ট্যাব জেনারেশনের প্রথম উত্থান

Sat, Aug 4, 2018 1:53 AM

ট্যাব জেনারেশনের প্রথম উত্থান

হিলাল ফয়েজী : এককালের 'রাজপথ' কথাটি এখন কার্যত অচল। স্রেফ 'জনপথ'। শুধু 'জনপথ'ই নয়, 'জ্যামপথ' বলাই বরং  ঠিক। সে যে পথই বলি না কেন, সে পথ দখলের প্রথম মিছিলে ছিলাম ১৩ বছর বয়সে। ১৯৬৪ সালের ফেব্রুয়ারি গেণ্ডারিয়া থেকে প্রভাতফেরিতে নগ্নপদ মিছিলে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। তারপর ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান। পথ জনতার। একাত্তরের মার্চ। বিদ্রোহী রূপকথা। সকল স্তরের বাঙালিদের দখলে পথ। নব্বইয়ে পথ দখলের গণবিস্ম্ফোরণ। কোটা সংস্কার আন্দোলনটি ছিল মিশ্র প্রতিক্রিয়ার। 'মুক্তিযোদ্ধা'বিরোধী অবয়বদানের একটি কুটিল-নেপথ্য-জটিল ষড়যন্ত্রের শক্তি কোটা আন্দোলনের স্নিগ্ধ নির্যাসকে দূষিত করে ফেলতে সফল হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধপন্থি অনেককেও বিভ্রান্ত করতে ওরা সক্ষম হয়েছে।

বলতে গেলে সচেতন সারাটা জীবন প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সবভাবেই মানবমুক্তির সাম্য সাধনায় নিয়োজিত ছিলাম, আছি। পৃথিবীতে কখনও কোথাও এমনটা হয়েছে কিনা জানি না। পথে পথে, মোড়ে মোড়ে, শহরজুড়ে হীরক চূর্ণের হীরকদ্যুতি। ওরা ট্যাব জেনারেশন। ওদের সতীর্থদের রক্তে জনপথ এবং পথের কিনার লাল হয়েছে। ওরা ডিজিটাল স্বাপ্নিক। ওদের প্রতিবাদের ডিজিটাল সংকেত ছড়িয়ে পড়ল সারাদেশে। একজন অ্যানালগ মিনিস্টারের হৃদয়হীনতার কুটিল হাস্যময় দন্ত এই ডিজিটাল জেনারেশনকে তীব্রভাবে ক্ষিপ্ত করে তুলল। এই অ্যানালগ মিনিস্টার মন্ত্রী হলেন নৌযানের, সড়কযানের তিনি মালিক এবং পরিবহনের এক নম্বর ইউনিয়নিস্ট। একের ভেতর কত যে বাহার। 'সর্প হইয়া দংশন' আর 'ওঝা হইয়া ঝাড়া'র মুখোশ তার উন্মোচিত। তার ইশারায় থেমে যায় গতিময় পরিবহনের বাংলাদেশ। সুতরাং স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীকেও হিসেব করে চলতে হয়। এ অ্যানালগ ভয়ঙ্কর। বিপজ্জনক।

পরিবহন শ্রমিকরাও এই মালিক-জন-শ্রমিক নেতার 'অঘটন'পটু ক্ষমতা ও প্রভাবের কথা জানেন। বিশেষত প্রতিটি বাসে বাসে এ খবর জানা। এই বাসগুলো কোনোরকম কেয়ার করে না। যেমন ইচ্ছা তেমন। যখন ইচ্ছা তখন। এই অ্যানালগ 'কুশাসনে' মানুষ ত্যক্ত-বিরক্ত। ক্ষমতাসীন প্রধান নেত্রী রাষ্ট্রের ক্ষমতাযুদ্ধে এমন একজন অ্যানালগ-তারকাকে চটাতে যে চান না, এটা রাষ্ট্রের 'ওপেন সিক্রেট'। এই বাসগুলোর মালিক অ্যানালগ মিনিস্টারের দলবল, ক্ষমতাসীন অনেকে। আমাদের সামরিক-বেসামরিক আমলা, আমাদের জবরদস্ত পুলিশেরা। সুতরাং পায় কে কোন বাসকে। এই বাসের জবরদস্তিতে কত যে প্রাণ গেছে, তার হিসাবও নেই, ঠিকুজিও নেই। বাসে বাসে লাগাও দমকাড়া কমপিটিশন। তাতে বাসচালক-শ্রমিকরাও যে প্রাণে বাঁচে না, সেও আর বিচিত্র খবর নয়।

অ্যানালগ মিনিস্টার দাঁত কেলিয়ে হাসেন। ভারতে ৩৩ জন মরলেও রা নেই। বাংলাদেশে মাত্র দু'জন। এতে এত ক্ষোভ-প্রতিবাদের কী আছে! এই একটি বাক্য যখন ডিজিটাল মিডিয়ায় দেখানো হলো, ওই দাঁত, ওই কেলানো শিল্পকলা, তখন ডিজিটাল ট্যাব জেনারেশনের ক্ষোভ দাউদাউ করে উঠল। ষাটের দশকের মতোই সে আগুন ছড়িয়ে গেল সবখানে। টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া। রূপসা থেকে পাথারিয়া। এত দ্রুত, এত সুন্দরগতিতে, এত সুশৃঙ্খল।

শুধু প্রতিবাদ নয়। হঠাৎ ওদের ভেতরের ট্যাব প্রজন্ম জেগে উঠল। ওরা নিজেরাই পরিবহন খাতের সব নোংরা-ময়লা-দুর্নীতি পরিচ্ছন্ন করে ফেলবে। ওরা নিজেরাই ড্রাইভিং লাইসেন্স দেখবে, রুট পারমিট, ট্যাক্স টোকেন, ফিটনেস সনদ দেখবে। তবে তো গাড়িকে মুক্তি দেওয়ার আগে এসব কৈশোরিক অনুসন্ধান সিদ্ধ হবে।

তারপর? বিশ্ব দেখল এক চারুময় দৃশ্য। ট্যাব জেনারেশন কী বুদ্ধির দীপ্তি হীরকদ্যুতি ছড়িয়ে শহরের মোড়ে মোড়ে চেক করে চলেছে পথে নামা গাড়ি। ত্রুটি থাকলে গাড়ির চাবি জমা দিচ্ছে কর্তব্যরত কিংকর্তব্যবিমূঢ় ট্রাফিক পুলিশের কাছে। এই ডিজিটাল ট্যাব জেনারেশন কার্যত থাপ্পড় দিচ্ছে অ্যানালগ প্রশাসনকে। অ্যানালগ মাফিয়া দুর্নীতিবাজদের।

এ যুগের ছেলেরা ট্যাবমুখী, ফেসবুকমুখী, কোনোদিকে কোনো খবর রাখে না। স্বার্থপর। সমাজবিমুখ। যারা ক্ষমতায়, তারাও এদের চেতনার খবর রাখে না। যারা বিরোধী পক্ষে তারা তো ফাঁকফোকর সুযোগ খোঁজে। যেমন এবারও।

'ডিজিটাল সরকারের দাবিদার' অ্যানালগ প্রশাসন রীতিমতো হতবাক হয়ে গেছে ট্যাব জেনারেশনের এই আশ্চর্য উত্থানে। অ্যানালগ-মাফিয়ার দন্তব্যাদান কেমন কেমন ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। এখন শুরু হবে আরেক অধ্যায়।

ট্যাব জেনারেশনের কাছে সরকার যতটুকু সম্ভব সব দাবি মেনে নিয়ে অবস্থান শক্ত করছে। ওদিকে ওরা যেন কোনোমতেই রাজপথ না ছাড়ে সে জন্য সরল-জটিল অনেকেই সামাজিক মাধ্যমে চেষ্টা করে যাচ্ছে। এই উত্থানে বিস্মিত অনুরাগী অনেকেই বলছে, হে হীরক আলো ছড়ানো সন্তানেরা, তোমাদের কাজ তোমরা করেছো। তোমরা পথ দেখিয়েছো। অ্যানালগ প্রশাসনের মুখ কালো রঙে পুড়িয়ে দেখিয়েছো জনপথে গাড়ি কত সুশৃঙ্খল চলতে পারে। এবার স্কুলে ফেরো। নইলে তোমাদের চমৎকার অর্জনকে ধ্বংস করে দেবে পরিবহন মাফিয়ারা, আর ঝোপ বোঝে কোপ মারা বিরোধী ষড়যন্ত্রীরা।

ট্যাব জেনারেশন, এবার উৎসাহের গতি কমিয়ে আনো। তোমাদের এই চেতনা প্রমাণ করেছে, আমাদের ভবিষ্যৎ নিরাপদ। তোমরা বড় হতে থাকো এবং মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ী বাংলাদেশকে সুন্দর থেকে সুন্দরতর করতে থাকো। তোমাদের উত্থানকে বিনষ্ট করার শক্তি অ্যানালগ প্রশাসনে, অ্যানালগ বিরোধী দলে। কে বলে এ দেশে শিক্ষার মান কমেছে। গত কয়েকদিনের বাংলাদেশ প্রমাণ করেছে, আমাদের ট্যাব জেনারেশন বাস্তব বুদ্ধিমত্তায় অনেক এগিয়ে।

দেশের এমন সম্ভাবনাময় সম্পদকে কেউ দাবিয়ে রাখতে পারবে না। শোনা গেছে, আগামী বছরই ফাইভ-জি এসে যাবে। আর আমাদের পায় কে? তথ্যপ্রযুক্তিতে আমরা এমন দীক্ষিত শিক্ষিত হবো যে, অ্যানালগ প্রশাসনের সব আবর্জনা পুড়িয়ে ফেলে অন্ধকার তাড়াবার আগুন জ্বালব দিকে দিকে। দুর্নীতিবাজদের ঘুম দেব খুন করে।

সালাম সালাম, হে নবউত্থিত ট্যাব জেনারেশন।

*লেখাটি দৈনিক সমকাল থেকে নেওয়া হয়েছে।


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান