বিষয় আবৃত্তি :শুধু তোমার বাণী নয় গো..

Fri, Jun 1, 2018 9:29 AM

বিষয় আবৃত্তি :শুধু তোমার বাণী নয় গো..

মিথুন আহমেদ : ১.আজকের আবৃত্তি শিল্প শুধু সাদামাটা পাঠ ও পঠনের সবাক উচ্চারণটি নয়। নৈমিত্তিক ও ধারাক্রমিক অনুশীলনের একটি চর্চা। যে কোনো শিল্পই কিছু না কিছু স্বতঃস্ফূর্ত শৃঙখলা-সীমানার শর্তকে মেনে চলে। এই সীমানা পরিসীমানার সুনির্দিষ্ট কোনো সীমারেখা নেই, তবে রেখার অন্তরালে রেখাবন্ধনীতে সেই শর্তটি কোথাও না কোথাও থেকেই যায়- হোক না সে কোনো সূত্র ভাঙ্গার সূত্র। পরিপূরক কিংবা সম্পূরকের বিপরীত সূত্র- তাও শিল্পের প্রচলিত অপ্রচলিত ধারণাকে মুখোমুখি দাঁড় করাতেও স্বতঃসিদ্ধ শর্তের সম্মূখীন হতে হয়।

২.যে কোনো শিল্পের প্রতি পেশাদারীত্বসুলভ মনোভাব সেই শিল্পটিকে যেমন মর্যাদাপূর্ণ করে, ঠিক তেমনি শিল্পীকে তার উৎকর্ষের লক্ষ্যে উত্তীর্ণ করতেও সহায়তা করে। গত সাড়ে তিন দশকের অধিককাল ধরে আবৃত্তি শিল্পের যে চর্চাটি বলবৎ রয়েছে, তা যে বিচ্ছিন্ন কোনো সামষ্টিকতার উদ্যোগ নয়- বরঞ্চ তা যে একটি সামগ্রীক ও বিস্তৃত শিল্প আন্দোলনের প্রয়াস, সেটা প্রথমেই বিবেচনায় আনতে হবে। প্রাসঙ্গিক যে কোনো কথনে আবৃত্তি নিয়ে বয়ান করতে গেলে- এ সমাজভূমির সমাজ ভাষাতত্ত্বের সকল প্রবণতাকে প্রথমেই আমলে আনা জরুরি।

 

৩.প্রতিশ্রুতির আহবানে উৎসারিত চিন্তাশীলতার চর্চার নামই অঙ্গীকার। আর সেই ধী-বিস্তারের উৎসারণ ও খণনের নামই শিল্পচিন্তা। বৈশ্বিক কিংবা স্বাদেশিকতার মানবিক বন্দনায় তখনই মৃত্তিকাবর্তী মানুষের সপক্ষে দাঁড়াতে জন্ম নেয় কোনো কোনো শিল্পের উৎসমুখ। এভাবে এমনি করেই একদিন বোধিমূলের উদ্গত আকাঙ্ক্ষায় বুক বেঁধে- বিপন্ন মানবিকতা ও শঙ্কিত গণতন্ত্রকে প্রাণ ফিরিয়ে দিতে শাসনের স্বেচ্ছাতন্ত্রকে মোকাবেলায় ও অবৈধতাকে বাজেয়াপ্তের সংগ্রামে শিল্পের বাঁক বদলে সক্ষম হয়েছিল আবৃত্তি নামক প্রায়োগিক কলার এই শাখাটি। এমন এক সময় তখন, আশির দশক থেকে নব্বইয়ে এক একজন আবৃত্তিকার যেন এক একজন চিরচেনা স্বজন। যেন শিল্পের এক অধিনায়ক।

৪.আবৃত্তি নিজেই একটি কণ্ঠপ্রযুক্তির মৌলিক শিল্প, তাই প্রয়োজনহীন অতি আবেগেমগ্ন কণ্ঠ কারুময়তার বশবর্তীতা কিংবা বাহুল্য আশ্রিত বাদ্যপ্রযুক্তির ব্যবহারকে অতিমাত্রিকতা বলে মনে হওয়াটা খুবই স্বাভাবিক। শব্দের ধ্বণিগত উচ্চারণ ছাড়াও অন্তঃমূলের উহ্য ও অনুচ্চারিত শব্দটিকে আবিষ্কার করে নতুন ধ্বনিগত তর্জমায় প্রতিস্থাপন করার ভাষাসূত্রটিই যদি আবৃত্তি শিল্প হয়- তাহলে সেই অন্বেষাকে খুঁজে পাওয়ার পথটিকেও রচনা করা জরুরি। বাংলা ভাষার সাহিত্য কিংবা টেক্সট ফর্মকে নিয়ে প্রয়োগ কলা-চর্চার অতি সাম্প্রতিক কালের এই প্রস্তুতি পর্বটিতো পার করতে চলেছে অনেকগুলো দশক, তাই আবৃত্তি এখন শুধু কবিতা-কেন্দ্রিক নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে এসে আরো বেশি ব্যাপ্তি পেয়েছে। নন্দন শিল্পের বাকশৈলী-ভিত্তিক এ অনুশীলন নানা দিক দিয়ে গুরুত্ব পাবার অন্যতম কারণ- বাক্য ও বক্তব্যের অসংখ্য নতুন নতুন অর্থবোধক চিন্তার দৃষ্টিভঙ্গিগত শব্দার্থ প্রকাশ করতে সক্ষম হয় এ শিল্প মাধ্যমটি। উচ্চারিত শব্দের অনুচ্চারিত অর্থ এবং অনুচ্চারিত শব্দের উচ্চারিত অর্থ বাৎলে দিতে পারে প্রচলিত ধারণাকে, পালটে দিতে পারে সচরাচরের প্রথাগত চিন্তাকেও। মনোভূমিতে বিরাজ করে আছে যে প্রশান্তির মায়ালোক, আর বিক্ষুব্ধ ছায়াপথে যে শঙ্কা, তাকেও নির্মল করে তোলে এ শিল্প চর্চার মঙ্গলালোক।

 

৫.স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে বিকাশমান অন্যান্য শিল্পধারার মধ্যে- গ্রুপ থিয়েটার, স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ও পথনাট্যের ফর্ম-এর পর আবৃত্তি শিল্পটি সংগ্রামী জীবন-যুগ-ধারা ও ঐতিহ্যের শক্ত বুনন গাথুঁনির মধ্য দিয়ে তৈরি হয়েছে। যে কোনো শিল্পের সমাজ ভূখণ্ডটি তৈরি করতে হলে তাকে অতিক্রম করে যেতে হয় দীর্ঘ- বহু দীর্ঘ একটি পথ।

তাই শিল্পের স্থায়ীত্ব আর শিল্পের অপরিহার্যতা নির্ধারিত হয়- কাল-ক্ষণ ও যুগ-সময়ের সেই আবদার থেকেই। বঙ্গীয় জনপদের আপোষরহিত সংগ্রামের ইতিহাস সুদীর্ঘ- বাক কলার এই শিল্পটি নিঃসঙ্কোচে সমঝোতাহীনতার সেই সাক্ষ্যকেই বহন করে আছে। সামাজিক শ্রেণিসমূহের ন্যায়ের লড়াই এবং ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে- ঐক্য সংগঠিত করার কাজে সমাজ-রাজনীতিতে- দলিত জনগোষ্ঠী ও ক্ষীণপ্রায় জাতিসত্বার অধিকার প্রতিষ্ঠায়, অসাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে কল্যাণকামীতার বিশ্বাসবোধের রাজনৈতিক দর্শনে - সাংস্কৃতিক বিপ্লবে স্থির থেকে সকল প্রতিকূলতাকে মোকাবেলা করার এক শিল্পীত হাতিয়ার হচ্ছে আবৃত্তি। রাজনৈতিক সংস্কৃতির সুস্পষ্ট মেরুকরণকে প্রত্যক্ষ বিবেচনায় রেখে আবৃত্তির অভিযাত্রা তার লক্ষ্যকে নির্দেশ করে। প্রচলিত অন্যান্য শিল্পধারা থেকে আবৃত্তি শিল্প তাই কেবল শুধু পৃথকই নয়, আবৃত্তি এক প্রতিশিল্পও বটে। বাক-স্বাধীনতা আদায়কে গণশিল্পে রূপান্তরের প্রথম আত্মপ্রকাশকৃত শিল্প মাধ্যমটির নাম আবৃত্তি শিল্প। বিকল্প শিল্পচিন্তা জাগাতে সরাসরি গণসংযোগ সৃষ্টিতে আবৃত্তি শিল্পের ভূমিকা একই সূচ্যাগ্রে দাঁড়িয়ে।

 

৬.শিল্প-চর্চাকে মানবিকতা ও মানবিক উন্নয়নের জন্য ভাবনাকে সঙ্গী করলে সেই সৃজন মাধ্যমটির পরিপ্রেক্ষিত তৈরি হয় গণসামাজিক শিল্পের আঙ্গিনায়, তাই যে কোনো সঙ্গীন পরিস্থিতিতে বিস্তর আকাঙ্ক্ষা নিয়ে সাধারণ জনগোষ্ঠী মুখাপেক্ষী হয়ে অপেক্ষমান থাকে সেই শিল্পটির যাত্রা অভিঘাতের সনদ শোনার জন্য।

 

৭.আবৃত্তি হচ্ছে এমন একটি শিল্প যা কিনা কেবলই শ্রোতার শ্রুতিকে উপযোগী করে সর্বোচ্চ সংযোগ উপস্থাপনে শিল্পীকে উদ্যোগী করে তোলে- এই রপ্ত অনুশীলনটা লেখক ও কবির দ্বিমাত্রিক-বহুমাত্রিক ভাবনা ও অনুভূতিকে শ্রোতার খুব কাছাকাছি সংবেদনশীলতাকে ইন্দ্রীয়জাত করতে উপযোগী একটি স্থান করে দেয়। রূপ, রঙ ও রসের নিমগ্ন ঘোরে অন্তর্ভেদী হয় বাক্যের মায়াজাল- শব্দের বিস্তারে বিস্তারে। বাক্যের পরমাত্মার সন্ধানমুখীনতাই হচ্ছে আবৃত্তি। একটি লিখিত পাঠ্যের ভেতরে যে বক্তব্য আর তার স্তরে স্তরে নিমজ্জিত যে অন্তঃপাঠ থাকে, তার অন্তরালে বিশেষ-নির্বিশেষের রূপ-অরূপকে সহজসাধ্য ও শ্রুতিগ্রাহ্য করতে পারাটাই শিল্পের অন্তর্গত আলো। তাই ধ্বনির কুসুমে শোভিত বাক্যরাজিই আজকের এই বাক-ভাষিকতার শিল্প।

 

৮.বাংলা ভাষা-ব্যবহারকারীরা আজ স্বদেশ থেকে ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বের ভিন্ন ভিন্ন জনগোষ্ঠীর ভাষা-সংস্কৃতির সমুদ্রে। বহুমুখী ভাষা-বৈচিত্র‍্যের বহুগোত্রীয় ভাষা সমষ্টির মধ্যেও বাংলা তার নিজস্ব স্বাতন্ত্রিকতার মর্যাদায় প্রসারিত হচ্ছে, বাঙালির সংস্কৃতি চর্চাও স্বদেশের সীমারেখা পেরিয়ে ব্রহ্মাণ্ডের সুদূর পরিসরে পৌঁছে প্রশস্ত হচ্ছে। আবৃত্তি বলতে বাঙালির হাতে যে শিল্পের পত্তনটি একদিন ঘটেছিল আশির দশকের উত্তাল সময়ে- সারা বাংলাদেশে- একদিন সেটা হয়তো ছড়িয়ে পড়বে মার্কিনি-বিলেতি সংস্কৃতিতেও।

 

ইংরেজিতে ভাষান্তর হয়ে ব্রডওয়েতে আবৃত্তি হবে বাংলার মহাকাব্য, আখ্যান, চর্যার পংক্তি, মধ্যযুগের বাংলা গীতি কবিতা, রবীন্দ্র-নজরুল--জীবনানন্দ-বুদ্ধদেব-সুনীল-শামসুর রাহমান-শহীদ কাদরী -রফিক আজাদ-নির্মলেন্দু গুণ-আবুল হাসান।


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান