দেখে এলাম  লিবারেল পার্টির জাতীয় সম্মেলন

Wed, May 23, 2018 12:47 PM

দেখে এলাম  লিবারেল পার্টির জাতীয় সম্মেলন

কুমার অনুপ: গত ১৯ থেকে ২১ এপ্রিল ২০১৮ অনুষ্ঠিত হলো ক্যানাডার ক্ষমতাসীন লিবারেল পার্টির জাতীয় সম্মেলন  নোভা স্কশিয়ার হ্যালিফ্যাক্সে আমরা পুরো পরিবার উড়ে গেলাম সম্মেলনে অংশ নিতে উদ্দেশ্য ছিলো দুটো; হ্যালিফ্যাক্স ভ্রমণ আর সেই সাথে সম্মেলনে অংশ নেয়া আকাশপথে মাত্র ঘন্টা ১৫ মিনিটের ভ্রমণ ছোট্ট ছিমছাম সাজানো অথচ পুরোনো ঐতিহ্যে ভরা হ্যালিফ্যাক্স শহরটি আমরা যখন হ্যালিফ্যাক্সে নামলাম তখন দুপুর টা এয়ারপোর্ট থেকে একটি ট্যাক্সি নিলাম ট্যাক্সি ড্রাইভার ছিল একজন জর্দানী সে বললো সম্মেলন উপলক্ষে পুরো শহর এখন ব্যস্ত প্রায় তিন হাজার মানুষের আগমন ঘটেছে এই শহরে সম্মেলনকে কেন্দ্র করে হোটেলে ব্যাগ রেখে আর একটু ফ্রেশ হয়ে গেলাম সম্মেলন কেন্দ্রে এটি একটি বিশাল সম্মেলন কেন্দ্র পুরো সম্মেলন কেন্দ্রটি লিবারেলের ব্যানার আর পোস্টার দিয়ে সাজানো ছিলো বিশাল একটি প্লেনারি সেশন রুম, সাথে আরও অনেক ছোট বড় রুম বিভিন্ন সেশন পরিচালনার জন্য ক্যানাডার বর্তমান ক্ষমতাসীন লিবারেল পার্টি  ক্ষমতায় এসেছিলো ২০১৫ সালে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর নেতৃত্বে আগামী বছর অর্থাৎ ২০১৯ পূর্ণ হবে এই সরকারের বছর সম্মেলনের মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল ২০১৯ এর নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নতুন নেতৃত্ত্ব নির্বাচন এবং কিছু নীতির অগ্রাধিকার ধার্য্য করা পুরো তিন দিনই আমি বিভিন্ন সেশনে অংশ গ্রহণ করি সর্বশেষ দিন অর্থাৎ ২১ মে তারিখে ছিল সবচেয়ে বড় আকর্ষন প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর বক্তৃতা শেষ দিন ট্রুডোর ভাষণের আগে অডিটোরিয়াম কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে গেলো অধীর আগ্রহে সবাই অপেক্ষা করছিলো ট্রুডোর মূল্যবান কিছু কথা শোনার জন্য যথাসময়ে ট্রুডো মঞ্চে উঠলো অংশগ্রহণকারীরা বিপুল করতালি দিয়ে তাঁকে স্বাগত জানালো ট্রুডোর ভাষণের যে দিকটা আমাকে সবচেয়ে আকর্ষন করেছে তাহলো, বক্তৃতার কোনো এক সময়ে  তিনি বললেন আমাদের বিরোধী শিবির কনজারভেটিভ পার্টি আমাদের শত্রু নয়, তারা আমাদের প্রতিবেশী, ক্যানাডার উন্নয়নে আমরা একসাথে কাজ করতে চাই তিনি আরো বললেন, মানুষ মাত্রই ভুল করে, ভুল হয়তো আমাদেরও আছে  উদাহরণ হিসেবে  তিনি বললেন , আমার স্ত্রী আমাকে গত পনেরো বছর যাবৎ বলছে আমি সঠিক নই তাই ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে আমরা সামনের দিকে এগুতে চাই অর্জন প্রসঙ্গে বললেন আমরা উল্লেখযোগ্যভাবে বেকারত্ব কমিয়েছি এবং আমাদের অঙ্গীকার অনুযায়ী সিরিয়ায় নির্যাতিত মানুষদের পাশে দাঁড়াতে পেরেছি বিরোধী কনজারভেটিভ পার্টি সম্পর্কে বলতে গিয়ে ট্রুডো শুধুমাত্র একটিই মন্তব্য করলেন, কনজারভেটিভ পার্টির একজন সিনিয়র নেতা বলেছেন ক্যানাডা নাকি আজ দ্বিখণ্ডিত তিনি বললেন আসলে তাদের এই অভিজ্ঞতা হয়েছে ২০১৫ সালে যখন তারা জাতীয় নির্বাচনে পরাজিত হয় আমরা মনে করিনা ক্যানাডা দ্বিখণ্ডিত যেটা আমরা আবার প্রমান করবো ২০১৯ সালের নির্বাচনে পুরো সম্মেলনের তিন দিন যেটা আমাকে সবচেয়ে আকর্ষণ করেছে তা হলো পার্টির কোনো নেতা বক্তৃতার সময় একবারের জন্যও বিরোধী দল সম্পর্কে কোন খারাপ মন্তব্য করে নাই আরেকটি বিষয় উল্লেখ করার মতো, যখনই কোনো নেতা মঞ্চে বক্তৃতা করতে উঠে তখনই সবাই একসাথে উঠে দাঁড়িয়ে তাঁকে সম্মান জানানো

এবার আসি আমাদের বাংলাদেশের রাজনীতির সাথে এদের পার্থক্যের বিষয়টিতে আমি যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র তখন বাংলাদেশে সক্রিয়ভাবে একটি রাজনৈতিক দলের সাথে সম্পৃক্ত ছিলাম ৯০ এর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে সরাসরি মাঠে থেকে আন্দোলনে সক্রিয় ছিলাম বাংলাদেশের বর্তমান রাজনীতিতে যারা নেতৃত্ব দিচ্ছেন এমন কিছু নেতা নেত্রীর সাথে এখনো আমার যোগাযোগ আছে যারা আমার বন্ধুস্থানীয় আমি খুব কাছ থেকে বাংলাদেশের রাজনীতিকে দেখেছি আমাদের বাংলাদেশের রাজনীতিতে যেমন আছে অসম্ভব মেধাবী, নিস্বার্থ কিছু নেতা কর্মী ঠিক তেমনি আছে অসম্ভব অসৎ কিছু নেতা কর্মী যদি উন্নয়নের কথা বলতে হয় তাহলে সবাইকে স্বীকার করতে হবে, বর্তমান সরকারের নেতৃত্বে বাংলাদেশ অনেকদূর এগিয়েছেপাশাপাশি একথাও বলা প্রয়োজন যে, বর্তমান সরকারের অনেক উন্নয়ন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে দলের কিছু অসৎ, সুবিধাভোগী নেতা কর্মীর জন্য ক্যানাডার সাথে বাংলাদেশের জীবনযাপনের একটা বড় পার্থক্য হচ্ছে ক্যানাডাতে আইন আছে এবং তার প্রয়োগও আছে দুই একটি ব্যতিক্রম ছাড়া আর বাংলাদেশে আইন আছে কিন্তু তার যথাযথ প্রয়োগ নেই যেকারণে অনেক ক্ষেত্রে ভালো কাজ করেও বিশেষ করে সরকারী দল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছুতে পারেনা তবে বাংলাদেশের সাথে এখানকার রাজনীতির একটি বড় পার্থক্য, বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত নিম্নমধ্যবিত্তদের মাঝে রাজনীতি নিয়ে যে আগ্রহ আছে সেটা এখানে একটু ভিন্ন এখানে কিছুসংখ্যক মানুষ রাজনীতি নিয়ে ব্যস্ত বাকিরা তাদের নিজেদের জীবন যাপন নিয়েই ব্যস্ত বাংলাদেশর সেই প্রত্যন্ত অঞ্চলের একটি চায়ের দোকানেরও প্রধান আলোচনা থাকে রাজনীতি , যেটা ক্যানাডাতে একেবারেই অনুপস্থিত আমি তিন দিন খুব কাছ থেকে ক্যানাডার রাজনীতিকে দেখলাম আমার মনে হয়েছে যারা সম্মেলনের অংশগ্রণকারী তারা ছাড়া পুরো শহরে অন্য মানুষদের নিয়ে কোনো মাথা ব্যাথা নাই  তারা খুশী এইজন্য যে সম্মেলন উপলক্ষে তাদের ব্যবসা বাণিজ্য ভালো বাংলাদেশের রাজনীতিতে পেশীশক্তি এবং অর্থ দুটোরই প্রভাব উল্লেখ করার মতো মেধাবী ছাত্র ছাত্রীরা আজকে রাজনীতিতে আসতে চায়না যে কারণে বাংলাদেশের রাজনীতি অনেকটা পেশীশক্তি এবং অর্থ বিত্তের কাছে জিম্মি হয়ে গেছে অথচ আমাদের রাজনীতির ইতিহাস তা বলেনা বাংলার মাটিতে একসময় রাজনীতি তারাই করতো যারা মেধাবী এবং বিচক্ষণ ছিল বর্তমানে বিভিন্ন পেশাজীবি প্রতিষ্ঠান যেমন বিশ্ববিদ্যলয়ের শিক্ষক সমিতি, বার এসোসিয়েশন , সাংবাদিক সমিতি এখন প্রকাশ্যে কোনো কোনো রাজনৈতিক দলের হয়ে কাজ করছে এমত অবস্থায় দেশের সাধারণ মানুষ আসলেই নিরুপায়, তারা মুখ খুলে কোন রকম প্রতিবাদ করতে পারেনা যে সরকার যখন আসে তারা তাদের সাথে তাল মিলিয়েই চলতে চায় পাছে ঝুট ঝামেলা থেকে দূরে থাকার জন্য বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৯৭০ সালের নির্বাচন উল্লেখ করার মতো যেটাতে সত্যিই মানুষ মনের অন্তস্থল থেকে ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছিল স্বাধিকার আন্দোলনের পক্ষে সেই নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামীলীগ পেয়েছিলো বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা ফলে আওয়ামীলীগ এবং বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আমরা পেয়েছি একটি স্বাধীন দেশ পরবর্তীতে যতগুলো নির্বাচন হয়েছে মানুষ কোন না কোন ভাবে নীতির বিরুদ্ধে গিয়ে ভোট দিয়েছে যেমন আমি আওয়ামী লীগকে পছন্দ করিনা তাই বিএনপিকে ভোট দিবো অথবা আমি বিএনপিকে পছন্দ করিনা তাই আওয়ামী লীগকে ভোট দেব অর্থাৎ বছরের ভালো বা মন্দ কর্মকান্ডের খুব একটা প্রতিফলন লক্ষ করা যায়নি অর্থাৎ আমি যেটা বলতে চেয়েছি বাংলাদেশের মানুষ আজ পুরোপুরিভাবে দুটি ভাগে বিভক্ত হয়ে গিয়েছে দেশের প্রায় প্রত্যেকটা মানুষই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে কোনো না কোন ভাবে দুটি বৃহৎ দলের পক্ষে কথা বলে  কাজেই একপক্ষ যত ভালোই কাজ করুক না কেন অন্যপক্ষের বিরোধীতা করা যেন একটা নিয়মে পরিণত হয়েছে ক্যানাডা সহ বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত দেশেও দুটি বৃহৎ দলের মধ্যেই নির্বাচনী যুদ্ধ হয় পার্থক্য হলো এই সব দেশগুলোতে সরাসরি দলীয় রাজনীতির সাথে কিছুসংক্ষক মানুষ জড়িত বাকী সাধারণ জনগণ চার্ বছর বা পাঁচ বছরের কর্মকান্ডের উপর তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করে এখানে পেশীশক্তির কোন মূল্য নেই সাধারণ নাগরিক স্বাধীন মত প্রকাশের ক্ষমতা রাখে চারবছর মেয়াদী কর্মকান্ডেরই মূলতঃ প্রতিফলন হয় জাতীয় নির্বাচনে তবে একটি দল তার পলিসি নির্ধারণ করে তার ভোট ব্যাংক কে মাথায় রেখে যদি কোনো সরকার তাদের নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী অঙ্গীকার পূরণে ব্যর্থ হয়, ধরে নেয়া যেতে পারে যে পরবর্তী নির্বাচনে জনগণ তাদের প্রত্যাখ্যান করবে এই ক্ষেত্রে ক্যানাডার ক্ষমতাসীন লিবারেল পার্টি যথেষ্ট চেষ্টা করেছে তাদের অঙ্গীকার পূরণ করার জন্য এবং অনেকটা সফলকামও হয়েছে যদিও তাদের কর্মকান্ডের অনেক নেতিবাচক সমালোচনাও রয়েছে তবে যতই সমালোচনা থাক, আমি একজন বাংলাদেশী ক্যানাডিয়ান হিসাবে মনে করি লিবারেল পার্টির পলিসি এবং রাজনৈতিক দর্শন আমাদের জন্য সহায়ক লিবারেল পার্টির তিন দিনের সম্মেলনে আমার উপস্থিতির অভিজ্ঞতা হলো, তারা যথাসাধ্য চেষ্টা করছে তাদের সরকারের ভুল ত্রুটি থেকে শিক্ষা নিতে তারা অভিজ্ঞতার আলোকে তাদের কর্মপন্থা নির্ধারণ করছে যাতে করে তারা আগামী বছরের নির্বাচনী যুদ্ধে অংশ নিয়ে আবার সরকার গঠন করতে পারে   


Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান