কেউ অবিশ্বাসী হলেই তাকে খুন করে ফেলতে হবে?

Mon, Jun 11, 2018 4:04 PM

কেউ অবিশ্বাসী হলেই তাকে খুন করে ফেলতে হবে?

লুৎফর রহমান রিটন: বাংলা একাডেমির একুশের বইমেলায় দেখা হতো তাঁর সঙ্গে। আমি শাহজাহান বাচ্চুর কথা বলছি। প্রকাশক শাহজাহান বাচ্চু। লেখক শাহজাহান বাচ্চু। ব্লগার শাহজাহান বাচ্চু। অনলাইন এক্টিভিস্ট বাচ্চু। সর্বোপরি কবিতা পাগল শাহজাহান বাচ্চু। হ্যাঁ, কবিতা ভালোবাসতেন। ভালোবাসতেন কবিদের। কবিতা পাগল মানুষটা একটা প্রকাশনীই খুলেছিলেন শুধুমাত্র কবিতার বই প্রকাশ করবেন বলে। তাঁর 'বিশাখা' নামের প্রকাশনা সংস্থা থেকে শুধুমাত্র কবিতার বইই বেরুতো।

 

বইমেলায় দেখা হতো তাঁর সঙ্গে। অদ্ভুত একটা সরল হাসি ঝুলে থাকতো লোকটার মুখে। মনে আছে প্রথম পরিচয়ের দিন আমি তাঁকে প্রশ্ন করেছিলাম--ভাইজানের কি জমিদারি আছে?

 

আমার প্রশ্নে খানিকটা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে সরল হাসিতে উদ্ভাসিত হয়ে বিক্রমপুইরা এক্সেন্টে জবাব দিয়েছিলেন তিনি--ঠিক জমিদারি নাই তয় জমিজমা তো আছে কিছু।

 

--মিয়া আপ্নের জমিদারি না থাকলে শুধু কবিতার বই বাইর করতে আইছেন কোন সাহসে? জমিদারি তো লাটে উঠবো। কবিতার বই তো চলে না ভাইজান!

 

--চলে না, তয় চলবো একদিন। মাইন্সে কবিতা না পড়লে চলবো ক্যাম্নে?

 

--আমার বন্ধু বিখ্যাত প্রকাশক হামিদুল ইসলাম, বিউটি বুক হাউজ নামের প্রকাশনীর কর্ণধার। তিনি দেখাইছিলেন, কবি শামসুর রাহমানের একটা কবিতার বই, এক হাজার ছাপাইছিলেন, তিন বচ্ছরেও এডিশন শ্যাষ হয় নাই। আর আপ্নে তো মিয়া বাইর করেন কুদ্দুস গো কবিতা!

 

--ঠিক অই কইছেন। আমি না ছাপাইলে কুদ্দুস গো কবিতা ক্যাডায় ছাপবো? অগো কবিতাও তো ছাপন দরকার। মাইন্সে জানবো ক্যাম্নে অগো চিন্তা চেতনা। ব্যবসা হবে না। কিন্তু ছাপন তো লাগবো।

 

আমি বললাম--আপ্নে মিয়া পাগল একটা। আপ্নারে পছন্দ হইছে আমার। দ্যাশে এইরকম পাগল বিশেষ কইরা প্রকাশনায় এইরকম দুই একটা পাগল না থাকলে চলবো না। আপ্নে আউগাইয়া যান। আমি আছি আপ্নের লগে।

 

সেই থেকে বাচ্চু ভাইয়ের সঙ্গে চমৎকার একটা সম্পর্ক গড়ে উঠেছিলো। আমাকে দেখলেই ছুটে আসতেন। তারপর বিক্রম্পুইরা এক্সেন্টে চলতো আমাদের আলাপচারিতা।

 

আমার একেকটা কথায় শিশুর মতো হেঁচকি তুলে হাসতেন বাচ্চু ভাই। অনুযোগ করতেন--আপ্নে একদিনও আইলেন না আমার স্টলে। বলতাম যাবো একদিন। বলতেন--আসেন একদিন। কিছুক্ষণ বসেন আমার স্টলে। আপ্নের খারাপ লাগবো না কবিতার সঙ্গে বসবাস।

 

কবিতা পাগল মানুষটা এক বিকেলে আমাকে টানতে টানতে নিয়ে গেলেন তাঁর 'বিশাখা'র স্টলে। গ্রামের বাড়ি মুনশিগঞ্জ থেকে কী সব পিঠাপুলি নাকি নিয়ে এসেছেন আমাকে খাওয়াবেন বলে। সম্ভবত তাঁর বউ-র হাতে বানানো।

সেদিন, বিশাখা স্টলে বসে খেয়েছিলাম কয়েকটা পিঠা। প্রতিটা পিঠায় চিনি-লবণ-চালেরগুঁড়োর সঙ্গে পর্যাপ্ত মিশেল ছিলো গভীর আন্তরিকতার। একেকটা পিঠায় কামড় বসিয়েছি আর স্বভাবসুলভ আহা উহু করে আমি পিঠার স্বাদের মাত্রা নিরূপন করেছি। আমার কান্ডকীর্তিতে কী যে খুশি হয়েছিলেন মানুষটা!

 

একটা শব্দ খুব প্রিয় ছিলো তাঁর। শব্দটা ছিলো--'আবাল'। বলতেন, আবালে দ্যাশটা ভইরা গেলো গা। তাঁর কথিত আবালদের বিরুদ্ধে সদা সর্ব্দা সোচ্চার ছিলেন তিনি। ফেসবুকে অনেক স্ট্যাটাস দেখেছি। ধর্মান্ধ মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে তিনি লিখতেন। নির্ভীক ছিলেন। ভয় পেতেন না কোনো রক্তচক্ষুকে। টেলিফোনে হুমকি পেতেন। কিন্তু খুব একটা পাত্তা দিতেন না। ২০১৫ সালের ০৮ অগাস্ট ডেইলি অব্জারভারে 'হু ইজ নেক্সট টার্গেট?' শিরোনামে প্রকাশিত এক সংবাদে শাহজাহান বাচ্চুর জীবনাশঙ্কার কথা মুদ্রিত হয়েছিলো। কিন্তু টেলিফোনে হুমকিকে খুব একটা আমলে নিতেন না বাচ্চু। নিজের বিশ্বাস অবিশ্বাসের কথা লিখতেন দ্বিধাহীন চিত্তে।

 

আজ সকালে ল্যাপটপ ওপেন করে ফেসবুকে ঢুকেই মনটা বিষণ্ণ হয়ে গেলো। কবি মুজিব মেহদীর স্ট্যাটাস থেকে জানলাম--হত্যা করা হয়েছে শাহজাহান বাচ্চুকে। কবিতা পাগল মানুষটাকে দু'জন আততায়ী হোন্ডায় করে এসে ঠান্ডা মাথায় গুলি করে হত্যা করে গেছে। শেষ বিকেলে ইফতারের আগে মুনশিগঞ্জের সিরাজদিখান এলাকার একটা দোকানে বসেছিলেন অনলাইন এক্টিভিস্ট বাচ্চু। এমন সময় দুটি মোটরসাইকেলে চেপে দুই আততায়ী সেখানে এসে বাচ্চুকে গুলি করে পালিয়ে যায়।

নিহত লেখক ব্লগারদের মৃত্যুর মিছিলে আরেকটি নাম যুক্ত হলো।

মসির বিরুদ্ধে অসির ব্যবহার বন্ধ হবে কবে?

কেউ অবিশ্বাসী হলেই তাকে খুন করে ফেলতে হবে?

 

অটোয়া ১১ জুন ২০১৮


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান