জাতি হিসেবে আমরা এতো ঐতিহ্য বিমুখ কেন? ​​​​​​​

Tue, Apr 24, 2018 12:50 AM

জাতি হিসেবে আমরা এতো ঐতিহ্য বিমুখ কেন? ​​​​​​​

নাসরিন শাপলা: দেশে বিদেশে বাঙালি জাতি সবেমাত্রই নতুন বাংলা বছর ১৪২৫কে স্বাগত জানালো। ছোটবেলা থেকে দেখে এসেছি, পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠান মানেই সাদা শাড়ি লাল পাড়। বছরের পর বছর আমাদের ছোটদের কপালে জুটতো সেই একই সূতির লাল পেড়ে সাদা শাড়ি। কখনো মনে হয়নি, গত বছর তো এই শাড়িটা পরে ফেলেছি, এই বছর আর পরা যাবেনা। তবে আম্মার আলমারীর ক্রীম রঙের লাল পেড়ে গরদটার দিকে লোভাতুর দৃষ্টি থাকতো সবসময়ই। আর আম্মা যথারীতি যক্ষের ধনের মতো আগলাতেন দুর্লভ সেই শাড়ি, এখন নাকি হাজার টাকা দিলেও এই শাড়ি পাওয়া যাবে না (আম্মার তৎকালীন ডায়ালোগ)। আমি বড় আশায় আশায় থাকতাম, শাড়ি ভালো করে পরা শিখলে একদিন আম্মাও নিশ্চয়ই ......।

 

গত কয়েক বছর থেকেই দেখছি পহেলা বৈশাখে লাল-সাদা শাড়ির একতরফা রাজত্ব আর নেই। কোনফাঁকে নীরবে নিভৃতে অন্যান্য রঙেরা তাদের জায়গা করে নিচ্ছে- সবুজ, হলুদ, নীল। তাতে কোন অন্যায় নেই নিশ্চয়ই। তবে আমার মনটা কেন যেন পহেলা বৈশাখে শুধু লাল-সাদাকেই খোঁজে।

 

এই যেমন চাঁদ রাতে মনটা আঁকুপাঁকু করে, 'রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশীর দিন" গানটি শোনার জন্য। ছোটবেলায় এই গানটি না শুনলে কেমন যেন ঈদ ঈদ মনেই হতো না। এমনকি এদেশে আসার পরও ঈদের ঘোষনা শুনলেই ইন্টারনেটে খুঁজে খুঁজে এই গানটা শুনতাম। এখন বোধহয় দেশে এই গান আর কেউ শোনেনা। টিভি চ্যানেলে চললেও অনেক আকুতি নিয়ে তার জন্য কেউ অপেক্ষা করেনা। সময় কোথায়? চান রাতের পার্টি আছে না?

 

এখন তো আবার কেউ 'ঈদ' উদযাপন করেনা, সবাইকে 'ইদ' করতে হয়। আমি জানিনা, কতোটি শহুরে পরিবার এখন ঈদে ঘরে সেমাই রান্না করেন। আর করলেও সেটা পরিবারের বাচ্চারা কতোটা আগ্রহ করে খায়? অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা বরাদ্দ থাকে বাসার গৃহকর্মীদের জন্য। অথচ একসময় ঈদ মানেই বাজারের তালিকায় নানা পদের সেমাই থাকতো সবার প্রথমে। আতর, কেওড়া, গোলাপজল, দারুচিনি, এলাচী, জায়ফল আর জয়ত্রীর গন্ধ মিলেমিশে ঈদের সকালের অন্যরকম একটা সুবাশ থাকতো। সকালে চোখ খুলে সেই গন্ধটাই প্রথম মনে করিয়ে দিতো আজ ঈদ।

 

অথচ অদ্ভুত কি জানেন? এখানে আমি ক্রিসমাসের গন্ধ পাই- সিনামন, জিঞ্জার ব্রেড আর ক্যান্ডি কেইনের মিশেলে একটা অদ্ভুত গন্ধ। গত ১৫ বছরে এই গন্ধ বা ক্রিসমাস ট্র্যাডিশন বদলাতে দেখিনি। সেই একই ট্র্যাডিশনাল খাবার, ক্রিসমাস কুকিস, ট্র্যাডিশনাল সাজ আর সেই স্যান্টা ক্লজ। প্রতিবছর মোটামুটি একই ধরনের ক্রিসমাস সোয়েটার আর বাচ্চাদের ভেল্ভেট কাপড়ের জামায় দোকান ভরে যায়। বড়রা তাদের ক্লোজেট থেকে বের করে নেয় ক্রিস্টমাস ডিনারে পড়ার উপযোগী কিছু একটা। কোন তাড়া নেই নতুন জামা কেনার, তাড়া নেই দৌড়ে দৌড়ে হাল ফ্যাশনের কাপড় কেনার। নিয়ম করে একইভাবে প্রতিবছর তোলা হয় স্যান্টা ক্লজের সাথে একই ছবি। এই সবই ট্র্যাডিশন। খুব একটা ব্যাত্যয় দেখিনা এই চিত্রের।

 

ঐতিহ্য হারানোর সবচেয়ে বড় খাঁড়াটি বোধহয় পরেছে আমাদের দেশের বিয়ের অনুষ্ঠানের উপর। আমাদের দেশের এখনকার বিয়ের অনুষ্ঠানগুলো শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত হিসেব করলে বোধহয় ৫% ও আমাদের ঐতিহ্যকে ধারন করেনা। সেখানে বলিউড আর হলিউড কালচারের মহাদৌরাত্য। লাল বেনারসীর জায়গায় স্থান নিয়েছে ভারতীয় বা পাকিস্থানী লেহেঙ্গা। আমাদের গায়ে হলুদ কবে যেন হয়ে গেলো মেহেন্দী আর হলদি। আর সেখানে হিন্দি গানের ধামাকা তো আছেই। আজকাল শুনি ব্রাইডাল শাওয়ার আর ব্যচেলরস নাইটও মাষ্ট হ্যাভের মাঝে পরে গেছে। সলাজ মুখে কনের বন্ধু আর ভাবী পরিবেষ্টিত হয়ে বর এখন আয়নায় কনের মুখ দেখে, 'চাঁদ দেখলাম' বলে কি না জানিনা। তবে যেভাবে অনুষ্ঠানের শুরুতে ঘোষকের ঘোষনার মধ্য দিয়ে হাত ধরে নাচতে নাচতে বর- বউয়ের অনুষ্ঠানে প্রবেশ ঘটে তাতে আর আয়নায় মুখ দেখার মজাটা থাকার কথা না। আজকাল মধ্যবিত্ত বাবারা মেয়েকে বিদায় দেবার কষ্টের চেয়ে বোধহয় আলিশান খরচের আতঙ্কেই বেশী মুখ শুকিয়ে ঘুরে বেড়ান।

 

অথচ এদেশে বিয়ে এখনো সাদা গাউনেই হয়। ক্ষেত্র বিশেষে দেখেছি,মা বা নানী/দাদীর বিয়ের গাউন কে অলটার করে মেয়ে বা নাতনী বিয়েতে পরছে। পুরো ব্যাপারটার পিছনেই একটা আবেগ আর ভালোবাসা কাজ করে। বিয়ের জাঁকজমক ঠিক ততোটুকুই, যতোটুকু বর কনে নিজে খরচ করতে পারে।

 

আবার নামের ব্যাপারটাই ধরুন। পাশ্চাত্যে ঘুরে ফিরে সেই হাতে গোনা কিছু নামই রাখা হয় বাচ্চাদের। লাস্ট নেম, অতি অবশ্যই বংশের টাইটেল। ফার্ষ্ট নেম হয়তো পূর্বপুরুষের কারো নামকে স্মরণ করে রাখা হয়। আর সেটা না হলেও ঘুরে ফিরে বাঁধাধরা কিছু নাম। অথচ আমরা বাচ্চার নাম রাখতে গলদঘর্ম। দাদা/দাদী নানা/নানীর সেকেলে নাম বাচ্চার রাখবো? অসম্ভব ! নামটা কি বাঙালী রীতি মেনে হবে না ধর্মীয় নীতি মেনে হবে, সেটাও আরেক যুদ্ধ? তবে নাম অতি অবশ্যই এমন হতে হবে যেন সেই নাম হয় একেবারে আনকোরা, সাত জন্মেও কেউ শোনেনি!

 

আবার সাহিত্য বা সঙ্গীতের কথাই যদি ধরি, সেটাতেও ফর্ম পরিবর্তন করার প্রচেষ্টা। এরা শেক্সপীয়ারকে তাঁর মতোই থাকতে দিয়েছে, বরং তাঁর সাহিত্যকে বোঝার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করে। মোসার্ট আর বেটোফেন-এর সৃষ্টিকে যথেষ্ট আধুনিক না বলে নতুন করে আধুনিক করতে বসে নি। পাশ্চাত্য বোঝে, শেক্সপীয়ার, মোসার্ট বা বেটোফেন সবার জন্য নয়। এগুলো উপভোগের জন্যও নিজেকে তৈরী করতে হয়।

 

অথচ বিশ্বভারতীর ১৫০ বছরের নিয়ন্ত্রন যখন উঠে গেলো স্রোতের মতো রবীন্দ্রনাথকে আধুনিকীকরন শুরু হলো। সাথে কপাল পুড়লো নজরুল, লালনসহ হাজারো সুর স্রষ্টার। কি না? এরা যথেষ্ট আধুনিক নন, নতুন প্রজন্মের কাছে যথেষ্ট আবেদন রাখতে পারছেন না। জন্ম হলো 'রক উইথ রবীন্দ্রনাথ-নজরুল" এর। আরে বাবারা ! বুঝতে হবে This is not your cup of tea. কবে না জানি শুনি বঙ্কিম আর মধুসুদন বাবুর লেখা সহজীকরন করা হবে আপামর জনসাধারণের সুবিধার্থে!

 

আমি শুধু বোঝার চেষ্টা করি পাশ্চাত্য যখন বছরের পর বছর তাদের ঐতিহ্যকে এতো ভালোবাসা দিয়ে, গর্ব নিয়ে ধরে রাখে, তখন আমাদের কাছে আমাদের নিজস্ব ঐতিহ্য কিভাবে এতো সেকেলে হয়ে যায়? জাতি হিসেবে আমরা এতো ঐতিহ্য বিমুখ কেন? ভেবে দেখুন তো, ঐতিহ্যকে জলাঞ্জলি দিলে, জাতি হিসেবে আমাদের থাকলোটা কি?


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান