স্বাধীনতাহীনতার বাংলাদেশে

Wed, Aug 8, 2018 10:20 PM

স্বাধীনতাহীনতার বাংলাদেশে

বেলাল বেগ : ‘স্বাধীনতা’ শব্দটির সন্ধিবিচ্ছেদ করলে দাঁড়ায়, স্ব+অধীনতা; সাধারণ কথায় নিজের মালিকানা বুঝায়। এ নিবন্ধে আলোচনার তিনটি দিক থাকবে; ব্যক্তিগত, জাতিগত ও রাষ্ট্রীয়।

স্বাধীনতা প্রানের বৈশিষ্ট। নির্বাক নিশ্চল উদ্ভিদের বীজ থেকে জীবের জীবকোষ নিজে নিজেই বৃদ্ধি ও পরিপূর্ণতা পায়। ঐ বৃদ্ধিতে বাধা পড়লে তারা নিজেরাই বিকল্প পথ বের করে বেঁচে থাকতে চায়। যে লতা ও চারা সরাসরি আলো পায় না সে নিজের দেহটিকে এঁকে বেঁকে হলেও সূর্যালোক থেকে তার খাদ্য সংগ্রহ করার চেষ্টা করে, না পেলে মরে যায়। প্রানী শিশুদেরও চাই বেড়ে ওঠার স্বাধীনতা। মানব শিশুর বেড়ে ওঠা ঘটে দু’ ক্ষেত্রে, দেহে এবং মনে। দুই ক্ষেত্রেই বেড়ে ওঠার শর্ত স্বাধীনতা। উপযুক্ত পরিবেশ না পেয়ে বিকলাঙ্গ এই উভয় প্রকার বৃদ্ধি, একজন পূর্নাঙ্গ মানুষের সারা জীবনের বিড়ম্বনা, কষ্ট ও অশান্তির কারণ হয়ে যায়; অবহেলা ও করুণায় তার সারাটি জীবন দূর্বিসহ হয়ে থাকে।

মানুষের ব্যক্তিস্বাধীনতাকে শৈশব থেকেই লালন করতে হয়। সন্তানের লালন পালনের দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধ স্ত্রী পুরুষ উভয় লিঙ্গের প্রানীর মাঝে প্রকৃতিই প্রস্তুত রাখে। মানুষের ক্ষেত্রেও তাই। শিশুদের স্বাধীনতা শুরু হয় হামাগুড়ি, হাতাহাতি,ঘাটাঘাটি দিয়ে। গরীবঘরের খেটে খাওয়া মানুষের শিশুরা এ স্তরটি ভালভাবেই উপভোগ করতে পারে কারণ তাদের উপর চোখ রেখেও বাবা মা সংসারের কাজ করে কিন্তু স্বচ্ছল ঘরের শিশুরা হামাগুড়ি দেবার আগেই কোলে কিংবা প্যারাম্বুলেটরে ওঠে। এভাবেই ওরা পরনির্ভর হবার সাথে সাথে আত্মনির্ভরতা বাঁ স্বাধীনতা হারাতে থাকে। এদিক থেকে গরীবের ছেলেটা ভাগ্যবান। স্বাধীনতার প্রাকৃতিক প্রশিক্ষন ছয় বছর বয়েছে শেষ হয়ে যায় যখন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মানব শিশুর সামাজিকরণ শুরু করে। শিশু জীবনের এই সন্ধিক্ষনে নির্ধারিত হয়ে যায় তার ভবিষ্যত জীবন যখন শিক্ষার মানই নির্ধারণ করে তার ভাগ্য। উন্নত অনুন্নত,পশ্চাদপদ, সভ্য অসভ্য দেশগুলির পার্থক্য নির্ধারিত হয় শিশু শিক্ষার মানের পার্থক্য দিয়ে।

অনুন্নত, পশ্চাদপদ দেশগুলির রাজনীতির প্রধান স্লোগানই হল উন্নয়ন। তাদের মনযোগের সবটাতেই থাকে নগরায়ন,নাগরিক সুবিধাদি। কিন্তু যে লোকবলের সাহায্যে ঐ উন্নয়ন যজ্ঞ চলে তার যথাযথ যোগ্যতার যোগান সম্বন্ধে বেশি মনযোগ থাকে না। শুধু তা নয়, ব্যবস্থাপকেরা হুকুমের মাধ্যমে শ্রমিক কর্মীদের কাজ আদায় করে নেয়, উন্নত দেশের স্বতঃপ্রণোদিত স্বতঃস্ফূর্ত শ্রমের কল্পনাও করতে পারে না। উন্নত দেশগুলিঢ় মানুষ স্বাভাবিক ভাবে শুধু কর্মপ্রিয়ই নয়, তারা কর্মের সুফলও পায়। কোথায় পায় তারা এ শিক্ষা? ঐ সেই মানবজীবনের স্বাধীনতা উপভোগের আনন্দ থেকে যা দেয় তাদের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা।

বাংলাদেশে ‘স্বাধীনতা’ নিহায়েৎ একটি রাজনোইতিক প্রপাপান্ডা, মোটেই রাজনৈতিক বাস্তবতা নয়। রাজনৈতিক বাস্তবতা হত বাঙালির জাতি-রাষ্ট্রটি যদি ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারীতে জেগে ওঠার পর থেকেই তার ধর্মনিরপেক্ষ সামাজিক সাংস্কৃতিক রাজনোইতিক জীবনটা ধারাবাহিকভাবে অনুসরণ করে যেতে পারত। তাদের প্রধান প্রতিবন্ধকতাটাই হচ্ছে ধর্ম যা যুগে যুগে মানুষে মানুষে ভেদাভেদ ও হানাহানি সৃষ্টি করেছে এবং এখনও করে চলেছে। শুধু তাই নয়, ধর্ম প্রশ্নাতীত বিশ্বাস দ্বারা মানবের স্বাধীনতাকে অস্বীকার করে। ধর্মের দোহাই দিয়ে জন্ম নেয়া পাকিস্তানের ইতিহাস কখনই বাঙালির ইতিহাস ছিল না বা হতেই পারে না। বাংলাদেশের জন্মই তা প্রমান করে দিয়েছে। পাকিস্তান এনেছিল বাঙালি মুসলমানেরা যারা মাতৃভাষা বাঁচাতে গুলি খেয়েই শেষ বারের মত বুঝেছে নিয়েছে ধর্ম আসলেই একটি রাজনোইতিক ধাপ্পা।

১৯৭১’র মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানী শাসকদের বিদায়ের সঙ্গে সঙ্গে ঝেঁটিয়ে সাফ করা হয়েছিল তাদের ধর্ম-ধাপ্পা সংস্কৃতি যার হিংস্র অনুসারী হচ্ছে জামাতে ইসলাম যারা ইসলামি রাজ প্রতিষ্ঠায় রক্তপাতেও বিশ্বাস করে। স্বাধীনতার পর জামা্তে ইসলাম এবং জামাত-মুস্লিম লীগের ধর্ম-রাজনীতি স্বাভাবিক ভাবেই ধর্মনিরপেক্ষ বাঙালির দেশ বাংলাদেশে নিষিদ্ধ হয়েছিল; বহিষ্কৃত হয়েছিল গোলাম আযম, আর গা ঢাকা দিয়েছিল পাকিস্তানের সহায়তাকারী রাজাকার আলবদর খুনীরা। বাঙালি জীবন দর্শন ও সংস্কৃতি বিরোধী সকল প্রতিবন্ধকতা অপসারণ করার পরই আসল কাজটি করে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার; তারা রচনা ও প্রতিষ্টা করেন ইতিহাসের প্রথম বাঙালি রাষ্ট্র বাংলাদেশের মহান সংবিধান যা ছিল শ্বাশ্বত বাঙালির জীবন বিধান। সংবিধান প্রলনের সংগে সংগেই মুক্তিযুদ্ধার্জিত স্বাধীনতা চিরস্থায়ী ঠিকানা পেয়ে যায়। সেই স্বাধীনতাই নিহত হয়ে গেছে সপরিবার স্বাধীনতার স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ চার সহযোগীর নির্মম হত্যাকান্ডের মাধ্যমে। পরাজিত পাকিসতান ও তার প্রতিপালক আমেরিকার অনুচরেরা জিয়া-মুশতাক গং শুধু বাংলাদেশেরই দখলই নেয়নি, বাঙালির যে শক্তি তার সংস্কৃতি সেটাতেই ধর্মের রঙ মেখে সঙ বানানর চেষ্টা শুরু করে। ধর্মনিরপেক্ষ বাঙালির সংবিধানে বিসমিল্লাহ ঢুকিয়ে তারা দেশটাকে মুস্লিম হিসাবে বিশ্বে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিল। ঠিক এ সময় জনগনের সহায়তায় আওয়ামি লীগ আবার বাংলাদেশের শাসন ভার পায়। জনগন ভেবেছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা বিরোধীদের ধংস করা সংবিধান আবার ফিরে আসবে, বাঙালি আবার ফিরে পাবে তার স্বাধীনতা। কিন্তু পেলনা; বিধর্মীর কলমা পড়ে মুসলমান হবার মত বিসমিল্লাহ’র হেডব্যান্ড পরা বাঙালির প্রথম সংবিধান মুসলমানই থেকে গেল; ৩০ লক্ষ শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা পাকিস্তানের কাছেই জমা থাকল। জনগন কিছুই বলল না কারণ তাদেরই অর্জিত স্বাধীনতা আওয়ামি লীগ যেমন তাদের ফেরৎ দেয়নি, বিএনপিও দেয়নি অর্থাৎ বাংলাদেশের জনগন বঙ্গবন্ধুর পর সেই যে বিচ্ছিন্ন হয়েছে, আজও বিচ্ছিন্ন আছে। স্টেডিয়ামে বসে খেলা দেখার মত তারা খাই-দাই-ফূর্তি করা রাজনীতি খেলা দেখছে। ‘বড় বিষ বড় জ্বালা এ বুকে, রাজনীতি খেলা তোমরা খেল গো বন্ধু যাহারা আছ সুখে। ৭ই মার্চের ভাষণ আজ শুধু হতাশার বাষ্প ছড়ায়! আগুন ঝড়ায় না। হায় স্বাধীনতা।


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান