আনিসুল হকের আয়েশামঙ্গল, ইনাম আহমেদের ইংরেজি অনুবাদ

Thu, Jul 19, 2018 5:27 PM

আনিসুল হকের আয়েশামঙ্গল, ইনাম আহমেদের ইংরেজি অনুবাদ

মশিউল আলম: “চিঠিটা আছে লম্বা হলুদ খামে, খামের বাঁ কোণে প্রেরকের মনোগ্রাম আর ঠিকানা, ছাপার অক্ষরে, বাংলার আকাশ রাখিব মুক্ত, একটা পাখি আকাশে উড়ছে, ইংরেজি বর্ণ ভি–এর মতো পাখা মেলে দিয়ে, কি পাখি এটা, পায়রা নাকি ঈগল, চিল নাকি শকুন! নাকি বাজ! খামের ভেতরে টাইপ করা চিঠি, এসেছে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সদর দফতর থেকে।

 

বাংলার আকাশ রাখিব মুক্ত। এমনি একটি চিল পিছু নিয়েছিল বেহুলার। মনসার মন্ত্রবলে স্বর্গের ধোবানি চিল হয়ে হামলে পড়েছিল লখিন্দরের লাশের ওপর। লখিন্দরের পাঁজর সে ছোঁ মেরে নিয়ে যেতে চেয়েছিল।

A letter arrived in a long yellow envelope. The monogram and the address of the sender were inscribed on the left. There was a motto as well: Banglar Akash Rakhibo Mukto: 'Free shall we keep the sky of Bangladesh.' A bird was flying, wings spread into a 'V' on the paper. It was difficult to figure out the species--was it a pigeon, an eagle, a kite or a vulture?

A typewritten letter nestled inside the envelope. The big eagle. According to a folktale, a similar bird of prey had once chased Behula. Under the curse of the goddess Manasha, a washerwoman from heaven, in the guise of a kite, had tried to snatch a bone off Lakhindar's ribcage.

 

বিশ্বস্ত ও সুন্দর, সাবলীল অনুবাদ। বরং বলা যায়, কিছুটা পরিশীলিত; যতি চিহ্নের ব্যবহার অধিকতর যুক্তিসঙ্গত ও স্বাভাবিক।

 

আনিসুল হকের বাংলায় প্রথম প্যারাটি লক্ষ করি। কমা দিয়ে দিয়ে বাক্য দীর্ঘ করা হয়েছে; আদতে কমাগুলোর জায়গায় যে বাক্য শেষ হয়ে গেছে এবং দাড়ি চিহ্নই স্বাভাবিকভাবে বসবে, তা স্পষ্ট হয়েছে ইংরেজি অনুবাদে।

“চিঠিটা আছে লম্বা হলুদ খামে,” এখানে আসলে বাক্য শেষ হয়ে গেছে। কমার জায়গায় স্বাভাবিকভাবেই দাড়ি হবে। ইনাম আহমেদ তাঁর অনুবাদে তা–ই করেছেন: A letter arrived in a long yellow envelope. আনিসুল হক যেখানে কমা দিয়েছেন, ইনাম আহমেদ সেখানে ফুল স্টপ দিয়েছেন। কারণ এখানে কমা দিয়ে পরের ক্লজ শুরু করলে তা ন্যাচারাল ইংলিশ হতো না, দুটো সম্পূর্ণ বাক্য আলাদা ক্লজ হিসেবে আলগা হয়ে থাকত।

তারপর “খামের বাঁ কোণে প্রেরকের মনোগ্রাম আর ঠিকানা, ছাপার অক্ষরে,” এখানেও অবশ্যই বাক্য শেষ হয়ে গেছে। এখানে দাঁড়ি চিহ্ন না দিয়ে কমা দিয়ে এবং তার পরের বাক৵গুলোকেও কমা দিয়ে দিয়ে বাক্য হতে না দিয়ে বাক্যাংশ বা ক্লজ বানিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা হয়েছে: “বাংলার আকাশ রাখিব মুক্ত, একটা পাখি আকাশে উড়ছে, ইংরেজি বর্ণ ভি–এর মতো পাখা মেলে দিয়ে, কি পাখি এটা, পায়রা নাকি ঈগল, চিল নাকি শকুন! নাকি বাজ!”

“বাংলার আকাশ রাখিব মুক্ত, একটা পাখি আকাশে উড়ছে,” এই দুই বাক্যাংশের মধ্যে কী সম্পর্ক তা বোঝা যায় না।

ইনাম আহমেদ যথাস্থানে যথার্থ যতিচিহ্ন ব্যবহার করে এই বিশৃঙ্খলা দূর করেছেন: The monogram and the address of the sender were inscribed on the left. There was a motto as well: Banglar Akash Rakhibo Mukto: 'Free shall we keep the sky of Bangladesh.' A bird was flying, wings spread into a 'V' on the paper. It was difficult to figure out the species--was it a pigeon, an eagle, a kite or a vulture?

 

‘বাংলার আকাশ রাখিব মুক্ত’––এটা যে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর একটা স্লোগান, তা ইংরেজি ভাষাভাষি পাঠকদের বোঝানোর জন্য ইনাম আহমেদ বাড়তি এই বাক্যাংশ যোগ করেছেন: There was a motto as well:

এইভাবে পড়ে চললে দেখা যাবে, ইনাম আহমেদের অনূদিত ভাষ্যটি শুধু সু–অনূদিতই নয়, সুসম্পাদিতও বটে। বাংলাদেশে বই প্রকাশনার জগতে বুক এডিটিং বলে কোনো ব্যাপার নাই। থাকলে আমার ধারণা, আনিসুল হকের বাংলা ভাষ্যটির অনেক পরিমার্জনা ও পরিশীলনের পরামর্শ তিনি পেতেন। কিন্তু এ নিয়ে আফসোস করে লাভ নাই, লেখকের সমালোচনা করেও লাভ নাই। যেসব দেশে সাহিত্য লেখা একটা স্বয়ংসম্পূর্ণ পেশা এবং পুস্তক প্রকাশনা একটা ইন্ডাস্ট্রি, সেসব দেশে এই বিষয়গুলো পেশাদারির অংশ, সাহিত্যের, বা অনুবাদ সাহিত্যের মাথাব্যথার বিষয় নয়।

 

আয়েশামঙ্গল আনিসুল হকের সেইসব আখ্যানগদ্যের অন্তর্ভুক্ত, যেগুলোতে মানবিক পরিস্থিতি বা হিউম্যান কন্ডিশান সিরিয়াসভাবে ডিল করা হয়েছে। মেলোড্রামা অর্থে নাটকীয়তা সৃষ্টির যে প্রবণতা আমাদের দেশের উপন্যাস সাহিত্যে লক্ষ করা যায়, আয়েশামঙ্গল সেই প্রবণতার বাইরের লেখা। লেখকের আন্তরিক উপলব্ধি না ঘটলে এমন কাহিনি এভাবে রচিত হতে পারে না।

 

১৯৭৭ সালের বিমান বাহিনীর ব্যর্থ অভ্যুত্থান প্রচেষ্টা ও তার নির্মম পরিণতির কাহিনি এখানে লেখকের উপলব্ধি প্রকাশের বাহন মাত্র। এই ঘটনার সঙ্গে ঘটনাক্রমে সম্পৃক্ত বিমান বাহিনীর এক সৈনিকের স্ত্রীর মানবিক পরিস্থিতি বা হিউম্যান কন্ডিশান তুলে ধরাই লেখকের চূড়ান্ত লক্ষ্য। ঔপন্যাসিকের নজর ব্যক্তিমানুষের প্রতি, ব্যক্তিই তাঁর প্রধান পর্যবেক্ষণের বিষয়। ব্যক্তিকে নিয়েই তাঁর সব বাক্য রচনা; পাঠকের মনে সেই উপলব্ধি সঞ্চারিত করা, যার ভেতর দিয়ে তিনি নিজেই গেছেন। তলস্তয় সব সময় বলতেন, লেখক নিজে যা উপলব্ধি করেছেন, সেই উপলব্ধি পাঠকের মধ্যে সঞ্চারিত করাই তাঁর কাজ। ঠিকঠাকভাবে সঞ্চারিত করতে পারলেই তাঁর কাজ হয়ে গেল। আনা কারেনিনায় তিনি তা–ই করেছেন, ইভান ইলিচের মৃত্যৃতে তা–ই করেছেন, হাজি মুরাদে তা–ই করেছেন।

 

আনিসুল হক তাঁর ‘আয়েশামঙ্গলে’ সেই কাজটিই করতে পেরেছেন বলে আমি মনে করি।

 

ইনাম আহমেদ এক অপূর্ব সুন্দর লেখক। ডেইলি স্টার–এ তাঁর লেখা প্রতিবেদন প্রথম পড়ে আমার মনে পড়ে গিয়েছিল আমেরিকার নিউ জার্নালিজম ধারার ন্যারেটিভ রিপোটিংয়ের কথা, মনে পড়েছিল টম উলফের কথা। আমি ভেবেছিলাম, ইনাম আহমেদ আমেরিকায় পড়াশোনা করেছেন, আমেরিকান নিউ জার্নালিজমের ভাষা ও বর্ণনাশৈলীর মধ্যে জীবন যাপন করেছেন। কিন্তু পরে জেনেছি, আমার ধারণা ভুল। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। কী করে তিনি এই ইংলিশ প্রোজ রপ্ত করলেন তা আমার কাছে এক বিরাট বিস্ময়।

 

আমেরিকার আধুনিক কথাসাহিত্য নিউ জার্নালিজম যুগের গদ্যশৈলীর কথাসাহিত্য। ইনাম আহমেদ সেই গদ্যশৈলী বিস্ময়করভাবে রপ্ত করেছেন। অবশ্য এরকম রায় দেওয়া আমার পক্ষে সমীচীন কি না তা আমি জানি না। কারণ আমি আমেরিকান সমকালীন ইংরেজি ভাষার পরিমণ্ডলে জীবন যাপন করিনি। তবে রেইমন্ড কারভার থেকে জর্জ সন্ডার্স পর্যন্ত আমেরিকান কথাসাহিত্যের ভাষাশৈলীর সঙ্গে আমার যৎসামান্য পরিচয় আছে। সল বেলো, কুর্ট ভোনেগাট কিংবা ফিলিপ রথের কথাও বলতে পারি। এঁদের পর থেকে আমেরিকান কথাসাহিত্যের ভাষা খুব একটা বদলায়নি, বিশেষ আঞ্চলিকতার কথা বাদ দিয়েই এ কথা বলছি।

এত কথা বললাম এটা দাবি করার জন্য নয় যে ইনাম আহমেদের ইংরেজি অনুবাদের যথার্থ মূল্যায়ন করার যোগ্যতা আমার আছে। সেটা নাই, কারণ ইংরেজি আমার মাতৃভাষা নয়। সাহিত্যের স্বাদ পেতে হলে যে ভাষায় সে সাহিত্য রচিত কিংবা অনূদিত হয়, সেই ভাষার ব্যঞ্জনা, রং, রূপ ইত্যাদি উপলব্ধি করার সামর্থ্য থাকতে হয়। আমার তা নেই। আমি শুধু বলতে পারি, আনিসুল হকের আয়েশামঙ্গল উপন্যাসের যে ইংরেজি অনুবাদ ইনাম আহমেদ করেছেন, তা আমার কাছে বিশ্বস্ত, সুন্দর, পরিশীলিত ও যথার্থ বলে মনে হয়েছে।

 

ইনাম আহমেদকে আন্তরিক অভিবাদন।

আনিসুল হকের জন্য বরাবরের মতো ভালোবাসা।


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান