চোখের জলে দেশপ্রেম

Mon, Jan 14, 2019 12:06 PM

চোখের জলে দেশপ্রেম

কিশোয়ার লায়লা : আমি দেশপ্রেমিক নই। দেশ ছেড়েছি বলে নিজেকে এমন বিশেষণে বিশেষায়িত করছি তা নয়। আমি দেশের জন্য কখনো জীবন দিতে পারবো না। এক ফোঁটা রক্তও হয়তো দিতে পারবো না। লোক দেখানোর জন্য হলেও দেবো না এমন ডায়লগ। দেয়ার সাহসও নেই। সেজন্যই বলছি, আমি দেশপ্রেমিক নই। আমার দৌঁড় শুধু, এখনো দেশের ভাল কোন খবরে, ওয়াও বলা। খারাপ কিছু শুনলে, ইস্, কেন এটা হলো। এসব বলা। তবে হ্যাঁ, এখানে কেউ যখন বাংলাদেশের নাম শুনলেই বলে, এটা কী ইন্ডিয়াতে? বা ইন্ডিয়ার পাশে? তখন জোর গলায় বলি, না। ইন্ডিয়া বাংলাদেশের প্রতিবেশি একটি দেশ। আমরা স্বাধীন দেশ। অপর ব্যক্তি একটু বেশি কৌতুহল দেখালে বলি, পাকিস্তানকে হারিয়ে কিভাবে বাংলাদেশ স্বাধীন হলো সেই গল্প।

দেশ ছেড়ে এসেছি পাঁচ বছর হলো। এখনো সময় সুযোগ পেলে কান্নাকাটি করি। সেটা করি ফেলে আসা পেশার জন্য। কিভাবে চোখের সামনে নিজের মেধায় পচন ধরেছে, সেজন্য মন খারাপ করি। খারাপ লাগে শুধু বাবা মা’র জন্য। ছেলে যখন জানতে চায়, টেলিভিশনে যারা কথা বলে, ওরা কিভাবে ভেতরে যেতে পারে? তখন কষ্ট হয়। আহারে, দেশে থাকলে তো ছেলে এমন প্রশ্ন কখনই করতো না। তার মা’কেই দেখতো টিভির ভেতরে। টিভির ভেতরে যাওয়ার প্রক্রিয়া এ টু জেড জেনে যেতো এই বাচ্চা! তাই আমি বলি, আমি এখনো পেশাপ্রেমি। দেশপ্রেমি না।

এবার আসল কথায় আসি। সেদিন ১৩ ডিসেম্বর। বৃহঃস্পতিবার। কানাডায় পাড়ি জমানোর উদ্দেশ্যের চূড়ান্ত প্রক্রিয়া। মানে, নাগরিকত্বের শপথ গ্রহন এবং সনদ নেবার পালা। এদেশের আইন কানুনের প্রতি, বৃটিশ রানীর প্রতি আনুগত্য প্রকাশের জন্য শপথ নেবার দিন। যেদিন এই দিনক্ষণ জানিয়ে চিঠি এলো, সেদিনই বলছিলাম, হায়রে কপাল, খুঁজে পেতে ডিসেম্বরেই এই আনুগত্যের শপথ নিতে হবে? তারিখটা অন্তত আর তিনদিন পরে হলেও তো হতো!

যথারীতি সাজুগুজু করে লাল রংয়ের একটা টপস পড়ে, ছেলেকে কোটেড-বুটেডে হাজির হলাম আনুগত্যের বোঝা মাথায় নিতে। একটা উৎসব উৎসব লাগছিলো মনের ভেতর। আমার মতো আরো ১৪৩ জন এসেছে এই আনুষ্ঠানিকতায় অংশ নিতে। সাথে অতিথিও এসেছে বেশিরভাগের। ঠিক বারোটায় শুরু হলো বিশাল কোর্ট রুমে ঢোকার প্রক্রিয়া। নির্দিষ্ট আসনে আগে থেকেই রাখা ছিলো, শপথের কপি, কিছু বুকলেট আর কানাডার জাতিয় পতাকা। ছেলে পতাকাটা নিয়ে শুন্যে ওড়াচ্ছিলো। আচমকা গলার কাছে কেমন জানি দলা পাকিয়ে উঠলো। অনেকটা সম্বিত ফিরে পাওয়ার মতো মনে হলো। এই পতাকা এখন আমার পতাকা? আমার ছেলে এখন থেকে এটার পরিচয় বহন করবে? সামনে মাইকে কী সব হাবিজাবি নির্দেশনা দেয়া হচ্ছে, মাথায় কিছুই ঢুকছে না। জামাইকে জিজ্ঞাসা করলাম, কী বলছে এসব? জানালো, ফ্রেঞ্চ ভাষায় বলছে। বোঝবার কথা না। সামনের থেকে চার নম্বর সারিতে বসেছি। কেমন জানি অস্থির লাগছে। আশপাশ তাকাচ্ছি। পেছনে দেখছি। এই অনুষ্ঠান নাকি আড়াইটা পর্যন্ত চলবে। এতক্ষণ কিভাবে বসে থাকবো? আসল বিচারক এখনো আসেননি। তাঁর চেয়ার ফাঁকা। মেয়ে কানাডিয়ান। তার কোন আনুষ্ঠানিকতা নেই। কিন্তু আমার অস্থিরতা মনে হয় ও টের পেলো? শান্তশিষ্ট মেয়েটা হঠাৎ চিৎকার করে কাঁদা শুরু করলো? শাপে বর পেলাম। মেয়েকে নিয়ে ঝট করে বেরিয়ে পড়লাম দমবন্ধ করা এই রুম থেকে। বাইরে গিয়ে মনে হয় নিঃশ্বাস ছাড়লাম। লবিতে বেশ কয়টা টিভি স্ক্রীনে দেখতে পাচ্ছিলাম ভেতরের সবকিছু। এভাবে পনেরো বিশ মিনিট কাটানোর পর নিজেকে শান্ত করলাম। বাস্তবতাকে আলিঙ্গণ করলাম। ঠিক যেভাবে গত পাঁচবছর জড়িয়ে ধরে আছি কঠিন বাস্তবতাকে- তাকে আবারও মাথা নত করে মেনে নিলাম। মনে মনে বললাম, কিশোয়ার, দিস ইজ ইওর ডেসটিনি। দ্যো ইটস পেইনফুল। বাট রাইট নাও, নো ওয়ে। শান্ত হয়ে আবার ঢুকলাম কোর্ট রুমে। কানায় কানায় পূর্ণ। এবার আর রুমটা বড়ো মনে হচ্ছে না। মেয়েটাও চুপ হয়ে গেছে। কিন্তু পরিবারের সাথে বসলাম না। পেছনের দিকে একটা খালি আসনে বসে পড়লাম। ততক্ষণে সব প্রস্তুত। মূল বিচারক ঢুকবেন এখনই। সবাই দাঁড়িয়ে সম্মান দেখালাম। আনুষ্ঠানিকতা শুরু হলো। দাঁড়িয়ে শপথ নেবার সময় আবারো ঘটলো বিপত্তি। ডানহাত উঠিয়ে শপথ নিচ্ছি আর চোখ দিয়ে টপ টপ করে পানি ঝড়ছে। এমন তো হবার কথা ছিলো না। সব ঝেড়ে ফেলে তো আবার ঢুকলাম এই রুমে। কেন এই পানি। বাঁ কোলে মেয়ে। পানিটা মুছতেও পারছি না। পুরোটা শপথ জুড়ে পানি গড়িয়ে পড়লো। এই পানি কিসের?  কোন্ কষ্টের পানি এটা? বুকের ভেতর কেমন জানি করছে। মনে হচ্ছে কে যেনো ভেতর থেকে কিছু একটা ছিনিয়ে নিয়ে যাচ্ছে! আমি তো দেশপ্রেমিক না। তাহলে কেন এমন মনে হচ্ছে? আমি তো বাংলাদেশের জন্য জীবন দেয়ার শপথ কখনো নেইনি। তাহলে কেন এতো কষ্ট হচ্ছে? গাল বেঁয়ে গড়িয়ে পড়া এই কয়েক ফোঁটা জলই কী তাহলে দেশপ্রেম? আবারো চলে গেলাম ঘোরের মধ্যে। কখন মেয়ে হাত দিয়ে চোখের পানি মুছে দিলো টের পাইনি। কখন শপথ শেষ করে বসে পড়লাম সেটাও মনে নেই।

বাকি সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে বাসায় ফেরার পথে কেবলই ভাবছি, বাকি আরো ১৪৩ জনের কারো চোখে কী আমার মতো জল ছিলো? আমি কী দু’নৌকায় পা দিয়ে চলছি? নিজেকে বড়ো বেঈমান মনে হলো। কোনো দেশকেই তো আপন করতে পারলাম না। অন্য দেশের জন্য শপথ নিলাম ঠিকই। কিন্তু চোখের জলে ছিলো আমার জন্মস্থান। আমার মতো কী কেউ আছে আর? আমার মতো কী আর কারো চোখে এমন জল গড়িয়ে পড়েছে? নাকি আমি একাই এমন মানসিক জটিলতায় ভুগেছি? খুব জানতে ইচ্ছে করে।   


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান