আর একটি হত্যাও নয়

Fri, May 4, 2018 4:54 PM

আর একটি হত্যাও নয়

ইমতিয়াজ মাহমুদ:আমি ভয় পেয়েছি। না, নিজের জীবন নিয়ে বা নিজের কোন বিপদ আপদ হতে পারে সে নিয়ে ভয় পাইনি। নিজের বিপদ নিয়ে বা একজন বা দুইজন মানুষের বিপদ নিয়ে খুব বেশী ভয় পাওয়ার কিছু নাইও। বিশেষ করে আপনি যখন বিপদের অস্তিত্ব সম্পর্কে সচেতন আর ভয়ের সূত্রটা বা উৎসটা আপনার জানা থাকে তখন তো আর ভয়ের কিছু থাকে না। ভয় হয় যখন বিপদটা ঝুলতে থাকে একটা জাতির উপর বা একটা জনগোষ্ঠীর উপর বা অনেক মানুষের উপর এবং যখন আপনি জানেন না বিপদের উৎস কি সূত্র কি আর কারা আছে এইরকম সম্ভাব্য বিপদের পেছনে।

 

তরুণ বন্ধুরা আপনারাও কি ভয় পেয়েছেন? ভয় পেলে নিজের কাছে আগে নিজে স্বীকার করুন যে ভয় পেয়েছেন। ভয় পাওয়া মন্দ কিছু না। কিন্তু ভয়ের সময় মাথা ঠাণ্ডা রাখতে হয়। মাথা ঠাণ্ডা রাখুন, চোখ খোলা রাখুন, আশেপাশে সকলের সাথে কথা বলুন। সতর্ক থাকুন।

 

আশেপাশের সকলের কাছে কি কথা বলবেন? প্রথমত শোকটা শেয়ার করুন। কেবল রাজনৈতিক মতপার্থক্যের কারণেই কারো মৃত্যুতে আনন্দিত হবেন না। সকলের সাথে শোকটা ভাগাভাগি করে নিন। তারপর বুঝতে চেষ্টা করুন, জানতে চেষ্টা করুন এইসব ঘটনা কেন ঘটছে আর কারা ঘটাচ্ছে। এইসব ঘটনার সামনে কারা আছে আর পেছনে কারা আছে সেটা জানতে চেষ্টা করুন। মাথা ঠাণ্ডা রাখুন আর জানতে চেষ্টা করুন কেন এইসব ঘতত্না ঘটাচ্ছে ওরা আর এই সময়টাতেই কেন ঘটাচ্ছে।

 

নিজে সতর্ক থাকুন এবং লক্ষ্য রাখুন অন্যের বিপদ হতে পারে সেরকম কোন কিছুর ইঙ্গিত বা সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছেন কিনা। যদি মনে হয় আপনার পরিচিত কারো উপর আক্রমণ আসতে পারে তাঁকেও সতর্ক করুন। পরস্পর পরস্পরকে রক্ষা করুন। সতর্ক থাকুন। পক্ষ বিপক্ষ ভুলে যান, চেনা পরিচিত সকলের নিরাপত্তার দিকটা খেয়াল রাখুন।

 

প্রতিহিংসার কথা বা প্রতিশোধের কথা মাথায়ও আনবেন না। অন্তত এই সময়েই না। এটা সঙ্কটের সময়। নিজের চেনাজানাদের মধ্যে এবং সেই সকলের মধ্যে শান্তি ও সমঝোতার পক্ষে একটা জনমত তৈরি করতে চেষ্টা করুন। মনে রাখবেন প্রতিটি মানুষের মতামতের গুরুত্ব আছে। সকলের মতামতের গুরুত্ব আছে। দশজন লোক যদি হত্যা খুন গুম এইসবের বিপক্ষে নিজেদের মধ্যে কথা বলে তাইলে সেটা অনেক দুর দুর ছড়িয়ে যায় এবং সেই কথাটি সকলের কানে পৌঁছে যায়। কাউকেই গুরুত্বহীন মনে করবেন না।

 

একটা ঐক্যমত্য তৈরি করতে চেষ্টা করুন। কঠিন কাজ, কিন্তু অসম্ভব না। ঐক্যমত্যের ইস্যুটা যদি খুব সংক্ষিপ্ত এবং সীমিত রাখেন তাইলে ঐক্যমত্যে পৌঁছানো সহজ। ঐক্যমত্যের ইস্যুটা কি? সকলকে বলুন যে আমরা আর হত্যা চাই না। কার দশ বেশী কার দোষ কম সেই তর্কে যাবেন না। সেই তর্কটা পরে করবেন। আপাতত সকলকে জানান যে আমরা আর হত্যা চাই না।

 

আর একটি জীবনেরও যেন এইরকম অপচয় না হয়। যথেষ্ট হয়েছে। আমার ভাই গেছে, আপনার ভাই গেছে, আরেকজনের মামা গেছে কারো আজু গেছে। যথেষ্ট হয়েছে। হত্যা করা ছাড়াও আদর্শ ও নীতির জন্যে লড়ার অনেক পথ আছে। গণতান্ত্রিক পথে লড়ুন। নিজেদেরকে হত্যা করে জাতির কোন লাভ হবে না। নিজেরাই পরস্পরকে কেন হত্যা করছেন। কে লাভবান হচ্ছে?

 

তরুণ বন্ধুরা, আপনারা নিজেরা আলোচনাটা চালু করুন। বুড়োরা পারবে না। বুড়োদের মন ছোট থাকে। বুড়োদের চক্ষু আচ্ছন্ন থাকে। বুড়োরা নতুন পথে হাঁটতে চায় না। আপনারা নিজেরা আলোচনাটা শুরু করুন। আমরা আর নিজেদের হাতে নিজেদের মানুষের মৃত্যু চাই না। হত্যা চাই না। রাজনৈতিক লড়াই রাজনৈতিকভাবে লড়ুন। হত্যা নয়। আপনাদেরকেই ঐক্যটা গড়তে হবে। আপনাদেরকেই রাস্তাটা বের করতে হবে। তরুণ বন্ধুরা, আপনারাই বুড়োদেরকে চেপে ধরতে পারেন।

 

আর বাইরে থেকে কেউ আপনাদের মধ্যে ঐক্যমত্য তৈরি করে দিতে পারবে না। আপনারা নিজেরাই সেটা করবেন। আমরা বাইরে থেকে আপনাদেরকে নিয়ে হাসতে পারি, কাঁদতে পারি, পরামর্শ দিতে পারি- কিন্তু কাজটা আপনাদেরকেই করতে হবে। বাইরের পরামর্শ বাইরের উপদেশ গ্রহণ করবেন না কেন, করবেন। শুনবেন কিন্তু সাবধান থাকবেন। বাইরের লোকের কথা বিচার বিবেচনা করে গ্রহণ বা বর্জন করবেন।

 

মনে রাখবেন, আমি যত বুদ্ধিমানই হই না কেন, যত সংবেদনশীলই হই না কেন, আপনার ব্যাথা আপনার বাস্তবতা আপনার মাঠের হাওয়ার স্বরূপ আমি পুরোটা উপলব্ধি করতে কখনোই পারবো না। আপনাকেই বুঝেশুনে ঠিক সিদ্ধান্তটা নিতে হবে।

 

ভয় পাচ্ছি। অস্থির লাগছে। আর অস্থির লাগছে বলেই বলি- এইটা মাথা ঠাণ্ডা রেখে পদক্ষেপ নেওয়ার সময়, এইটা ঐক্যবদ্ধ হওয়ার সময়। কেবল প্রবল জনমত এবং তরুণদের ঐক্যমত্যই এই বিপন্ন সময় থেকে জাতকে বের করে নিয়ে আসতে পারে। ক্রোধ নয়, প্রতিরোধ নয়, প্রতিহিংসা বা প্রতিশোধও নয়- ঐক্যমত্য চাই। এনাফ ইজ এনাফ। আর হত্যা নয়। আর একটি হত্যাও নয়।


Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান