সাড়ে সাতাশ পদ!

Sun, Jul 29, 2018 11:30 AM

সাড়ে সাতাশ পদ!

সালাহ উদ্দিন শৈবাল: ২০১০ সালে টরন্টো এসে প্রথম যে দাওয়াতটাতে গিয়েছিলাম সেখানে আমার জন্য অপেক্ষা করছিলো বিস্ময়!! সাড়ে সাতাশ পদ! টেবিল ভর্তি খাবার!!! বড় মাছ কয়েক ধরনের। ছোট মাছ মেলা ধরনের। নানান সব্জী, নানান ভর্তা....গরুর মাংস, খাসীর মাংস, মুরগীর মাংস....আর কোনো মাংস না পেয়ে কোয়েল মাংস (!!)

বাসায় তৈরী নানান ধরনের মিষ্টি..দই...পায়েস....সব মিলিয়ে সাতাশ পদ!!

সংগে আস্ত আস্ত ডিমের তরকারী। টোটাল হলো সাড়ে সাতাশ। ডিমের তরকারীকে আমি পূর্ন পদের মর্যাদা দিতে নারাজ। আমাদের বাসায় যখন অন্য কিছু থাকতো না কিন্তু মেহমান এসে গেছে..তখন ডিমের তরকারীই ছিলো ভরসা। তাই ডিমের তরকারী অর্ধেক পদ।

ভেবেছিলাম এটা বোধহয় এই বিশেষ ফ্যামিলীর বৈশিষ্ট। কিন্তু না...আমার ভুল ভাঙ্গতে সময় লাগলো না। একের পর এক দাওয়াত...আর প্রতিবারই একই ঘটনা। টেবিল ভর্তি খাবার আর খাবার!! এটাই কি তবে এখানকার বৈশিষ্ট?! আপনার ফ্রেন্ড লিষ্টে যদি কোনো প্রবাসী থেকে থাকে তবে এখনই তার ফেইসবুক ওয়াল চেক করুন। নির্ঘাৎ টেবিল ভর্তি খাবারের এক গাদা ছবি পাবেন। মাসে মাসে। সপ্তাহে সপ্তাহে।

জীবনে তিন-তিন বার অতি আহারে প্রায় মৃত্যু মুখে পতিত হওয়া আমার মতো ভোজন রসিকের এতে খুশীতে পাগল হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু আমি হলাম চুড়ান্ত আতংকিত!! প্রবাসে কোনো কাজের লোক নাই। সাহায্য করার আর কেউ নাই। আমি চা ‘রান্না’ও জানিনা....ভরসা শুধু ছন্দ। আমার যখন দাওয়াত দেয়ার টার্ন আসবে...আমার কি হবে এই চিন্তায় সাড়ে সাতাশ পদ আমার গলায় আঁটকে আঁটকে যেতে লাগলো।

সংগে কৌতুহলও বেড়ে গেলো। এতো রান্না এরা কেনো করে? কখন করে?

কখন করে এটা জানতে সময় লাগলো না। একদিন এক দাওয়াতে গেলাম। তখনো খাওয়া শুরু হয় নাই। বাড়ীর দশ বছরের ছেলে মুখ কালো করে ঘুরছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, “বাবা, মন খারাপ নাকি?” ছেলে কাচুমাচু হয়ে বলল, “জানেন আংকেল..এই পার্টির জন্য গত তিন দিন ধরে বাসায় খাওয়া-দাওয়া সব বন্ধ। একটার পর একটা পদ রান্না হচ্ছে। কিন্তু আম্মা কাউকে কিছু খেতে দিচ্ছে না। একটু পর পর আম্মা আর আব্বা ঝগড়া করছে। দুজনের মেজাজই তিরিক্ষি..”। এই সময় খাওয়ার ডাক পড়ল। ছেলে কথা ছুড়ে ফেলে দিয়ে বিদ্যুৎ গতিতে সাড়ে সাতাশ পদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। আহা...বেচারা গতো তিন দিন ধরে না খাওয়া!

বাংলাদেশে পারিবারিক দাওয়াতে এতো অজস্র পদ দেখেছি বলেতো মনে পড়েনা। যেখানে কাজের লোক পাওয়া যায়। অন্যদের সাহায্য পাওয়া যায়। তারপরেও না। তাহলে প্রবাসে কেনো???

ঠিক-ঠাক জানতে পারিনি। অনুমান করার চেষ্টা করতে পারি।

কেউ একজন হয়তো প্রথমে দুই পদ করেছিলেন। তাকে টেক্কা দিতে পরের জন তিন পদ....তাকে দেখিয়ে দিতে পরের জন চার পদ। তারপরের জন কম কিসে......পাঁচ পদ! ...ছয়...সাত....দশ....এই করতে করতে এখন এসে সাড়ে সাতাশ পদে ঠেকেছে! আমার এটাই ধারনা!

আমরা দেখিয়ে দিতে বিরাট ওস্তাদ!

সব কিছুতেই তথাকথিত ‘সুশীল’ মানুষ থাকে। এই চুড়ান্ত খাদ্যাচার যে হোস্টের (পড়ুন হোস্ট বাড়ীর মহিলাদের। কারন বাংগালী পুরুষ রান্না করে না।) জন্য অত্যাচার হয়ে যাচ্ছে তা এই সুশীলরা ঠিকই বুঝতে পারেন। কিন্তু ‘সাড়ে সাতাশ পদ কেন?’ এই প্রশ্ন করার সাহস তাদের থাকে না। তারা একটা মাঝামাঝি রাস্তা খুঁজতে থাকেন। তাতে অত্যাচার ঠিকই থাকে। কিন্তু বাইরে থেকে অত্যাচার মনে হয় না।

‘সুশীল’ সমাজ আবিস্কৃত প্রবাসে সেই দাওয়াত ব্যবস্থার পোষাকি নাম ‘পট লাক’!! আমার দুই চোখের বিষ। আসেন সবাই একেক জন একেক পদ রান্না করে নিয়ে যাই....তারপর সবাই মিলে সেই ‘সাড়ে সাতাশ’ পদই খাই। আসেন এই বার পরিষ্কার জামা কাপড় পড়ে...শীতকালে গোবদা গোবদা জ্যাকেট লাগিয়ে এত্তো বড় বড় পাত্র নিয়ে দাওয়াত খাইতে যাই!! ঝোল পায়জামায় লাগবে...গাড়ীতে পড়বে....তাতে কি? ফেইসবুকে ছবি দিতে হবে না? অল্প পদ হলে কেমনে কি? মান-সম্মান পায়জামার চেয়েও মূল্যবান এখানে!!

একটা সিম্পল প্রশ্ন....”ভাইরে এতো পদের দরকার কি? আমরা কি রাক্ষস নাকি?” কিন্তু এই প্রশ্ন কেউ করে না।

বিশ্বাস করেন...এই খিচুড়ী-ডিম ভাজি...কিংবা রুটি-তন্দুরী...বেশি হলে কাচ্চি সংগে ঘন বুটের ডাল.....হয়ে যায়। এর বেশি আসলে লাগে না। চা আর মুড়ি মাখানো দিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা কাটিয়ে দেয়া যায়।

ভালোবাসার মানুষকে পেছনে ফেলে এসে....প্রিয় লোকালয়...ঘর..ঘরের ঘুলঘুলি...ঘুলঘুলিতে বসা চড়ুই...সব ফেলে এসে...প্রবাসে মানুষ....মানুষ খোঁজে। কথা বলা মানুষ খোঁজে। জমিয়ে আড্ডা দেয়ার উপলক্ষ্য খোঁজে। হা..হা..হি...হি করে মনের তাবৎ দরজা..জানালা খুলে দিয়ে চিরচেনা বাতাস খোঁজে।

কেউ খাবার খোঁজে না। কত পদ হলো তা খোঁজে না। আর যে খোঁজে সে আপনার বন্ধু না। পিরিয়ড!


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান