ভাষা যখন অপদস্ত!

Tue, Oct 16, 2018 12:14 AM

ভাষা যখন অপদস্ত!

ফরহাদ টিটো: আমি অনেকটাই নিশ্চিত এই পৃথিবীতে দুইটা দেশের মাতৃডাষা আর রাষ্ট্রীয় ভাষা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ তাদের নাগরিকদের হাতেই। এই দুই দেশ ইন্ডিয়া আর বাংলাদেশ । ইন্ডিয়ায় তাদের প্রধান ভাষা (যা বলিউডের ভাষাও) বহু আগে থেকেই ইংলিশ ভাষার কাছে ধর্ষিত উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত সমাজে। এত জগাখিচুড়ি ভাষা হয়ে গেছে হিন্দি যে ওরা হিন্দিতে একটা বাক্য কোনোদিনও বলতে পারেনা । এক লাইন হিন্দির মধ্যে যদি দশটা শব্দ থাকে, তার মধ্যে চার বা পাঁচটা শব্দ শুনবেন ইংলিশ । এতে অপদস্থ দুই ভাষাই।

ইন্ডিয়া থেকে খুব পিছিয়ে নেই আধুনিক বাংলাদেশও । এখনকার উচ্চবিত্ত-উচ্চমধ্যবিত্ত-মধ্যবিত্ত সমাজের শিক্ষিত অংশের বিশাল একটা অংশ বাংলা-ইংলিশ মিলিয়ে জগাখিচুড়ি একটা ভাষা বলে। এই চর্চাটা অসহ্য পর্যায়ে চলে গেছে শো-বিজে আর মিডিয়ায় । আপনি কোনো রেডিও জকি'র ভাষা শুনবেন বা কোনো পার্টিতে ডিস্ক জকি'র ভাষা শুনবেন, বিশেষ ধরণের কোনো তারকানুষ্ঠান দেখবেন, সারেগামাপা টাইপের অডিশন দেখবেন অথবা মিস বাংলাদেশ/ওয়ার্ল্ড বাছাই পর্ব দেখবেন ? বাংলা ভাষার কি করুণ অবস্থা সেসব জায়গায় । মনটা খুব খারাপ হয়ে যায় এসব দেখলে !

কিছুক্ষণ আগে একটা মিউজিক্যাল শো'র (ইন্ডিয়ার Zee Bangla সারেগামাপা) বাংলাদেশ অডিশন পর্ব'র প্রতিযোগীদের মন্তব্য দেখছিলাম টিভি ক্যামেরার সামনে। কয়েকজনকেই বলতে শুনলাম "আপনারা আমার জন্য Pray করবেন"।

কেন ভাই Pray না বলে "দোয়া" বললে কি ইসলামী মৌলবাদী হয়ে যাবেন? আমাদের প্রজন্মে, তার আগের ও পরের প্রজন্মে আমরা তো মুসলমান-হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান সবাই সারাজীবনই বলে এসেছি "আমার জন্য দোয়া করবেন" অথবা "আশীর্বাদ করবেন"। এখানে আশীর্বাদ করবেন বললেও তো কট্টর হিন্দুবাদী হয়ে যাচ্ছেন না ! আশীর্বাদ তো বাংলা শব্দ-ই...নাকি ?

 

আমি জানি, আমরা জানি, আমাদের ভাষায় ইংরেজি বা অন্য কিছু প্রধান আন্তর্জাতিক ভাষার সংস্পর্শ, সম্পৃক্ততা সবসময়ই থাকবে। বলার সময় এমনকী লেখার সময়ও কিছু কিছু ইংলিশ শব্দের সংমিশ্রণ ছাড়া চলতে পারবো না আমরা। কিন্তু তাই বলে এত !!! এত অপ্রয়োজনীয় শব্দ ঢুকিয়ে মাতৃভাষাকে 'ধর্ষন' করবো ?

এর মধ্যে আবার আরবী, হিন্দি, উর্দু'র অনুপ্রবেশও লক্ষ্যণীয় ব্যাপক মাত্রায়। এই আমলে দেশের কাউকে যদি জিজ্ঞেস করি " কেমন আছেন "...বেশিরভাগ মানুষই উত্তর দেয় "আলহামদুলিল্লাহ"। কেন ভাই.. প্রথমে " ভালো আছি" বলে তারপরে "আলহামদুলিল্লাহ" বলা যায় না ?

আমাদের গর্ব ছিলো রক্ত দিয়ে মাতৃভাষা বাংলা অর্জন করেছি আমরা। আমাদের গর্ব ছিলো জাতি সংঘ ঘোষিত আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস একুশে ফেব্রুয়ারি । এইসব গর্ব এখনো হয়তো আছে । কিন্তু ভাষা চর্চায় তার প্রমান নেই, প্রতিফলন নেই ।

এটা যে কত বড় লজ্জা দুনিয়া ঘুরলে বুঝতে পারবেন । ইন্ডিয়া ছাড়া বিশ্বের অন্যান্য দেশের টেলিভিশন অনুষ্ঠানগুলি দেখলে বুঝতে পারবেন ।

আমি এমন একটা দেশে থাকি এখন যেখানে পৃথিবীর সব দেশের, সব সংস্কৃতির মানুষই বাস করে । এরা প্রত্যেকেই নিজেদের কমিউনিটির অনেক আচার-অনুষ্ঠান করে, তাদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক চর্চা করে। বিশ্বাস করেন সবাই নিজের মাতৃচাষায় ভাষায় যখন কথা বলে তখন ইংলিশ বা ফ্রেঞ্চ (এই দেশের দুই রাষ্ট্রীয় ভাষা) ব্যবহার করেনা নিজেদের ভাষার ভেতর। করলেও তা খুব কম। অথচ সব ইন্ডিয়ান, অসংখ্য বাংলাদেশী , অনেক পাকিস্তানী নিজেদের ভাষাটাকে এমন জগাখিচুড়ি করে ফেলে ইংলিশ ঢুকিয়ে যে অন্যভাষার মানুষেরা দ্বিধায় পড়ে যায় শুনলে.. এটা কোন ভাষায় কথা বলছে ওরা ?

 

আমরা কোনোদিনই হয়তো আর শতভাগ বাংলায় কথা বলতে পারবোনা। শতভাগ বাংলা শব্দে রচনাও লিখতে পারবোনা। তবে অন্য ভাষার, বিদেশী শব্দের অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার কমিয়ে দিয়ে মাতৃভাষাটাকে বাঁচাতে তো পারবো ?

 

আসুন না চেষ্টা করি । আজ থেকেই শুরু করি !

লেখক: ফরহাদ টিটো, বাংলাদেশের আধুনিক  ক্রীড়া সাংবাদিকতার পথিকৃৎ


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান