খ  ম  জাহাঙ্গীর বনাম গোলাম মৌলা রনি

Sat, Dec 1, 2018 11:48 AM

খ  ম  জাহাঙ্গীর বনাম গোলাম মৌলা রনি

মহিবুল ইজদানী খান ডাবলু স্টকহল্ম: দেশের পত্র পত্রিকায় কিংবা টকশোগুলোতে গোলাম মৌলা রনি একটি পরিচিত নাম৷ প্রতিদিন পত্রিকার পাতা খুললেই তার কোনো না কোনো বিষয়ের উপর লেখা চোখে পরে৷ এছাড়া টকশোগুলোতে তার উপস্থিতি সবসময় লক্ষণীয়l বেক্তিগতভাবে আমার সাথে তার কখনো দেখা হয়নি৷ তবে আওয়ামী লীগের এম পি থাকাকালীন তিনি একবার স্টকহলম সফরে আসেন৷ এইসময় তার সাথে অন্যান্য সংসদ সদস্যরাও ছিলেনl দেশে ফিরে গিয়ে তার এই সফর সম্পর্কে একটি লেখা লিখতে গিয়ে বিএনপির জনৈক মহিলা সংসদ সদস্যা নিয়ে কিছু রসিকতা করে লিখেছিলেনl শুনেছি স্টকহল্মে অবস্থানকালে স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতারা তার সাথে দেখা করেছেন ,ছবি তুলেছেনl সেই ছবি আবার FB আপলোডও করেছেন৷ তবে  আওয়ামী লীগের এম পি হলেও আমার কাছে তিনি ছিলেন একজন গুরুত্বহীন  ব্যক্তি।

গোলাম মৌলা রনির নাম আমি প্রথমে শুনি যখন তিনি পটুয়াখালীর খেপুপাড়া এলাকা থেকে আওয়ামী লীগের টিকেটে এমপি নির্বাচিত হন৷ কারণ এই এলাকাটা আমার কাছে অনেক আগে থেকেই পরিচিত৷ আমার একসময়ের রাজনৈতিক বন্ধু ঢাকা ধানমন্ডি আইডিয়াল কলেজ ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক (১৯৭৩) স, ম জাহাঙ্গীরের মুখে আমি গলাচিপা খেপু পাড়ার কথা প্রথম শুনি৷ জাহাঙ্গীর এখন না ফেরার দেশে চলে গেছে৷ শুনেছি মির্তুর পূর্বে সে এই এলাকায় বঙ্গবন্ধু কলেজের উন্নয়নে কাজ করেছে৷

 

 

 

তবে স, ম জাহাঙ্গীর না থাকলেও সেখানে আমার পরিচিত দ্বিতীয় বেক্তি আছেন৷ তিনি হলেন খ, ম জাহাঙ্গীর৷ যিনি একসময় ছাত্রলীগের সভাপতি ও পরবর্তিতে শেখ হাসিনার ৯৬ মন্ত্রী সভায় পাঠ প্রতি মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন৷ পরবর্তিতে ডক্টর ফখরুদ্দিন আহমেদের অস্থায়ী সরকারের সময় তাকে ষড়যন্ত্র করে সংস্কার পন্থীতে জড়িয়ে দুরে ছুড়ে ফেলা হয়েছিল৷ আর এই কারণেই হটাত করে ভাগ্য খুলে যায় গোলাম মৌলা রনির৷ খ, ম, জাহাঙ্গীরের পরিবর্তে নমিনেশন দেওয়া হয় আওয়ামী লীগে হটাৎ করে উড়ে এসে জুড়ে বসা গোলাম মৌলা রনিকে। সময়ের সাথে সাথে তার মুখোশ উন্মোচন হলে গত  নির্বাচনে (২০১৩) দ্বিতীয়বারের  মতো তাকে প্রার্থী না করে খ, ম জাহাঙ্গীরকে করা হয়।

 

গোলাম মৌলা রনি আগে কোনদিন ছাত্রলীগ যুবলীগ আওয়ামী লীগ করেছেন বলে আমার জানা নেই৷ ছাত্র অবস্থায় ছাত্রলীগ করলেও করতে পারেন৷ সত্যি সত্যি যদি তাই হয়ে থাকে তাহলে বঙ্গবন্ধুর আদর্শের কোনো দল না করা সত্বেও সেদিন ঠিকই তিনি আওয়ামী লীগের নির্বাচনী টিকেট যোগার করতে সক্ষম হয়েছিলেন৷ কি সৌভাগ্যমান বেক্তি তিনি৷ তার কৌশলতার প্রশংসা না করে উপায় নেই৷ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে তিনি কৌশলে নিজের পক্ষে নিয়ে আসতে সক্ষম হন৷ কারণ ২০০৮ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ খ, ম জাহাঙ্গীরকে নমিনেশন না দিয়ে দিয়েছিল সম্পূর্ণ অপরিচিত গোলাম মৌলা রনিকে নমিনেশন৷ রনি যেন হটাত করে হাতে আসমানের চাদ পেলেন৷ হয়েও গেলেন পটুয়াখালীর গলাচিপা নির্বাচনী এলাকার নির্বাচিত এমপি৷ সম্পূর্ণ অপরিচিত এক বেক্তি রাতারাতি সারা দেশে পরিচিত হয়ে উঠলেনl এমন সৌভাগ্য কয়জনের হয়l কোনোদিন  আওয়ামী  লীগ  কিংবা  তার  কোনো  অঙ্গসংগঠনের  সাথে  জড়িত  না  হয়েও বাগিয়ে  নিলেন  আওয়ামী লীগের  টিকেট।

কোথায় বলে শাক দিয়ে কখনো মাছ ঢাকা যায় নাl রনির বেলায়ও একসময় তাই হলোl  টকশো ও পত্র পত্রিকার মাধ্যমে একসময় সামনে বেরিয়ে আসতে লাগলো তার আসল চেহারা৷ শেষ পর্যন্ত তাকে যেতে হলো জেলে৷ হারালেন তার এম পি পদ৷ কিন্তু তবুও তিনি থামবার মানুষ নন৷ এর  পর খুব কৌশলে লেখালেখি ও টকশোর কাজ চালিয়ে যান৷ এর মাঝে তিনি শাহরিয়ার কবিরকে অসম্মান করে তার ফেসবুক একটি পোস্টও দিয়েছিলেন৷ যেটা বাসের কেল্লা সহ এই গোষ্ঠির মিথ্যাবাদীরা প্রচার করে৷ ওই পোস্টের সূত্র ধরে আমি গোলাম মৌলা রনির ফেসবুকে বিভিন্ন পোস্টগুলো পড়লাম৷ সব কিছু দেখে আমাকে অবাক হতে হয়েছে৷ ভাবলাম আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনা এধরনের চিন্তা ধারার একজন বেক্তিকে কিভাবে আওয়ামী লীগ থেকে নমিনেশন দিলেন? গোলাম মৌলা রনির টিভিতে লাগামহীন মিথ্যা আর ফেসবুকে লেখা দেখে মনে হয় তিনি কখনো আওয়ামী লীগের আদর্শের লোক ছিলেন না৷ তিনি সুযোগ বুঝে দলে ঢুকে পড়েছেন৷  সময়  আসলে ভবিষ্যতে হয়তো  তার আসল চেহারা উন্মুক্ত হতে পারে৷

 

শুনেছি রনি এলাকায় জন্মসূত্রে স্থায়ী বাসিন্দা না হয়ে নাকি বিয়ের সূত্র ধরে এখানে বাস করতেনl অর্থাৎ তিনি ছিলেন এই এলাকার জামাই৷ বিবাহসূত্রে এই নির্বাচনী এলাকায় তার বসবাস৷ কিনতু তাতে কি হয়েছে৷ তিনি তো জন্মসুত্রে বাংলাদেশেরই নাগরিক৷ বাংলাদেশের যে কোনো স্থান থেকে নির্বাচনে প্রতিদন্দিতা করা সকলেরই জন্মগত অধিকার৷ সুতরাং এখানে আপত্বি আসবেই বা কেন? কিন্তু এভাবে না দেখে না জেনে শুনে তাকে সেদিন আওয়ামী লীগের নমিনেশন দেওয়া কত ভুল ছিল তা এখন আওয়ামী লীগ হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেl তাহলে কি আওয়ামী লীগ এবার সেই একই ভুল করতে যাচ্ছে?

 

 

 

পটুয়াখালী-৩ আসনে এবার  খ, ম জাহাঙ্গীরকে নমিনেশন না দিয়ে দেওয়া হয়েছে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের ভাগ্নে ছাত্রলীগের সাবেক স্থানীয় নেতা এস এম শাহাজাদাকেl যার কারণেই বিরোধী দলগুলো থেকে আওয়ামী লীগ এখন সমালোচনার মুখে পড়েছেl নির্বাচন কমিশনকে এখন অনেকেই সন্দেহ করছেl আসছে নিরপেক্ষতার প্রশ্নl আওয়ামী লীগ পুনরায় তাদের আপনজনকে চিনতে ভুল করছেl তা না হলে ছাত্র জীবন থেকে পরীক্ষিত ও পঁচাত্তরের পরবর্তীতে আন্ডারগ্রাউন্ডে ছাত্রলীগকে সুসংগঠিত করতে যিনি  অগ্রগামী ভূমিকা রেখেছিলেন  তাকে কেন পুনরায়  প্রত্যাখ্যান করা হলো? বিষয়টি এলাকার মানুষের কাছে পরিষ্কার নয়l যেখানে উঠতে বসতে বিরোধী পক্ষ থেকে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বতার সমালোচনা আসছে সেখানে বার বার জয়ী হওয়া একজন যোগ্য প্রার্থীকে বাদ দিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের ভাগ্নেকে নমিনেশন দেওয়া আওয়ামী লীগের জন্য ক্ষতি ছাড়া অন্য কিছু বয়ে আনবে নাl কারণ এবার সেই গোলাম মৌলা রনি বিএনপিতে যোগদান করে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে একই নির্বাচনী এলাকায় হয়েছেন প্রার্থী।

গোলাম মৌলা রনি  ২০১৪ সালে দশম সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নমিনেশন চেয়ে না পেয়ে আওয়ামী লীগ প্রার্থী খ ম জাহাঙ্গীরের বিপরীতে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে লড়াইয়ে নেমে হেরে যান। সারা জীবন বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বিশ্বাসী খ, ম জাহাঙ্গীর সেবার নৌকা প্রতীকের প্রার্থী হয়ে বিপুল ভোট জয়লাভ করেনl এই খ, ম জাহাঙ্গীরের সাথে আমার পরিচয় বাহাত্তর সাল থেকেl ১৯৭৪-৭৫ বাংলাদেশ ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছিলেন তিনিl জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর জেনারেল জিয়ার সামরিক আইনের আড়ালে ঢাকা শহরে যারা সেদিন ছাত্রলীগকে সংঘটিত করেছিলেন তাদের মধ্যে একজন ছিলেন খ, ম জাহাঙ্গীরl এই সময় আরো যারা সক্রিয় ছিলেন তাদের মধ্যে ওবায়দুল কাদের, রবিউল আলম মুক্তাদির চৌধুরী, মমতাজ হোসেন, ইসমত কাদির গামা, মানিকগঞ্জ আওয়ামী লীগের বর্তমান সভাপতি গোলাম মহিউদ্দিন, কামাল আহমেদ মজুমদার, মুকুল বোস, চট্টগ্রামের এস এম ইউসুফ সহ আরো অনেকেl ৪ নভেম্বরের (৭৫) মৌন মিছিল থেকে শুরু করে ছাত্রলীগের সব কিছুতেই তাদের অবদান আওয়ামী লীগকে স্বীকার করতে হবেl কারণ ঐসময় ছিল আওয়ামী লীগের জন্য সবচেয়ে দুর্দিনl

 

আবারো সেই দুঃসময়ের পরীক্ষিত নেতা খ, ম জাহাঙ্গীরকে পটুয়াখালীর খেপুপাড়ার প্রার্থী পদ থেকে বঞ্চিত করা হলোl জানিনা তার দোষ কি? তবে আজকের আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও মন্ত্রী ওয়াবায়দুল কাদেরের কাছে তিনি কোনো অপরিচিত বেক্তি ননl খ, ম জাহাঙ্গীরকে নমিনেশন না দিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের ভাগ্নেকে নমিনেশন দেওয়া আদৌ কোনো যুক্তিসঙ্গত কি না বিষয়টা আশাকরি আওয়ামী লীগের মনোনয়ন বোর্ড নুতন করে ভেবে দেখবেl একবার খাল কেটে গোলাম মৌলা রনির মতো কুমির এনে আওয়ামী  লীগের  কি কোনো  শিক্ষা হয়নি? দুঃসময়ের পরীক্ষিত নেতা খ, ম জাহাঙ্গীরকে পটুয়াখালীর খেপুপাড়ার প্রার্থী পদ না দিয়ে আওয়ামী লীগ কেন আজ অন্য পথ অনুসরণ করছে? পটুয়াখালী-৩ আসনে ১৯৯১ ও ১৯৯৬ ও  ২০১৩ মোট  তিনবার  আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য ছিলেন ছাত্রলীগের এই সাবেক সাধারণ সম্পাদক আ খ ম জাহাঙ্গীর হোসাইন। আশাকরি সময় থাকতে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা বিষয়টিকে গুরুত্ব দিবেনl অযথা নির্বাচনের পূর্বে এধরণের সমালোচনার সম্মুখীন হওয়া আওয়ামী লীগের জন্য কোনো শুভ  লক্ষণ নয়l

 

গোলাম মৌলা রনি আওয়ামী লীগের প্রতি মনোক্ষুন্ন হয়ে বিএনপিতে যোগদান করাটাকে আমি সমালোচনা করবো নাl কারণ এটা তার সম্পূর্ণ নিজস্ব বেক্তিগত সিদ্ধান্তl তবে একদিন  আওয়ামী লীগ করে যিনি বঙ্গবন্ধুর আদর্শের কথা ও মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাসের পক্ষে টিভির টকশো ও পত্র পত্রিকায় সাফাই গেয়েছেন তিনি আজ কি করে জিয়ার ধানের শীষ নিয়ে নির্বাচন করছেন? মুখে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বাস্তবায়নের কথা বলে এখন বলছেন আমি সারা জীবন বিএনপির রাজনীতির সাথে থাকবোl এতদিন পর  আজ তাহলে  তার  আসল চরিত্র উন্মোচন হল।


Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান