ইলিয়াস কাঞ্চনের প্রতি খোলা চিঠি  

Fri, Aug 10, 2018 12:26 PM

ইলিয়াস কাঞ্চনের প্রতি খোলা চিঠি  

মাহমুদ হাসান: প্রিয় ইলিয়াস কাঞ্চন, শুভেচ্ছা নিবেন। শৈশবে আপনার অভিনীত কত সিনেমা দেখেই না বড় হয়েছি। বাসায় টিভি ছিল না, সিনেমা হল চিনতাম না, শুক্রবারের বিকালে বিটিভিতে প্রচারিত পূর্ণদৈর্ঘ্য বাংলা ছায়াছবিই ছিল একমাত্র ভরসা, সেটাও অন্য কারও বাসায়, অন্য কারও টিভিতে। আপনি ছিলেন আমাদের শৈশবের নায়ক। শুভ্র সাদা একটা প্যান্ট, আর সাদা শার্টের মাঝে কিছু চুমকি সেলাই করে লাগানো গেট আপ নিতেন আপনি, সঙ্গে সাদা কেডস ছিল আপনার একটা কমন লুক। সেই লুকটাই মনে হত কী আকর্ষণীয়! পর্দায় আপনি কাঁদতেন, সেই কান্না দেখে আমরাও কাঁদতাম। আপনি ভিলেনকে মেরে ভর্তা বানিয়ে ফেলতেন, আমরাও দেখে দেখে বালিশ কে ভিলেন বানিয়ে মেরে ভর্তা করে দিতাম।

একটু যখন বড় হলাম, চারপাশে বুঝতে শিখলাম, সিনেমা যে সত্যি জীবন নয় সেটা জানলাম, এবং দেশের সিনেমার পাশাপাশি বিদেশের সিনেমাও দেখা শুরু করলাম, আপনি কেমন যেন হারিয়ে গেলেন আমাদের মাঝে থেকে। আলোচনায় আসতেন, তবে সেই গেট আপ নিয়ে আর নায়কোচিত এপিয়ারেন্স নিয়ে আসতে পারতেন না, আপনার সাদা প্যান্ট আর সাদা কেডস আমাদের তখন হাস্য়রসের কারণ হত। কৈশোরেও আপনি ও আপনার সাদা প্যান্ট আমাদের এক অর্থে বিনোদনই দিয়েছেন। আমাদের নায়কের খোরাক মিটাতে তখন বলিউড হলিউডের এক ঝাঁক গ্ল্যামার নিয়ে আসা অভিনেতারা দখল নিয়ে নিয়েছেন আমাদের বিনোদন জগতের। পর্দায় আপনার সাদামাটা প্রেম তখন হাস্যকর লাগত, শাহরুখের আবেগী প্রেম দেখে কান্না পেত।

আরও একটু বড় হয়ে গেলাম, সিনেমার কারিগরি দিক, গল্প বলার ঢং, অভিনয়ের নানা কলাকৌশল জানলাম, একই ছকে ফেলা বাংলা সিনেমায় তখন আমাদের আর পোষাত না, আমরা ভিন্ন গল্পের সিনেমা, ভিন্ন জনরার সিনেমা, ভিন্ন ভাষার সিনেমা, ভিন্ন জগতের সিনেমা দেখা শুরু করলাম। আপনি পুরোপুরিই হারিয়ে গেলেন তখন আমাদের মাঝ থেকে। আপনার সাদা প্যান্ট আর সাদা কেডসও হাস্যরসের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হওয়ার যোগ্যতা হারাল আমাদের জেনারেশনের কাছে। আমাদের কাছে তখন আপনার একমাত্র খবর ছিল বছরে একবার নিরাপদ সড়ক দিবস। আমরা জানতাম, আপনার স্ত্রী সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন, আপনি নিরাপদ সড়ক চাই নামক একটি আন্দোলন করছেন, বছরে দুই একবার প্রেসক্লাবের সামনে একটা ব্যানার ধরে মানববন্ধন করেন, সেখানে চার পাঁচ জনের বেশি কেউ থাকে না। নিরীহ আন্দোলন দেখে সাংবাদিক-পুলিশ-সরকার-জনগণ কেউ সেই আন্দোলনকে পুছে না। আমরা অনুধাবন করতে পারতাম না, বছরের পর বছর এই নিরামিষ আন্দোলন করে কী লাভ হচ্ছে?

তারেক মাসুদ, মিশুক মুনীর মারা গেলেন রোড এক্সিডেন্টে, আমরা নড়েচড়ে বসলাম। ভিন্ন জনরার ছবি তৈরী, ভিন্ন ঢঙে গল্প বলার কারিগর যাঁরা বাংলা সিনেমায় আমাদের ফিরিয়ে আনছিলেন তাঁরা এভাবে মারা যাবেন? নিতে পারছিলাম না আমরা, তখন সম্ভবত জীবনে প্রথমবার আপনার কথা আমাদের নিজে থেকে মনে পড়ে - ইলিয়াস কাঞ্চন না রোড সেফটি নিয়ে একটা আন্দোলন করছিলেন - তবে আমরা সেটা আবার ভুলে যাই দ্রুত।

আস্তে আস্তে আমাদের প্রজন্ম যুবক, টগবগে ও কর্মক্ষম হয়ে উঠে, আমাদের প্রজন্ম দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য, প্রযুক্তি, প্রশাসন, শিক্ষা, অর্থনীতি সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রের দায়িত্ব নেয়া শুরু করে, আমাদের প্রজন্মের কেউ কেউ বাবা-মা-স্বামী-স্ত্রী হয়ে উঠে, দেশ ও পরিবারের দায়িত্ব নিতে শিখে আর আপনারা হয়ে যান বৃদ্ধ। আমাদের সন্তানেরা, ভাইয়েরা, বোনেরা, রাস্তায় ঘাতক বাস-ট্রাকের নিচে পিষ্ট হতে থাকে আর আমাদের কেবলই আপনার কথা মনে পড়তে থাকে। আপনার সাদা প্যান্ট বা সাদা কেডস নয়, আপনার আন্দোলনের কথা, বছরের পর বছর ধরে প্রেসক্লাবের সামনে চার-পাঁচটা মানুষ একটা ব্যানার হাতে নিয়ে নিরীহ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা আন্দোলনটার কথা মনে পড়তে থাকে। আমরা বুঝতে পারি, আপনার ধৈর্য্য আছে।

তারপর যখন একদিন আমাদের সন্তানেরা, ছোট ভাই বোনেরা রাস্তায় ফুঁসে ওঠে রাজপথে নির্বিচার এই হত্যার প্রতিবাদে, আমরা প্রথমেই খুঁজে বের করি আপনাকে। চার পাঁচ জন নয়, এবার বিশ পঁচিশ জন নিয়ে আপনি আপনার নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের অফিসের সামনে দাঁড়িয়ে দীর্ঘ সাক্ষাৎকার দেন। বর্ণনা করেন, কীভাবে বুকে পাথর বেঁধেও আপনি সরাসরি শিশু-কিশোরদের আন্দোলনে যুক্ত হননি, কারণ তখন আপনাকে এই দেশে দোষারোপ করা হত - আপনি উস্কানি দিয়ে ছাত্রদের ক্ষেপিয়ে তুলছেন বলে। আমরা বুঝতে পারি, আপনি শুধু ধৈর্য্যশীল নন, আপনি প্রাজ্ঞ ও বিচক্ষণও বটে। সিনেমায় আপনার এপিয়ারেন্স যতই সাদামাটা হোক না কেন, বাস্তবে আপনার মত নায়কোচিত এপিয়ারেন্স আমাদের এই অভাগা দেশে আর কারও নেই। দিন যায়, আপনি রাস্তায় নামেন, আমরা জানতে পারি যে আপনার সন্তান-সম্ভবা একমাত্র মেয়ের কাছে লন্ডনে না গিয়ে আপনি দেশে বসে আছেন শুধুমাত্র ছাত্র-ছাত্রীদের সঙ্গে থেকে সাহসটা যোগাতে। যেই সাহসটা যোগাতে দেশের অন্য কোন পাবলিক ফিগার পথে নামেননি তখনও। তারপর যখন আপনি দেখেন যে আপনার পঁচিশ বছরের নিঃসঙ্গ পথচলায় অংশ নিতে যেই কিশোর-তরুণেরা পথে নেমেছে, সেই কিশোর-তরুণদের সামনে পড়ে থাকা বাকিটা জীবন ধ্বংস করে দিতে এই দেশের চিরঞ্জীব ভ্রষ্ট রাজনৈতিক পঙ্কিলতা তার করাল থাবা বাড়িয়ে দিয়েছে, আপনি তখন সংবাদ সম্মেলন করে কাঁদতে কাঁদতে সবাইকে ঘরে ফিরে যেতে বলেন, অন্য কিছু না - কেবল জীবনের জন্য, বেঁচে থাকার জন্য। বেঁচে থাকার জন্যেই তো আপনি পঁচিশ বছর ধরে একা একা একটা ব্যানার নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন পথে, আপনি কী করে চোখের সামনে সবাইকে মরতে বা জীবন নষ্ট হতে দিতে পারেন? পারেন না। পারেন না দেখেই আপনি সংবাদ সম্মেলনে আকুল হয়ে কাঁদেন। পর্দার নকল কান্না না, হৃদয়ের গভীরতম গোপন স্থানে পঁচিশ বছর ধরে জমিয়ে রাখা কান্না। আমরা তো এখন আর ছোট নেই, সিনেমায় আপনার নকল কান্না দেখে কান্না না পেলেও সংবাদ সম্মেলনে আপনার সত্যিকারের কান্না দেখে আমাদের চোখ ভিজে আসে। আমরা বুঝতে পারি পর্দায় শাহরুখ খান আর টম হ্যাংকস যতই আপনার চেয়ে ভাল অভিনয় করুক আর পুরষ্কার নিক, বাস্তব জীবনে অন্তত আমাদের দেশের জন্য আপনার মহত্ত্বের ধারে কাছেও তাঁরা কোনদিন আসতে পারবেন না। সিনেমায় আপনার সেই সাদা প্যান্ট আর সাদা শার্ট আর সাদা কেডস যেন আমাদের বাস্তব জীবনের শুভ্রতার প্রতীক, সৌম্যের প্রতীক। আপনি আমাদের বাস্তব জীবনের নায়ক, আমাদের ধৈর্য্য, সহনশীলতা আর মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকার মানবিক দাবীর প্রতি অচল থাকা শেখানোর অসামান্য শিক্ষক। আপনি আমাদের মহানায়ক।

আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যদি কোনদিন আমাদের প্রশ্ন করে, আমাদের চলচ্চিত্রে এত বছরেও কোন অভিনেতার অস্কার নেই কেন, আমরা বলব, আমাদের প্রয়োজন নেই। যেই চলচ্চিত্র শিল্পে আমাদের একজন ইলিয়াস কাঞ্চন আছেন, সেই শিল্পে আমাদের অস্কার না হলেও চলবে। আমাদের তো আগে জীবনের নিরাপত্তা দরকার, পরে বিনোদন। আর সেই নিরাপত্তার দাবীর জন্য নিঃসঙ্গ শেরপা, নিঃসঙ্গ প্রহরী হিসেবে পঁচিশ বছর ধরে আমাদের উপর ছায়া হয়ে থাকা একজন মহানায়ক আছেন। আমাদের অস্কার আপাতত না হলেও চলবে।

[আমি জানি না আপনি এই খোলাচিঠি কখনও পড়বেন কি না, তবে নিশ্চিত জানবেন, আপনার এই গল্প পৃথিবীর আর কোথাও কেউ না লিখুক, আমি লিখে রেখে যাব। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম জানবে - পর্দায় নয়, মহানায়কেরা জন্ম নেন বাস্তব জীবনেই।]


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান