টরন্টো সিটি নির্বাচন এবং ভবিষ্যতের প্রস্তুতি

Wed, Oct 31, 2018 1:42 AM

টরন্টো সিটি নির্বাচন এবং ভবিষ্যতের প্রস্তুতি

হিশাম চিশতি : গত সপ্তাহে টরান্টো সিটি কাউন্সিলের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। জন টোরী দ্বিতীয়বারের মত টরন্টোর মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন, এবং আমাদের সবার আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু স্কারবোরো সাউথওয়েস্ট থেকে গ্যারি ক্রফোর্ড কাউন্সিলর হিসাবে নির্বাচিত হয়েছেন। জন, গ্যারি সহ অন্যান্য যারা কাউন্সিলর এবং ট্রাস্টি নির্বাচিত হয়েছেন- আমি তাদের সবাইকে আমি আন্তরিক অভিনন্দন জানাচ্ছি। আশা করছি এই নতুন কাউন্সিল একুশ শতকের টরন্টো গড়ার লক্ষে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।

 

আমি এই নির্বাচনে একজন কাউন্সিলর প্রার্থী হিসাবে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলাম। পরবর্তীতে প্রভিন্সিয়াল সরকারের একটি সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে ওয়ার্ডের বাউন্ডারী পরিবর্তন হয়ে ওয়ার্ডের আয়তন প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়। এমতাবস্হায় আরেকজন কাউন্সিলর প্রার্থী মহসিন ভুঁইয়ার সাথে আমি আলোচনায় বসি। তিনি আমাকে প্রতিশ্রুতি দেন যে আমার এজেন্ডাগুলো তিনি বাস্তবায়ন করবেন এবং এবার জয়ী হতে না পারলে সামনের নির্বাচনে তিনি আমাকে সমর্থন দেবেন। এই প্রতিশ্রতির উপর ভিত্তি করে কমিউনিটির স্বার্থে একক একজন বাংলাদেশী প্রার্থী করার লক্ষে মহসিন ভুঁইয়াকে সমর্থন দিয়ে আমি নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াই।

 আপনারা সবাই জানেন যে একক একজন প্রার্থী থাকা সত্বেও নির্বাচনে আমাদের ফল খুব একটা ভাল হয়নি। এই ব্যার্থতার কারণ নিয়ে নানা রকমের আলোচনা চলছে, ফেইসবুক এবং সংবাদপত্রেও অনেকে লেখালেখি করছেন। গত ছয় মাসের নির্বাচনী অভিজ্ঞতা থেকে সাবেক একজন প্রার্থী হিসাবে এই আলোচনায় আমিও কয়েকটি কথা যোগ করতে চাই।

 

কাউন্সিলর নির্বাচন এমপি এবং এমপিপি নির্বাচন থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। এখানে দলীয় কোন ভোট ব্যাঙ্ক থাকেনা, ফেডারেল বা প্রভিন্সিয়াল ইলেকশনের মত এত ডোনারও থাকেনা। প্রার্থীকে সম্পূর্ণ নিজের প্রচেষ্টায় নিজের রেজিউমি ভোটারের কাছে পৌছে দিতে হয় এবং বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই নিজের পকেট থেকে প্রচুর অর্থ খরচ করতে হয়। একজন প্রার্থীর জন্য তাই নিজের রেজিউমি বিল্ড আপ করার জন্য মেইনস্ট্রীমের বিভিন্ন সামাজিক কর্মকান্ডে যুক্ত থাকার কোন বিকল্প নাই। একজন প্রার্থীর লক্ষ হওয়া উচিত বিভিন্ন সামাজিক এবং এলাকাভিত্তিক ইস্যুতে সোচ্চার থাকা, বিভিন্ন সংগঠনের সাথে কাজ করার মাধ্যমে নিজের পরিচিতি বাড়ানো এবং নির্বাচনের আগে আগে একটি শক্তিশালী টীম গঠন করে নিজের ম্যানিফেস্টোটা ভোটারের কাছে পৌছে দেয়া।

এবারের নির্বাচনে আমাদের প্রার্থী মোট ভোটের ১০% পেয়েছেন। ২০১৪ সালের সিটি নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় যে ৩১ নাম্বার ওয়ার্ড থেকে ১ জন বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত প্রার্থী দাঁড়িয়ে ৮% ভোট পেয়েছিলেন। ৩৫ নাম্বার ওয়ার্ড থেকে তিন জন দাঁড়িয়ে মোট ভোটের ১১% পেয়েছিলেন। নির্বাচনে জিততে হলে মোট ভোটের ৩৫-৪০% মত পেতে হয়, আমরা এর কাছাকাছিও যেতে পারছিনা। ২০১৬ এর সেনসাস অনুযায়ী বর্তমান ২০ নাম্বার ওয়ার্ডে বাংলাভাষীর সংখ্যা মোট জনসংখ্যার ৮% এর কাছাকাছি। সুতরাং এটা ধারণা করা যায় আমাদের প্রার্থীরা ঘুরে-ফিরে বাংলাদেশী ভোটের বাইরে তেমন কিছু পাচ্ছেন না এবং শুধুমাত্র বাংলাদেশী ভোটের জোরে নির্বাচিত হবার মত যথেষ্ঠ ভোট আমাদের হাতে নেই।

 

টরন্টো পৃথিবীর সবচেয়ে কালচারালি ডাইভার্স শহর, এখানকার মাল্টিকালচারিজমের কথা আমরা সারা পৃথিবীর কাছে জোর গলায় বলে বেড়াই। একজন বাংলাদেশী-কানাডিয়ান হিসাবে আমি আমার বাংলাদেশী শেকড় নিয়ে গর্ববোধ করি, বাংলাদেশী কমিউনিটির যেকোন প্রয়োজনে সবার আগে সামনে দাঁড়িয়ে যেতে চাই। একই সাথে আমি যখন নির্বাচনে দাঁড়াই, তখন আমি কখনোই চাইনা যে আমি বাংলাদেশী- শুধু মাত্র এই একটি কারণে মানুষ আমাকে ভোট দিক। আমি বাংলাদেশী কমিউনিটির অংশ, বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশী কমিউনিটির জন্য কিছু করতে পারলে আমি নিজেকে ধন্য মনে করি । একই সাথে আমি একজন কানাডিয়ান, কানাডা আমাকে অনেক কিছু দিয়েছে এবং এই অসম্ভব সুন্দর দেশটাকে কিছু ফিরিয়ে দেয়াটা আমার কর্তব্যের মধ্যে পড়ে। আমি আমার বাংলাদেশী এবং কানাডিয়ান দুটি সত্বাকে গুরুত্ব দিয়েই সামনে এগিয়ে যেতে চাই। এখানকার ভোটাররা যথেষ্ঠ সচেতন, এমনকি বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত ভোটাররাও প্রার্থীর যোগ্যতাটাকেই সবচেয়ে বড় ক্রাইটেরিয়া হিসাবে মনে করেন। সেই কারণে আমি মনে করি একজন প্রার্থীর জন্য নিজের কমিউনিটির সাথে সাথে কানাডিয়ান মূলধারাতে প্রবেশ করা এবং বিভিন্ন কমিউনিটির সাথে যুক্ত হয়ে তাদের সমস্যা নিয়ে কাজ করাটা খুবই জরুরী।

 

মানুষের দরজায় দরজায় যেয়ে ভোট চাওয়ার সময় আমি যে জিনিষটা উপলব্ধি করেছি সেটা হচ্ছে এখানকার মানুষ পার্সোনাল টাচ জিনিষটা খুবই পছন্দ করে। ভোট দেবার আগে তারা এটা চায় যে প্রার্থী তাদের কাছে আসুক, তাদের কথা শুনুক এবং নিজের এজেন্ডাগুলো তাদের সামনে তুলে ধরুক। র‍্যালি বা শোডাউন জাতীয় প্রচারণা এখানে খুব বেশী কাজে আসেনা। আর গণতন্ত্রে ভিন্নমতের প্রতি সহনশীলতা থাকাটাও খুবই জরুরী। সব ভোটার আপনাকে ভোট দেবেনা, আপনার পলিসির সাথে একমত হবেনা, আপনি ভোট চাইতে গেলে দরজা খুলবেনা। একজন মানুষের পূর্ণ স্বাধীনতা আছে নিজের প্রার্থীকে বেছে নেবার, তার সমর্থনে অনলাইন এবং অফলাইনে লেখালেখি করবার। এখানে বিরোধীতাটাকে ব্যাক্তিগতভাবে না নিয়ে বিরুদ্ধমতের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে সামনে এগিয়ে যাওয়াটাই উচিত।

 নির্বাচনী টীম গঠন করাটাও খুবই গুরুত্বপূর্ণ। প্রার্থীর স্ট্র্যাটেজিক টীমের আকার হওয়া উচিত খুবই ছোট, ভলান্টিয়ার টীমের আকার হওয়া উচিত বড়। আর সবসময় একটা জিনিষ খেয়াল রাখতে হবে, প্রার্থীর ক্যাম্পেইনে প্রার্থীই যেন সবচেয়ে প্রাধান্য পান এবং তাকে সামনে রেখেই যেন ক্যাম্পেইন চালানো হয়। ভোটাররা প্রার্থীকে দেখতে চায়, তার পরিকল্পনার কথা শুনতে চায়- সেই লক্ষেই নির্বাচনী কার্যক্রম পরিচালনা করা উচিত।

স্কারবোরো সাউথওয়েস্টে আমি বিভিন্ন সংগঠনের সাথে আমি অনেক বছর ধরেই যুক্ত। সমাজসেবা করার জন্য কাউন্সিলার, এমপি, এমপিপি হতে হয় এটা আমি কখনোই বিশ্বাস করিনা। সমাজের স্বার্থে আমি আগে যেমন এগিয়ে এসেছিলাম, এখনও ঠিক সেভাবেই এগিয়ে আসব। আমাদের ওয়ার্ডের মূল ইস্যুগুলো হচ্ছে, ট্রানজিট সিস্টেম আধুনিকরণ, স্কারবোরোর সাবওয়ে, সিনিয়র সিটিজেনদের জন্য আ্যাসিস্টেড লিভিং ফ্যাসিলিটির ব্যাবস্থা করা, পর্যাপ্ত পরিমাণ ডে-কেয়ার, চাকরী সৃষ্টি করা, বাড়ি বাড়া বৃদ্ধির প্রেক্ষিতে আ্যাফোর্ডেবল হাউজিঙের ব্যাবস্থা করা, পর্যাপ্ত খেলার মাঠের ব্যাবস্থা করা। এই ইস্যুগুলো নিয়ে আমাদের কাজ করে যেতে হবে- এমপি, এমপিপি,কাউন্সিলারদের নি্র্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলো পূরণ করার জন্য কার্যকর ব্যাবস্হা নিতে তাদের উপর চাপ প্রয়োগ করতে হবে। নির্বাচনের ঠিক আগ মুহুর্তে প্রার্থী হিসাবে হাজির না হয়ে সামনের চার বছর যদি সত্যিকার অর্থে কেউ মানুষের জন্য কাজ করা যায়, তবে আমার বিশ্বাস ভোটাররা তাকে খালি হাতে ফেরাবেনা।

 

এটি ছিল আমার প্রথমবারের মত নির্বাচনে অংশগ্রহণ। নির্বাচনে দাঁড়িয়ে প্রচুর অভিজ্ঞতা সঞ্চয় হয়েছে, অনেক মানুষ আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন- সমর্থন দিয়েছেন। নতুন কিছু সংগঠনের সাথে যুক্ত হতে পেরেছি, দরজায় দরজায় যাওয়ার কারণে অনেক মানুষের সাথে পরিচয় হয়েছে।সবার নাম এখানে নেয়া সম্ভব হচ্ছেনা, সবাইকে আমি অন্তরের অন্তস্হল থেকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আমার স্ট্র্যাটেজিক এবং ভলান্টিয়ার টীমের জন্য কোন ধন্যবাদই যথেষ্ঠ নয়, এই দূর প্রবাসে তাদেরকেই আমি আত্নীয়-পরিজন হিসাবে মনে করি।

নির্বাচনে দাঁড়িয়ে কিছু নেতিবাচক অভিজ্ঞতাও অর্জিত হয়েছে। ফেইসবুকে ফেইক একাউন্ট খুলে কেউ কেউ আমার বিরুদ্ধে মিথ্যাচারে লিপ্ত হয়েছেন। দুয়েকজন আবার গুজব ছড়ানোর চেষ্টা করেছেন যে আমি নাকি টাকা নিয়ে নির্বাচন থেকে নেমে গিয়েছি। আমাকে যারা চেনেন, তারা সবাই জানেন মানুষের উপকার ছাড়া অন্য কিছু আমার দ্বারা কখনো হয়নি। আমি নিজের সিদ্ধান্তে নির্বাচনে দাঁড়িয়েছি, আমার নির্বাচনী খরচ সম্পূর্ণভাবে আমি নিজে চালিয়েছি এবং নির্বাচন থেকে সরে গিয়েছি সম্পূর্ণ কমিউনিটির স্বার্থে। সৃষ্টিকর্তা আমাকে বৈধভাবে রোজগার করে জীবন চালানোর সামর্থ্য দিয়েছেন, কারো থেকে টাকা-পয়সা নিয়ে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর প্রয়োজন আশা করি কখনো পড়বেনা। যারা ফেইসবুকে ফেইক আ্যাকাউন্ট খুলে বা নানা গুজব ছড়িয়ে আমাকে হেয় করার চেষ্টা করেছেন, তাদের একটা কথাই বলি- এসব করে আমাকে আমার লক্ষ থেকে বিচ্যুত করতে পারবেনা না। বরং এই সময়টুকু কোন ভাল কাজে ব্যাবহার করলে সেটা সমাজ, পরিবার এবং আপনাদের নিজেদের জন্যও মঙ্গল বয়ে আনবে।

 

মহসিন ভাইকে আমি অভিনন্দন জানাই তার সামর্থের সবটুকু দিয়ে শেষ পর্যন্ত লড়াই করে যাবার জন্য। আমাদের কমিউনিটি থেকে তোফাজ্জল ভাই এবং মনোয়ার হোসেন মেয়র প্রার্থী হিসাবে দাঁড়িয়েছিলেন, আমি আশা করি তাদের মেসেজটুকু ভোটারদের কাছে পৌছেছে। ট্রাস্টি পদে দাঁড়িয়ে ফেরদৌস বারী ভাই কি পরিমাণ পরিশ্রম করেছেন সেটা আমার নিজের চোখে দেখা। আমি আশা করব সামনেরবার দাঁড়ালে তিনি নির্বাচিত হবেন। মহসিন ভাই একক প্রার্থী হবার পর কমিউনিটির অনেক মানুষ নিঃস্বার্থ ভাবে তার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন- তাঁদের প্রতি আমার বিনম্র শ্রদ্ধা। কিছু মানুষ আছেন যারা নামে পরোয়া না করে শুধু মাত্র কমিউনিটির স্বার্থে আড়াল থেকে কাজ করে যান, আমরা সব সময় তাদের মুল্যায়ন করতে পারিনা। কিন্তু আমরা যদি এভাবে ঐক্যবদ্ধ থাকতে পারি, বিজয় সময়ের ব্যাপার মাত্র।


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান