সিনহার যুদ্ধ

Sun, Sep 30, 2018 10:06 PM

সিনহার যুদ্ধ

জহিরুল চৌধুরী : বিচারপতি সিনহা একটি অলিখিত যুদ্ধ শুরু করে দিয়েছিলেন সরকারের বিরুদ্ধে। যে যুদ্ধে চাকরির মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার মাত্র কয়েক মাস আগে তাকে পরাজিত হয়ে বিদায় নিতে হয়েছে। তবে তার নিরন্তর যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়া নিয়ে তিনি যে বইটি লিখে গেছেন, সেটি তাকে অমর করে রাখবে বাংলাদেশের বিচার বিভাগের ইতিহাসে।

সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী জাতীয় সংসদে গৃহীত হয়েছিল ১৭ই সেপ্টেম্বর ২০১৪। সেই সংশোধনী অনুযায়ী বিচারকদের অপসারণ ক্ষমতা সংরক্ষণ করেছিল জাতীয় সংসদ। কিন্তু ২০১৬ সালের ৫মে তারিখে তিনি পাঁচ বিচারপতি সমন্বয়ে গঠিত আপীল বিভাগের রায়ে সংসদে গৃহীত সংশধনীকে বলেন অবৈধ, এবং সংবিধানের সংগে সাংঘর্ষিক।

ঘটনাটি ছিল যুদ্ধের পরিণতি। এর আগে পর্যন্ত বিচারপতি সিনহা সরকারের প্রায় সব রাজনৈতিক আকাঙ্খাকে অগ্রসর করে নিয়েছেন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকার্যে তিনি রায় দিয়েছেন নির্দ্ধিধায়।

কিন্তু ইতোমধ্যে তিনি শত্রু বানিয়ে ফেলেছেন আমলাতন্ত্র এবং সেনাবাহিনীর গোয়েন্দাসংস্থা ডিজিএফআইকে। কারন কয়েক জন সচিব এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের গোয়েন্দা প্রধানের অনুরোধকে তিনি প্রত্যাখ্যান করেছেন ন্যায় বিচারের স্বার্থে।

বিচারপতি সিনহা ছিলেন একজন স্কুল শিক্ষকের ছেলে। সিলেটের নিম্ন আদালতে তিনি উকালতি শুরু করেন ১৯৭৪ সাল থেকে। সততা ও ন্যায় পরায়ণতাকে তিনি পাথেয় করেছিলেন জীবনে। যে কারনে রাস্ট্রের সর্বোচ্চ কাজীর আসন অলঙ্কৃত করেছিলেন মফস্বল থেকে আসা একজন নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তান।

ষোড়শ সংশোধনীকে অবৈধ বলে তিনি কি অন্যায় করেছিলেন? এটি প্রশ্নবোধক হয়ে থাকবে। তবে তিনি সরকারের ক্ষমতাকে এবং রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানকে অবজ্ঞা করেছিলেন পাকিস্তানের বিচারকদের মত।

এ কথা সবাই স্বীকার করেন যে বর্তমান সংসদ যথেষ্ঠ জনপ্রতিনিধিত্বশীল নয়। এটা সরকারে আসীনরা স্বীকার করলেও সংসদ একটি নির্বাচিত রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। একে সাময়িকভাবে দূর্বল ভাবা গেলেও সংসদ চিরকাল দূর্বল থাকবে না। এ দেশে অবাধ নির্বাচনের মাধ্যমে জনপ্রতিনিধিত্বশীল সংসদ অতীতে যেমন গঠিত হয়েছে, ভবিষ্যতেও হবে।

বিচারপতি সিনহা আসলে একজন মেধাবী বিচারক। তিনি এক ঢিলে দুই পাখি মারতে চেয়েছেন। তিনি বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থায় অমর থাকতে চেয়েছেন। আবার একইভাবে তিনি ডানপন্থীদের যে বিরাগভাজনের শিকার হয়েছিলেন, তা থেকে বেরিয়ে আসতে চেয়েছেন। উভয় ক্ষেত্রে তিনি সফল।

এখন আসুন দেখা যাক যুক্তরাষ্ট্রে বিচারবিভাগের স্বাধীনতা কিভাবে রক্ষা করা হয়। যুক্তরাষ্ট্র সংবিধানের অনুচ্ছেদ তিন (আর্টিকেল ৩) দ্বারা বিচারবিভাগ কংগ্রেস অর্থাৎ প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণাধীন। কংগ্রেস যেমন বিচারকদের নিয়োগ দেয়, তেমনি অসদাচরণের জন্য তাদের নিয়োগও বাতিল করে। তবে নিম্ন আদালতের বিচারকদের নিয়োগ দেয় জাস্টিস ডিপার্টমেন্ট। বাংলাদেশে যেটা জুডিশিয়াল সার্ভিস পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগ হয়ে থাকে।

যুক্তরাষ্ট্রে, এমনকি বাংলাদেশের মত বিচারকদের বেতন-ভাতাও নির্ধারণ করে থাকে কংগ্রেস। যুক্তরাস্ট্রের সুপ্রীম কোর্টের প্রধান বিচারপতি জন রবার্টস গত কয়েক বছর ধরে বিচারকদের বেতন ভাতা বৃদ্ধির দাবি জানালেও কংগ্রেস তাতে কর্ণপাত করেনি। এদেশে সুপ্রীম কোর্টের বিচারক নিয়োগ হন আজীবনের জন্য। তবে নিয়োগের আগে তাদের চরিত্র নিয়ে যে বিতর্ক হয় সেটি খুবই দৃষ্টিকটূ হলেও স্বাভাবিক। আমাদের দেশে এটা কল্পনাও করা যায় না!

তবে বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার অনেক সংস্কার প্রয়োজন। প্রয়োজন এটিকে সাধারণ নাগরিকদের নাগালে আনা। সেদিক বিচারে বিচারপতি সিনহার ৬১০ পৃষ্ঠার “দ্যা ব্রোকেন ড্রিম” আমাদের অনেক কাজে লাগবে।


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান