"সুন্দরের অতন্দ্র প্রহরী"

Sat, Apr 13, 2019 11:42 PM

"সুন্দরের অতন্দ্র প্রহরী"

(ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দল। দেশের রাজনীতিকে উল্টোমুখো করে দেওয়ার প্রক্রিয়ার প্রতিরোধ হিসেবেই জন্ম নিয়েছিলো সংগঠনটি। না, রাজনৈতিক দল হিসেবে নয়, সংস্কৃতি দিয়ে দেশ এবং রাজনীতিকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পথে ধরে রাখার প্রত্যয় নিয়ে এই সংগঠনের যাত্রা। তার পর তো ইতিহাস। স্বৈরাচারী এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে তো এই সংগঠনটি হয়ে উঠেছিলো অপরিহার্য্য শক্তি।

সেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দলকে যারা গড়ে তুলেছেন, বিভিন্ন সময়ে এই সংগঠনটির সাথে সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে ছিলেন, তাদের ভাবনাগুলো, স্মৃতিকথাগুলোকে গ্রন্থিত করার উদ্যোগ নিয়েছেন সংগঠনের পক্ষে  আহমেদ হোসেন। টরন্টোতে বসবাসরত সাংস্কৃতিক সংগঠক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দলের প্রতিষ্ঠালগ্নের উদ্যোগের সাথে ছিলেন, এখনো চেতনায় সেই স্পিরিটকেই ধারন করেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দল নিয়ে বিভিন্নজনের স্মৃতিগাঁথাগুলো গ্রন্থিত হয়ে পাঠকের হাতে যাবার আগে সেগুলো ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশ করবে নতুনদেশ । আপনাদের মতামতকেও আমরাও সাদরে গ্রহন করবো।– বিভাগীয় সম্পাদক, নতুনদেশ।)

- সুবর্ণা চৌধুরী : আদ্যোপান্ত লাল-শাড়িতে চুড়িতে কখনও সৌখিন লাল টিপ-সিঁদুরে সেজে ট্রাক মিছিলে গণগান গাইবার স্পর্ধিত অভিজ্ঞতা আমার সাংস্কৃতিক জোটের বলয়ে এসেই শুরু - সেটা বিশ্ববিদ্যালয়ের চৌহদ্দিতে এসে। খ্রিস্টাব্দ ১৯৮৪, প্রথমে সংগীত ভবন অত:পর ঢাবিসাদ নামের জাদুকরী ‘দল’-এর সাথে যুথযাত্রায়।

আমার যৌথতার শক্তির ব্যাপকতার অনুধাবনও শুরু সেই সাথে। শৈশবে উদীচী বলয়, অতঃপর সংগীত ভবন - তাদের বিপুল গণগানের চর্চায় আমাকে শিখিয়েছে শিল্পের সুষমা আর জনতার শক্তির প্রতাপ। সংক্রান্ত পরিণত অনুধাবনের শুরু আমাদের ঢাবিসাদ-এর যজ্ঞে উৎসবে। আমরা তাই গাই, “জোট বাঁধো তৈরী হও, যুদ্ধ নয় তোলো আওয়াজ” - সেটাই সুন্দরের প্রহরা : এবং আমরা সুন্দরের অতন্দ্র প্রহরী ! আমরা মানে আমাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দল।

তখন সামরিক শাসনের যুগ। যে যুগে দেশের অনেক শিশুকিশোরকিশোরী কখনো কারফিউবিহীন রাত্রি দেখেনি, সেইসব দিনে গর্জে-ওঠা তারুণ্যের অজস্র অপরূপ অভিজ্ঞানে অভিজ্ঞতায় ঝুলি ভরে তোলা আমাদের। তখন, যখন শান্তিরক্ষার সশস্ত্র বাহিনী অশান্তির সূত্রপাতের জন্যই ব্যবহৃত পরিচিত ছিল, সেইসব দিন মনে আছে? সেটা উনিশশো তিরাশি - আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের পাট শুরুর সামান্য আগের কথা । বিশ্ববিদ্যালয়ে দিনভর নির্বিচারে ছাত্র-শিক্ষক লাঞ্ছনার ইতিহাসও তো সেদিনরই । জাফর জয়নাল দীপালীর পথে গেছে সেলিম দেলোয়ার বসুনিয়া মিলন নূর হোসেন এবং আরও কতো জন। তবে তিরাশির ঘটনার পরে যে প্রশ্নটা আগে কখনও আসেনি, সেটাই এসে পড়লোঃ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আর পড়া যাবে তো? তারুণ্যের নিনাদে তাও পার হওয়া গেলো। পড়া মানে ভর্তি হওয়া গেলো, পড়া আদৌ হলো কিনা, এখনও জানি না। তবে জানি, ক্লাসরুম আর সিলেবাসের সাথে জীবনের পাঠ হয়েছিল বেহিসেবি - আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই দিনগুলোতে ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হলাম। সেই সুবাদে সাংস্কৃতিক দলেরও সদস্য। আয়েশী শৈশব শেষে হঠাৎ দেখি আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র এবং এক সময় আবাসিক ছাত্র - অর্থাৎ রোকেয়া হলের বাসিন্দা। জীবন হঠাৎ অন্য রকম। হলে আমাদের নমিত নিরবচ্ছিন্ন বিরস বিকেল ! সেই সব প্রায় বিষন্ন যেন বিপন্ন বিকেলগুলোতে কীই বা করার ছিল ছাত্রী হলের মেয়েদের? বরং সেইসব রঙিন বিকেলে “কী হয়ে থাকে ঐ চত্বরের সমাবেশে - ঐ দলে? যাই দেখেই আসি”, ভেবে যেই দলের সদস্য হতে যাওয়া, সে এক সময় আমার জাগ্রত দিনের প্রায় সবটুকু টেনে নিলো। সেটাই দল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দল।

ঢাবিসাদ - যার একটা দপ্তর ছিল ছাত্রশিক্ষক কেন্দ্রের দোতলায়।| সেখানে বসলে সামনের পুরো রাস্তা ও চত্বরটা স্পষ্ট দেখা যেতো । এই সেই “দপ্তর” যেখানে বহু কারণে এবং স্রেফ অকারণেও দিব্যি যাওয়া যেতো জরুরী সভায় বা বিলাসী আড্ডায়। যেখানে মৃদুভাষী, মধুভাষী রহিম ভাই প্রায় সর্বক্ষণ সহাস্য উপস্থিত। আর ছিলেন লাকি ভাই - মুরুব্বী ভাবওয়ালা অকস্মাৎ উপস্থিতির লাকীভাই ! ভূপেন হাজারিকার গান কী ভালই না গাইতেন! খুব কমই নিজে একক গাইতেন কিন্তু কি ভালই না গাইতেন। তখন আর তাঁর অলকগুচ্ছের স্বল্পতা কিংবা আপাতগাম্ভীর্য কোন ব্যাপার ছিল নাI তখন তিনি ‘লাকী ভাই’ ! ছিল তাঁর ‘আরে কোন ব্যাপার না’ টাইপ মাপা হাসি। এবং ছিল আমাদের তুমুল কোৱাস - ঐকতানের দার্ঢ্যে তখন সবার সব ফারাক তফাৎ বিলীন ও একাকার। আজকের নতুন নামে যা ঢাবিসাদ, তাকে তখন আমরা ব্যতিক্রমবিহীন ভাবেই বলতাম “দল”! দলের ঐ ঐকতানে আমাদের দিগন্ত আপ্লুত হয়ে উঠতো - টিএসসি চত্বর বা কখনও দূরের কোন শহরের কোন প্রতিষ্ঠানের খোলা প্রান্তর ! শিহরণ জাগানো আবেগমথিত উচ্চারণ ছিল তার অপরিহার্য অনুষঙ্গ এবং শক্তিও। এটি কি নাটকীয় শোনালো? একদম না, অন্তত আমার কাছে এটাই চূড়ান্ত সত্যি - ঐসব বলিষ্ঠ উচ্চারণের মধ্যে দিয়ে আমরা ভবিষ্যৎ দেখতাম - একদিন সূর্যের ভোরের আশা-জাগানিয়া স্বপ্নের বাংলাদেশের। কত দশক পার হলো, আশ্চর্য স্মৃতির মিনার অবিচল, ভাঙেনি মোটেই  সেদিনের  বাঁধভাঙা গণ-গান এখনো কাজে-অবসরে অনিবার কণ্ঠসঙ্গী আমার।

 

ইংরেজি বিভাগ, দ্বিতীয় বর্ষ। অভাগার চূড়ান্ত পরীক্ষার মধ্যে পড়লো দলের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী - যেটা বেশ আড়ম্বরে পালন করা হতো ! আড়ম্বর বলতে মেয়েদের সাদা বা লাল শাড়ি, ছেলেদের পাঞ্জাবী আর অজস্র গান ! গান মানেই তো সুশৃঙ্খল চর্চা পিথাগোরাস তো জানিয়েই গেছেন, সব কোলাহল আর বিশৃঙ্খলার বিপরীতই সংগীত ! আর দলের উৎসব মানেই তো অজস্র গান | আমাদের আনন্দগান সবার সাথে ভাগ করে নিতেই মিছিলে মিছিলে গান, শোভাযাত্রা, র‍্যালী ! কলা ভবনের চারতলায় পরীক্ষা দিতে বসে দিকপ্রান্ত ছাপানো প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর সেই গানের র‍্যালি শুনে আক্ষরিক অর্থেই শিহরিত এই অভাজন লেখা ফেলে মনে মনে চলছিলো ঐ র‍্যালির সাথেই । তার রেশ শেষ হবার পরেই আবার লিখতে বসা। পরীক্ষার হলে বসেও মনে মনে র‍্যালিতে। .. হইলো কিসু? এটাই ঢাবিসাদের গল্প। ক্রমে জেনে গেছি - ঐকতানেই পরিচয় সংঘের সঙ্গবদ্ধতার । আমরা সঙ্গবদ্ধ সুন্দরের অতন্দ্র প্রহরায় ! আমি ভাবি - ভাবতে চাই, সম্ভবত আজও আমাদের কেউই সুন্দরের প্রহরার ঐ গুরু দায়িত্বের বাইরে নেই ! আপাত যোগাযোগহীন আমরা যে যেখানেই থাকি না কেন, জীবনের দায়িত্ব যাকে যেখানেই পৌঁছে দিক না কেন, দিনশেষে আমরা এখনও জ্ঞাতে-অজ্ঞাতে প্রত্যেকেই সুন্দরের অতন্দ্র প্রহরী !

 

সাংস্কৃতিক দল অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় সাংস্কৃতিক দল। তাতে কতো  শাখা - গান নাচ অভিনয় আবৃত্তি উপস্থাপনা, সব মিলে আমাদের আশ্চর্য অর্কেস্ট্রা ! একটা কথা খুব সত্যি - আমাদের গানের দলে খুব তৈরি গলার অনেক গাইয়ে ছিল - সবার একক গাইবার চল খুব না থাকলেও, ওই যে কণ্ঠের শক্তি, সেটা কোরাসেও স্পষ্ট বোঝা যেতো। তখন ভাবতাম - আমরা সবাই ভালোই গাই। এখন বুঝি সদস্য নির্বাচনের ছাঁকনিটা মন্দ ছিলো না । আর স্পষ্ট মন আছে, সেই আনন্দে কোন এক ডিসেম্বর মাসে আমরা পঁচিশ বা ছাব্বিশটা অনুষ্ঠান করেছিলাম ! শেষের দিকে প্রায় সবারই ভাঙা গলা ছিল, তাতে কী! ভাঙা গলার ঐকতানের আবেদনই আলাদা ! বিশ্বাস না হয় শুনেই দেখুন না আহা কী বলে শিমু কৃষ্টি বেলি আপা সুলতানা পিনুদা নুকুদাদা  শান্তনু'দা নারায়ণদা সুজিতদা জামাল কামাল সহোদর ছিলেন দীলিপদা  তাঁর কাজ ছিল অতি গুরুত্বপূর্ণ ! তীরহারা ঐ ঢেউয়ের সাগর পাড়ি দেবো রে ঐ গানে রথীন্দ্রনাথের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ঝড়ের মাঝির মতই আমাদের গানের খেয়া পার করে নিতেন, “ওওওওওও ” প্রলম্বিত ওই টানটা দেওয়ার একচ্ছত্র দায়িত্ব আধিপত্য ছিল তাঁরই । কোথায় এখন দীলিপদা? আঃ  আরও কতো কণ্ঠের সঙ্গ ছিল - লিপি, নাদিরা, মৃদুলা হা আরও কতো চেনা মুখের নাম মনে করতে পারছি না। তবু স্মৃতি ততো প্রতারক নয়, কারও মুখ ভুলবো না।

ওদিকে ছিল বৃন্দ-আবৃত্তির দাপট ! কমলাকান্তের সাহেব বালককে জিজ্ঞাসিল - “.... বালক, এক্সপেরিমেন্টাল সাইন্স খাবি ?” আর সাংস্কৃতিক দলের আবৃত্তিও পরীক্ষামূলক পরিবেশনায় বৃন্দ উচ্চারণে সকলকে দিওয়ানা মাতোয়ারা করিলো ! এতো আনন্দধ্বনি উঠিল কোথায় দীর্ঘ পান্ডুলিপির সব লেখা সবার মুখস্ত, তার মধ্যে বাঁশি বাজে, গৌরাঙ্গদাকে মনে পড়ে। ঝমকে নেচে ওঠে সুনীতা হঠাৎ আর ঝংকার ওঠে - আনন্দ আনন্দ ! অতএব, প্রতিপাদ্য প্রমাণিত: একতাই বল - যূথবদ্ধ কণ্ঠযোদ্ধাদের অবিরাম সমর তখন বিশ্ববিদ্যালয় তল্লাটে এবং অতঃপর পরিব্যাপ্ত দেশময়।

গান প্রতিদিনের। তবে, নাচ শুধু বিশেষ দিনের জন্যই তোলা থাকতো আমি ভাবি, কেন যে বাংলা বাগ্ধারা বলে খুশিতে নেচে ওঠো, অথচ বাঙালি নাচে এত্ত কম। আমাদের কি খুশির আকাল? নাকি নাচতে তেমন জানি না বলেই আঙিনার ত্রুটি আবিষ্কার ?

দলে এসে শুরুতেই যে অনুষ্ঠান পাই তাতে ছিল আবৃত্তির ঝড় “এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়/ এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়” হেলাল হাফিজ গর্জে ওঠেন ঝাঁক বাঁধা তারুণ্যের উত্তাল কণ্ঠে - ডালিয়া আপা গীতি আপা নাসিম ভাই আনিস ভাই ইস্তেকবাল আজকের নানা আন্দোলনের চেনামুখ নেত্রী মিশু এবং আরও আরও আরও অনেকে! এবং আমরা সবাই  “মিছিলে মিলেছি কেননা বুকের কলেজের সাথে হাড়-পাঁজরেরা মিছিলে মিলেছে কবে একদিন জীবনের সন্ধানে” এই উচ্চারণে দলে তীব্র উপস্থিত।

 

ছিল অভিনয় শাখা - ছিল ‘রয়েল বেঙ্গল টাইগার’ ! কেন যে রাজাকারের শার্দুলবেশ সেটা অবশ্য এখন ভাবি উত্তরবিহীন। তখন জিজ্ঞেস করিনি কেন? বাংলার রাজসিক ব্যাঘ্রদল তো প্রিয় সাকিব তামিম মুশফিক মাশরাফি ! তবু বাঘবেশে গোলাম আযমের উর্দ্ধশ্বাস পলায়ন দর্শক বিপুল আবেগে গ্রহণ করতো, মিতবাক সলজ্জ সাইফুল ভাই ঐ চরিত্রে চিরস্থায়ী ভূমিকায়। সাথে কিসলু আহমেদ অসি আর স্বয়ং লাকিভাই। সেইসাথে গানের দলের আনন্দ গায়ন - “স্বভাব তো কখনও যাবে না, বাঘে হরিণে খানা একসাথে খাবে না”  তাই তাই। বাঘে মহিষে কখনও একঘাটে যায় বটে, তবু স্বভাব কখনও যায় না ! কয়লার দেহের অন্তর্লীন রঙের মতন - স্বভাব যায় না বলেই দ্রোহী আর নতজানুর পরিচয় চিরকালই পৃথক ! হোক সে দেশের বা মানুষের কিংবা জায়া জননীর জন্য মোহন বোধে প্রদীপ্ত, তবু, তবু ! ছিল ‘অতঃপর হরেন মন্ডল’ এবং “এটা সেটা আরও কতো কি!”

 

ছিলো উপস্থাপনাও। সবই তাৎক্ষণিক প্রতীয়মান হতো। একদা কি কারণে যেন শুটিং দেখতে গিয়ে অকুস্থলে পাকড়াও হয়ে বিটিভির এই-সেই অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করি, সেই সূত্রে সামান্য মুখচেনার আনন্দও পেয়ে যাই   তবে বলতেই হবে খাটি উপস্থাপনার আনন্দ ও হাতেখড়ি ওই দলেই। কি করে? সহস্রাধিকের সমাবেশে এক্সটেম্পো! এর চেয়ে বড় তালিম আর কি? অনুমোদিত স্ক্রিপ্টবিহীন বলবার যে সুখ বিটিভিতে ছিলো না, দলের টুকটাক উপস্থাপনাতেও তা ছিল খুউব তাই এইখানেতেই দিন কাটে এই খেলার ছলে  এর বিষম ঝড়ের বায়ে আমি মারের সাগর পাড়ি দেবো গো!

 

বছর জুড়ে আমাদের লাগাতার মানে ম্যালা ম্যালা অনুষ্ঠানের মধ্যে বিশিষ্ট অন্যতম ছিল বিশ্ববিদ্যালয় দিবসের অনুষ্ঠান। সম্ভবতঃ হাজার দশেক দর্শকের সামনে সেই অনুষ্ঠান - সেই দর্শকের কজন হয় তো দীর্ঘ বৃক্ষ শাখায় দোদুল দুলিতে দুলিতে গানের শ্রোতা, কেউ কেউ বৃক্ষপোরি দলেবলে উপবিষ্ট, কেউ হয় তো শীর্ণ শাখা ভেঙেই কুপোকাৎ ! তবু অতো সহস্র দর্শকের সম্মিলিত উপস্থিতির প্রভাব এবং মূল্য বর্ণনাতীত। শুধু বলি, প্রথম দিন গাইতে দাঁড়িয়ে মনে হলো, হাঁটুটাকে কিছুতেই থামানো যাচ্ছে না কেন, সে থরোথরো কম্পমান। তারপর কখন এক সময় কেটেও গেলো। পরের বছরগুলোতে আর তেমন কিছু হলো না, বরং আরও কতো না কিসিমের দর্শক সমাবেশ পরিবেশনা ও  ভংগী উপভোগ-বরদাস্ত করেছি। সেই সেইসব। সেই অভিজ্ঞতা কম কিছু না।

 

আরো একটা বিষয় ছিল, ছিল নির্বিবাদে সকল, মানে নতুন বাংলা আর শিবির ছাড়া স-ক-ল রাজনৈতিক দলের ঢাবি শাখার সকল প্রকার অনুষ্ঠানে যখন-তখন হরেদরে গান গাওয়া। সেইসব অনুষ্ঠান থেকে অর্থপ্রাপ্তিযোগের কথা কখনও মনেই আসেনি। কিন্তু সঙ্গতভাবেই কারও কারও মনে সেই সহজ প্রশ্নটি এলো, যেমন এই সম্পাদক মহাশয়ের (বাণিজ্য বিভাগের পড়ুয়ার জন্য সেই তো স্বাভাবিক)  যা ক্রমে সঞ্চারিত অন্য মনে, অথবা ‘গ্রেট মেন্ থিঙ্ক এলাইক’ বলেই সমভাবাপন্নদের আক্রোশ একাধারে উপচে উঠেছিল। সে মিটে গেছে একদিন। এবং মানি সেও জীবনেরই অংশ, জীবনের অনিবার্য শিক্ষাও।

 

প্রশ্ন এসেছিল, হিসাবও মিলেই গেছিলো। কিন্তু সেই সম্মিলিত প্রশ্ন আর ক্ষোভ যতদিনে এক পথে ধেয়ে এক ঠিকানায়, ততদিনে আমার ছাত্রী নিবাসে বসবাসের কাল শেষ। বাড়ি ফিরিয়া গেলাম এবং সোজা ক্লাস-বাসা রুটিনেও ফিরিলাম। দলের যুদ্ধকালের দিবস-রজনী আমার অদেখা রহিল। তবু দলের সূত্রে যা কিছু সঞ্চয়, তা অক্ষয় হয়ে রইল কালের কৌটয় - সুন্দরের প্রহরায়, যৌথতার শিল্পে-শাসনে।

সেই দল কিনা আজ ঢাবিসাদ? বলতেই হচ্ছে, দলের এই নতুন নাম আমার বড়ো অচেনা। সুন্দরের প্রহরীর নাম হওয়া চাই আরও আরও আরও নান্দনিক । শিল্পের সন্ধানে আমরা বলাকা, শান্তির আকাশে মেলেছি পাখা -  বিষাদগ্ৰস্ততার পাশ ছুঁয়ে যাওয়া এই অপ্রসন্ন নাম কী করে আমাদের হয়? না, আমি প্রসন্ন নই, প্রশান্ত নই। আমাদের নাম হোক অতন্দ্র প্রহরী বা সুন্দরের প্রহরী - ঢাবি অপ্র বা সুপ্র ?

এই দাবী থাকবেই, কেননা এখনো বয়ে বেড়াই বিশ্ববিদ্যালয়ের, টিএসসির মঞ্চে-মাঠে, কক্ষে-করিডোরে আর দলের দপ্তরে-প্রান্তরে শেখা টুকরো-খুচরো জীবনের শিক্ষা ! আমার বিপুল জীবনের অপরিহার্য খন্ড ওর ওই আলোয় মাখানো! “হারিয়ে যাওয়া আলোর মাঝে কণা কণা কুড়িয়ে পেলেম যারে / রইল গাঁথা মোর জীবনের হারে ...

 

এক পলকের পুলক যত, এক নিমেষের প্রদীপখানি জ্বালা,

একতারাতে আধখানা গান গাওয়া॥”


Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান