ভয়ের সংস্কৃতি ও রাষ্ট্রীয় স্ববিরোধিতা

Sun, Jun 10, 2018 1:45 AM

ভয়ের সংস্কৃতি ও রাষ্ট্রীয় স্ববিরোধিতা

খান শরীফুজ্জামান :“আমি ইউএনও অফিসে যাচ্ছি। কাজ সেরে ইনশাল্লাহ ফিরে  আসব।” কাঁদো কাঁদো কণ্ঠের উত্তর শোনা যায়। কিন্তু মানুষটি আর ফিরে আসেনি ! ফোনের ওপার হতে শোনা যায় গুলির আওয়াজ (বিবিসি, প্রথম আলো, ২ জুন ২০১৮)। একরাম নিহত হয় তথাকথিত ‘বন্দুক যুদ্ধে’। বিধবা হয় আয়েশা। এতিম হয় তাহিয়াত-নাহিয়ানেরা। হোক একরাম যুবলীগের বা যুবদলের সভাপতি,  হোক মাদকসেবী বা ব্যবসায়ী তাকে বিনা বিচারে বন্দুকের গুলিতে প্রাণ দিতে হবে, এটি একটি আধুনিক সভ্যদেশে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। একটি রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যে  নাগরিক বা বিদেশী হলেও তার অপরাধের উপযুক্ত বিচারের জন্য তার আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার দেশীয় বা আর্ন্তজাতিক দুই আইন দ্বারাই সিদ্ধ। রাষ্ট্রের নাগরিকের সঙ্গে রাষ্ট্রের প্রধান  সন্ধিই হলো- রাষ্ট্র নাগরিকের নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করবে। তা নাহলে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্মেরও প্রয়োজন ছিল না।

সরকারের সাম্প্রতিক মাদক বিরোধী অভিযান একটি মহৎ উদ্যোগ। কিন্তু এর পদ্ধতি, আইনগত ভিত্তি ও কঠোরতা নিয়ে নাগরিক সমাজে পক্ষে-বিপক্ষে নানা মত চালু আছে। মানবাধিকার সংস্থা অধিকারের রিপোর্ট (জুন,২০১৮) অনুযায়ী এ বছরে গত পাঁচ মাসে (জানুয়ারি-মে) দেশে ২২২টি বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ড ঘটেছে। এর মধ্যে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ (ক্রসফায়ার) মারা গেছেন ২১৬ জন। সম্প্রতি র‌্যাব আর পুলিশের মাদকবিরোধী অভিযানে গত ২৩ দিনে (৮ জুন পর্যন্ত ২০১৮) ‘বন্দুকযুদ্ধে’ ১৩৯ জন ‘মাদক ব্যবসায়ী’ নিহত হয়েছেন; গ্রেফতার হয়েছে ১৩০০এর বেশি। ২০১৬ সালে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মারা যায় ১৫৬ জন ও ২০১৭ সালে ১৭৮ জন (৬ জুন ২০১৮, ডেইলি স্টার)। এ সংখ্যা সংকাজনক হারেই প্রতি বছর বাড়ছে। ২০০২ সালের ১৬ অক্টোবর থেকে ২০০৩ সালের ৯ জানুয়ারি পর্যন্ত তৎকালীন সরকারও সন্ত্রাস দমন ও অস্ত্র উদ্ধারের জন্য একই ধরনের অভিযান ‘অপারেশন ক্লিন হার্ট’ পরিচালনা করে। এসময়ে ৫৭ জন মানুষ আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর কাস্টডিতে প্রাণ হারায় (৬ জুন ২০১৮, ডেইলি স্টার)। 

গত এক যুগেরও বেশি সময় ধরে দেশে যে ‘খুনের বা গুলির সংস্কৃতি’ শুরু হয়েছে তা অনেক যুদ্ধের মৃত্যুর  সংখ্যাকেও হার মানিয়েছে। রাষ্ট্রীয় ভাষ্য মতে সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই এমন অভিযান চলেছে। এই মাদক বিরোধী অভিযানটি সুপরিকল্পিত হলে এর প্রথম ধাপে মাদকসেবী ও ব্যবসায়ীদের সংগায়িত করে একটি আইন তৈরি করা হতো এবং যারা এ অপকর্মের সাথে জড়িত তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার আহবান করে একটি সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করা যেত। বঙ্গবন্ধু যুদ্ধ অপরাধীদের সাধারণ ক্ষমা করতে পারলে, মাদক ব্যবসায়ীরা কেন সাধারণ ক্ষমা পেতে পারেনা। তাদের পুনর্বাসন ও কর্মসংস্থানেরও সুজোগ সৃষ্টি করা যেত। সরকার যদি দ্রুত এর বিচার সম্পন্ন করতে চাইত, সে ক্ষেত্রে দ্বিতীয় ধাপে একটি দ্রুত বিচার ট্রাইবুনাল গঠন করে প্রকৃত অপরাধীদের শাস্তি আইনি কাঠামোর মধ্যেই সম্ভব হতো। কিন্তু সরকার বা রাষ্ট্র যখন নিজেই আইন ভঙ্গ করে মানুষের জীবনধারনের অধিকার কেড়ে নেয়, তখন সেটি হয়ে পড়ে ব্যর্থ রাষ্ট্র। নাগরিকেরা সে রাষ্ট্র ও সরকারের আনুগত্য করে না। সরকারের আইন, শাসন ও বিচার বিভাগ মুখ থুবড়ে পড়ে, হয়ে যায় অপ্রয়োজনীয়  উপাদান। ক্ষমতাসীন সরকার পড়ে যায় বৈধতার সংকটে (খবমরঃরসধপু ঈৎরংরং)।

এ অভিযানে বর্তমান সরকার সংশ্লিষ্ট মাদক গডফাদাররা পেয়েছে বিশেষ ছাড়, যা সাধারণ মানুষের কাছে স্পষ্ট। কেউ কেউ সরকারের অনুমোদন নিয়ে চলে গেছেন বিদেশ ভ্রমণে। কিন্তু গুলি খেয়ে মরছে মধ্যম সারির ও প্রন্তিক পর্যায়ে জড়িতরা। শুধু মাদক কেন, যারা দেশের মানুষের হাজার হাজর কোটি টাকা লোপাট করে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর নাকের ডগা দিয়ে দিনাতিপাত করে মহাসুখে তাদের কেন কোন বিচার হয়না। দুইশ টাকার আকরামদের কেন মরতে হয়? ব্যাসিক ব্যাংকের ৪৫০০ কোটি টাকা ও জনতা ব্যাংকের ৫৫০৪ কোটি টাকা লুটকারীদের কেন কিছু হয়না? এসব বড় বড় খুনের আসামীরা যখন বাচাঁর অধিকার পায়, আকরামেরা কেন আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার টুকু পাবে না?

এছাড়া মাদক বিষয়ে রাষ্ট্রীয় নীতিরও কিছু স্ববিরোধিতা লক্ষ্য করা যায়। যুবকেরা নেশার প্রথম ধাপে শুরু করে ধুমপান যা মানুষের শরীরে বড় বড় রোগ সৃষ্টি করে ও পরিবেশ দুষণ করে। সেই বিড়ি-সিগারেট কোম্পানিগুলোকে শুধু রাষ্ট্র ট্যাক্স-রেভিনিউ পাওয়ার আশায় ছাড় দিয়ে রেখেছে জনগণের ক্ষতি করার জন্য। তদুপরি, একদিকে মদপান ও ব্যবসায়ের লাইসেন্স দিয়ে রাখা হয়েছে আবার অন্য দিকে মাদক বিরোধী অভিযান চলছে- যা রাষ্ট্রীয় দ্বৈতনীতির প্রতিফলন। নাকি এসকল নেশাজাত দ্রব্য সব সরকারেরই এমপি-মন্ত্রিদের লাগে বলে বৈধ বলে ধরে নেওয়া হয়েছে। যে দেশের সংবিধানে ইসলামকে রাষ্ট্র ধর্ম  করা হয়েছে, সে দেশে মদ-ধুমপান কেমন করে বৈধ হয় তা কোনো সাধারণ মানুষেরও বোধে আসবে বলে মনে হয় না। নেশাজাত দ্রব্য ধর্মনিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকেও অগ্রহণযোগ্য। বিগত ও সাম্প্রতিক সরকারগুলো মদের লাইসেন্স কীভাবে দিয়ে রেখেছে সেটাও জনমনে একটা বড় প্রশ্ন।

সমস্যার মূল উৎপাটন না করে শাখা-প্রশাখা ছাঁটা কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। মাদক উৎপাদন, আমদানি ও সরবরাহ বন্ধ করলেইতো এর ব্যবসা ও সেবন ৮০% কমে যায়। এক্ষেত্রে কূটনৈতিক তৎপরতার ও প্রয়োজন ছিল কারণ, আমাদের যুবকদেরকে উদ্দেশ্য করে ভারত ও মায়ানমার সারা বাংলাদেশ সীমান্ত জুড়ে ফেন্সিডিল ও অন্যান্য নেশাজাতীয় দ্রব্য উৎপাদন ও সরবরাহ করে আসছে, যা সংবাদ মাধ্যমের মারফত আমরা বহুদিন ধরে শুনে আসছি। এছাড়া অন্যায়, দুর্নীতি ও অনিয়মগুলো যে সাংবাদিকরা বা সোশাল মিডিয়া সরকারের নজরে আনবে তার উপায়ও সীমিত। সবাই আজ রাজনৈতিক বিভাজনে বিভাজিত। সরকারের বিরোধী কিছু লিখলেই ভয়ে থাকতে হয় সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী ও লেখকদের- কে কখন গুম হয়ে যায়! মানবাধিকার সংস্থা অধিকারের রিপোর্ট (জুন,২০১৮) অনুযায়ী এ বছরে গত পাঁচ মাসে (জানুয়ারি-মে) ২৫ জন সাংবাদিক আক্রান্ত হয়েছেন, সাত জন লাঞ্ছিত, সাত জনকে হুমকি দেওয়া হয়েছে ও ছয় জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তি আইনে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের বিরুদ্ধে ফেসবুকে মন্তব্য করায়।

দেশের মানুষ রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন কার্যক্রম বা সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের সমালোচনা রাজপথেও করতে পারছে না, করলে গুলি; সংবাদ মাধ্যমে সমালোচনা করলে গুম; সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে করলে গ্রেফতার। মানুষ যেন আজ ত্রাসের রাজার দাশের রাজত্বে বন্দী। যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক রাষ্ট্রবিজ্ঞানী আলী রিয়াজ দেশের এ পরিস্থিতিকে ‘ভয়ের সংস্কৃতি’ বলে উল্লেখ করেছেন। তবে পৃথিবীর রাজনীতির ইতিহাস বলে কোনো সমস্যার সমাধান আইনি প্রক্রিয়ায় শুরু হলে তা আইনি প্রক্রিয়ায় শেষ হয়; রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় শুরু হলে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় শেষ করা যায়, আর গুলির মাধ্যমে শুরু হলে তা গুলি দিয়েই শেষ হয়। যে দেশে মসির চেয়ে অসি বেশি শক্তিশালী, যে দেশে যুক্তির আলোকে নিভিয়ে দেওয়া হয় বন্দুকের গুলিতে- সে দেশে রাজনৈতিক বা সামাজিক মুক্তি আসার পথ অত্যন্ত সংকীর্ণ। তাই আমাদের প্রিয় জন্মভূমির সামনের দিনগুলি নিয়ে কোনোভাবেই সস্তি আসছেনা চিন্তাশীলদেও মনে । পাকিস্তানের  সামরিক জান্তার গুলির বিরুদ্ধে এ দেশের মানুষ যে স্পৃহা নিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম দিয়েছিল, সেই দেশে বন্দুকের গুলিতে এতো মানুষের মৃত্যু- নিশ্চয়ই বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশের চিত্র হতে পারে না।

 লেখক: পিএইচডি গবেষক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।shoheldu412@gmail.com, www.thoughtreviver.com


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান