয়া আ্যন্ড কমিউনিকশনের তথ্যমতে বিবাহিত নারীদের ৮০.২ ভাগ জীবনে কোন না কোন সময়ে আর্থিক, মানসিক, শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন।দেশ ছেড়ে এসেছি অনেক বছর হয়ে গেলো, কিন্তু আমার বন্ধুরা, আমার বোনেরা তো রয়ে গেছে। শংকা হয় কেমন আছে আমার বোনেরা, বন্ধুরা , আমাদের মেয়েরা!

 

যেমনটা বলেছিলাম হাউসফুল প্রদর্শনী ছিলো। তবে বাংলাদেশী কমিউনিটির মিডিয়া  পার্টনারদের উপস্স্থিতি একদমই ছিলো না, যেটা খুবই দৃস্টিকটু লেগেছে। প্রদর্শনী শেষে কিছু দর্শক প্রতিক্রিয়া জানার চেস্টা করেছিলাম। পাঠকদের জন্য কয়েকজনের মন্তব্য    উল্লেখ করছি। Megan Nadajewski বলেন “ A beautiful piece of art depicting the harsh reality of women in this day and age while simultaneously showing us the strength of inspiration to continue our lives even after atrocities have been committed against us. Beautiful “

আরো একজন দর্শক Melody Ann Hardy তার মতামত জানান এভাবে, “ The women in this film showed such courage coming forward. I hope this film is shown in Bangladesh. It was a very emotional experience for me and it was very informative.” দর্শক তনিমা আলী বলছিলেন, ছবিটি দেখতে গিয়ে নিজেকে সম্পূর্ন একাত্ম করতে পারছিলেন। বলছিলেন এ যেনো তার জীবনেরই গল্প। Heidi Nota-Reid বলেছেন “I found the film both enlightening and disturbing.  Obviously the director has put a lot of research and hard work into making this a thought provoking documentary.  This was achieved by recruiting the actual women who were the actual victims of both physical and verbal abuse by the men in their lives.  It ended on a positive note, however, for some of the women who escaped the brutality of these controlling  and egotistical men.  Some were able to move on with their lives and had the courage to share their experiences with the world.  They were the heroes of this film and deserve to be congratulated for their bravery.  I thoroughly enjoyed the film and hope it gets picked up by the TIFF for the September 2019 festival in Toronto.”

 

বাংলাদেশের বেশীরভাগ মানুষ মনে করেন লিঙ্গ হিসেবে পুরুষ উচ্চ শ্রেনীর। এই পুরুষ কতৃত্ববাদী শাসন শোষণের সাথে জড়িয়ে আছে হাজার বছরের সংস্কার, পুঁজির শাসন আর বিশ্ব ব্যবস্থা। আমি বিশ্বাস করি মানুষ একদিন এই পুরুষবাদী লিঙ্গনির্ভর দাসত্ব থেকে মুক্তি পাবেন, তখনই হয়তো মানুষ হিসেবে মানুষের উত্তরণ ঘটবে, একে অন্যের উপর নিপিড়ন, সহিংসতা বন্ধ হবে, নারী পুরুষে সমতা আসবে, আর সর্বোপরি নারীরা মানুষ হিসেবে দিন যাপন করতে পারবেন।

 

পরিচালক জানা শাম্মীকে অভিনন্দন জানাই নারী নির্যাতন এবং সহিংসতার মত একটি স্পর্শকাতর বিষয়কে বেছে নেয়ার জন্য, শুধু হতাশা আর বন্চনা নয়, আমাদেরকে আশা আর আলোর পথ দেখানোর জন্যে তার Untying the Knot ডকুফিল্মটির মাধ্যমে। জয়তু জানা শাম্মী।


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান