সবার কথা কইলে কবি, এবার নিজের কথা কহো

Mon, Aug 27, 2018 12:04 AM

সবার কথা কইলে কবি, এবার নিজের কথা কহো

ভজন সরকার : মাত্র ৪২ বৎসর বয়েসে স্তব্ধ হয়ে গেলেন। সৃষ্টি থেমে গেল। মাত্র চার দশকের যাপিত জীবনের যে অভিঘাত, যে সংগ্রাম, যে দুঃখকষ্ট, অর্থের বিনিময়ে ইচ্ছের বিরুদ্ধে সৃষ্টির যে অতীব মনোকষ্ট এবং সর্বোপরি উচ্ছল প্রেমের উন্মত্ত দূরন্তপনা থেকে সংসারে- স্ত্রীসন্তানে থিতু হ’বার যে সময়; সে সময়েই এক বিরাট বিশাল শূন্যতাকে সাথী করে নিজেই হয়ে পড়লেন অন্যের দয়াপ্রার্থী।

৪২ বৎসরের মধ্যবয়েসী মানুষটির জীবনের চাকা যেন পেছন দিকে ঘুরে গিয়ে আবার নতুন করে শুরু হলো একেবারে না-বুঝ শিশুর মতো। এতদিনের লিখে রাখা গান-কবিতার বিষয়ভাবনা যেন নিজের জীবনের পরিণতির সাথেই মিশে গেল এক নিদারুণ ট্র্যাজেডির মতো। বাংলাসাহিত্যের এ দূঃখের কাণ্ডারী মহান কবির নাম কাজী নজরুল ইসলাম। নজরুলের জীবনের দুঃখের পূর্বাভাস কি ছোটবেলার ডাক নাম “দূখু মিয়া”-র মধ্যেই নিহিত ছিল?

একবারেই গ্রামের নিম্নবিত্ত পরিবারে জন্মে গোটা জীবন দারিদ্রের মধ্যেই কেটে গেল। প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়ার সুযোগ হলো না তেমন কিছুই। গানটি যদিও শুরু হলো অর্থ-উপার্জণের নিমিত্তে, গ্রামের “লেটো” যাত্রাদলে। অর্থের বিনিময়ের গান লেখার প্রয়োজনীয়তা পরবর্তী জীবনেও বহালই রইল। মানুষের ধর্ম-সাম্যবাদের ধর্মই যাঁর প্রথম জীবনের পাথেয়। সমস্ত প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের প্রতি যাঁর তীব্র অনীহা। ধর্মীয় স্থানে সাধারণের প্রবেশনিষিদ্ধ নিয়ে যাঁর তীব্র ঘৃণাবোধ। তাঁকেও সংসার নির্বাহের প্রয়োজনে ধর্মব্যবসায়ী বেনিয়াদের কাছ থেকে অর্থ নেয়ার বিনিময়ে ধর্মের অযাজিত প্রশংসা করে গান লিখতে হলো। সংসারের প্রয়োজনের জন্য অপ্রয়োজনীয় সৃষ্টিকর্ম নিয়ে আজও ধর্মান্ধদের উন্মাদ-উচ্ছাস সমান তালে চলেছে।

জন্মেছিলেন সাধারণ মানুষের বন্ধু হিসেবে একেবারে সাধারণ ঘরে। লিখেছেন সাধারণ মানুষের পক্ষেই। সাধারণ মানুষের মুক্তির জন্য সংগ্রাম করেছেন ব্যক্তিজীবনে। কবিতা গানেও তার ছোঁয়া; কখনো বিদ্রোহের নিণাদে; কখনো প্রতিবাদের উচ্চকন্ঠে; কখনো ব্যঙ্গাত্মক তীর্যক ভাষায়। কিন্তু সবখানেই এক দরদী কবি মনের সুনিপুন স্পর্শ।

এসব কিছু ছাড়িয়ে কাজী নজরুল ইসলামের উজ্জ্বল প্রকাশ এক গভীর গহীন প্রেমে। সে প্রেম কোন নির্দিষ্ট নারীর মধ্যেই শুধু সীমাবদ্ধ থাকেনি। ছড়িয়ে পড়েছে সমস্ত মানব-মানবীর মধ্যে এক শাশ্বত আকুলতায়। তিনি যতটা বিদ্রোহের কবি, যতটা সাম্যবাদের কবি, তার চেয়েও অনেক অনেক বেশী প্রেমের কবি। তাই ব্যক্তি নজরুলের প্রেমের সমুদ্রমন্থনে উঠে আসে অনেক মহিয়সী নারী। কখনো কবিতায় কিন্ত বেশীর ভাগই তাঁর গানে। আর প্রেমের জন্য নিজের জীবনে এত চড়ামূল্য কাজী নজরুল ইসলাম ছাড়া বাংলাসাহিত্যের অন্য কোন কবি দিয়েছেন কি?

১৯২১ সালে কুমিল্লা বেড়াতে এসে নজরুলের জীবনে এক নয়া অধ্যায়ের সূচনা হলো প্রমীলা দেবীর সাথে পরিচয়ে। পরিচয় থেকে প্রণয় এবং পরিণতি ১৯২৪ সালে। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে জেল ও অনশনে যে টুকু জনপ্রিয়তা ও প্রশংসা কুড়িয়েছিলেন, ব্রাহ্ম প্রমীলা দেবীকে বিয়ের মাধ্যমে তিনি হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের ধর্মান্ধদের কাছ থেকে পেলেন নানা সমালোচনা ও অসহযোগীতা। সে সাথে ব্যক্তিজীবনেও মৃত্যুশোক এলো একের পর এক।

প্রথমে মা মারা গেলেন, পরে প্রথম পুত্র বুলবুল এবং তারপর আরেকপুত্র কৃষ্ণমোহাম্মদ। সাথে যোগ হলো সাংসারিক অনটন। এ সময়েই দেখা যায় নজরুল চাকুরীর পর চাকুরী বদলাচ্ছেন; তবুও সাংসারিক অনটন কমছে না কিছুতেই। একসময়ে তিনি বাধ্য হয়ে কলকাতা ছেড়ে কৃষ্ণনগরে আবাস গড়লেন। ক’বছর পরেই প্রিয়তমা স্ত্রী প্রমীলা দেবী শয্যাশায়ী। মাত্র কিছু টাকার বিনিময়ে এ সময়েই তিনি তাঁর গ্রামোফোন কোম্পানী ও সাহিত্যের স্বত্ত্ব বিক্রি করে দিলেন। কোথাও সাহায্যের ছিঁটেফোটা পেলেন না নজরুল। প্রমীলা দেবীর মা গিরিবালা দেবী নজরুলের দু’পুত্র ও রোগে শয্যাশায়ী কন্যা প্রমীলা দেবীকে নিয়ে অতি কষ্টে সংসার চালিয়ে নিচ্ছিলেন কোন রকমে।

এবার এলো সে কঠিন আঘাত। কিছুদিন আগেই মারা গেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। রবিঠাকুরের শোকে নজরুল মূহ্যমান। হঠাৎ করে নজরুলের বাকশক্তি বিকল হতে লাগলো। মাসাধিক কালের মধ্যেই তিনি ক্রমে ক্রমে স্বব্ধ হয়ে গেলেন বাকশক্তির সাথে বোধশক্তিটুকুও রহিত হয়ে গেল নজরুলের। শয্যাশায়ী স্ত্রী প্রমীলা দেবী পরম মমতায় স্বামী নজরুলের সেবা যত্ন করেও তাঁকে স্বাভাবিকতায় ফিরিয়ে আনতে পারলেন না। নজরুলের চিকিৎসার জন্য উদ্যোগ নেয়া হলো শেষতক তাও ১০ বছর পরে। ততোদিনে নজরুলের দুরারোগ্য ব্যাধি আরোগ্যের বাইরে চলে গেছে।

মাতৃসমা গিরিবালা দেবী মারা গেলেন, চলে গেলেন প্রিয়তমা স্ত্রী প্রমীলাদেবীও। স্বাধীন বাংলাদেশে নজরুলকে নিয়ে আসা হলো চিকিৎসা ও একটু উন্নত সেবাশুশ্রুষার জন্য। এর মধ্যেই কলকাতায় প্রয়াত হলেন পুত্র কাজী অনিরুদ্ধ। এতোসব প্রিয়জনের মৃত্যুতেও নির্বাক কবি। সে নির্বাকতা ভেঙে কবিও চলে গেলেন একদিন। ১৮৯৯ সালের ২৪ মে জন্ম নেয়া “দুখু মিয়া” দীর্ঘ জীবনের স্বল্পপরিসর সময়ে অসীম সৃষ্টি কর্ম রেখে চলে গেলেন না ফেরার দেশে ১৯৭৬ সালের ২৯ আগষ্ট।

বাংলাসাহিত্যের সেই অমর বরপুত্র ও মহান কবির মৃত্যু দিন আজ। অন্তরের গভীরতম স্থান থেকে কবির প্রতি জন্মদিনের শ্রদ্ধাঞ্জলি। “ সবার কথা কইলে কবি, এবার নিজের কথা কহো “।

( হ্যামিল্টন, ওণ্টারিও - আগস্ট, ২০১৪)


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান