স্যাডেলাইটের চার্জ কতক্ষণ থাহে? আলো ক্যামন?   

Thu, May 10, 2018 9:59 PM

স্যাডেলাইটের চার্জ কতক্ষণ থাহে? আলো ক্যামন?   

. শাখাওয়াৎ নয়ন: (এক) উত্তর ব্রাম্মন্দী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের থার্ড স্যার মনিরঞ্জন কুন্ডু একটু দূর থেকে দেখলেন, গ্রামের চায়ের দোকানে কয়েকজন তরুন ছেলের দল খুবই উচ্চসিত। প্রথমে তিনি বুঝতে পারেন নি, তারা কি নিয়ে কথা বলছে? তবে এটা বোঝা যাচ্ছিল যে, খুব আনন্দের এবং ভালো কোনো ব্যাপার আছে। একেকজন একেকটি কথা বলছে, আর সবাই খুব খুশি খুশি চেহারায় হাসছে। একটু কাছে যেতেই শুনলাম, তারা মহাকাশে বাংলাদেশের প্রথম স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ নিয়ে কথা বলছে। মনিরঞ্জন কুন্ডু কিছুই না বলে নিরবে কান পেতে আছেন। যদিও এভাবে কানপাতা খুব খারাপ কাজ, তবুও লোভ সামলাতে পারলেন না। কি করবেন? তার যে শুনতে ইচ্ছে করছে। ওরা একজন বলছে-

‘শুন! পৃথিবীতে প্রায় ২০০টি দেশ আছে কিন্তু স্যাটেলাইট পাঠাতে পারছে মাত্র ৫৬টি দেশ। বাংলাদেশ হবে ৫৭তম দেশ’

আরেকজন তার বুকের ছাতি আরেকটু ফুলিয়ে বলে-

‘আরে শুন শুন, এবার তো ফ্রান্সের কোম্পানীরে দিয়া বানাইছি, এরপরেরটা আমরা নিজেরাই বানামু, দেহিস কইলাম’

একটু চিকনা মতো একজন ঘাড়টা একটু কাত করে হাসিহাসিমুখে বলে-  

‘একটা কামের কাম অইছে মাশাল্লাহ। আইজ ঘুমামু না, কোনো টিভিতে লাইভ দেখাইবো? তোরা সব আমাগো বাসায় চলে আয়...’     

উত্তরদিক থেকে হঠাৎ একজন মধ্যবয়স্ক লোক এলেন। ছেলেগুলো তাকে সালাম দিল। সালাম গ্রহণ করে তিনি ছেলেদেরকে জিজ্ঞেস করলেন-

‘অই মিয়ারা তুমরা কি নিয়া এত গপশপ করছো?’

একটু একটু গোফ উঠেছে এমন একজন কিশোর বল্লো-

‘আজকে রাইতে বাংলাদ্যাশের প্রথম স্যাটেলাইট “বঙ্গবন্ধু-১” উৎক্ষেপণ করা হবেহেইডা নিয়া কতাবার্তা কইতেছিলাম’। 

‘আইচ্ছা। কি লাইট?’

‘স্যাটেলাইট’

‘জীবনভর হ্যাজাক লাইট, কারেন্টের লাইট, চার্জার লাইট, টর্চ লাইট, তিনব্যাটারি, পাঁচব্যাটারি লাইট, কতরকমের লাইটের কতা যে হুনলাম, তয় স্যাডেলাইটের কতা তো কুনুদিন হুনি নাই। তয় ...স্যাডেলাইটের চার্জ কতক্ষণ থাহে? আলো ক্যামন?       

‘আরে এইটা সেই লাইট না।‘

‘তয় কুন লাইট?’

‘এইটা যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। আমরা মোবাইল ফোনে কথা বলি, টেলিভিশন দেখি, আবহাওয়ার খবর জানতে পারি, এসব কিছুই স্যাটেলাইটের সাহায্যে করা হয়’। 

‘ও আইচ্ছা। তয় ক্যামন টাকা-পয়সা লাগছে?’

‘প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা লাগছে’।

‘হায়! হায়!! হায়!!! করছে কি? এতদিন হুনছি মানুষ টাকা-পয়সা জলে ফালায়, হাসিনা আর তার পোলায় তো দেহি দ্যাশের টাকা-পয়সা সব বাতাসে উড়াইয়া দিতাছে। দ্যাশের মাইনষে ভাত পায় না, আর উনি ফুডানি করে! এইসব মাইনষে সহ্য করতে পারে...!’   

‘চাচা! স্যাটেলাইট ভাড়া বাবদ অন্যদেশকে তো প্রতিবছর প্রচুর পরিমানে টাকা দিতে হয়’  

‘স্যাটেলাইট ভাড়া করনের দরকার কি?’

‘তাইলে মোবাইলে কথা বলবেন কিভাবে?’

‘মোবাইলে কতা কইমু না, দ-র-কা-র না-ই’।

দরকার নাই কথাটি বলে শেষ না করতেই তার ছেলে তাকে ইতালী থেকে ফোন করেছে। তিনি ফোন রিসিভ করে, একটু দূরে গিয়ে ছেলের সাথে কথা বলছেন। কিশোর ছেলের দল হাসাহাসি করতে করতে গড়াগড়ি খাবার অবস্থা। একজন বলে-

‘দেখলি? শামচু চাচায় কয় ‘মোবাইলে কতা কমু না’ আর সাথে সাথে বিদেশ থেকে তার ফোন এসেছে, চাচা কথা বলা শুরু করে দিয়েছে!’

শামচু চাচা কথা ফোনে কথা বলা শেষ করে ফিরে এলেন। ছেলেগুলো কেউ মুচকি মুচকি, কেউ মুখ টিপে, কেউ মুখ নিচু করে হাসছে। শামচু চাচা অবস্থা আঁচ করতে পেরে নিজেই আবার কথা তুললেন-

‘আরে থামো মিয়ারা! অইসব বাঁশের স্যাটেলাইট উডাইবো ক্যাম্নে? আর যাইয়া দ্যাহো কী সব জোড়াতালি দিয়া বানাইছে, অইডা দিয়া টেলিভিশন দ্যাহা যাইবো না, মোবাইলের নেটোয়ার্ক পাওয়া যাইবো না। আবহাওয়ার খবর দ্যাখবা এহন থিকা উল্টা পাল্টা অইয়া যাইবোএই ইহুদী, নাছারা, কাফের, মালাউনের সরকার কুনু ভালো কাম করতে পারবো না’  

‘কী যে কন চাচা! আমরা তো আশা করছি, এবছর নিজস্ব স্যাটেলাইট দিয়া পবিত্র হজ্ব লাইভ দেখমু, ইনশাল্লাহ’। 

‘আগে দেইখ্যা লও বাবা, তারপরে কইওএই সরকার কুনু আন্তর্জাতিক মান-সম্পন্ন স্যাডেলাইট বানাইতে পারবো না। ...আরেকটা কতা! তয় হুনলাম, বেশ কয়বার চ্যাস্টা কইরাও নাহি ঐ স্যাডেলাইট উডাইতে পারে নাই?’

‘ওগুলো তো বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছিল, তা ছাড়া আবহাওয়ার ব্যাপার আছে না?’  

‘তুমরা নাবালোক ছেলেপেলে...বুঝু না...অইসব বাঁশের স্যাডেলাইট উডাইবো ক্যাম্নে? উডাইতে পারলেও ভাইংগা পড়বো, দ্যাহো কয়দিন থাহে...!’

কথাটি বলতে বলতে শামচু চাচা দ্রুত মাথায় হাত দিয়ে উপরের দিকে তাকালেন। ভাবখানা এমন যেন এখনই তার মাথার উপর স্যাটেলাইট ভেংগে পড়বে। ছেলেগুলো প্রায় সমস্বরে বলে উঠলো-

‘কী যে বলেন চাচা! বাঁশ দিয়া কি স্যাটেলাইট বানানো যায়?’

‘যায়! যায়!! আম্লীগ্রে তুমরা চেনো না, এরা সবই পারে...’  

(দুই)

রফিক সাহেব ইউভার্সিটিতে একজন অফিস ক্লার্ক হিসেবে চাকুরি করেন। অফিসে কয়েকদিন ধরেই স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ নিয়ে বেশ আলোচনা-সমালোচনা শুনছেন। না, একটু ভুল হলো, শুধু অফিসে কেন? বাসে, ক্যান্টিনে, ইউনিভার্সিটিতে সব জায়গায়-ই ব্যাপারটি বেশ আলোচিত হচ্ছে। যেখানেই যাচ্ছেন, একটা কথাই বারবার ঘুরেফিরে শুনছেন, গতকাল টিএসসিসিতে কয়েকজন ছেলেমেয়ে একই আলোচনা করছিল। রফিস সাহেব তাদের কথা শোনার চেষ্টা করছেন। তাদের একজন বলছেন-

-এই স্যাটেলাইটের মালিকানা নাকি বেক্সিমকোর?

-কোন প্রমাণ আছে একটি ভুয়া অনলাইন ভিডিও ছাড়া? এই স্যাটেলাটের সম্পূর্ণ মালিকানা বাংলাদেশ সরকারের। আরেকটু নির্দিষ্ট করে বললে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রনালয়ের অধীনে থাকা Bangladesh Communication Satellite Company Limited এর। BCSCL থেকে যেকোন কেউ ফ্রিকোয়েন্সি কিনে ব্যবসা করতে পারে। বেক্সিমকোও কিনেছে। সামনে আরো অনেকেই কিনবে। BCSCL থেকে না কিনলে তারা এই ব্যান্ডউইথ বাইরে থেকেই কিনতো। দেশ থেকে চলে যেতো ফরেন কারেন্সি।

-এই স্যাটেলাইট দিয়ে দেশের কোন লাভ হবেনা। হাজার কোটি টাকা জলে গেল।

- আচ্ছা, স্যাটেলাইট বানানো যদি লসই হয়, যে দেশ যত উন্নত সে দেশের স্যাটেলাইট সংখ্যা এত বেশি কেন? গুগলে সার্চ করে দেখুন। শত শত বাণিজ্যিক স্যাটেলাইট কোম্পানী আছে যারা নিজেদের ব্যান্ডউইথ বিক্রি করছে। এই ব্যবসা যদি লসই হয়, তবে তারা বাঁচছে কীভাবে?

তবে এটি সত্য, আর্থিকভাবে কতটুকু লাভবান হবে সেটি এখনো বলা যাচ্ছে না। কারণ বিমান বা রেল, সরকারী কোন প্রতিষ্ঠানই লাভে নেই।

কিন্তু বিশ্বের কোন দেশের সরকারী বিমান কোম্পানী লাভে আছে? আল-ইটালিয়া থেকে শুরু করে পাশের এয়ার ইন্ডিয়া, সবাই লসে আছে। কারণ সরকারের কাজ ব্যবসা করা নয়। জনগণের উপকার করা। অলাভজনক রুটগুলোতে যাত্রা বা হজ্বের সময় সস্তায় সিট দেওয়া এগুলো সবই সম্ভব নিজস্ব বিমান বাংলাদেশ আছে বলেই। একটা কথা না বলে পারছি না, গত তিন বছর যাবত বাংলাদেশ বিমান লাভ করছে। খোজ নিয়ে দেখ।

-এই স্যাটেলাইট বাংলাদেশের উপর থাকবে না। থাকবে ইন্দোনেশিয়ার উপর।

- ভাই, এবার থামেন। একটু পড়া লেখা করেন। এই স্যাটেলাইট জিয়োস্টেশনারি। অর্থাৎ, এই স্যাটেলাইট সব সময় বাংলাদেশের দিকেই মুখ করে থাকবে। কিন্তু হ্যাঁ, একেবারে ঠিক বাংলাদেশের মাথার উপরে, অর্থাৎ, ঠিক নব্বই ডিগ্রী উপরে থাকলে আরো ভালো হতো। কিন্তু এই এঙ্গেলটি আগেই অন্যান্য উন্নত দেশ নিয়ে ফেলেছে। আপনাদের মত পাকনা মানুষজন সে সব দেশে থাকলে আমাদেরই লাভ হতো। ওরা ওদের দেশের স্যাটেলাইটকে ছ্যাঁ, ছ্যাঁ করতো, আর আমরা ৯০ ডিগ্রি এঙ্গেলটি ফাঁকা পেতাম। তাও ভাল আমরা ২০১৮ সালে এসে এটি নিয়েছি। আরো দশ বছর পরে নিলে এই স্যাটেলাইট অস্ট্রেলিয়ার উপর থাকতো।

-এই স্যাটেলাইটই প্রথম নয়। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় আগেই স্যাটেলাইট বানিয়ে পাঠিয়েছে। হাজার কোটি লাগেনি।

- বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের দিয়েই যদি এটি বানানো যেতো, স্যাটেলাইট পাঠানো দেশ পৃথিবীতে মাত্র ৫৭টি থাকতো না। উগান্ডা-রুয়ান্ডারাও এতদিনে পাঠিয়ে দিতো। ব্র্যাকের ছেলেদের বানানো স্যাটেলাইট ছিলো ন্যানো সেট। কয়েক কেজি ওজনের। স্টুডেন্ট প্রজেক্ট হিসেবে নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবীদার। কিন্তু বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইটের ওজন সাড়ে তিন টন। এটি পরিবহণ করা হয়, বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী বিমান এন্টানোভের মাধ্যমে।

সেই তিন দশক আগেও বটম লেস বাস্কেট বলে স্বীকৃত বাংলাদেশ পুরো বিশ্বের কাছে নিজের ইমেজ পাল্টে দিয়েছে এক পদ্মাসেতু নিজের টাকায় তৈরী করে। দ্বিতীয় বার পাল্টাবে আজকের এই বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষপণের মাধ্যমে। বিশ্বের বহু দেশ নিজেদের ভাবমূর্তি উজ্জ্বলের জন্য বিলিয়ন ডলার বিজ্ঞাপনেই ব্যয় করে। আমেরিকা এক সময় নিজের বাজেটের সাড়ে চারভাগ ব্যয় করতো এই মহাকাশ গবেষণায়। কেন? চাঁদে গিয়ে ব্যবসার জন্য? নাকি চাঁদে মানুষ পাঠিয়ে পুরো বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দেবার জন্য যে আমরাই সেরা?

তাই আর কিছু না হোক এই স্যাটেলাইটের মাধ্যমে যে ফ্রী বিজ্ঞাপন আমরা পাচ্ছি সেটাই বা কম কীসে? আজ বাংলাদেশ আরেকটি নতুন দিগন্তে প্রবেশ করতে যাচ্ছে। জয়তু বাংলাদেশ। জয় বাংলা। 

উল্লেখ্য, আরেকটি জিনিস না বললেই নয়। সেই নব্বই দশকে বিশ্ব যখন আমাদের বিনামূল্যে সাবমেরিন কেবল দিতে চায়, তৎকালীন বিএনপি সরকার ফিরিয়ে দিয়েছিলো। যা পরবর্তীতে আমাদের কয়েক হাজার কোটি টাকা দিয়ে কিনতে হয়েছে।  

[দ্বিতীয় অংশটির আদনান সাদিকের প্রতি কৃতজ্ঞতা]

লেখকঃ কথাসাহিত্যিক এবং একাডেমিক, ইউনিভার্সিটি অফ নিউ সাউথ ওয়েলস, অস্ট্রেলিয়া।


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান