নাহিদ জাহানের  সংগ্রাম এবং  স্বপ্ন ছোঁয়ার গল্প

Sat, May 5, 2018 10:55 AM

নাহিদ জাহানের  সংগ্রাম এবং  স্বপ্ন ছোঁয়ার গল্প

বি জামান মুকুল: অফিস থেকে বাসায় ফিরে গ্যারেজে ঢোকার সময় মিস নাহিদের ক্ষুদে বার্তাপেলাম। " I am very glad to tell you that they confirmed me today. I will join there on June 4, 2018….” । আমার জন্য এটি অসাধারণ এবং আনন্দের খবর। 

মিস নাহিদের সাথে আমার পরিচ পর্বটিও  ইন্টারেস্টিং।হঠাৎ একদিন পরিচিত গুজরাটি কানাডীয়ান  এক সোশ্যাল ওয়ার্কার এর টেক্সট পেলাম। তিনি আমার ফোন নাম্বারটি সে বাংলাদেশের একজন MSW স্টুডেন্টকে দিতে পারবেন কি না তার নুমতি চাইলেন। তিনি তখন গ্রে-হাউন্ড বাসে শিকাগোর পথে। তার সহযাত্রী মিস নাহিদ।কথা প্রসঙ্গে তিনি মিস নাহিদকে আমার কথা জানালেন। মিস নাহিদ ফোন নাম্বার নিলেন এবং যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণ শেষে দেশে ফিরে নিজের পড়াশুনায় মনোনিবেশ করলেন।

কয়েক মাস পরে মিস নাহিদ প্লেসমেন্ট করতে উইন্ডসর থেকে টরোন্টোতে আসেন। সেই অফিসের ক্যাফেটেরিয়ায় তার পরিচয় হয় একজন  পাকিস্তানী কানাডীয়ান  ফামিলি কাউন্সিলর এর সাথে। মিস নাহিদ কথা প্রসঙ্গে তাকে জানান উনি বাংলাদেশী এবং প্লেসমেন্ট শেষে সোশ্যাল সার্ভিসে চাকরি খুঁজবেন এবং তার সাহায্য দরকার হতে পারে। ওই ফ্যামিলি কাউন্সিলর  মিস নাহিদকে বলেন, অবশই তুমি আমার সাথে কন্টাক্ট করতে পারো তবে আমার পরিচিত  তোমাদের দেশের একজন আছে, যে আমাকে বেশ কিছু তথ্য দিয়ে উপকার করেছিল। আমার মনে হয় উনার সাথে কথা বলে দেখতে পারো। ওই পাকিস্তানী কাউন্সিলর আমার নামও জানালেন তাকে। মিস নাহিদ বললেন আমি তাকে চিনি না, কিন্তু এখন আমার তার সাথে পরিচিত হতেই হবে। একই ব্যক্তির  নাম আমি সেই শিকাগো শহরে কোনো এক বাসে একজন ইন্ডিয়ানের কাছে শুনেছি, আজকে আবার তুমি বলছো অথচ বালাদেশের অনেকের নাম জানি বা অনেকের কথা শুনেছি কিন্তু উনার কথা জানি না।‘  ওই কাউন্সিলর তখন আমাকে ফোন করলেন এবং বললেন উনি আমাকে একজন দেশি ভদ্রমহিলার সাথে পরিচয় করাতে চান।

এর পর মিস নাহিদকে ফোন দেন।  তিনি  দেখা করতে চাইলেন, একদিন অফিস শেষে তাঁর সাথে দেখাও হয়ে গেলো।

তাঁর সাথে কথা বলে আমার বুঝতে আর বাকি ছিল না যে তিনি একদিন ভালো করবেন। তাঁর যোগ্যতা আছে  কিন্তু এদেশে আসলে এবং সঠিক তথ্য না জানলে প্রথম প্রথম যা হয়; নিজেকে অদক্ষ, অযোগ্য, দুর্ভাগা ইত্যাদি মনে হয়। তার অবস্থাও তেমন। আমি আর বলিনি যে উনার যোগ্যতা আমাদের থেকে কোনো অংশে কম না এবং উনি আমাদের থেকে ভালো চাকরি পাবেন। শুধু বললাম, আমি উনার অবস্থানে থাকাকালীন যতটা অগ্রসর ছিলাম না, উনি তার থেকে অনেক অগ্রসর, সুতারং দুশ্চিন্তাকে একটু দূরে রেখে সুচিন্তাকে সেই জায়গাতে  স্থান দিলে উনি ঠিক জায়গায়া একদিন পৌঁছে যাবেন।

এরপর পর উনি আরো একটা প্লেসমেন্ট করলেন। ডিগ্রি শেষ করলেন।  সিটিতে একটি চাকরিও পেলেন, কিন্তু উনার কাঙ্খিত চাকরি আর হচ্ছে না। যদিও সেই চাকরির জন্য ২/৩ বার ইন্টারভিউ দিলেন। আমি যতটুকু পেরেছি সাহায্য করলাম কিন্তু আমার সাপোর্ট কাজে দিলো না। ওই ধরণের কাজ করেন এরকম এক জনের সাথে কানেক্ট করিয়ে দিলাম, আর হাল না ছেড়ে ক্রমাগত চেষ্টা করে যেতে বললাম। উনি তাই করলেন। আর সেই চেষ্টা আর কষ্টের সুফলটা এলো আজকে। আর আমার ভালো লাগলো, উনাকে আমি যে বলেছিলাম উনি আমাদের থেকে অগ্রসর, শুধু এই দেশের সিস্টেম এবং সময়ের বাঁকে পড়ে নিজেকে হতভাগা মনে হচ্ছে। দিন একদিন আসবে, আর আমার সেই কথা প্রমানিত হলো। আমিও নতুন করে শিখলাম, Dream never dies, it may hibernate; we just have to wake it up and work on it.

মিস নাহিদের  ব্যক্তিগত  ব্যাপারে কখনো কিছু  জিজ্ঞেস করা হযনি। আজ জানতে চাইলাম, কখন এদেশে এলেন এবং কেন পরিবার টরন্টো রেখে MSW করতে উইন্ডসর গেলেন।সংক্ষেপে তার উত্তর বলি। প্রায় ৬ বছর  আগে সোসিওলজিতে ডিগ্রি এবং চাকরির অভিজ্ঞতা নিয়ে এখানে আসেন।তেমন কোনো ভালো গাইডেন্স পাননি। অবশেষে একটি অফিসে  গিয়ে সেখানকার কাজ এবং পরিবেশ  উনার খুব পছন্দ হয় এবং উনি জানতে পারেন ওই অফিসে কাজ করতে হলে নূন্যতম BSW থাকতে হবে। ইয়র্ক উনিভার্সিটিতে BSW ভর্তির সুযোগও পান কিন্তু ভালো পরামর্শের অভাবে সেটি আর করতে পারেন নাই।  হাল ছাড়েন নাই উনি।  পরিশেষে ভর্তি হন উইন্ডসর উনিভাসির্টিতে MSW তে। শুরু হলো তার স্বপ্নের সিঁড়িতে উঠার সংগ্রাম। এবং এই সংগ্রামের পথ খুব মসৃন ছিল না, বরং ছিল অনেক বন্দুর। তবুও উনি চালিয়ে গেলেন।

বললেন পড়াশুনা শুরুর আগে পরিবারের প্রয়োজন মেটাতে উনাকে সিকুরিটি এবং পেট্রল পাম্প থেকে শুরু করে অনেক অড জব করতে হয় এবং সেগুলি অনেক কষ্টের ছিল । পেট্রল পাম্প এর কাজ শুরু করতে হতো ভোর ৫ টা থেকে। দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে তার মনে হতো ওই জাতীয় কাজ তার পক্ষে বেশি দিন করা সম্ভব হবে না, তাই যত কষ্টই হোক তাকে এই বয়সে হলেও MSW শেষ করতে হবে।

 বলে রাখি, আমাদের এই বয়সে এবং পরিবারের দায়িত্ব পালন করে ওই রকম একটি FT ডিগ্রী করা চাটটি খানি কথা নয়। আর একজন মহিলাকে এখনো দেশে একটু খাটো করে দেখা হয় কিন্তু উনি সেই sterotype ধ্যানধারণা পাল্টে দেওয়ায় অনেকের সাথে নিজেকে যুক্ত করেছেন। মিস নাহিদ দুটি কন্যার জননী।

এবার কমুনিকেশন এবং নেটওয়ার্কিং এর কথায় আসি। আগেকার দিনের থেকে এখন সামাজিক মাধ্যম কমুনিকেশন এবং নেটওয়ার্কিংকে অনেক সহজ করে দিয়েছে। কিন্তু এখনো পর্যন্ত আমরা সেটাকে সঠিক ভাবে ব্যবহার করছি না। এখানে অনেক ওয়ার্কশপ, সেমিনার বা এই জাতীয় ব্লগে চাকুরী প্রাথীদের তেমন  সমাগম দেখা যায় না। অথচ পেশাগত চাকরির  ব্যাপারে হা হুতাশের কমতি নেই। মিস নাহিদের সাফল্যের পিছনে কমুনিকেশন এবং নেটওয়ার্কিং যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে, সেটা তার এই স্বপ্নের সিঁড়ি উত্তরণের কাহিনী থেকেই অনুধাবন করা যায়।


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান