বীথির কাছে চিঠি-৪৮

Sat, Apr 28, 2018 2:55 PM

বীথির কাছে চিঠি-৪৮

লুনা শিরীন: বীথি, দুয়ারে প্রস্তুত গাড়ি । বেলা দ্বিপ্রহর –শরতের  রৌদ্র ক্রমেই হচ্ছে  প্রখর। ফিরে যেতে হবে সেই  কর্মস্থলে –দুরদেশে।  ছোটবেলায় মায়ের  মুখে  শোনা কবিতা ,মনে আছে তোর?পরে কলেজ /ইউনিভারসিটিতে আমিও তোকে কতবার পড়ে শুনিয়েছি রবি ঠাকুরের দুইবিঘা জমি

 আগামীকাল থেকে আবার অফিস শুরু। নিজের ভুবন ফেলে আবারো আমি চলে যাবো তিনদিনের জন্য । বেশ কয়েকদিন পরে  তোকে লিখছি বীথি, মাঝে ঈদ গেলো – গত সপ্তাহে – আমি  টরন্টোর দশ বছরের জীবনে এই প্রথম ঈদের নামাজ পড়তে গিয়েছিলাম । ঈদের আগের রাতে  ছিলাম  বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাচমেট  বিলকিস লুনার বাসায় – ওর তিন ছেলে মেয়ে , ভরা সংসার –সারাক্ষণ লুনা ওর স্বামী /ছেলেমেয়েদের সাথে জড়াজড়ি করে  দিনযাপন করে।  আমার মন ভরে যায় ওর বাসায় গেলে – কেবলই মনে হয় বিলকিসের  জীবনে আর কি চাইবার আছে ? ও নানান সমস্যার কথা বলে- তার ভিতরে সবটাই জাগতিক সমস্যা কিন্তু আমার মাথায় সেসব  ঢোকে না – আমি বার বার ওকে বলি – রাখ তোর চাকরি টাকা পয়সা – কি হবে ও দিয়ে –এই জীবন যদি তোকে একা পাড় করতে হয় ? যদি জীবনে শেয়ার করে বাচতে না পারিস, কি হবে সাফল্য দিয়ে ?

আমি জানি বীথি – আমাদের সবার জীবনেই তাই ।  যার  যা আছে,আমরা সেদিকে মন দেই না – যা নেই আমরা শুধু সেদিকেই প্রানপাত করি। জীবনের অঘোম নিয়ম-ই তাই । আমার পরিচিত ৯৯% মানুষ আমাকে বলে – লুনা– আপনি কত ভালো আছেন আপনি জানেন না বলেই হাহাকার করেন- জানলে করতেন না আমি তাদেরকে নদীর এপাড় – ওপাড়ের গল্প  স্মরণ করিয়ে দেই । এই প্রথম ঈদ আমার বেশ কাটলো – নাইয়া নেই – কিন্তু তিতিনা, ফিঊনা, লাবিব – বিলকিসের এই তিন ছেলেমেয়ে সারাদিন ধরে আমাকে খালামনি খালামনি ডেকে মাতিয়ে রাখলো ।

তোকে অন্যরকম একটা দিনের কথা বলার জন্য এই লেখা  লিখছিআজকের দিনের মতই গতকালের দিনটা ছিলো উজ্জল আলোর দিন –হাল্কা বাতাস – আর  ঝরঝরে রোদ । ঘুম থেকে উঠেই মনে হলো আমি দিনটা বাইরে কাটাবো,ডাঊন টাঊন টরোন্টো আমার বেশ চেনা জায়গা। ২০১২ সালে মোট দশ মাস অফিস করেছি ঐ এলাকায় – অন্টারিও লেক-কে ঘিরে আছে হারবার ফ্রন্ট এলাকা,বোট,পার্ক রাস্তায় রাস্তায় খাবারের দোকান দিয়ে ছুটির দিনগুলো জমজমাট হয়ে থাকে কত কত দেশের মানুষ যে আসে এই শহর দেখতে – কারো কারো কাধে গোটা সংসার ঝোলে – বড় বড় ব্যাগপ্যাক বহন করে এরা। হাতে থাকে  শহরের ম্যাপ আর থাকে খুচরো পয়সা ।

 সারা  পৃথিবীর নানান জাতের মানুষ (ছেলে /মেয়ে) টরোন্টো  শহর দেখার জন্য সারা বছর ধরে পয়সা জমায় ,প্লান করে,তারপর ঝোলা কাধে বেরিয়ে পড়ে – আবার অনেকে আছে –সারাদিনের জন্য বের হয় সেই তুলনায় আমরা বাঙ্গালীরা ভীষনভাবে  ঘরমুখো – আমাদের মাথার ভিতরে সংসার / বাচ্চা / স্বামী / সন্তান ছাড়া কিছুই নেই – কিচ্ছু না । এখনো আমরা বাঙ্গালী মেয়েরা/ছেলেরা –১০০ ভাগ বিশ্বাস করি –আমার যদি  সংসার না হয় গোটা জীবন  বুঝি বয়ে গেলো – এই  ধারনা কিন্তু আমাদের মাথায়,আমাদের বেড়ে উঠায় – এখানে সমাজের দায় কিন্তু সিকিভাগ ও নেই  জীবন খুব বড় আর বিশাল – কতভাবে যে মানুষ আনন্দ পেতে পারে সেটা না জানলে আনন্দ পাবো কি করে বল ? উপরের ভাবনাকে সঙ্গী করেই গতকাল বেরিয়েছিলাম – ওই যে কথায় বলে – পথ-ই পথ  বলে দেয় – সাবওয়েতে উঠতেই দেখা হলো চাইনিজ বন্ধু চ্যাং এর সাথে – সাথে ওর বান্ধবী লিয়েন – চ্যাং এর সাথে দোভাষীর কোর্স করেছিলাম ২০১২ তে – সারাদিন কাটলো ওদের সাথে – ওরা জুটি, আমি একা –কিন্তু তাতে কি ? একসাথে উঠলাম কাজলাম  নামে একটা  বিশাল পালতোলা  নৌকায় –  প্রায় ৭০/৭৫ জন যাত্রী --  দিগন্ত জোড়া নীল আকাশকে সাথে নিয়ে লেকের পানিতে ভেসে যাচ্ছে পাল তোলা নৌকা – আমি চ্যাংদের পাশ  কাটিয়ে দূরে  কোনার দিকে সরে আসি –যেন আমার চোখের  নোনা জল কেউ দেখতে না পারে।  দুঃখ কি ফেরি করে দেখাবার জিনিস ? আমি জীবনে যত বেশী  পেয়েছি  ততবেশী কেদেছি,আমি জানি সুখ খুব অল্প সময়ের জন্য আসে – জীবন জুড়ে থাকে সেই হাহাকার যার কোন উত্তর নেই

 হারবার   ফ্রন্টের কোল ঘেসে উচু উচু দামী দামী দালান – হাজার হাজার  ডলার দিয়ে এইসব  বাড়িতে মানুষ থাকে –তারা   ঘণ্টায়  ঘণ্টায় ডলার পে করে সঙ্গী খোঁজে বা দিনরাত পড়ে থাকে নেট এ বা বারে এই তো আধুনিক সভ্যতা বীথি – কেউ কাঊকে বিস্বাশ করে না – কেউ কাউকে ভয়ে কাছে  ডাকে না – তারপর একদিন নিজের  শুন্য ঘরে একা মরে পরে থাকে আর আমি ভাবি আমার গরীব  দুঃখী দেশের কথা,অনেক মানুষ সেখানে – অভাবের চাপে এমন কোন অন্যায়  বা প্রতারনা নেই যা বাংলাদেশের মানুষ করে না – কিন্তু তাতেও কি দুঃখ কাটে বীথি ? আমরা বাংলাদেশের এখোনো বেশীরভাগ মানুষ বিদেশে আসি দুটো বাড়তি ডলারের স্বপ্ন বুকে নিয়ে –কিন্তু সেই স্বপ্ন পুরন করতে গিয়ে গোটা জীবন ক্ষয়ে যায় –মাথার ভিতরে থাকে ফেলে আসা দেশের দুঃখ কষ্টের গান –সারাক্ষণ দেশ /বিদেশের তুলনা বহন করি –তাই  সত্যিকার সুখী হয়ে বাঁচা হয় না আমাদের । আবার এই জীবনেই সেই আনন্দ- কে সঙ্গী করতে পারি না বলে নিজেকে সান্তনা দেই পরকালের স্বপ্ন দিয়ে – কি অবাক –এই চোখের দেখা দুনিয়াতেই  আমি হিসেব মেলাতে পারলাম না –আর যে জীবন দেখিনি সেই জীবনে সুখী হবো কি করে ?  মানুষের  জীবন-ই এক গোলক ধাধা – কি করলে সুখ আসবে – সেই হিসেব করতে করতেই একদিন বেলাশেষের ঘন্টা বাজেচ্যাং –কে রাতের সুভেচ্ছা জানিয়ে বাড়ি ফিরেছি রাত দশটায় ।

৪/ ০৮/২০১৪

আরো পড়ুন: বীথির কাছে চিঠি-৪৭


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান