বাংলাদেশে সহিংসতার শিকার শিশুদের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ

Thu, Aug 9, 2018 1:28 AM

বাংলাদেশে সহিংসতার শিকার শিশুদের  অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ

সৈকত রুশদী: নিরাপদ সড়ক। সামান্য এই চাওয়া। রাষ্ট্রের কাছে। শিশু-কিশোর ছেলে ও মেয়ে শিক্ষার্থীদের। আরও চেয়েছিল গত ২৯ জুলাই দুর্ঘটনার নামে রাজপথে সতীর্থ শিক্ষার্থী হত্যার ন্যায়বিচার। আর কিছু নয়।

পথও দেখিয়েছে তারা, রাজপথে নেমে। পরপর কয়েকদিন ধরে যান ও মানুষ চলাচলে অভূতপূর্ব শৃঙ্খলা এনে। ভাঙচুর করেনি গাড়ি। আক্রমণ করেনি মানুষ। সহিংস হয়নি তারা। গাড়ি থামিয়ে লাইসেন্স পরীক্ষা করে দেখার সময় গাড়ির চালক বা মালিককে 'স্যার' বলে সম্বোধন করেছে সবসময়। একটানা ছয় দিন তারা পথে। কোনো বিশৃঙ্খলা ছাড়াই।

কোথাও (যেমন, সিলেটে) কর্তব্যরত পুলিশের হাতে ভালোবাসার প্রতীক গোলাপ ফুল তুলে দিয়েছে। কোথাও বুকে বুক মিলিয়েছে। পুলিশের সদস্যরাও হাসিমুখে ফুল নিয়ে মৈত্রী স্থাপন করেছেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সাথে। কোথাও সন্তানতুল্য শিক্ষার্থীদের বুকে টেনে নিয়েছেন তাঁরা। অসাধারণ এই আচরণের মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীরা জয় করেছে দেশে-বিদেশে কোটি কোটি মানুষের হৃদয়। এমনকী যানের স্বল্পতায় ভোগান্তির শিকার, পায়ে হেঁটে চলাচলে বাধ্য হওয়া মানুষেরও।

হাতেনাতে দেখিয়েছে তারা, রাজপথে কারা আইন ভঙ্গ করে। মূলতঃ আইন প্রণেতা, আইন সুরক্ষা প্রদানকারী কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা এবং আইন প্রয়োগকারী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা।

লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চড়া ও চালানোর দায়ে ধরাশায়ী হয়েছেন মন্ত্রী, সাংসদ, সচিব, বিচারক থেকে শুরু করে পুলিশের বড় বড় কর্তা, সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা, আইনজীবী ও সাংবাদিক সহ সকল স্তরের মানুষ।  শিশু-কিশোর শিক্ষার্থীদের ন্যায়নিষ্ঠতা ও কর্তব্যপরায়ণতার সামনে নিজেদের লজ্জা পাওয়ার কথা স্বীকার করেছেন তাঁরা।

দাবি মেনে হোক আর প্রতিশ্রুতি দিয়ে হোক, তাদেরকে স্নেহের স্পর্শ দিয়ে ঘরে ফেরানো যেত। কিন্তু না। সেপথে যায়নি জাতীয় সংসদের ৫১ শতাংশ আসনে ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ না দিয়ে নির্বাচন নামের এক প্রহসনের মাধ্যমে বাংলাদেশে ক্ষমতাসীন সরকার।অনৈতিকভাবে রাষ্ট্র পরিচালনায় থাকায় এই সরকারের কর্তা-কর্ত্রীদের অল্পতেই আতঙ্ক।  রজ্জুতে সর্পভ্রম।

বন্দুকযুদ্ধের নামে বিনাবিচারে দেশের নাগরিকদের হত্যা ও গুম এবং যেকোনো ন্যায়সঙ্গত দাবিকে শক্তি প্রয়োগ ও নিপীড়ন করে দমনের নীতি যাদের, সরকার পরিচালনাকারী সেই ব্যক্তিদের মধ্যে সম্ভবত: নিজ সন্তানের বাইরে আর কোনো শিশু-কিশোরের জন্য ভালোবাসা অবশিষ্ট নেই। ক্ষমতা ও বিত্তের লোভ গ্রাস করেছে তাদের মানবিকতা।

রাজপথে সেই শিশুরা আজ পুলিশ এবং সশস্ত্র ভাড়াটে গুন্ডাদের উপুর্যপরি আক্রমণে শারীরিক সহিংসতার শিকার।  অনেকে  গুরুতর আহত হয়েছে।  তাদের বেশিরভাগের শারীরিক আঘাত ও ক্ষত দৃশ্যমান।  অনেকের আঘাত বাইরে থেকে দৃশ্যমান নয়। অনেকে  আঘাত থেকে বেঁচে গেলেও চোখের সামনে সতীর্থের উপর হামলার দৃশ্য দেখে মানসিক সহিংসতার শিকার। তারা ট্রমা আক্রান্ত। 

ফলে এদের মধ্যে কেউ কেউ এখন মানসিক অসুস্থতার লক্ষণ 'প্যানিক অ্যাটাক'-এ আক্রান্ত হচ্ছে।  এর জন্য দায়ী পুলিশি অভিযানের নির্দেশ দাতা সরকার এবং রাষ্ট্র। ভাড়াটে গুন্ডা ব্যবহারের কুবুদ্ধিধারী ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল।

প্রাসঙ্গিক বলেই মনে পড়ছে আজ থেকে প্রায় পাঁচ দশক আগেকার কিছু স্মৃতি। অভিজ্ঞতা। ১৯৬৯ সালে আমি ষষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্র ঢাকার ইন্টারমিডিয়েট টেকনিক্যাল কলেজে (বর্তমানে বিজ্ঞান কলেজ)।  জানুয়ারীর দ্বিতীয় সপ্তাহে ভর্তি হয়ে ঢাকায় আমার শিক্ষার্থী জীবনের সূচনার কয়েকদিনের মধ্যে ১১-দফার আন্দোলন দানা বেঁধে উঠলো তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে। জ্যেষ্ঠ শিক্ষার্থীদের অনুগামী হয়ে আমরাও রাজপথ প্রকম্পিত করলাম পাকিস্তানের আইয়ুব খান ও সরকার বিরোধী শ্লোগানে। অগণিত মিছিলে।  জ্যেষ্ঠদের মধ্যে ছিলেন ১৯৯০ সালের ২৭ নভেম্বর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে শহীদ ডাক্তার শামসুল আলম মিলন।  মুস্তাফা মজিদ নামে খ্যাত লেখক ড: গোলাম মোস্তফা প্রমুখ।

ছাত্রদের বিক্ষোভে উত্তাল ধাকায় ২০ জানুয়ারী পুলিশের গুলিতে ঢাকায় শহীদ হলেন কলেজ ছাত্র আসাদুজ্জামান।  আর ২৪ জানুয়ারী স্কুলের ছাত্র মতিউর।  ফেব্রুয়ারীতে ছাত্রদের বাঁচাতে গিয়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গুলিতে শহীদ হলেন ড: শামসুজ্জোহা। আন্দোলন বেগবান হয়ে গণঅভ্যুত্থানে রূপ নিলে ২৫ মার্চ ক্ষমতা ছেড়ে দিতে বাধ্য হলেন লৌহমানব নামে খ্যাত বা কুখ্যাত সাবেক সামরিক শাসক ফিল্ড মার্শাল মোহাম্মদ আইয়ুব খান। বিজয় হলো ন্যায়সঙ্গত দাবির।

১৯৭০ সালে আবারও রাজপথে নামি আমরা 'পাকিস্তানের কৃষ্টি' নামে পাঠ্যক্রম বাতিলের দাবিতে। আমাদের বয়স তখন বারোর নিচে।

পাকিস্তানের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী উর্দুভাষী সরকারের নির্দেশে কখনও কখনও গুলি চালালেও শিশু-কিশোরদের উপর সহিসংসতার নজির নেই বললেই চলে।  ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাত্রিতে পাকিস্তানীদের কাপুরুষোচিত আক্রমণে সূচিত নয়মাসব্যাপী গণহত্যা ও নৃশংসতার আগে ট্রমাতে আক্রান্ত হওয়ার মতো কোনো সহিংসতার অভিজ্ঞতা আমাদের হয়নি।

সাতচল্লিশ বছর পরে, স্বাধীন বাংলাদেশে শিশু-কিশোরদের ট্রমাতে আক্রান্ত হওয়ার মতো সহিংসতার শিকার হতে হয়েছে এদেশের বাংলা ভাষী এক সরকারের নির্দেশে। যে সরকার 'মুক্তিযুদ্ধের চেতনা' ফেরী করে ক্ষমতায় আসীন এবং টিকে থাকতে চায়! কী লজ্জার !

ট্রমা আক্রান্ত ও প্যানিক অ্যাটাকের শিকার এই শিশু-কিশোরদের সুস্থ করে তোলার জন্য প্রয়োজন সঠিক রোগ নির্ণয়, মানসিক চিকিৎসা এবং সস্নেহ পরিচর্যা।  নিজ বাড়িতে, আত্মীয় পরিজন ও  প্রতিবেশীর মাঝে এবং শিক্ষালয়ে সহানুভূতিপূর্ণ অনুকূল পরিবেশ।

প্রয়োজন নিরাপদ সড়ক ও যানবাহন।  আর আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ।  তবেই কেবল তারা সুস্থ হয়ে উঠতে পারে।

নাহলে এই প্রজন্মের শিশু-কিশোর ছেলে ও মেয়েদের মধ্যে যে মানসিক অসুস্থতাজনিত দীর্ঘমেয়াদী প্রতিক্রিয়া দেখা দেবে, তার নেতিবাচক ফল দেখা দিতে পারে ভবিষ্যতের তরুণ ও যুবকদের মধ্যে।  বৃহত্তর সমাজে ও বাংলাদেশের ভবিষ্যতে।

শারীরিক ও মানসিক আঘাতে অসুস্থ হয়ে পড়া এই শিশু-কিশোরদের ভবিষ্যৎ নিরাপদ করতে না পারলে বাংলাদেশে কারও ভবিষ্যৎই কী নিরাপদ থাকবে?

টরন্টো, ৯ আগস্ট ২০১৮


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান