মাশরাফির জাতীয় সংসদ নির্বাচন

Fri, Nov 30, 2018 11:39 AM

মাশরাফির জাতীয় সংসদ নির্বাচন

কুমার অনুপ : আমরা ইতিমধ্যে জানতে পেরেছি জাতীয় ক্রিকেট দলের সফল অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজা নড়াইল-২ আসনে এ বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের হয়ে সংসদ সদস্য পদে নির্বাচন করতে যাচ্ছেন।এই বিষয়টি নিয়ে পক্ষে ও বিপক্ষে তুমুল বাকবিতন্ডা লক্ষ্য করা যাচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়াতে। অনেকে বলছেন মাশরাফি জাতীয় দলের অধিনায়ক হয়ে কিভাবে একটি দলের হয়ে নির্বাচনে অংশ নেয়? কেউবা বলছেন মাশরাফির যদি এতোই দেশ সেবা করার ইচ্ছা তাহলে ইমরান খানের মতো একটি নিজস্ব দল তৈরী করেই সেটা করতে পারতো ইত্যাদি। অন্যদিকে, আরেকপক্ষ মাশরাফির এই সিদ্ধান্তকে প্রতিনিয়ত শুধু মাত্র সাধুবাদই জানাচ্ছে না, কেউ কেউ বলছেন  এতদিন পর আমার ভোটটি একটি ভালো মানুষেকে দিতে পারবো, কেউ আবার বলছেন, মাশরাফির মতো মানুষদের রাজনীতিতে আসার দরকার আছে।

 এবার দেখি মাশরাফি নিজে কি বলছেন তার এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে। মাশরাফি তার ফেসবুকের স্ট্যাটাসে বলেছে, 'আমি কাউকে আঘাত করার জন্য রাজনীতিতে আসিনি'। সে আরও বলেছে 'আপনারা যদি আমাকে ভালো মানুষ বলেন তাহলে ভালো মানুষ রাজনীতিতে না আসলে রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন হবে কি করে'? পাশাপাশি সে এও বলেছে, আপনারা কিভাবে বলেন আমি ভালো মানুষ? আমার খেলা দেখে ? আমি ভালো কি খারাপ সেটাতো আমার রাজনৈতিক কর্মকান্ড দেখেই শুধু বুঝতে পারবেন’।  সোশ্যাল মিডিয়ার বিভিন্ন তথ্য উপাত্তে মনে হচ্ছে, মাশরাফির রাজনীতিতে আগমন এবং সংসদ  নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিয়ে যতটা না সমস্যা তার চেয়ে বেশী সমস্যা মনে হচ্ছে কারো কারো কাছে, কেন তিনি আওয়ামীলীগের হয়ে নির্বাচন করতে যাচ্ছেন?

এই প্রসঙ্গে আমি আমার ব্যক্তি অভিজ্ঞতা থেকে কিছু আলোকপাত করতে চাচ্ছি ।  আমার আর মাশরাফির জন্ম একই শহর, নড়াইলে। আমি এইচএসচি শেষ করার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসার সুবাদে নড়াইল ত্যাগ করে ঢাকাতে বসবাস শুরু করলেও আমি নিয়মিত আমার জন্মস্থান নড়াইলের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করার চেষ্টা করেছি।বলে রাখছি, নড়াইল একটি ছোট্ট অবহেলিত শহর যার মাঝ খান দিয়ে বয়ে চলে গেছে অপরূপ চিত্ৰা নদী। এই নড়াইলে অনেক বিখ্যাত ব্যক্তির জন্ম যেমন, চিত্রশিল্পী এস এম সুলতান, বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ, গীতিকবি বিজয় সরকার, লেখক নিহার রঞ্জন গুপ্ত এবং পরিশেষে মাশরাফি বিন মর্তুজা । এটি একটি ছোট্ট শহর হওয়ার কারনে প্রায় সবাই আমরা পরস্পরকে চিনি এবং জানি।মাশরাফির নানা অ্যাডভোকেট আতাউর রহমান এবং আমার বাবা অ্যাডভোকেট প্রফুল্ল কুমার বোস ছিলেন খুব নিকট জন। মাশরাফির বাবা গোলাম মর্তুজা স্বপন, আর মা বলাকা আমার নিজের বড় ভাই আর বোনের মতো । এতকিছু বলার উদ্দেশ্য হচ্ছে আমি ওর নাড়ী নক্ষত্র অর্থাৎ ওর বেড়ে ওঠা এবং এই পর্যন্ত আসা সবই আমি মোটামুটি জানি।

মাশরাফি কোনো একসময় তার একটি স্ট্যাটাসে লিখেছিলো 'আমরা যারা খেলোয়াড় তারা দেশের জন্য কি এমন করি? শুধুমাত্র বিনোদন দেই। একজন ডাক্তার যে কিনা একজন মানুষের জীবন বাঁচায় আমরা কি সেটা পারি? আরেকটি স্ট্যাটাসে সে লিখেছিলো 'মুক্তিযোদ্ধা হচ্ছে জাতীর শ্রেষ্ঠ সন্তান যারা জীবন বাজী রেখে আমাদের দেশেকে স্বাধীন করেছিল'। এইগুলি বলার উদ্দেশ্য এই যে, ও মানুষ হিসেবে অনেক মহৎ যেটা হয়তো ও পেয়েছে তার পরিবার থেকে। আপনারা হয়তো অনেকেই জানেননা কোনো এক টুর্নামেন্ট থেকে ওর পাওয়া এক কোটি টাকা ও না নিয়ে সেটা দিয়ে ও নড়াইল হাসপাতালের জন্য একটি অ্যাম্বুলেন্স কিনে দিয়েছে দুস্থ্য মানবতার সেবার জন্য। আমাদের সমাজে  কয় জনে পারে এটা বলতে পারেন ?

 ফিরে আসি ওর নির্বাচন প্রসঙ্গে। প্রশ্ন হচ্ছে ও কেন আওয়ামীলীগ থেকে নির্বাচন করছে? ও পরিষ্কার ভাবে বলেছে ও বেড়ে উঠেছে বঙ্গবন্ধু আর মুক্তিযুদ্ধের কথা শুনে। তাহলে ও যদি বঙ্গবন্ধুর দল আওয়ামীলীগ থেকে নির্বাচন করে তাতে সমস্যা কোথায় ? মাশরাফি পরিষ্কারভাবে বলেছে আমি কাউকে আঘাত করার জন্য এই নির্বাচন করছিনা। তার উদ্দেশ্যই হলো নড়াইলের মতো একটি অবহেলিত জেলার সর্বাঙ্গীন উন্নয়ন করা। এই চাওয়াটা কি তার অন্যায় ? সে যদি তার ইমেজ আর কর্মকান্ড দিয়ে একটি জেলার উন্নয়ন করতে পারে তাহলে সমস্যা কোথায় ? এভাবেই হয়তো একদিন হতে পারে আমাদের ৬৪ টি জেলার উন্নয়ন যা সত্যিই নির্ভর করে অনেকটাই একজন জনপ্রতিনিধির উপর।

পরিশেষে আমি এটুকুই বলতে চাই, অনুগ্রহ করে মাশরাফির নির্বাচন নিয়ে আপনারা কেউ রাজনীতি করবেন না, দেশে অনেক বিষয় আছে রাজনীতি করার। আমি বিশ্বাস করি মাশরাফির রাজনীতিতে আগমন এবং নির্বাচনে অংশগ্রহণ তার প্রতিপক্ষের জন্য কখনোই কোনো বিপদজনক অবস্থা তৈরী করবেনা। বরঞ্চ সে একটা উদাহরন হতে পারে রাজনৈতিক সহাবস্থান তৈরীর ক্ষেত্রে। যেটা দেশের সাধারণ মানুষের অনেক বড় একটি চাওয়া । সে সবাইকে নিয়েই কাজ করতে চায়। যদি তাকে সত্যিই আমরা ভালোবাসি তাহলে এই ধরণের একজন সমাজসেবককে দল মতের উর্ধে উঠে আমাদের সমর্থন করা উচিত বলে আমি মনে করি।  

আমি আরো বিশ্বাস করি মাশরাফি নিজেই একটি ইনস্টিটিউশন, রাজনীতিতে সে কখনো লোভ লালসার বশে নিজের স্বপ্ন, ব্যাক্তিত্বকে জলাঞ্জলি দেবেনা। শেষ করতে চাই এই বলে যে, মাশরাফির মতো খেলোয়াড় হয়তো অনেক পাওয়া যাবে  কিন্তু ওর মতো হৃদয়বান, পরোপকারী, দেশহিতৈষী খেলোয়াড় পেতে আমাদের হয়তো অনেকদিন অপেক্ষা করতে হবে।


Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান