জলসাঘরের মান্না দে -আমার মান্না দে

Tue, Apr 30, 2019 5:24 PM

জলসাঘরের মান্না দে -আমার মান্না দে

আহমেদ হোসেন : ভাসা ভাসা নয় গভীর প্রেম। মান্না দে এর বাংলা গানের প্রেমে পড়েছি আশির দশকে। সকাল সন্ধ্যা সেই সময়টাতে গান শুনতাম। বাড়িতে অনেক মান্নাদের গান বেজে চলতো আর শুনতে শুনতে ভক্ত হয়ে গেলাম, তেমনটা নয়। তাহলে কিভাবে পাগল হলাম। সে এক সাতকাহন। মা অসাধারণ গমগম শব্দ করে এমন একটি ক্যাসেট প্লেয়ারের কিনে দিয়েছিলেন আমার ঢাকা কলেজের জীবনটার সময় (১৯৮০-৮২)। সেটাতেই খুলনা শহরে বয়রা কলোনীর দোতলায় জোরে শব্দ দিয়ে গান শুনতাম। সব গানের মাঝে মান্না দে আর মান্না দে।

"তুমি নিজের মুখে বললে যেদিন সবই তোমার অভিনয়.. "; " তুমি অনেক যত্ন করে আমায় দুঃখ দিতে চেয়েছ... "। " শুধু একদিন ভালবাসা মৃত্যু যে তারপর... "। " হিমালয় আল্পসের সমস্ত জমাট বরফ"। সাথে মাঝে মধ্যে সাথীর খালি গলায় মান্না দে। বন্ধু জাহিদ আর আমি কতই না আহা আহা করতাম মেয়েটির গায়কি দেখে। দিনগুলি মোর।

তখন কি আর জানতাম মান্না দে অর্থাৎ প্রবোধ চন্দ্র দে, পিতা মহামায়া চন্দ্র দে, মাতা পূর্ণা চন্দ্র দে কাছ থেকে এবং পরে মূলতঃ কাকা কৃষ্ণ চন্দ্র দে কাছেই সঙ্গীতের হাতেখড়ি নিয়েছেন তিনি। শিখে নিয়েছেন সব প্রকারের গান করার দক্ষতা। শাস্ত্রীয়, রাগ রাগিনী, ভজন, কীর্তন, রবীন্দ্র নজরুল, লোক সঙ্গীত কতকি। মান্না দে আজীবন কাকা কাকা করতেন। কারণ কৃষ্ণ কাকাই শিখিয়েছেন কি করে গাইতে হয় সকল গান। কৃষ্ণ চন্দ্র দেখতে পেতেন না, অন্ধ ছিলেন। ছিলেন বড় উস্তাদ। সায়গল, পংকজ মল্লিক এর সমসাময়িক শিল্পী তিনি। শচীন কর্তা যখন কৃষ্ণ চন্দ্রের কাছে সঙ্গীতের তালিম নিতেন তখন বালক মান্না দে পাশে বসে শুনতেন। পরে সেই শচীন দেব বর্মন এর সাথে অনেক কাজ করেছেন মান্নাদে। সহকারী হিসেবে চলচ্চিত্রে কাজ করেছেন। সারাক্ষণ কর্তার সাথে থাকতেন, কলা কিনে আনতেন, পান কিনে আনতেন কর্তার জন্যে। শচীন কর্তার অসংখ্য গান গেয়েছেন মান্না দে। যেমন গেয়েছেন শচীনপুত্র রাহুল দেব বর্মন ( পঞ্চম) এর। কিশোর কুমার, পঞ্চম আর মান্না দে স্টুডিও মাতিয়ে রাখতেন রেকর্ডিং এর দিনে। আড্ডা দিয়ে মজা করে কত কত ছবির মধ্যে "শোলে" ছবির বিখ্যাত " এ দোস্তি হাম নেহি তোরেংগে" গান রেকর্ড করেছিলেন।

 

মান্না দের বাপ কাকা সকলেই স্বাস্থ্য সচেতন ছিলেন। ডন বৈঠক করাতেন। কাকা বলতেন বুকের ছাতি ঠিক না থাকলে গান গাইবে কিভাবে। তাই মান্না দে শৈশব থেকে ব্যায়াম, মুষ্টিযুদ্ধ আর কুস্তি করার পাশাপাশি সংগীত চর্চা করতেন। কাকা ছাড়াও উস্তাদ দবির খাঁন এর কাছে তালিম নিয়েছেন তিনি। স্কটিস চার্চ কলেজে পড়াকালীন সময় আন্ত-কলেজের সংগীত প্রতিযোগিতায় বন্ধুদের পীড়াপীড়িতে নাম দিতে চাইলে কাকা প্রথমে বাঁধা দেন। বলেন আমি চাইনা অনেক না শিখে মান্না জনপ্রিয়তার মোহে পড়ুক। শেষে স্বয়ং প্রিন্সিপাল এর চিঠি পেয়ে কাকা রাজি হলে মান্না দে সংগীতের তিন বিভাগে/ শাখায় পর পর তিন বছর প্রথম স্থান অধিকার করেন।

তারপর জীবন জীবিকার সন্ধানে সঙ্গীতাচার্য কাকার সাথে ১৯৪২ সালে বোম্বে সিনেমাতে গানের সহকারী হিসেবে কাজ শুরু করেন। এই সময়টাতেও তিনি হিন্দিস্থানী শাস্ত্রীয় সংগীতেও তালিম নিয়েছেন আমান আলী খাঁন এবং ওস্তাদ আবদুল রহমান খাঁন এর কাছে। বোম্বের সিনেমাতে তখন মুকেশ, রফি, হেমন্ত, কিশোরদের জয়জয়কার। সেই ১৯৪২ "তামান্না " ছবিতে সুরাইয়া এর সাথে কাকা কৃষ্ণ চন্দ্র দে-র সুরে " জাগো আয়ে উষা পাঞ্চি বলে জাগো" গেয়ে সেই যে জনপ্রিয়তা পেলেন সেটা নিতে নিতে তাঁকে মানুষের হৃদয় অন্তস্থলে , অসংখ্য সম্মাননায়, পদক,পুরস্কারসহ পদ্মশ্রী (১৯৭১), পদ্মভূষণ (২০০৫), দাদা সাহেব ফালকে( ২০০৭) পর্যন্ত এনে দিয়েছে তাঁর জীবন কৃত্তিতে, মনিহারের ভাজে ভাজে।

 

চলচ্চিত্রে বাল্মিকী চরিত্রে গান করার জন্যে কৃষ্ণ চন্দ্রকে অনুরোধ করলে তিনি নাকচ করে দিয়ে তাঁর ভাইপোকে নিতে বলেন। বোম্বেতে স্টুডিও বসা ছিলেন তরুন মান্না দে। অডিশনের পরেই রেকর্ডিং পাক্কা হয়ে গেল। সেই থেকেই মান্না দে এক সংগীতের আকাশে উজ্জ্বল নক্ষত্র। তারপর তো ইতিহাস। শত শত গেয়ে গেলেন কালজয়ী গান। গাইলেন "লাগা চুনমিরে মে দাগ, চুনরি মে দাগ দাগ ছুপাও ক্যায়সে" ; " এ রাত ভিগি ভিগি", " লাপাক ঝাপাক তু আ রে", " এ মেরি পেয়ারে ওয়াতন ", " পুছ না ক্যায়সে " ইত্যাদি।

 

আমার প্রেম, বিয়ে, বিরহ, যন্ত্রণা, আনন্দ, উল্লাস, হাসি উচ্ছ্বাস, আশা নিরাশায়,দুঃখ কষ্টে রবির পরেই মান্না দে। যখন প্রেমিকার সাথে প্রেমিক হয়ে গেলাম। তখন মেরুনা একবার ময়মনসিংহ এর ষ্টেশন রোডের মকবুল রেডিও ঘরে ফরমায়েশ দিয়ে একটা পুরো ৬০ মিনিট শুধু " আমি আকাশ হতে পারি, যদি সূর্য জ্বেলে দাও" গানটি রেকর্ড করে কোন একক্ষণে হাতে তুলে দিয়েছিলো। বিয়ে, গায়ে হলুদ এই সব অনুষ্ঠানে " সব তোমারই জন্যে " গানটি অনুরোধে বাজানো হয়েছিলো থেকে থেকে আমারই অনুরোধে।

 

৪০০০ হাজারের অধিক গানের রেকর্ড করেছেন মান্না দে। পঞ্চাশ আর ষাটের দশকে তাঁর সিনেমার গান তুমুল জনপ্রিয়তা পায়। তিনি ১৯৫৩-৫৫ সালে ৮৩টি,১৯৫৬ সালে ৪৫ টি, ১৯৫৭ সালে ৯৫ আর ১৯৫৮ সালে ৬৪টি গান রেকর্ড করেন তিনি। দেখা যায় ১৯৫৭ থেকে ১৯৬৯ পর্যন্ত সিনেমার গান গেয়েছেন ৬৩১টি।

সে সময়ের সব বিখ্যাত শিল্পীদের সাথে গান করেছেন। আদিতে সামসাদ বেগম, রাজকুমারী, সুরাইয়া এর সাথে প্লেব্যাক করেন।

কবি প্রদীপ এর লেখা, শচীন দেব বর্মন এর সুরে ১৯৫০ সালে " মশাল " ছবিতে " "..উপার গগন বিশাল " আর " দুনিয়াকে লোগো " গেয়ে জুটি বাঁধার পর অনেক গান বেঁধেছেন দুজনে।

 

লতা মঙ্গেসকর এর সাথে জুটি বেঁধে গান করেছেন ১০৩ টি, গীতা দত্তের সাথে ২৭টি, কিশোর কুমারের সাথে ৩১টি, আশার সাথে ১৬০টি। যে গান এখনো মানুষের মুখে মুখে।

৫০ / ৬০ এর দশকে চলচ্চিত্রে বয়স্ক অভিনেতাদের ঠোঁটে গান সুপার হিট হতে হতে এমন পর্যায়ে যায় যে বুড়ো চরিত্রের গান হবে তবে মান্নাদে-কে নাও। বিষয়টি তাঁর খুব কষ্ট লাগতো। এটা ভাঙতে কিছু সময় নিলেও পরে রাজ কাপুর এর ঠোঁটে গান একটা পর হিট হতে থাকে। আর বাংলা ছবিতে উত্তম কুমার, ছবি বিশ্বাস, সৌমিত্র প্রমুখ তো আছেনই। সেইকালে এমনকি অভিনেতা মেহমুদ, অভিনেতা প্রাণ এর ঠোঁটে মান্না দে দরাজ গান এক অন্যমাত্রা এনে দেয় চলচ্চিত্র জগতে এই অভিনেতাদের অবস্থানকে।

১৯৭১ সালে সুরকার সলিল চৌধুরীর সুরে "আনান্দ" ছবিতে মান্নাদের কন্ঠে " জিন্দেগী ক্যায়সে হে পেহলি" গানের সাথে ঠোঁট মেলান অভিনেতা রাজেশ খান্না। এরপর একের পর ছবিতে মান্না দে রাজেশ খান্নার জন্যে গান করেন।

আর মহানায়ক উত্তম কুমারে জন্যে তাঁর অনেক কালজয়ী গান আছে। ১৯৬৬ সালে সুধীন দাস গুপ্তের সুরে পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা মান্নাদে শংখবেলার জন্যে লতাকে সাথে গান করেন " কে প্রথম ভালবেসেছে"।

আরোও সেকি অসাধারণ গান পুলক বন্দ্যোপাধ্যায় এর লেখা " আমি আগন্তুক " আর গৌরিপ্রসন্ন মজুমদার এর " আমি যামিনী তুমি শশী হে"। " আমি যে জলসাঘরে বেলোওয়ারী ঝাড়"।

গীতিকার গৌরিপ্রসন্ন মজুমদার, পুলক বন্দ্যোপাধ্যায় এর কালজয়ী অনেক গান করেছেন মান্না দে।

পুলক বন্দ্যোপাধ্যায় প্রথম গান লিখে ডাকযোগে বোম্বে পাঠালে মান্না দে সুর করে রেকর্ড করেন " তুমি নিজের মুখে বললে যেদিন "। তারপর পুলক আর মান্না বাংলা গানের জগতে দিয়েছেন অসাধারণ সব কালজয়ী গান। " আমার ভালবাসার রাজপ্রসাদে ",       " জানি তোমার প্রেমের যোগ্য আমি তো নই "। ষড়ঋতুর নিয়ে মান্নাদে- র অনুরোধে পুলক বন্দ্যোপাধ্যায় লেখেন গান আর সুর করেন মান্না দের ভাই প্রভাস দে। আহা কি সেই গান " পৌষের কাছাকাছি রোদ মাখা " " না না যেওনা, শাখায় তুমি থাকো", " প্রখর দারুণ অতি দীর্ঘ দগ্ধদিন"।

প্রখ্যাত সুরকার নচিকেতা ঘোষের ছেলে সুপর্ণ কান্তি ঘোষ গৌরিপ্রসন্ন মজুমদার এর লেখা " কফি হাউসের সেই আড্ডা আজ আর নেই"। এই গান ক'জন গাইতে পারে এভাবে। অথচ কি আশ্চর্য মান্না দে কখনো কফি হাউসে আড্ডাই দেননি।

 

অনেক ভাবি, পুলক বন্দ্যোপাধ্যায় এর " ললিতা গো ওকে আজ চলে যেতে বলনা " গানটি নিয়ে । কলকাতায় একদিন গাড়ি দিয়ে যাবার পথে মান্না দে তাঁর কাকার গান " শ্যাম ঘুন ঘটকে পাট খুলোরে" গুনগুন করছিলেন এবং সেটা শুনেই পুলক বন্দ্যোপাধ্যায় গাড়ি থামিয়ে একটি গানের স্কুলে গিয়ে মান্না দেকে অনুরোধ করেন পুরো গানটি আবার করার জন্যে আর খাতা নিয়ে সেই আদলে লিখে ফেলেন অসাধারণ গান " ললিতা গো"। রাধার পয়েন্ট অব ভিউতে লেখা, একটি নারীর মুখের কথা, কতটাই না প্রাণবন্ত করে মান্না দে গাইতে পারেন আর সেকারণেই অদ্যাবধি আবালবৃদ্ধবনিতার হৃদয় জয় করে তারা নিজেরা কন্ঠ মিলিয়ে গেয়ে উঠেন ".. দিবালোকে সে আমার নাম ধরে ডাকে.. "

 

টরন্টোতে আড্ডায় প্রতি সপ্তাহে অন্তত একবার আমরা গাই এই গান সুরে বেসুরে। টরন্টো ফিল্ম ফোরামে রানা, বিদ্যুৎ'দা, হিমাদ্রী,  দেলওয়ার এলাহি, টুকু, বাচ্চু'দা, মনিস গেয়ে উঠে " অসময়ে সময় সে কেন বুঝে না .... ললিতা গো ওকে আজ চলে যেতে বলনা। "

 

আমাদের অকৃত্রিম ভালবাসার শিল্পী মান্না দে। এই শহরে কন্ঠশিল্পী নুরুল আলম লাল ভাইকে অনেক ভাললাগে তার পেছনেও হয়তবা তিনি মান্নাদের গান করেন বলে৷ লাল ভাইয়ের গান শুনতে বসলেই বলি, হয়ে যাক লাল ভাই " এ নদী এমন নদী"।  কণ্ঠশিল্পী রনী প্রেন্টিসও মান্নাদের গান করেন দরাজ গলায়। হালে অনুপ বোস শুনিয়ে যায় " ক'ফোটা চোখের জল  ফেলছো যে তুমি ভালোবাসবে"। মাঝে পিনু সাত্তার শুনিয়ে যায়, আরও যায় অনেকেই।

 

মান্না দে এর গান তাঁর খুব কাছাকাছি বসে শোনার সৌভাগ্য হয়েছে আমার বারদুয়েক। প্রথমবার বাংলাদেশে জাতীয় যাদুঘর মিলনায়তনে তাঁর একক সংগীত সন্ধ্যা আর পরে এই টরন্টোতে।

 

জানি, কত শত কোটি কোটি সংগীতশিল্পী জন্ম নেবে, চলে যাবে, হারিয়ে যাবে কালের গহব্বরে।

হারাবে না মান্না দে। উজ্জ্বল তারা হয়ে ভেসে থাকবেন তিনি সঙ্গীতের আকাশে, নীলিমায়।

 

মান্না দে কলকাতায় মে ১, ১৯১৯ ইংরেজি জন্মগ্রহণ করেন।

 

১লা মে, ২০১৯ তোমার ১০০তম জন্মদিন। শুভ জন্মদিন মহান বীরচূড়ামনি শিল্পী, সুরকার, জলসাঘরের মান্না দে,  আমাদের মান্না দে,  আমার মান্না দে ।

 

তথ্যসূত্র - উইকিপিডিয়া,ইউটিউব, আমার স্মৃতি।


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান