‘হে নুতন দেখা দিক আর-বার, জন্মের প্রথম শুভক্ষন'

Mon, May 7, 2018 8:55 PM

‘হে নুতন দেখা দিক আর-বার, জন্মের প্রথম শুভক্ষন'

সায়ীদ যাদীদ: ভেবেছিলেম যাবো না এবার। কিন্তু, কানাডার বাংলা টেলিভিশনের ‘জন্মতিথিতে রবীন্দ্রস্মরন’ অনুষ্ঠান তার ভাব গাম্ভীর্য, সৌন্দর্য এ সৌকর্যে আর দশটা আয়োজনের চেয়ে যে আলাদা! কাজেই শরীরের সাথে যুদ্ধ করে মনই জয়ী হলো। এবং আমার ভাঙ্গা শরীর চাঙ্গা মনের উত্তরীয় জড়িয়ে নিয়ে পরস্পর হাত ধরাধরি করে হাজির হোল স্যার ওয়াল্টার স্টুয়ার্ট পাবলিক লাইব্রেরীর মিলনায়তনে। ৫ ই মে-র নাতিশীতোষ্ণ মনোরম সন্ধ্যাটি যেন এই অনুষ্ঠানটিকে আবাহনের জন্য প্রস্তুতই ছিল। ‘গানের আড্ডা’ শিরোনামে বাংলা টেলিভশন অনেক দিন ধরে নিয়মিত একটি ঘরোয়া গানের অনুষ্ঠান করে আসছে। বিশেষ তাৎপর্যময় দিবসের মুখোমুখি হলে কোন কোন ঘরোয়া ‘গানের আড্ডাকে’ কর্তৃপক্ষ ঘরের বাইরে মঞ্চে নিয়ে তোলেন সঙ্গত কারনেই। এবারের গানের আড্ডায়ও শ্রোতারা তাই ফরাশ পাতা টানা মেঝের বদলে বসেছেন সার বাঁধা কেদারায়। সে যাক, গানের কথায় আসি।

বাংলা টেলিভিশনের ঐতিহ্য মেনে, বাছাই করা শিল্পীদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল এদিনকার অনুষ্ঠানে, যাকে বলে hand picked. রবীন্দ্র সঙ্গীতে স্নিগ্ধা চৌধুরী, সুভাষ দাস, মেনালিসা চৌধুরী, স্বর্নালী মুক্তা রায়, নন্দিতা গোমস ও সুনীল গোমস। আবৃত্তিতে নুরুন্নাহার সুপ্তি, ফারজানা হক ও ফারহানা ইয়াসমিন গল্প এবং প্রবন্ধ পাঠে ড:সুজিত দত্ত।

প্রথমেই বাংলা টেলিভিশনের সাজ্জাদ আলীর উদ্বোধনী বক্তব্যের পর সজীব চৌধুরী তাঁর সংক্ষিপ্ত ভাষনের মধ্য দিয়ে আমন্ত্রিত অভ্যাগতদের স্বাগত: জানালেন। দিনের অনুষ্ঠানটির সার্বিক সঞ্চালনায় ছিলেন ফ্লোরা শুচি। ফ্লোরা শুচি বাংলা টেলিভিশন অনুষ্ঠানমালার নিয়মিত উপস্থাপক ও সঞ্চালক। তাঁর নিঁখুত উচ্চারন, চমৎকার কন্ঠস্বর ও সাবলীল উপস্থাপনা সবসময়ই দর্শক নন্দিত। ফ্লোরা মঞ্চে ডাকলেন দিনের প্রথম শিল্পী স্নিগ্ধা চৌধুরীকে। ‘হে নূতন দেখা দিক আর বার’ দিয়ে স্নিগ্ধা সূচনা করলেন তার নিবেদন এবং একে একে গাইলেন, ‘নিবিড় ঘন আঁধারে জ্বলিছে ধ্রুবতারা’, ‘হৃদয় নন্দন বনে নিভৃত এ নিকেতনে’ এবং ‘গহন কুসুম কুন্জ মাঝে।’ ক্রিকেটের মাঠে ওপেনারদের কাছে যেমন প্রত্যাশা থাকে, সঙ্গীত মঞ্চেও তেমনি থাকে সূচনা-শিল্পীর কাছে। সে প্রত্যাশা স্নিগ্ধা সবসময় পূরনও করে থাকেন বিশ্বস্ততার সাথে। আর তাই হয়তো ফিরে ফিরেই তাঁকে দেখা যায় বাংলা টেলিভিশনের অনুষ্ঠানগুলোর সূচনা শিল্পী হিসেবে। কিন্তু গতকাল তাঁর কন্ঠের সাথে শব্দ গ্রাহক যন্ত্রের যথাযথ সমন্বয় ঘটেনি। ফলে তার সুগীত গান গুলোর কথা বুঝতে কিছুটা বেগ পেতে হয়েছে।স্নিগ্ধার প্রথম গানটির খুব চমৎকার প্রেক্ষাপট বর্ণনা করেছেন ফ্লোরা শুচি। গুরুদেবের জন্মতিথিতে যার পর নাই লাগসই নির্বাচন। বিশেষ করে এই গানটির জন্য স্নিগ্ধা চৌধুরীকে আলাদা করে ধন্যবাদ দিতে চাই।

অত:পর ফারহানা ইয়াসমিন গল্প রবীন্দ্রনাথের বহুল শ্রুত ‘নির্ঝরের স্বপ্ন ভঙ্গ’ কবিতাটি আবৃত্তি করলেন তার নিজস্ব ভঙ্গিমায়। এরপর মঞ্চে এলেন শিল্পী সুভাষ দাস। পরপর তিনি গাইলেন, ‘আপনারে দিয়ে রচিলি রে কি এ আপনারই আবরণ’, ‘আমার হিয়ার মাঝে লুকিয়ে ছিলে’, ‘ তুমি কেমন করে গান করো হে গুনী’ এবং ‘ মহাবিশ্বে মহাকাশে মহাকাল মাঝে।’ সুভাষ দাসের গান আগেও শুনেছি কিন্তু এদিনকার গানে তাঁকে আরো ঋদ্ধ, সুরানুগামী মনে হয়েছে। গভীর কন্ঠস্বরে সুরের স্থাপনা, গায়কী ও তন্ময়তায় তিনি নিজেকে দারুন রাবীন্দ্রিক আবহে উপস্থাপন করেছেন। শ্রোতাদের ‘প্রাণ ভরিয়ে তৃষা হরিয়ে’ দিয়েছেন।

পরের পরিবেশনা নুরুন্নাহার সুপ্তির কন্ঠে কবিগুরুর ‘সোজাসুজি’ কবিতার আবৃত্তি। নুরুন্নাহার সুপ্তি একজন চারুশিল্পী, চারুকলায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর এবং বাংলা টেলিভিশনের শিল্প নির্দেশক। তিনি শিল্প নির্দেশনায় এবং আবৃত্তিতে সমান পারঙ্গম। বরাবরের মত এবারের মঞ্চ সজ্জাও তার শিল্প নির্দেশনার উদাহরন। নুরুন্নাহারের পর ফারজানা হক আবৃত্তি করলেন রবীন্দ্রনাথের ‘পরিচয়’ কবিতাটি। ফারজানা হকের কন্ঠ  ও কন্ঠের স্বর প্রক্ষেপন কবিতার বিষয় ও ভাবানুগ। রবীন্দ্রগানের পরে বা ফাঁকে ফাঁকে কবিতাবৃত্তি খুব সহজসাধ্য কাজ নয়। কিন্তু সেই কাজটিই এদিনের আবৃত্তি শিল্পীরা খুব সফল ভাবে করতে পেরেছেন এবং শ্রোতাদের সপ্রশংস হাত তালি কুড়িয়েছেন।

পর পর দুই বাচিক শিল্পীর কবিতাবৃত্তির পর মোনালিসা চৌধুরী একে একে গেয়ে শোনালেন পূজা পর্যায়ের ‘ মধুর রূপে বিরাজ হে বিশ্ব রাজ’, ‘পান্থ তুমি পান্থ জনের সখা হে’, ‘দিনের বেলায় বাঁশী তোমার বাজিয়েছিলে অনেক সুরে’ এবং ‘নিত্য তোমার যে ফুল ফোটে ফুলবনে।’ মোনালিসার গান ও গায়ন সম্পর্কে নুতন করে কিছু বলার নেই। তিনি তার সুললিত কন্ঠের পরিশীলিত গায়কী দিয়ে সতত:ই দর্শক শ্রোতার চিত্ত জয় করে চলেছেন।

কুড়ি মিনিট বিরতির পর স্বর্ণালী মুক্তা রায় গাইলেন পূজা পর্যায়ের ‘ আকাশ জুড়ে শুনিনু ওই বাজে’ এবং ‘শুধু তোমার বাণী নয় গো, হে বন্ধু হে প্রিয়’ গান দুখানি আর নন্দিতা গোমস গাইলেন ‘গরব মম হরেছ প্রভু, দিয়েছ বহু লাজ’,

‘হে মোর দেবতা, ভরিয়া এ দেহ প্রাণ’, ‘আমার মন তুমি নাথ, লবে হরে’ এবং ‘ তুমি যে চেয়ে আছো আকাশ ভরে।’

গানের পর কবিতা না হয় চললো তার কাব্য গুনে কিংবা আবৃত্তির করণকৌশলে। কিন্তু প্রবন্ধ পাঠ ? সবিস্ময়ে দেখা গেল ইংরেজী সাহিত্যের অধ্যাপক ড: সুজিত দত্ত এই আপাত: দু:সাধ্য কাজটি অনায়াস, সপ্রতিভ ভঙ্গিতে সম্পন্ন করলেন দর্শক শ্রোতার পিন পতন নিস্তব্ধতার ভিতর দিয়ে। তাঁর এবারের বিষয় ছিল ‘ রবীন্দ্র দর্শনে বিশ্বজনীনতা।’ যে বিষয়টি একটি পূর্ণাঙ্গ পুস্তকের উপজীব্য হওয়ার দাবীদার, তাকেই তিনি মাত্র দশ মিনিটের ফ্রেমে বন্দী করেছেন আলো বাতাসের প্রবাহ অক্ষুন্ন রেখেই। রবীন্দ্র সাহিত্যের বিশ্বজনীনতা বা বিশ্বজাগতিকতার চিত্রাকংকনের জন্য দরকার বিস্তৃত ক্যানভাস। কিন্তু ছোট্ট পরিসরে ড: দত্ত যে দক্ষতায় তাঁর প্রবন্ধটির গ্রন্থনা ও উপস্থাপনা করেছেন তা বিশেষ উল্লেখের দাবী রাখে।

সবশেষে সুনীল গোমস এলেন তাঁর সঙ্গীতান্জলী নিয়ে। শিল্পী সুনীল গোমস একাধারে হস্তে ধারন করেন এস্রাজের ছড়, কন্ঠে ধারন করেন রবীন্দ্র গান আর অন্তরে ধারন করেন রবীন্দ্র প্রেম। আর এই তিনের সমন্বয়ে তার নিবেদন সিক্ত, পূর্ণ হয়ে ওঠে ভক্তি ও ভালোবাসায়। আর হবে নাই বা কেন। তিনি যে শ্রী আশীষ ভট্টাচার্য, শৈলজারন্জন মজুমদার আর রনবীর রায় চৌধুরী প্রমুখের পরম্পরা বয়ে চলেছেন! তো, সুনীল গাইলেন, ‘অন্তরে জাগিছো অন্তর্যামী, তবু সদা দূরে ভ্রমিতেছি আমি’, ‘নাথ হে প্রেম পথে সব বাঁধা ভাঙিয়া দাও’, ‘তাই তোমার আনন্দ আমার পর’ এবং ‘এ মোহ-আবরন খুলে দাও, দাও হে।’ শিল্পী যখন সুনীল গোমস তখন ধরে নেয়া যায় তিনি কিছু অপ্রচলিত গান গাইবেন।  অনুষ্ঠানের শেষ শিল্পী যখন সুনীল গোমস তখন বলে দেয়া যায় তাঁর শেষ গানটি হবে মুক্ত ছন্দের পূজা পর্যায়ের গান। আর অনুষ্ঠানের শেষ গানটি যখন সুনীল গাইবেন তখন নি:শ্চিত বলে দেয়া যায় ‘তার শেষের গানের রেশ নিয়ে প্রাণে’ তৃপ্ত শ্রোতা বাড়ি ফিরবেন- ফ্লোরা শুচি যেমনটি বলেছিলেন। অপূর্ব, অপার্থিব সুর-ব্যঞ্জনায় সবার মন ভরিয়ে দিয়ে সুনীল শেষ করলেন তার নিবেদন।

এ দিনের অনুষ্ঠানের সাথ-সঙ্গতকাররা ছিলেন তবলা ও শ্রীখোলে সজীব চৌধুরী, এস্রাজে সুনীল গোমস, তানপুরায় স্বর্নালী মুক্তা রায় ও নন্দিতা গোমস, হারমোনিয়মে অমিত রায় ও মন্দিরায় অরূপ মুখার্জি। এঁদের প্রত্যেকেই প্রত্যেকের জায়গায় সুসিদ্ধ,তন্নিষ্ঠ। পুরো অনুষ্ঠানটিকে ক্যামেরা বন্দী করেছেন সুদীপ্ত, ফারজানা সহ বাংলা টেলিভিশনের নিয়মিত চিত্র গ্রাহকবৃন্দ। এবারকার অনুষ্ঠানের মধ্যভাগে বিরতি পর্বে আগের তুলনায় অনেক শৃঙ্খলা পরিলক্ষিত হয়েছে যেটা আয়োজক কর্তৃপক্ষের অনেক চেষ্টা ও পরীক্ষা নিরীক্ষার ফল বলা যায়। দর্শক-শ্রোতা এবং আয়োজকদের পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহযোগীতা এবং সহমর্মিতা বোধ একটি অনুষ্ঠানকে আক্ষরিক অর্থেই যে নান্দনিক করে তুলতে পারে এটা তারই প্রমান। আর এ কথা উল্লেখ করতেই হয়, বিজ্ঞাপন ও স্পন্সর মুক্ত এমন একটি রুচি-স্নিগ্ধ অনুষ্ঠান আয়োজন করে বাংলা টেলিভিশনের জনাব সাজ্জাদ আলী ও তার দল আমাদের, শ্রোতাদের কৃতজ্ঞতাভাজন হয়েছেন। ধন্যবাদ বাংলা টেলিভিশন কানাডা।


Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান