কেবল যোগ্য প্রার্থীকেই যেন ভোট দেই

Wed, Apr 18, 2018 10:21 PM

কেবল যোগ্য প্রার্থীকেই যেন ভোট দেই

খুরশীদ শাম্মী : কানাডায় চলছে এখন নির্বাচন মৌসুম আগামী ৭ই জুন, ২০১৮ কানাডার অন্টারিও প্রদেশের সংসদ নির্বাচন এর পরপরই ২২শে অক্টোবর,২০১৮ অন্টারিও প্রদেশের বিভিন্ন শহরের পৌরসভা নির্বাচন এছাড়াও কানাডার অন্যান্য প্রদেশের সংসদ ও পৌরসভা নির্বাচনের জন্য দিন নির্ধারিত হয়েছে ইতিমধ্যেই। সকল প্রাদেশিক ও পৌরসভা নির্বাচন শেষে ২১শে অক্টোবর, ২০১৯ কানাডার ফেডারেল  নির্বাচন। নির্বাচনী প্রচারণা নিয়ে ব্যস্ত প্রতিটি শহরের রাজনীতিবিদরা, নির্বাচনে মনোনীত ও সম্ভাব্য প্রার্থীরা আর সংবাদ মাধ্যমগুলো প্রার্থীদের প্রচারণার চুলচেরা বিশ্লেষণ করে খবর প্রকাশে মহাব্যস্ত

নির্বাচনের দমকা হাওয়া এসে লেগেছে টরন্টোর বাংলা কমিউনিটিতেও এবছর বেশ কয়েকজন বাংলাদেশি কানাডিয়ান প্রার্থীর নাম শোনা যাচ্ছে, যারা বিভিন্ন পদে নির্বাচন করতে আগ্রহী একজন ইতিমধ্যে পার্টি থেকে মনোনয় নিয়ে প্রচারণার কাজে নেমে পড়েছেন একজন বাংলাদেশি কানাডিয়ান হিসেবে খুব ভালো লাগছে বিষয়টি কেনই বা ভালো লাগবে না? সংসদে যখন দেখি বিভিন্ন দেশ থেকে আগত কানাডিয়ান নাগরিকেরা কানাডার কেন্দ্রিয় সংসদ সদস্য হয়ে কানাডার জনগণের প্রতিনিধিত্ব করছেন, তখন ইচ্ছে হয় বাংলাদেশিদেরও সেখানে দেখতে এই ইচ্ছেটা শুধু আমার একার যে নয়, সে সম্পর্কে আমি নিশ্চিত আমি মনে করি, সকল বাংলাদেশিই হয়তো মনে প্রাণে বাংলাদেশি কানাডিয়ানদের কেন্দ্রীয় সংসদে দেখতে চাচ্ছেন

এখন প্রশ্ন হলো, একজন বাংলাদেশি কানাডিয়ান যে কোনো পদে মনোনয়ন পেয়ে নির্বাচন করলেই কি আমাকে, আপনাকে, বাংলাদেশি সকলকে চোখ বন্ধ করে ভোট দেয়া উচিত হবে?

প্রশ্নটা খুব সহজে এক বাক্যে করা গেলেও, উত্তরটা কিন্তু “হ্যাঁ “কিংবা “না” একটি মাত্র শব্দ কিংবা একটি সরল বাক্যে দেয়া সম্ভব নয়। অনেকেই হয়তো এক বাক্যে বলতে পারেন, “আমার ভোট আমি দেবো, যাকে খুশি তাকে দেবো।” আমার ব্যক্তিগত মন্তব্যে এই প্রশ্নের উত্তরটা একটু ভিন্ন এবং ব্যাপক। কারণ যে কোনো প্রার্থীকে ভোট দেয়ার পূর্বে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিবেচনা করা প্রয়োজন বলে আমি মনে করি। আমার বিবেচনাধীন বিষয়গুলো নিম্নে এক এক করে বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা হলো।

প্রথমত; আমরা কিন্তু এখানে ভোট দেবো একজন কানাডিয়ান হিসেবে। সেক্ষেত্রে, আমাদের জন্মভূমির নাম কিংবা ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে গিয়ে আমাদের আর একটি দেশ-কানাডার স্বার্থ দেখাও আমাদের দায়িত্ব। সুতরাং প্রার্থীর ব্যক্তিগত পরিচয়ের পাশাপাশি, সে যে দলের প্রতিনিধিত্ব করছে সে দল সম্পর্কে, প্রাত্যহিক জীবনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে ঐ দলের অঙ্গীকার সম্পর্কে এবং তাদের অদূর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাও বিবেচনা করা আমাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।

দ্বিতীয়ত; কানাডা বহুকাল যাবত বিশ্বের অন্যান্য দেশের কাছে একটি শান্তিপ্রিয় উন্নত দেশ হিসেবে পরিচিত। কানাডার সেই সুনাম সমুন্নত রাখা আমাদের মতো অভিবাসী কানাডিয়ানদেরও কর্তব্য। সুতরাং ভোট দেয়ার পূর্বে প্রার্থীর নেতৃত্ব দেয়ার অভিজ্ঞতা, ব্যক্তিগত আচরণ, শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং কমিউনিটিতে তার সেবামূলক কাজের তালিকা অনুসন্ধান করে তার প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর ঐ সকল বিষয়গুলোর সাথে তুলনা করে সঠিক প্রার্থী বাছাই করা আমাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।     

তৃতীয়ত; কানাডিয়ান আইনের সুষ্ঠ ব্যবহারের ফলেই কিন্তু আমরা সকল ধরণের কানাডিয়ান নাগরিক সুযোগ সুবিধা গ্রহণ করতে সক্ষম হই। সেক্ষেত্রে, কানাডার আইনের সুষ্ঠ ব্যবহার অব্যাহত রাখার নিশ্চয়তায় কানাডার নির্বাচনে সঠিক ও যোগ্য প্রার্থীকে ভোট দেয়া আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য। সুতরাং, ভোট দেয়ার পূর্বে কানাডিয়ান আইন সম্পর্কে প্রার্থীর ব্যক্তিগত অভিমত এবং আইনের প্রতি তার শ্রদ্ধা কতটুকুন তা বিচার করতে হবে। এগুলো জানতে প্রার্থীর অতীত ক্রিমিনাল রেকর্ড, তার অধীনের কোনো ব্যবসা থাকলে, তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কর্মচারীদের জন্য নির্ধারিত সুযোগ সুবিধা এবং তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ট্যাক্স ফাইল সম্পর্কে অনুসন্ধান করা যেতে পারে।   

চতুর্থত; কানাডার রাজনীতির ধারা বাংলাদেশের রাজনীতির ধারা থেকে একটু ভিন্ন। এখানে রাজনীতিবিদরা যে দলেরই হোক না কেন, তারা সকলেই দেশের স্বার্থে এক পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করেন। প্রয়োজনে তারা জনগণের কাছে জবাবদীতিতা করতে বাধ্য, যেটা বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও নিয়ম থাকলেও রাজনীতিবিদদের কার্মকাণ্ডে সাধারণত দেখা যায় না। এখানকার রাজনীতিবিদরা কোনো ভুল করলে জনসাধারণের কাছে নিজের ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চেয়ে নিজেকে সংশোধনের সুযোগ নেন। নির্বাচনের পূর্বেই আমাদের দেখতে হবে প্রার্থী প্রয়োজনে নিজেকে সংশোধনের জন্য আদৌ প্রস্তুত কিনা।

সর্বশেষে; কানাডায় সুষ্ঠভাবে বসবাস করার নিশ্চয়তা রক্ষা করতে, একজন কানাডিয়ান হিসেবে যে কোনো নির্বাচনে ভোট দেয়ার পূর্বেই প্রার্থীদের পূর্ব্বর্তী কর্মকাণ্ড, কানাডা ও বিশ্বরাজনীতি সম্পর্কে তাদের বোধগম্যতা, বিশ্বের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাদের মন্তব্য, শিক্ষাগত যোগ্যতা, পেশা, সামাজিক মর্যাদা, ইত্যাদি, যাচাই বাছাই করতে হবে আমাদের মতো ভোটারদেরই আমাদের মনে রাখতে হবে, আমরা অনেকেই সুষ্ঠ ও সুশৃঙ্খল পরিবেশে জীবনযাপন এবং নতুন প্রজন্মকে সুষ্ঠ পরিবেশের নিশ্চয়তা দেয়ার লক্ষ্যে নিজেদের জন্মভূমি ছেড়ে এই কানাডায় এসেছিলাম। এখন আমরা কানাডিয়ান নাগরিক। এখানে এসেও যদি কেবলমাত্র বাংলাদেশি পরিচয়ে কোনো অযোগ্য প্রার্থীকে ভোট দেই, সেটা হবে বোকামী। কারণ অযোগ্য প্রার্থীকে আমাদের ভোট দিয়ে আমাদের প্রতিনিধি তৈরি করা কিন্তু নিজেদেরকেই অযোগ্য প্রমাণ করার শামিল।    

পূর্ববর্তী নির্বাচনগুলোতে কয়েকজন বাংলাদেশি কানাডিয়ান নির্বাচনে মনোনয়ন পেয়ে নির্বাচন করেছিলেন তারা নির্বাচিত হতে পারেননি, কিন্তু বাংলাদেশি কানাডিয়ানদের বেশকিছু ভোট পেয়েছেন যা-কি-না ইলেকশন কানাডার ড্যাটা সিস্টেমে আছে কখনো যদি পরিসংখ্যাণ দেখার সুযোগ হয়, দেখা যাবে আমরা বাংলাদেশিরা যোগ্যতা ও দলীয় বিশ্বাসের থেকে বাংলাদেশি পরিচয়ের মূল্য দিতে গিয়ে অন্ধের মতোই হয়তো ভোট দিয়েছি এটা অন্যায় কিছু নয়। এটা হচ্ছে, আমাদের সরল মনের প্রতিফলন।   

আমরা অবশ্যই বাংলাদেশি কানাডিয়ানদের ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করতে চাই কেন্দ্রীয় সংসদে, প্রাদেশিক সংসদে, সিটি অফিসে আমরা বাংলাদেশি কাউকে দেখতে চাই প্রয়োজনে কোনো দলীয় বিশ্বাসের চেয়েও বাংলাদেশি পরিচয়ের মূল্য দিতে চাই তবে অবশ্যই প্রার্থীকে কানাডার রাজনীতির জন্য সম্পূর্ণ যোগ্য হতে হবে বাংলা কমিউনিটির বাইরেও তার গ্রহণযোগ্যতা থাকতে হবে সুতরাং কেবলমাত্র একজন বাংলাদেশি কানাডিয়ানকে নয়, একজন যোগ্য বাংলাদেশি কানাডিয়ানকে ভোট দিয়ে বিজয়ী করতে চাইআসুন আমরা প্রার্থীদের ভালো করে জানতে চেষ্টা করি এবং কেবলমাত্র যোগ্য প্রার্থীকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করি 

ভোটের পূর্বে এতকিছু বিবেচনা করতে হবে ভেবে কেউ আবার ভোট দেয়া থেকে যেন বিরত না থাকেন। মনে রাখবেন, কানাডার নির্বাচন কিন্তু বাংলাদেশের নির্বাচনে মতো নয়। কানাডায় ভোটার ভোট না দিলে সে ভোটটি নষ্ট করা হয়। আর বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ভোটার ভোট না দিতে গেলেও, কেউ না কেউ ভোটটি দিয়ে দেয়। সুতরাং কানাডায় যোগ্য প্রার্থীকে নির্বাচন করতে ভোট দিতে যেতেই হবে এবং ভোটের পূর্বে প্রার্থীর যোগ্যতা সম্পর্কে জানতেই হবে।


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান