ক্রমাগত নির্যাতন নির্যাতিত মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে

Tue, Jul 17, 2018 7:07 PM

ক্রমাগত নির্যাতন নির্যাতিত মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে

ইমতিয়াজ মাহমুদ: আমি এটাকে সবসময় কোটা বাতিলের আন্দোলন হিসাবেই দেখি। এই কথাটা বললে ওরা চিৎকার করে ওঠে- না না না, আমরা তো কোটা বাতিল চাই না, আমরা সংস্কার চাই। উত্তম কথা, সংস্কার চান মানে কি? কোটা যদি বৃদ্ধি করা হয়? তাইলে মানবেন? না, সেইটা কেউ মানবেন না। মুক্তিযোদ্ধা কোটা বাদই দিলাম, আদিবাসী কোটা বা নারী কোটাও যদি বৃদ্ধির কথা বলেন, তাইলে কিন্তু কেউ কেউ মানবেন না। তাইলে আপনারা কি চান? মুক্তিযোদ্ধা কোটা যেটা এখন ওদের সন্তানদের জন্যে করা হয়েছে তার বিরুদ্ধেই ক্ষোভটা। সাথে অন্য কোটাগুলিও যদি ফেলে দেওয়া যায়, মন্দ কি! এজন্যে প্রধানমন্ত্রী যখন সব কোটা বাতিলের ঘোষণা দিলেন তখন ওরা মহা আহ্লাদে প্রধানমন্ত্রীকে ‘মাদার অব শিক্ষা’ উপাধি দিয়ে আনন্দে লাফিয়ে পড়লেন।

চিত্র যেটা সেটা হচ্ছে ওরা আংশিক কোটা বাতিল চায়, সম্পূর্ণ বাতিল হলেও ওরা আনন্দিতই হবে। তাই হয়েছিল। কিন্তু কোটা বৃদ্ধি, সেটা সাধারণভাবে সকল কোটা বা বিশেষ কোন একটি কোটা, সেটা ওরা মানবেন না। তো এটা সংস্কারের আন্দোলন? নাকি বাতিলের আন্দোলন? আপনি কি বলবেন? আমি এটাকে কোটা বিরোধী আন্দোলন হিসাবেই দেখি। আপনি যদি সংস্কারের আন্দোলন মনে করেন, ঠিক আছে আপনি সেইভাবেই দেখেন। নামকরন অংশটা না হয় বাদই দিলাম। যার যেটা ইচ্ছা বলেন। কিন্তু যেই জায়গাটায় আপনার সাথে আমার কোন ভিন্নমত হবে না সেটা হচ্ছে এই আন্দোলনটি একটি অর্থনীতিবাদী আন্দোলন। আমাদের দেশের ধর্মীয় ও এথনিক সংখ্যাগরিষ্ঠ মধ্যবিত্তের ছেলেমেয়েরা নিজেদের স্বার্থের অনুকূলে এই আন্দোলনটা গড়ে তুলেছে।

এমনিতে এই আন্দোলনটাতে খুব একটা সাড়া পাওয়ার কথা না এবং এইটা এমনিই মাঠে মারা যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এই আন্দোলনটাও দেখবেন আরও জমজমাট হয়ে যেতে পারে এবং এই আন্দোলন থেকেই একটা রাজনৈতিক পরিণতি হলেও হয়ে যেতে পারে। কিভাবে?

কারণ সাধারণভাবে মানুষের অসন্তোষ বেড়েছে। অসন্তোষ কি কি কারণে বেড়েছে তার ফিরিস্তি বিস্তারিত না হয় নাই দিলাম। মানুষের কণ্ঠ রুদ্ধ করা হচ্ছে, গণতান্ত্রিক অধিকার চর্চায় বাধা দেওয়া হচ্ছে এইগুলি হচ্ছে মুল কারণ। এইসব অসন্তোষ মানুষের মধ্যে জম হতে থাকে আর এইরকম ক্ষোভ জমা হতে হতে এক পর্যায়ে এমন অবস্থায় পৌঁছে যায় যে সাধারণ একটা বা দুইটা ঘটনাই স্ফুলিঙ্গের মতো কাজ করে আর মানুষ তখন জ্বলে ওঠে বিশাল দাবানলের মতো। দেখা যায় যে তখন সামান্য একটা ঘটনাকে কেন্দ্র করে অসংখ্য মানুষ এমনভাবে গর্জে ওঠে যে তখন সাধারণ যুক্তি বুদ্ধি রাজনৈতিক ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ তুচ্ছ হয়ে যায়।

এরকম ঘটনা দুনিয়ার বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন সময় ঘটেছে। ইতিহাসের বড় বড় সব অভ্যুত্থানের অনেকগুলির পেছনেই দেখবেন এইরকম সামান্য একটা বা দুইটা ছোট ছোট ঘটনা ইগ্নিশনের মতো কাজ করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের দেখা এইরকম একটা ঘটনা ছিল আরব বসন্ত বা Arab Spring.

আপনাদের অনেকেরই মনে থাকার কথা মোহাম্মদ বুয়াজিজির কথা। তিউনিসিয়ার যুবক মোহাম্মদ বুয়াজিজি ছোট একটা শহরে রাস্তায় নানারকম জিনিসপথ ফেরি করে বিক্রি করতো। জীবন নিয়ে অসন্তুষ্ট ছিল সে, ঠিকঠাক মতো কোন কাজ পায়নি, মিলিটারির জওয়ান হতে চেয়েছিল, চাকরী পায়নি, ভাইবোন পরিবার নিয়ে অভাবের সংসার। একদিন রাস্তার পাশে মোহাম্মদ যখন ওর ভ্যান নিয়ে জিনিসপত্র বিক্রি করছিল তখন পৌরসভার কর্মচারী ফাইদা হামদি, লাইসেন্স বা পারমিট এইসব ছিল না সম্ভবত, মোহাম্মদকে সবার সামনে থাপ্পড় মারে আর ওর মুখে থুথু মারে ওর ইলেক্ট্রনিক স্কেল আর মালপত্র জব্দ করে নিয়ে যায়।

রাগে দুঃখে অপমানে মোহাম্মদ বুয়াজিজি নিজের গায়ে আগুন দিয়ে প্রকাশ্যে আত্মহত্যার চেষ্টা করে। সাথে সাথে ওর মৃত্যু হয়নি, মৃত্যু হয়েছে বেশ কয়েকদিন পরে হাসপাতালে। এইসবই হচ্ছে ২০১০এর ডিসেম্বর আর ২০১১এর জানুয়ারি এই সময়ের কথা। এই বুয়াজিজির মৃত্যুকে কেন্দ্র করেই প্রথম আন্দোলনটা শূর হয় তিউনিসিয়ায় আর তিনিশিয়া থেকে সেটা ছড়িয়ে পরে মিশরে ও অন্যান্য আরব দেশগুলিতে। মোহাম্মদ বুয়াজিজির আত্মহত্যা সেইটাই ছিল আরব বসন্ত নামে দুনিয়া কাঁপানো সেই অভ্যুত্থানের মুল স্ফুলিঙ্গ। কিন্তু এই স্ফুলিঙ্গ থেকে যে আগুন জ্বলেছিল সে আগুনে কিন্তু বুয়াজিজির ব্যক্তিগত অপমান বঞ্চনা ইত্যাদি তলিয়ে গিয়ে গণতন্ত্র ও স্বাধীনতা সেইসব ইস্যু বড় হয়ে সকলের সামনে এসে গিয়েছিল।

 

এখন আমাদের এখানে এই যে একটা স্বার্থপর অর্থনীতিবাদী আন্দোলন, সেইটাকে কেন্দ্র করে যেসব বিক্ষোভ হয়েছিল কিছুদিন আগে সেখানেও কিন্তু সকলেই কেবলমাত্র কোটার ইস্যু নিয়ে যোগ দেয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন ছাত্রলীগের ছেলেরা আন্দোলনকারীদের উপর হামলা করে আর বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্যাম্পাসে যখন পুলিশ RAB এরা জড়ো হতে থাকে তখনই কিন্তু অসংখ্য ছেলেমেয়ে সেখানে জড়ো হয়। আমি নিজে ছেলেমেয়েদেরকে চিনি যারা এর আগে যায়নি, ধর্ষণ বিরোধী আন্দোলন করছিল সেখানে থেকে ক্যাম্পাসে কোটা আন্দোলনের সাথে সেইরাতে যোগ দিয়েছে। যারা এমনিতে ঘরে বসেছিল বা আন্দোলনে যোগ দেওয়ার ইচ্ছা ছিল না, ওরাও গেছে- আমার ক্যাম্পাসে পুলিশ কেন? গুণ্ডামি কেন করবে এইসব কারণে।

 

আর এই যে এখন যেটা হচ্ছে, কোটা বাতিলের ঘোষণায় আনন্দিত হয়ে যারা প্রধানমন্ত্রীকে যারা ‘মাদার অব এডুকেশন’ বলে গদগদ হয়েছিল ওরা যখন মিটিং ফিটিং করতে চাচ্ছে ছাত্রলীগ ওদেরকে পেটাচ্ছে। পুলিশ ওদেরকে হেনস্থা করছে। এইসব ঘটনাও কিন্তু একেকটা স্ফুলিঙ্গের মতো কাজ করতে পারে। একজন ছাত্র বলতেই পারে, বলাটাই সঙ্গত, যে আন্দোলনের সাথে আপনার দ্বিমত থাকতে পারে তাই বলে হাতুড়ি নিয়ে মারতে নামবেন কেন? এইটা তো মন্দ কাজ। আর সেদিন তো একজন টিচারের উপরও সরকারী দলের ছেলেরা চড়াও হয়েছে।

মনে রাখবেন বড় নির্যাতন বা স্বৈরাচারী আচরণ বা ক্রমাগত নির্যাতন নির্যাতিত মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে। তখন মানুষ অনেক রাজনৈতিক মতপার্থক্য ভুলে যায় বা মতপার্থক্য শিকেয় তুলে রাখে কিছু সময়ের জন্যে। গতকাল আমার পার্টনার ব্যারিস্টার মুস্তাফিজ উদাহরণ দিচ্ছিলেন চিয়াং কাইশেক আর মাও সে তুংএর ঐক্যের কথা বলে। জাপানীদের অত্যাচার এতো প্রবল ছিল যে জাতীয়তাবাদী চিয়াং কাইশেক আর বিপ্লবী মাও সে তুংও বাধ্য হয়েছিলেন নিজেদের মধ্যে ঐক্যবদ্ধ হতে। আগে তো ইমিডিয়েট স্বৈরাচার ঠেকাই, পরে না হয় নিজেরা লড়বো নিজেদের মধ্যে।

না, আমি কোন ভবিষ্যতবাণী করছি না। কেবল ইতিহাসের কথা মাথায় এলো বলে একাডেমিক ইন্টারেস্ট থেকে কথাগুলি বলা। ইতিহাসের কিন্তু পুনরাবৃত্তি হয়! একদম হুবহু একইরকম ঘটনা বারবার হয়তো হয় না, কিন্তু স্থান কাল প্রেক্ষাপট ভেদে মোটামুটি একইরকম পরিণতি বারবারই হয়। লোকে অবশ্য সেটা মনে রাখে না, আর কেউ মনে করিয়ে দিলে তাকেও পছন্দ করে না।


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান