‘অনিচ্ছাকৃত কুমার’: পূর্ব ও পশ্চিমের তফাৎ

Wed, Apr 25, 2018 11:50 PM

‘অনিচ্ছাকৃত কুমার’: পূর্ব ও পশ্চিমের তফাৎ

স্নেহাশীষ রয়: টরোন্টোর যে যুবকের উন্মাদনায় এতগুলো প্রাণ ঝরে গেলো, সে ছিল 'ইনসিল'।

Involuntary-র ইন আর Celibate-এর সিল। দুইয়ে মিলে ইনসিল। বাংলা করলে দাঁড়ায়, অনিচ্ছাকৃত কুমার। মেয়ে বান্ধবী খুঁজে না পেয়ে , কৌমার্য ধরে রেখেছে যে। পঁচিশ বছরের আলেকের নি:সঙ্গতা, উন্মদনায় রূপ নেয়।

আমরা যখন তরুণ ছিলাম, আমাদের জেনারেশানের অধিকাংশই , সামাজিক ষ্টিগমার জন্য, এই ক্যাটাগরীতেই ছিল।

আমরা জগন্নাথ হলে যারা ছিলাম, তাদের অবস্থা ছিলো আরো সঙ্গীন। এক দেয়াল পরেই ছাত্রী হল। যেন "ফকির লালন মরলো জল পিপাসায়, কাছ থাকতে নদী মেঘনা।" ইটের দেয়ালের চেয়েও দূর্ভেদ্য ছিলো, সমাজিক বিধি নিষেধের দেয়াল।

তাই কামদেবের বাণ খাওয়া , আমাদের ইনসিলরা সন্ধ‌্যা হলেই, দৌড়াতো ছাত্রী হলের আশে পাশে, কোন ক্রুড উদ্দেশ্য নিয়ে নয়, বরং স্বাভাবিক আকর্ষণের প্রতিক্রিয়ায়।

আমরা আড্ডা মারতাম, রোকেয়া হলের পাশে। ইভটিজিং, মনে হয় না, আমরা সেটা করেছি।

তাহলে, আমরা কি করতাম?

বসে থাকতাম। একই সিগারেট ভাগ করে খেতাম। সহপাঠিনী বা পরিচিতারা এলে, তাদের সাথে কথা বলতাম। অনেকের প্রেমিকা ছিল, তারাও আসতো, তারাও আড্ডায় যোগ দিত। কেউ হয়তো গান গাওয়ার চেষ্টা করতো। কোন সুন্দরী ধারে কাছে এলে, ভদ্রস্থ ভাবে পর্যবেক্ষণ করতাম।

নিচু গলায় নিজেদের মধ্যে সাংকেতিক ভাষায় কথা বলতাম।।

 

সাংকেতিক ভাষাটি কি রকম?

অনেক রকম ছিল। একটা উদাহরণ দিই।

এক বড় ভাই কোনদিন একটু দেরী করে আসলে, এসেই জিজ্ঞেস করতো, আসছিল নাকি?

-কে?

- আরে, সবজী। সবজী আসছিল নাকি?

রোকেয়া হল থেকে এক তরুণী বের হতো। দীঘল দেহকাণ্ড। কেউ তার নাম জানতাম না। আমাদের উক্ত ভ্রাতা, সেই মেয়েটির একটা নাম দিয়েছিলেন, সবজী। আমরা জিজ্ঞেস করেছিলাম, -- ভাই সবজী কেন?

ভাইজানের উত্তর, গায়ের রং দেখছস। নির্ঘাত নিয়মিত সবজী খায়।

সবজীকে দেখে , আড়ালে সবজী নামে ডেকে, আমাদের অনিচ্ছাকৃত কুমারেরা অনাবিল আনন্দ পেত।

বিভিন্ন গল্প হতো। অ্যাডামদের আড্ডায় কেন্দ্রীয় চরিত্রটি অবশ্যম্ভাবী ভাবে দখল করতো, ইভেরা।

এমনকি কল্পিত আষাঢ়ে গল্পেও স্থান করে নিতো ইভেরা।

এক বড় ভাই একদিন আসেন নি। পরদিন, জিজ্ঞেস করা হলো, কি ব্যাপার , কাইল আসেন নাই ক্যান।

বড় ভাই গল্প বানাতেন পারতেন। একটি গল্প ফাঁদলেন।

উনাকে খানিকটা জায়গা নৌকা করে আসতে হতো। তিনি বললেন, নৌকা ডুবে গেছিল।

-কেমনে?

-নৌকায় দশটা ছেলে। একজন সহযাত্রিনী।

-নৌকা ডুবলো কেমনে?

-মেয়েটি বসেছিল নৌকার এক প্রান্তে। শাড়ীর এক প্রান্ত ঝুলে ছিল। হঠাৎ শাড়ীর আঁচলের প্রান্ত ভাগ পানি স্পর্শ করে।

- এতেই নৌকা ডুবে গেল?

- বুঝলি না। দশটা যুবক ছেলে। ওরা কি বসে থাকে? সবাই একসাথে ঝাঁপিয়ে পড়ে, কার আগে কে আগে আঁচলটি তুলে দিবে। ছোট নৌকা বুঝস তো?

আমার এক বন্ধু একটু দুষ্ট ছিল।

নতুন কোন মেয়ের সাথে পরিচয় হলেই , বলতো তাঁর নাম , স্বামী।

মেয়েরা প্রথমে ভাবতো, আমার বন্ধুটি চাঁপাই । জিজ্ঞেস করতো, মানে, সামি?

বন্ধুটি তখন বানান করে বলতো, দন্তস্য ব-ফলা আকার ম দীর্ঘ-ইকার।

-আমরা তবে কি নামে ডাকবো?

বন্ধুটি নির্বিকার ভাবে বলতো, কেন, এই স্বামী।

বন্ধুটিকে অবশ্য কেউ এই নামে ডাকে নি।

(কিছু ক্ষণ আগে, আমার বউকে এই গল্পটা করেছিলাম। সে বললো, তোমরা যে এই দুষ্টামিগুলা করতা, কোন মেয়ে যদি এরকম ভাবে বলতো, তার নাম বউ। তাহলে তোমাদের কেমন লাগতো?

 

আমি হাসবো না , কাঁদবো, বুঝে উঠতে পারছিলাম না।

 

আমি বললাম, কোন মেয়ে যদি বলতো, তার নাম বউ। তবে হলের গেট দিয়ে মেয়েটি বের হওয়ার সাথে সাথেই, সবক'টি ছাত্র হল এক সাথে সমস্বরে চিৎকার করে উঠতো, হাই বউ, কেমন আছো?')

 

অনিচ্ছাকৃত কৌমার্যের প্রভাব ছেলেদের উপর কেমন ছিল, তা দেখার সুযোগ ছিল, কিন্তু অনিচ্ছাকৃত কুমারীরা কেমন আচরণ করতো আমার জানা নেই।

এরকম অসংখ্য ইভ কেন্দ্রীক গল্প ছিল আমাদের ইনসিলদের জীবনের অনুষঙ্গ। সব যে এমন নিরীহ ছিল তেমন নয়। অশ্লীল গল্পও ছিলো, নারী-অবমাননাকর গল্পও ছিলো। কিন্তু উন্মাদনা ছিলো না। আমাদের কাছে মনে হয়, এটি এক জীবনেরই অংশ। একদিন আমরা হয়তো মাঠের পারের দূরের দেশটির দেখা পাবো। এর মাঝে আশার ঝিলিকও ছিল। আমি জানি না , পাশ্চাত্যের সমাজ যৌনতাকে এক ধরণের অসহনীয় বোঝা বানিয়ে ফেলছে কিনা।


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান