সংরক্ষিত আসন তুলে নারী প্রার্থী বাড়ান

Sun, Dec 23, 2018 10:51 PM

সংরক্ষিত আসন তুলে নারী প্রার্থী বাড়ান

মহিবুল ইজদানী খান ডাবলু: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে এসে রাষ্ট্র প্রধানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি তখন বলেন, ৭০ নির্বাচন হয়েছিল যখন বাংলাদেশ ছিল পূর্ব পাকিস্তান। এখন স্বাধীন দেশ। সুতরাং জাতীয় নির্বাচন হতে হবে এবং জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা দেশ পরিচালনা করবে।

সেই মোতাবেক ১৯৭৩ সালে প্রথম জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।এতে আওয়ামী লীগ ২৯৩, জাসদ এক, জাতীয় লীগ এক ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা পাঁচটি আসন লাভ করে।

বঙ্গবন্ধুর ইচ্ছায় সংসদে নারীদের জন্য ১৫ আসন সংরক্ষিত করা হয়। লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল তাদের রাজনীতিতে উৎসাহিত করা।

নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভের কারণে সংসদে সংরক্ষিত আসনের ১৫টিই আওয়ামী লীগের পক্ষে আসে।

১৯৭৯ সালে দ্বিতীয় নির্বাচনের সময় সংসদে মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত আসন সংখ্যা ১৫ থেকে বাড়িয়ে ৩০টি করা হয়। জিয়াউর রহমানের বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বাজাদল) থেকে দুইজন নারী প্রার্থী সরাসরি এই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জেতেন। ফলে সংসদে নারীর সংখ্যা দাঁড়ায় ৩২।

১৯৮৬ সালে দেশের তৃতীয় সংসদ নির্বাচনে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জাতীয় পার্টির চার জন, আওয়ামী লীগের একজন জয়লাভ করেন। ফলে সংসদে নারী আসন সংখ্যা ৩৫ হয়।তবে আন্দোলনের কারণে এই  সংসদ পুরো মেয়াদ শেষ করতে পারেনি।

 

১৯৮৮ সালে বিরোধীদের বর্জনের মুখে নির্বাচনে সরাসরি ভোটে চারজন নারী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

১৯৯১ সালে পঞ্চম সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে তিন ও বিএনপি থেকে এক একজন নারী সরাসরি ভোটে জেতেন। এই চারটি আসন নিয়ে পঞ্চম জাতীয় সংসদে নারী সদস্য সংখ্যা হয় ৩৪।

১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে একতরফা ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি থেকে তিনজন নারী জেতেন। কিন্তু সংসদ ভেঙে যায় দ্রুতই আর একই বছরের জুনে হয় আবার নির্বাচন। সে সময় আওয়ামী লীগ ও বিএনপি থেকে তিন জন করে এবং জাতীয় পার্টি থেকে দুই জন নারী সরাসরি ভোটে জেতেন। ফলে সংসদে নারীর সংখ্যা বেড়ে হয় ৩৮।

 

২০০১ সালে অষ্টম সংসদ নির্বাচনে বিএনপির সাথে জোট বেঁধে জামায়াত নির্বাচন করেl বিএনপি ১৯৩, আওয়ামী লীগ ৬২, জামায়াত ১৬, জাতীয় পার্টি ১৪,  জাতীয় পার্টি নাজিউর ৪, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ ২, স্বতন্ত্র ও অন্যান দল ৯  আসন লাভ করে।

 

২০০৭ সালে নবম সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিরোধ সৃষ্টি হলে সেনাবাহিনীর সমর্থনে ফখরুদ্দিন আহমেদ সরকার গঠন করেন। একটানা দুই বছর ক্ষমতায় থেকে ২০০৮ দেশে নবম জাতীয় নির্বাচন দেয়। করা হয় ছবিযুক্ত ভোটার তালিকা। বাদ পড়ে এক কোটি ২১ লাভ ভুয়া ভোটার। বিএনপি-জামায়াতের ভরাডুবি হলে আওয়ামী লীগ এককসংখ্যা গরিষ্ঠতা পেয়ে ক্ষমতা গ্রহণ করে।

 

ওই বছর আওয়ামী লীগ ২৩০, বিএনপি ২৯, জাতীয় পার্টি ২৭, জামায়াত দুই, স্বতন্ত্র চার এবং অন্যান্য দল সাত আসন লাভ করে।

এই নির্বাচনে ১৯ জন নারী মহিলা প্রার্থী সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জয়লাভ করেন যা অতীতের সকল রেকর্ড ভঙ্গ করে।

দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকালে বিএনপি জামায়াতসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দল একত্রিত হয়ে জ্বালাও পোড়াও ও ধংসাত্বক তৎপরতা করে নির্বাচনকে বানচাল করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। তারা ভোটে না আসায় অংশ না বেগম খালেদা জিয়া সংসদে তার বিরোধী দলীয় পদটি হারান।

এই সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনের সংখ্যা ৪৫টি থেকে বাড়িয়ে ৫০ করা হয়। এর আগে অষ্টম সংসদে সংখ্যাটি ৩০ থেকে ৪৫ করা হয়।

 

শেখ হাসিনা ২০১৪ ক্ষমতায় এসে ব্যাপকভাবে নারীর ক্ষমতায়ন করেছেন। প্রধানমন্ত্রী, সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা এবং স্পিকারের মতো তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পদে বর্তমানে তিন জন নারী। কয়েকজন নারীকেও মন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়। শেখ হাসিনাকে এই  কারণে একজন নারীবাদী নেত্রী আখ্যায়িত করা যায়।

 

তবুও বলব, বাংলাদেশের রাজনীতি এখনো পুরুষতন্ত্রের কবল থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি।

 

৩০ ডিসেম্বরের  নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জোট থেকে মাত্র  ২০ জন ও  ঐক্যফ্রন্ট থেকে মাত্র ১৪ জন নারী প্রার্থীকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। দেশের নারী ভোটার মোট জন্যসংখ্যার যদি অর্ধেক হয়ে থাকে তাহলে মাত্র পাঁচ থেকে ছয় শতাংশ নারী প্রার্থীকে আওয়ামী লীগ ও ঐক্যফ্রন্ট থেকে নমিনেশন দেওয়াটা কখনই গ্রহণযোগ্য নয় ।  আগামীতে  এব্যাপারে  বিভিন্ন রাজনৈতিক দলকে এগিয়ে আসতে হবে।

 

দুই বছর আগে সুইডিশ জাতীয় সংসদের প্রতিনিধিদলকে শেখ হাসিনা বলেন, তার সরকার নারীদের সামনে নিয়ে আসতে নানা পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। সামরিক বাহিনীসহ সরকারের বিভিন্ন উচ্চ পর্যায়ে যোগ্যতার ভিত্তিতে চাকরির সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে। অতীতে কোনো সরকারই নারীর ক্ষমতায়ন এধরনের ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। দেশে নারীদের যোগ্যতাকে যথাযথ মূল্যায়ন করা হয়নি। নারীরা তাদের প্রাপ্য অধিকারটুকু পায়নি।

 

এখন প্রশ্ন হলো দেশের বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থানে সংসদে নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসন রাখার কোনো প্রয়োজনীয়তা আছে কি না। বিষয়টি নিয়ে সরকার ও রাজনৈতিক মহল নুতন করে ভেবে দেখতে পারে।

কারণ, বর্তমানে  রাজনীতির অঙ্গনে নারীর সক্রিয়তা অনেক বেশি। ৩০ ডিসেম্বরের ভোটে অনেক নারী এককভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন এবং এদের অনেকের  জয়লাভ করার সম্ভবনা রয়েছে।

দেশের নারী ভোটার মোট জন্যসংখ্যার প্রায় অর্ধেক। সুতরাং সংসদে নারী আসন সংরক্ষণ বিষয়টি নিয়ে ভবিষ্যতে নুতন করে আলোচনা হতে পারে। গণতান্ত্রিক দৃষ্টিকোণ দিয়ে বিবেচনা করলে নারী পুরুষ সকলেরই সমান অধিকার থাকা উচিত।

আগামী নির্বাচনগুলোতে নারীদের সরাসরি কমপক্ষে ৪০ শতাংশ প্রার্থিতা সৃষ্টি করলে তখন আর সংরক্ষিত আসনের প্রয়োজন হবে না। নারীদের জন্য আসন সংরক্ষণ করে বরং তাদের যোগ্যতাকে এখন আরো ছোট করা হচ্ছে।

নারীদের প্রতি বৈষম্য দূর ও অধিকার নিশ্চিত করতে গিয়ে এই পথে বাংলাদেশ আর কতদিন চলবে? আশা করি বাংলাদেশের রাজনীতিবিদরা আসছে সংসদে বিষয়টা নিয়ে আলোচনা করে একটি সমাধানে আসবেন।

 লেখক: সুইডিশ লেফট পার্টি (ভেনস্টার পার্টি) সেন্ট্রাল কমিটির মনোনয়ন বোর্ডের সদস্য


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান