ভারতের রোগটাই যেন  আমাদের দেশে বাসা বেঁধেছে

Sat, Dec 1, 2018 12:43 AM

ভারতের রোগটাই যেন  আমাদের দেশে বাসা বেঁধেছে

স্নেহাশীষ রয় : ১.ভারতে কৃষকদের মিছিলের ছবিটি দেখছি। ভোটের আগের রাজনীতি হয়তো আছে। কিন্তু এটি কি মিথ্যে যে, পৃথিবীর অন্যতম বৃহত্তম অর্থনীতিতে, কৃষকদের জীবনযাত্রার মান পৃথিবীর নিম্নতম।

 

ঋণের দায়ে, কৃষকেরা আত্মহত্যা করে, খবরে শুনেছি।

পানীয় জলের অভাব তাও খবরের কাগজেই দেখা।

অথচ, আমি মূলত: যে ভারতকে দেখছি, সে ভারত সত‌্যজিত রায়ের ভারত নয়, সে ভারত মুম্বাইয়ের আলোকোজ্জ্বল ভারতের চিত্র। যে চিত্রে, বিয়ে মানে হলো, উদয়পুরে ডেস্টিনেশান ওয়েডিং। যে ভারতে তরুণেরা, ছুটি কাটাতে স্পেনে গিয়ে, স্কাই ডাইভিং করে, জীবনের রোল মডেল শেখায়, এ জীবন দ্বিতীয়বার পাওয়া যাবে না। তাই, যত পারো ভোগ করো।

করণের সাথে কফির খাওয়ার শোটি দেখছিলাম। প্রথমেই মনে হলো, এদের মাতৃভাষা আসলে কি? হিন্দি, নাকি উপনিবেশের আমলে চাপিয়ে দেয়া ইংরেজী?

 

ভারত এমন একটি জেনারেশান তৈরী করেছে। জন্মের পর মুম্বাইয়ের আলোর ঝলকানিতে এদের চোখ এতটাই ধাঁধিয়ে যায়, এদের পিউপিল এতোটাই সংকুচিত হয়, এরা শুধু আলো দেখে, প্রদীপের তলার অন্ধকার দেখে না।পুরো ভারত, যেন খানিকটা মুম্বাইয়ের দিকে হেলে পড়েছে, আর সমগ্র ভারতের মানুষ তাল সামলাতে না পেরে, বার বার পিছলে যাচ্ছে।

 

এরা এমন একটি জেনারেশান তৈরী করেছে, যাঁরা বাঁচে দিপীকা-প্রিয়াংকাদের নিতম্ব নি:সৃত পরিপাকতন্ত্রের বাতাসের ধামাকা গুণে গুণে।

 

আর আছে, ক্রিকেট। ক্রিকেটাররা ব্যাট দিয়ে বল সীমানার বাইরে পাঠায়, নায়িকাদের সাথে প্রেম করে, তাই দেখে উল্লসিত জনতা ভুলে যায়, তাদের বঞ্ছনার দাওয়াই ক্রিকেট আর নিতম্ব প্রধান ফিল্মি নায়িকা নয়।

ভারতের সবচেয়ে বড় দুই রোগ হলো, সিনেমা আর ক্রিকেট। যা নতুন প্রজন্মকে মিথ্যের ভেলায় চাপিয়ে ভাসিয়ে বেড়ায়। আর পুঁজিপতিরা ক্রিকেট আর সিনেমাকে আশ্রয় করে, সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলে।

 

ক'দিন আগে পত্রিকায় দেখলাম। আট বছরের একটা ছেলে, যাঁর বাবা একজন কম্পিউটার প্রোগ্রামার। ছেলেটিও কম বয়সে, প্রোগ্রামিং শিখে গেছে।

ভারতীয় বংশোদ্ভূত মাইক্রোসফটের সিইও সত্য নাদেলা ভারতে গেছে। ছেলেটি তাকে জিজ্ঞেস করছে, ভবিষ্যত সিইওদের মাঝে কি কি গুণ থাকা উচিত?

 

কম বয়সে প্রোগ্রামিং শেখা খারাপ কিছু নয়। কিন্তু ছেলেটির এখন এক দূরন্ত শৈশব। যাঁর প্রজাপতির পেছনে ছোটার বয়স। তার মাথার ভেতর ঢুকে গেছে, সুন্দর পিচাই , সত্য নাদেলা।

 

এই শিশুটি কি তার কল্পনার পুরোটা ব্যবহার করতে সক্ষম হবে? এই শিশুটি কোনদিন জগদীশ চন্দ্র বসু হতে চাইবে? সে হতে চাইবে, সুন্দর পিচাই।

 

ভারতের মধ্যবিত্তের পুরো প্রজন্মটি কনজ্যুমার ড্রীমের স্বপ্নে মশগুল। আর সে সুযোগে প্রতিটি সরকার, বঞ্চিতদের দিকে না তাকিয়ে, পুঁজির প্রতিভূর সেবা করে যাচ্ছে। আর মানুষ বন্দী হয়ে আছে, এক ওয়ান্ডারল্যান্ডে, যেখানে ক্ষুধা আর দারিদ্র্যের ওষুধ হলো, সিনেমা আর ক্রিকেট।

 

২.এতক্ষণ যা লিখলাম , তা হলো অনধিকার চর্চা। কারণ ভারত আমার দেশ না। আমি কখনোই এই অনধিকার চর্চাটি করতাম না, যদি না আমার দেশ ভারতের এই বদ রোগগুলোর দ্বারা আক্রান্ত হতো।

 

আমি প্রথম আলোর অনলাইন সংস্করণটি পড়ি। ব্রাউজারে খুলতেই এখন, রবীন্দ্রনাথের 'কান পেতে রই' গানটির কথা মনে হয়। প্রথম আলো যেন কান পেতে আছে, কখন প্রিয়াংকা বাথরুমে যায়। প্রথম আলো যেন কান পেতে আছে, কখন দীপিকার শাড়িটি খুলে, আরেকটি নতুন শাড়ি পরে।

প্রথম আলো, দেশের সবচেয়ে প্রতিষ্ঠিত গণমাধ্যম। কিন্তু ইদানিং প্রথম আলোর অনলাইন সংস্করণটি আমার কাছে মনে হয়ে, ক্লিক বেইট জার্নালিজমের এক নিকৃষ্ট উদাহরণ।

 

ভারতের কাছ থেকেই আমরা অনেক কিছুই শিখতে পারি। ভারত কিভাবে, ওষুধ শিল্প গড়ে তুললো , ভারত কিভাবে সফটওয়ার ইন্ডাষ্ট্রী গড়ে তুললো।কিন্তু ক্রিকেট আর ফিল্ম এই দুই রোগ আমাদের দেশে আমদানী হোক, আমি কখনোই চাইবো না। আমি চাইবো, সত্যজিতের ছবি দেখে, জয়ের কবিতা পড়ে জীবন বোধ জাগ্রত হোক। ন্যায় আর অন্যায়ের মাঝে তফাৎ বাংলাদেশ শিখুক। শিল্প থেকে প্রাপ্ত জীবনবোধ হোক আমাদের সমাজের চালিকা শক্তি।

 

আমি কখনোই চাইবো না, আমাদের অভিনেত্রী মেয়েটি প্রিয়াংকার পোষাক-অঙ্গভঙ্গি নকল করে, বাংলাদেশের সিনেমাকে প্রভাবিত করুক। আমি চাইবো, বাংলাদেশের নিজস্ব স্বকীয়তায় সে উদ্ভাসিত হোক।

 

আমি কখনোও চাইবো না, ক্রিকেটের ছক্কা মারা ছেলেটি , বাংলাদেশের তরুণদের মনোজগতে বাসা বাঁধুক।

 

আমি একদিন, ফার্মগেট পার হয়ে আসতে আসতে দেখলাম, এক তরুণ ল্যাম্পপোষ্টের আলোতে বসে, পথশিশুদের পড়াচ্ছে। আমি জানি না ছেলেটি কে? কিন্তু আমি অবশ্যই চাইবো, ক্রিকেটে ছক্কা মারা ছেলেটি নয়, যে ছেলেটি ল্যাম্পপোষ্টের আলোতে পথশিশুদের পড়ায়, সেই ছেলেটিই বাংলাদেশে প্রজন্মের মনোজগত নিয়ন্ত্রণ করুক।

 

ভারতের কনজ্যুমার ড্রীম নয়, আমি চাইবো, ভারতের গান্ধী-বিবেকানন্দদের কাছ থেকে জীবন বোধের শিক্ষা নিতে।

 

কিন্তু আমার কেবলই মনে হচ্ছে, ভারত যে রোগে আক্রান্ত সে রোগ আমাদের দেশেও বাসা বেঁধেছে।


Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান