নিরাপদ সড়ক এবং আন্দোলন

Sun, Sep 9, 2018 9:25 PM

নিরাপদ সড়ক এবং আন্দোলন

মিতা হোসেন: এক সময় দেশকে নিয়ে, দেশের ভবিষ্যত নিয়ে ফেসবুকে লিখতাম। কনসার্নড ফিলিংসটা লেখার মাধ্যমে প্রকাশ করার চেষ্টা করতাম। অনেক আগে তা বাদ দিয়ে দিয়েছি। মনে হলো এভাবে লিখে প্রতিবাদ করে কি লাভ! কতজনই তো লিখছে। অবস্থা তো একই রয়ে যাচ্ছে। এক একটি ঘটনা ঘটে, জনসাধারণ সেটা নিয়ে তুমুল ঝড় তোলে। অনেক খবর হয়, প্রতিবাদ হয়, রক্ত বয়ে যায়, টেলিভিশন, সামাজিক মাধ্যমগুলোতে এই নিয়েই আলোচনা, তর্ক-বিতর্ক চলে, তারপর আবার যে কে সেই। দাবী যেগুলো তোলা হয়, সেগুলোর আর কোন খবর পাওয়া যায়না। প্রতিবাদের ফলাফল শূণ্যই থেকে যায়। আবারো একই ঘটনা ঘটে, তখন আবারো আন্দোলন শুরু হয়। আন্দোলন চলাকালে আশ্বাস দেয়া হয়, তারপর তা শ্রেফ হাওয়ায় মিলিয়ে যায়। এ যেন একটি বৃত্ত, ঐ বৃত্তেই আমরা সবাই ঘুরপাক খাচ্ছি।

 

নিরাপদ সড়ক চাই এটা নিয়ে জনাব ইলিয়াস কাঞ্চন একক উদ্যোগে আজ বহুবছর ধরে কাজ করে যাচ্ছেন। তাঁর মত আরো অনেকে যদি এগিয়ে আসেন তাহলে কাজটি আরো সহজ হবে বলে আমার বিশ্বাস। নিজ নিজ বিষয়ে সচেতন হলে, নিজের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করলে অনাসৃষ্টি এড়িয়ে যে কোন ক্ষেত্রেই উন্নয়ন সম্ভব। এক্ষেত্রে বর্তমান আন্দোলনের একটি ব্যাপার উল্লেখ করতেই হয়। এইযে বাচ্চাগুলো সবার লাইসেন্স পরীক্ষা করছে। অবাক হলাম দেখে যে, বেশীরভাগ গাড়ীর চালকরাই লাইসেন্স বা বৈধ কাগজপত্র ছাড়া গাড়ী চালাচ্ছে! এটা কি করে সম্ভব? অবশ্য আমি অবাক হলে কি হবে, বাংলাদেশে এটাই স্বাভাবিক, তা না হলে রাঘব-বোয়াল থেকে শুরু করে, সাংবাদিক এবং আম জনতার কারোরই কি করে লাইসেন্স বা বৈধ কাগজ নেই? আমার চোখে লাগছে কারণ আমি এমন একটি দেশে বাস করি, যেখানে আইনের প্রয়োগ রয়েছে। এখানে এটা কেউ চিন্তাও করতে পারেনা।  আমি দেশে থাকলে হয়ত আমিও বিষয়টিকে স্বাভাবিক বলেই মেনে নিতাম। অবাক লাগত না।

 

বেশ কয়েক বছর আগে একবার দেশে গেলে আমাদের এক স্নেহভাজন আমার কর্তাকে নিয়ে ড্রাইভ করে কোথায় যেন গিয়েছিল। সে সদ্য গাড়ী চালানো শিখেছে। কর্তা স্বাভাবিকভাবেই ভেবেছে, নতুন ড্রাইভিং শিখেছে, লাইসেন্সও করেছে। কিন্তু তার লাইসেন্স বা কোন বৈধ কাগজ-পত্র ছিলনা। এই মর্মে তার বক্তব্য ছিল, ড্রাইভিং জানলেই রাস্তায় নেমে পড়া যায়, লাইসেন্স কেউ দেখে না। কর্তার ভ্রু জোড়া এখনো কপালেই আটকে আছে এত অবাক হয়েছিল সে। যদিও সে নিজের দেশের সমাচার জানে, তবুও সে এতটা ভাবতে পারেনি। বহু বছর দেশ থেকে দূরে থাকায় হয়ত এমনটি হয়েছিল। সে এখনো এই কথা বলে অবাক হয় যে, কি করে এমন হতে পারে, গাড়ী চালানো শিখেই গাড়ী নিয়ে রাস্তায়? লার্নার্স পারমিটও লাগেনা।

 

এই দেশে, মানে মার্কিন মুল্লুকে আগে লিখিত পরীক্ষা দিতে হয় শুধু মাত্র গাড়ী চালানো শেখার পারমিটের জন্য। লিখিত পরীক্ষা দেবার জন্য তাদের রিতিমত পড়াশুনা করতে হয়। ডিপার্টমেন্ট অফ মোটর ভেহিকলস থেকে এই সংক্রান্ত একটি বই বের করে, যেটা বিনামূল্যে বিতরণ করা হয়। যাতে করে সবাই ড্রাইভিং এর নিয়মকানুনগুলো ভালভাবে রপ্ত করতে পারে। ড্রাইভিং লেসন নেবার আগে, এভাবে গাড়ী চালাবার নিয়ম কানুনগুলো শিখতে হয়, রাস্তার দিক-নির্দেশনাগুলো আগে জানতে হয়, তারপর লিখিত পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় পাশ করলে তবেই গাড়ী চালানো শেখার পারমিট পাওয়া যায়। তারপর ড্রাইভিং শিখে রোড টেস্ট দিলে, এবং কৃতকার্য হলে ড্রাইভিং লাইসেন্স হাতে পাওয়া যায়। এই লেসন নেবার একটি বিরাট অংশ আবার পাঁচ ঘন্টার একটি ক্লাসও করতে হয় যেখানে পুরোটা সময় ছাত্র-ছাত্রীদের ড্রাইভিং এর নিয়মাবলী সংক্রান্ত ভিডিও দেখানো হয়। আমাদের দেশে জানিনা এর প্রয়োগ কতখানি। কারণ ঢাকায় আমি নিজে যখন ড্রাইভিং শিখেছি এদেশে আসবার আগে, আমাকে ঐ পাঁচ ঘন্টার ক্লাস করতে হয়নি। দেশে এতকিছু হয়ত করা হয়না ড্রাইভিং শেখার জন্য।

 

যাকগে, বাচ্চাগুলোর জন্য দোয়া করছি, তারা যেন এমনভাবে শকড না হয় যাতে করে দেশের প্রতি তাদের ভালবাসা লোপ পেয়ে যায়। তাদের এই আন্দোলন যেন ফলপ্রসু হয়। কারণ, যে দেশে বিশ্বজিৎরা কোন অন্যায় না করেও রামদা এর কোপে মরে যায়; মেঘ তার বাবা-মায়ের হত্যার বিচার পায়না, এমনকি জানাও যায়না কে তাদের হত্যা করেছে (মেঘকেও রাস্তায় দেখা গেছে প্ল্যাকার্ড হাতে); যে দেশে বাসের ভেতর ধর্ষণ করে মেরে ফেলা হয়; ছোট ছোট শিশুদেরও ধর্ষণের মত ক্রাইমের শিকার হতে হয়। পায়েলরা বাসের ড্রাইভার এবং তার সহযোগীদের হাতে মৃত্যু বরণ করে। তনু ধর্ষণ এবং হত্যা, রাজীব হত্যা, ত্বকি হত্যা এবং আরও, আরও, আরও কত শত অন্যায়ের কোন বিচার হয়না, সেই দেশে নিরাপদ সড়ক চেয়ে আন্দোলন কতটা কার্যকর হবে ভেবে দেখার বিষয়! যে অধিকার সবার জন্যে ন্যায্য এবং  সবার প্রাপ্য, তা আদায় করতে যদি আন্দোলন করতে হয় তাহলে সেই দেশের সরকারের ছবিও ফুটে ওঠে। তবুও আশা জাগে, আমাদের সোনার বাংলা আক্ষরিক অর্থেই কোন একদিন সোনার বাংলা হয়ে উঠবে যখন এই সাহসী প্রজন্ম ভবিষ্যতে দেশের হাল ধরবে। তাই চাইছি, কয়েক বছর আগের প্রজন্ম চত্বরের আন্দোলনের মত এই আন্দোলনও যেন প্রহসনে পরিণত না হয়।


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান