প্রশ্ন করতে আসিনি; প্রশংসা করতে এসেছি

Wed, May 2, 2018 8:50 AM

প্রশ্ন করতে আসিনি; প্রশংসা করতে এসেছি

মাসকাওয়াথ আহসান:সুখি সাংবাদিক সমিতির সভাপতি তার গৃহে সমিতির সভ্যদের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। প্রশংসা সম্মেলনে সুখি সাংবাদিকদের টকিং পয়েন্টগুলো একটু ঠিক ঠাক করে দিতে।

সমিতির এক সভ্য মন্তব্য করেন, প্রশংসা ও প্রশ্নের একটি সোনালী গড় প্রয়োজন। এক মিনিট প্রশংসা আর এক মিনিট প্রশ্ন হলে শুনতে ভালো শোনাবে।

সভাপতি বলেন, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে আমাদের বডি ল্যাঙ্গুয়েজ। সবসময় লক্ষ্য করি সমিতির সভ্যরা অতিরিক্ত সুখ প্রদর্শন করছেন মুখাবয়বে। বিশেষ করে একটু স্বাস্থ্যবান সভ্যরা। আরে ভাই একটু ডায়েটিং করলেও তো পারেন। মফস্বল সাংবাদিকরা দেখলে কী ভাববে! বেতন না দিয়ে নিয়মিত নাঁকি কান্না যে কাঁদেন; সেই কান্নার সঙ্গে শরীর মেলেনা। চেহারাটা হতে হবে শোষিতের; শোষকের নয়।

এক নারী সাংবাদিক খিল খিল করে হেসেন ওঠেন।

 

--বিশ্বাস করুন ভাই; আমি ডায়েটিং-এর ওপরেই থাকি; কিন্তু ওজন কিছুতেই কমে না!

 

সাধারণ সম্পাদক বলেন, এবার টপিকে আসা যাক। কে কোন দিকটা কাভার করবেন। একে একে বলুন।

 

সংবাদপত্র ভাইয়া বলেন, মাননীয়, সারাবিশ্বের নেতাদের মুখে আপনার এতো প্রশংসা শুনি যে; নিজেকে বিরল সৌভাগ্যবান মনে হয় আপনার সান্নিধ্যে আসতে পেরে। আপনি যেভাবে দেশকে বিশ্বমানচিত্রে উজ্জ্বল করেছেন তা আপনাকে নিয়ে গেছে অনন্য উচ্চতায়।

 

সভাপতি বলেন, উঁহু কিন্তু প্রশ্নটা কোথায়!

 

--আসতেছি তো ধীরে ধীরে; আমাকে শেষ করতে দিন।

 

--ঠিক আছে বলুন।

 

--মাননীয় আপনি নারী উন্নয়নে যে ভূমিকা রেখেছেন; তার স্বীকৃতি গোটা বিশ্ব দিয়েছে।

 

--আহা নারী প্রসঙ্গ তুলবেন কোন নারী সভ্য। আপনি অন্যকিছু তুলুন।

 

--ঠিক আছে; আমি এখুনি প্রশংসার ড্রাফট কারেকশান করছি।

 

--প্রশংসা তো করলেনই। এখন প্রশ্নটা করুন।

 

সাধারণ সম্পাদক টেলিভিশন ভাইয়াকে ফ্লোর দেন।

 

টেলিভিশন ভাইয়া বলেন, মাননীয় আপনি বিশ্বের প্রভাবশালী মানুষদের মাঝে একজন বলে স্বীকৃত হয়েছেন; সেই প্রভাব কাজে লাগিয়ে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান করছেন না কেনো।

 

সাধারণ সম্পাদক থামিয়ে দিয়ে বলেন, এখানে প্রশংসা ছোট হয়ে গেছে; তার তুলনায় প্রশ্ন কঠিন। প্রশংসা বাড়িয়ে দিয়ে বলবেন, রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে মানবতার পালক যুক্ত হয়েছে আপনার গর্বের শিরোস্ত্রাণে। আমরা আশাবাদি রোহিঙ্গা সমস্যা নিরসনে আপনার হস্তক্ষেপ কার্যকর ভূমিকা রাখবে!

 

সভাপতি বলেন, প্রশ্নটা ঠিক প্রশ্নের মতো হইলো না। যাউক গিয়া নেক্সট।

 

টকশো ভাইয়া বলেন, মাননীয়, বিদ্যুৎ উতপাদনে আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে আপনার সরকার। তবুও বিচ্ছিন্নভাবে কিছু লোডশেডিং-এর খবর আসে। হয়তো দেশের শত্রুদের বাধার মুখে সুন্দরবনের কাছে বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনে বিলম্ব হওয়াই এর কারণ।

 

সাধারণ সম্পাদক বলেন, প্রশ্নের মতো লাগতেছে না; তবুও চলবে।

 

নেক্সট।

 

কলামিস্ট আপু বলেন, মাননীয় নারী উন্নয়নের প্রতীক আপনি। বিশ্ব তা বুঝেছে। কিন্তু স্বাধীনতা বিরোধীরা বোঝেনি। পুরস্কার প্রদান কেন্দ্রের বাইরে বিক্ষোভ করে আপনার অসম্মান করেছে। স্বাধীনতা বিরোধীদের কঠোরভাবে দমনের জন্য আপনি কী কোন পদক্ষেপ নেবেন? মনে রাখবেন, আপনি হারলে আমরা হেরে যাই।

 

সভাপতি হাততালি দিয়ে বলেন, ব্রিলিয়ান্ট কুয়েশ্চেন। নেক্সট।

 

সংবাদপত্র সম্পাদক ভাইয়া বলেন, মাননীয়, জাতিসংঘের মহাসচিব থেকে ক্যানাডার প্রধানমন্ত্রী সবাই আপনার গুণমুগ্ধ। আমি আপনার কতোটা গুণমুগ্ধ তা প্রকাশের ভাষা আমার জানা নেই। কিন্তু শত্রুশিবিরও থেমে নেই। লন্ডনের বুকে কাসিমবাজার কুটির গড়েছে দেশ ও জাতির শত্রু। ভাবতে লজ্জা লাগে, বৃটেন নিজেকে সভ্য বলে দাবী করে। অথচ সন্ত্রাসীদের আশ্রয় দেয়। মাননীয়, শীর্ষ সন্ত্রাসীকে দেশে ফিরিয়ে এনে শাস্তি দেবার প্রক্রিয়াটা কতোদূর এগুলো!

 

সাধারণ সম্পাদক মুচকি হেসে বলে, এঙ্গলিংডা দারুণ করছেন ভাই।

 

একজন নারী সাংবাদিক বলেন, ধর্ষণের সমস্যার কথাটা তুলতে চাই।

 

সভাপতি বলেন, গত কয়েকদিনে তো কিছু ঘটে নাই। কারেন্ট এফেয়ার্স ছেড়ে ফিচার আইটেমে যাওয়ার কী দরকার!

 

একজন সাংবাদিক বলেন, আমিও ক্রসফায়ার প্রসঙ্গটা তুলতে চাচ্ছিলাম। আইনের বাইরে গিয়ে কুইক সলিউশান দিতে গিয়ে আমরা সমাজের ক্ষতি করছি কীনা।

 

নারী সাংবাদিক বলেন, রাখেন আপনার ওয়েস্টার্ন স্ট্যান্ডার্ড মানবাধিকার। ইস্ট এন্ড ওয়েস্ট; ক্রসফায়ার ইজ দ্য বেস্ট।

 

এক কলামিস্ট ভাই জিজ্ঞেস করেন, প্রেস ফ্রিডম সূচকে দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন অবস্থানের কথাটা তুলবো।

 

সভাপতি বলেন, কোন দরকার নাই। আমরা সুখি সাংবাদিক সমিতি যে অলরেডি রিপোটার্স উইদাউট বর্ডার্স সমীপে রিপোর্ট প্রত্যাখ্যান করে প্রতিবাদ লিপি দিয়েছি; সে বিষয়টি আমি ব্রিফ করবো। আপনের এতো পণ্ডিতি দরকার নাই।

 

সাধারণ সম্পাদক বলেন, প্রশংসা ও প্রশ্ন গুছাইয়া আসছে। এখন সময় বেশি নাই; সবাই একটু ফ্রেশ হয়ে পৌঁছে যাবেন সময়মতো।

 

এক নারী সাংবাদিক দৌড়াতে দৌড়াতে বেরিয়ে যাবার সময় বলেন, আমার 'পারসোনা'র এপয়েনমেন্টের দেরি হয়ে গেলো। ভাইজানেরা গ্যালাম আমি।

 

এক সাংবাদিক জিজ্ঞেস করেন আর কোন প্রশ্ন কী জিজ্ঞেস করবো।

 

সভাপতি বলেন, লন্ডন ইস্যুতেই মহাভারত রচিত হবে। এরপর যদি সময় থাকে; পদ্মা সেতুর প্রশংসা দিয়ে শুরু করে কয়টি স্প্যান লাগানো হলো জিজ্ঞেস করতে পারেন। বিশ বছরের উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়া প্রশংসা শেষে স্যাটেলাইট উতক্ষেপনের গর্ব নিয়া প্রশ্ন করবেন।

 

সুখি সাংবাদিক সমিতির লোকেরা সুখি সুখি মুখে সবাই যাত্রা শুরু করে। সবাই সমস্বরে গায়,

 

আজি শুভদিনে সুখেরও ভবনে অমিত সদনে চলো যাই।

চলো চলো চলো যাই


Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান