ওরা সাম্প্রদায়িকতার দিকে ঝুকেছে কেন?

Sun, Nov 4, 2018 10:24 PM

ওরা সাম্প্রদায়িকতার দিকে ঝুকেছে কেন?

ইমতিয়াজ মাহমুদ: (১) না, হাসি ঠাট্টা বা রঙ তামাশার ব্যাপার না। আমি বাংলাদেশকে একটি সেক্যুলার রাষ্ট্র হিসাবে দেখতে চাই। আমি আমাদের সমাজকে সেক্যুলার সমাজ হিসাবে দেখতে চাই। আমি জেনেছি যে আমার এই প্রিয় রাষ্ট্রকে ধর্ম থেকে আলাদা করাটা জরুরী। আমি এইটাও চাই যে রাষ্ট্র আমাদের সকলের শিক্ষার দায়িত্ব নিবে এবং সেই শিক্ষা হবে ইহজাগতিক শিক্ষা। রাষ্ট্র কারো ধর্মীয় শিক্ষার দায়িত্ব নিবে না, তাকে স্বীকৃতি বা অস্বীকৃতি কিছুই দিবে না। সেগুলি শিক্ষা যারা শিখতে চায় তারা নিজ দায়িত্বে শিখবেন বা শেখাবেন।

 

বিশ্ববিদ্যালয়গুলির কথা আলাদা। সেখানে ওরা ধর্ম অধর্ম যে কোন কিছু শেখাতে পারে ওদের নিজেদের দায়িত্বে। সেখানে আবার রাষ্ট্র মাতব্বরি করতে পারবে না। বিশ্ববিদ্যালয়গুলি বা কোন একটি বিশ্ববিদ্যালয় যদি আজকে ইয়াহুদি ধর্ম শিক্ষা কোর্স খোলে, খুলবে। বা ইসলাম ধর্ম বা ক্রিশ্চান ধর্ম নিয়ে কোর্স- সেটা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইচ্ছা। ওরা পড়াবে ওরা ডিগ্রী দিবে। ঐটা ওদের কাজ। ওরা সেখানে আরবি ফার্সি হিব্রু পালি নানারকম সব ভাষাও শেখাবে।থিওলজি টিওলজিও পড়াতে পারে। সেগুলি তো হবেই।

 

এই যে আমার চাওয়া- আপনার যদি সেটা পছন্দ না হয়, তাইলে এই নীতিতে আপনি আমার পক্ষে নন। অন্য জায়গায় আপনি আমি এক দলে এক সাথে হৈ হৈ রৈ রৈ করতে পারি। ধরেন বাংলাদেশের ক্রিকেট টিমের ব্যাটিং বিপর্যয় নিয়ে আপনি একসাথে একইরকম উদ্বিগ্ন হবো। এইরকম আরও অনেক জায়গায়ই হয়তো আপনি আমি একসাথে হাসবো একসাথে কাঁদবো। সেগুলি হবে। কিন্তু আমাদের এই মতপার্থক্যটি কেবল একটি ইস্যুতে ছোট্ট একটি ভিন্নমত হিসাবে সীমাবদ্ধ থাকবে না।

 

কারণ আপনি কি সেকুলার রাষ্ট্র চান নাকি রাষ্ট্র ও ধর্মকে মিশিয়ে ফেলতে চান এটা একটা অনেক বড় সিদ্ধান্তের ব্যাপার। এটা রাষ্ট্রের কেবল একটি বা দুইটি নির্বাহী কর্ম বা একটি দুইটি আইন বা বিধানের বিষয় না। এই প্রশ্নটি রাষ্ট্রের চারিত্র্যের সাথে জড়িত। আর আমাদের ক্ষেত্রে তো বটেই।

 

(২)

আমাদের রাষ্ট্রের একটা মৌলিক রাজনৈতিক বিতর্ক আছে। সবদেশেই এইরকম একটা দুইটা ইস্যু থাকে। রাষ্ট্রগুলির জনগণ এইসব ইস্যু নিয়ে দ্বিধাবিভক্ত থাকে এবং তর্ক করতে থাকে বছরের পর বছর। আমাদের দেশে এইরকম একটা বিতর্ক হচ্ছে আমাদের স্বাধীনতার সাথে সাম্প্রদায়িকতা সম্পর্ক। আমরা একদল আছি যারা মনে করি সাম্প্রদায়িকতা আর আমাদের স্বাধীনতা পরস্পর বিরোধী দুইটি ধারনা। কেন? কেননা আমরা পাকিস্তানের সাথে থাকতে পারিনি তার কারণ ছিল আমরা বাঙালী।

 

পাকিস্তানকালের অভিজ্ঞতা আমদেরকে শিখিয়েছে যে কেবল ধর্মের কারণে দুইটি জনগোষ্ঠী মিলে একটি জাতী গঠন করতে পারে না। আমাদের অভিজ্ঞতা থেকে আমাদের উপলব্ধি আমাদের জাতীয় পরিচয় থেকে ধর্মকে বিচ্ছিন্ন করা। আমরা গণতন্ত্রকে রাষ্ট্রীয় নীতি মেনেছি, আর গণতন্ত্রে যেমন ধর্ম চলে না তেমনি ধর্মেও গণতন্ত্র চলে না।

 

আবার একদল লোক আছেন যারা মনে করেন যে আমাদের মুসলিম পরিচয়টা আমাদের রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের এবং জাতীয় পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।ওদের কথা হচ্ছে, আমরা বাঙালী শুধু এইটুকু বললেই হবে না, সেই সাথে আমরা মুসলমানও বটে- মানে কিনা মুসলমান বাঙালী। এদের কথায় হিন্দু আর মুসলমান কি ককন এক জাতী হয় নাকি? কভি নেহি। এরা মনে করেন পাঞ্জাবীদের সাথে আমাদের মিলে নাই, আমরা ইনসাফ চেয়েছি, যুদ্ধ করে আলাদা রাষ্ট্র বানিয়েছি, ভাল কথা, কিন্তু রাষ্ট্রের চরিত্র পালটাবে না। ওদের কথায় মনে হবে আগে একটা পাকিস্তান ছিল, এখন ভেঙে দুইটা পাকিস্তান হয়েছে।

 

সেই বিতর্কটা এখানে করছি না। উল্লেখ করলাম এই জন্যে যে ঐ যে প্রশ্নটা, রাষ্ট্রের সেক্যুলার হওয়ার প্রশ্ন, এইটা ছোটখাটো কোন প্রশ্ন না। রাষ্ট্রের মৌলিক ক্যারেক্টার নিয়ে একটা প্রশ্ন এবং এই প্রশ্নেই আমাদের দেশের সকল মানুষ মোটামুটি দুই ভাগে বিভক্ত এবং এই বিভক্তি নিয়েই আমরা আরও দীর্ঘদিন থাকবো। সুতরাং আমি আর বঙ্গবন্ধু যেহেতু সেক্যুলারদের দলে আপনি যদি আজকে কোন না কোনোভাবে সেক্যুলার রাষ্ট্রের বিপক্ষে আপনার অবস্থান নেন, তাইলে তো আপনি আমার ও বঙ্গবন্ধুর বিপক্ষের ক্যাম্পে গিয়ে অবস্থান নিলেন।

 

(৩)

এইটা মনে রাখবেন। বৃহৎ দুইটা ক্যাম্প যদি করেন, তাইলে আপনি কোন ক্যাম্পে? আপনি কি এখনো সেক্যুলার ক্যাম্পে আছেন? ঠিকঠাক মতো দেখেন। যদি থাকেন তাইলে একটু সচকিত হোন প্লিজ। কারণ আপনি যদি কাউকে সেক্যুলার ও লিবারেল সমাজের ত্রাণকর্তা মনে করে তাঁর পেছনে কাতার গড়ে থাকেন, তাইলে একটু ভালো করে আপনার ইমামের দিকে তাকিয়ে দেখেন। তিনি কি এখনো সেক্যুলার লিবারেল ক্যাম্পে আছেন বলে আপনি মনে করেন? যদি মনে না করেন তাইলে?

 

আপনি সেক্যুলার লিবারেল ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষের কাতার মনে করে যেখানে দাঁড়িয়েছিলেন, সেটি যদি আরও দক্ষিণে মোড় নেয় তাইলে আপনি কি করবেন? আপনি সেই কাতার ত্যাগ করবেন। কাতার থেকে বেরিয়ে স্পষ্ট কণ্ঠ আপনি সকলকে জানাবেন যে আপনি সেক্যুলার ও লিবারেল বাংলাদেশ চান এবং সেক্যুলার ও লিবারেল বাংলাদেশ চান বলেই আপনি সেই কাতারে দাঁড়িয়েছিলেন বা তার আশেপাশে ছিলেন। এখন মোহভঙ্গ হয়েছে বিধায় আপনি সঠিক কাতারে এসে দাঁড়িয়েছেন।

 

তাঁর মানে এই না যে ওদের সাথে আপনার মারামারি কাটাকাটি লাগিয়ে দিতে হবে। সেটা তো কোন কাজের কথা না। কিন্তু আপনি যে ঐ কাতারটি ত্যাগ করেছেন সেটা ওদেরকে জানান দিতে হবে। এই জানান দেওয়াটা জরুরী। কেন জরুরী? কারণ এখনো যারা ঐ কাতারে আছেন, আর ঐ কাতারের যিনি ইমাম, তারা যেন জানতে পারে যে সেক্যুলার লিবারেল মুক্তিযদ্ধের পক্ষের লোকজন ওদের সংগ ত্যাগ করছে। ওদেরকে জানতে দিন যে সকলেই ওদের প্রতি অন্ধআনুগত্যে ভুগছে না।

 

এটা তো ঠিক যে আপনি ওদেরকে সমর্থন করেছেন একটি নীতির জন্যে, সেই নীতিটি যদি কম্প্রমাইজড হয়ে পড়ে তাইলে আর ওদেরকে কেন সমর্থন করবেন? আপনি বরং সেখান থেকে সরে এসে আলাদা হয়ে স্পষ্ট করে আপনার সেক্যুলার রাষ্ট্রের পছন্দের কথাটি বলেন।

 

(৪)

এইখানে এসে আপনি আমাকে প্রশ্ন করবেন, বিকল্প কি? আর আমি আপনাকে একটা গালি দিব- ওরে গাধা, তুইই তো বিকল্প, এইটা ভুলে বসে আছিস? আপনি হাসবেন- কেননা আপনি ভাবছেন আমার আর কতোটা শক্তি। এবং শঙ্কিত হবেন, তাইলে যদি জামাত ইত্যাদি ক্ষমতায় চলে আসে? না না, এইসব ইমতিয়াজ ফিমতিয়াজের বাইচলামি শুনা যাবে না।

শোনেন। ওরা সাম্প্রদায়িকতার দিকে ঝুকেছে কেন? ভোট যায়। ভোটের জন্যে মুল্লাদের কাছেই কেন? কারণ বাকি আপনারা যারা আপনারা তো অলরেডি উনাদের পকেটে ঢুকে গেছেন। উনারা এখন হিসাব করছেন, যে আচ্ছা এরা তো আছে, কিনাইলে কইন্যাইলেও যাবে না, এখন একটু অন্যদেরকে আনা যায় কিনা দেখি। এই ভেবে নীতি ফিতি বিসর্জন দিয়ে নেমেছে। আজকে যদি আপনি ওদের কাতার থেকে সরে এসে পুরনো লাল পতাকাটা বেড় করে গুটি গুটি পায়ে পল্টনের দিকে মার্চ করেন, তাইলেই দেখবেন কি তেলেসমাতি কারবার হয়।

 

এখনো বুঝতে পারছেন না আমি কি বলছি? ভেঙে বলি?

 

যেসব বন্ধুরা নিজেকে অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিশীল মনে করেন, একসময় কোন না কোন ভাবে লাল পতাকার মিছিলে ছিলেন, আর এখন নিষ্ঠার সাথে আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় থাকা নিশ্চিত করার জন্যে কাজ করছেন, এখনই সময় আপনি আপনার লাল পতাকাটা নিয়ে সিপিবির পরবর্তী কর্মসূচীতে যোগ দেন। পনের দল ও আট দলের স্বভায় মোহাম্মদ ফরহাদের বক্তৃতার সময় যে লাল পতাকার বান ডাকতো, সেই অবস্থাটা ফিরয়ে আনার চেষ্টা করেন।

 

দেশের সকলে যখন দেখবে আপনার মিছিলে লোক হচ্ছে- তখন দেখবেন শেখ হাসিনাও ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলবেন, আজকের তরুণ ছাত্র যুবকদের মধ্যেও সাড়া পড়বে আর দেখবেন এমনকি বিএনপিও এসে ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলবে।আপনি যখন আপনার অবস্থানে দৃঢ়তা দেখাবেন, আপনার নীতির সমর্থনে শক্ত হয়ে দাঁড়াবেন, তখন দেখবেন মূলধারাঈ আপনার সাথে। কেন আপনি বিকল্প নাই ফিকল্প নাই বলে ভাবছেন।


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান