কোটা সংস্কার আন্দোলন ও সম্মিলিত অকৃতজ্ঞতার সংস্কৃতি

Sat, Apr 14, 2018 1:40 AM

কোটা সংস্কার আন্দোলন ও সম্মিলিত অকৃতজ্ঞতার সংস্কৃতি

শরীফ হাসান: “আমি কোটা সংস্কারের পক্ষে। এই নিয়ে আমার লাইভে অনেকবার বলেওছি। এখনো আমার বক্তব্য, কোটা সংস্কার চাই, কিন্তু কোটার বিলোপ নয়। নারী কোটা, নৃগোষ্ঠী কোটা, প্রতিবন্ধী কোটা থাকতে হবে। জেলা কোটা না থাকলে ভয়াবহ ব্যাপার ঘটবে ভবিষ্যতে”।

ফেইসবুক স্ট্যাটাসে কথাগুলো বলেছেন একজন জনপ্রিয় সাহিত্যিক। তাঁর মত আরও বিশ জন বিশিষ্ট ব্যক্তির টাইমলাইন ঘুরে এসেছি গত ২৪ ঘণ্টায়। এঁদের কেউ লেখক, কেউ শিক্ষক, কেউ আমলা, কেউ মোটিভেশনাল স্পিকার, নিদেনপক্ষে ফেইসবুক সেলিব্রিটি। এঁরা সবাই কোটা পদ্ধতির সংস্কার চান, বিলোপ নয়। নারী কোটা, প্রতিবন্ধী কোটা, আদিবাসী (মতান্তরে নৃগোষ্ঠী) কোটা এবং জেলা কোটা বহাল রাখার ব্যাপারে সবার রয়েছে অকাট্য যুক্তি। তবে এঁদের কেউই মুক্তিযোদ্ধা কোটার ব্যাপারে একটি শব্দও ব্যয় করেননি। খুব সম্ভবত এই কোটাটি বহাল রাখার জন্য তেমন যুতসই কারণ তাঁরা খুঁজে পাননি। যেমন পাননি কোটা সংস্কার আন্দোলনে যুক্ত থাকা লাখো ‘মেধাবী’ তরুণ।

কম করে হলেও ১০০ জন আন্দোলনকারীর টাইমলাইনে গিয়েছি। এদের সবাই মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কোটা বাতিল সংক্রান্ত ঘোষণায় উষ্মা প্রকাশ করে বলেছেন তাঁরা স্রেফ পদ্ধতির সংস্কার চেয়েছেন, বাতিল নয়। অনেকে আবার বিভিন্ন অংক কষে, হিসেব নিকেশ করে সংস্কারের নতুন রূপরেখা তুলে ধরেছেন। সেখানে সবাই সব কোটার প্রয়োজনীয়তা দেখছেন শুধু ওই মুক্তিযোদ্ধা কোটাতেই যত সমস্যা।

কোন সন্দেহ নেই, ৫৬ শতাংশ পদ কোটাবদ্ধ থাকা খুবই অন্যায্য এবং এর বিরুদ্ধে আন্দোলন অবশ্যই সমর্থনযোগ্য কিন্তু তাই বলে মুক্তিযোদ্ধা কোটাকে সমস্যার মূল ধরে নিয়ে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদেরকে অসম্মান করার প্রবণতা যে কোন বিচারেই পীড়াদায়ক। যাদের সর্বোচ্চ ত্যাগের বিনিময়ে আমাদের এই স্বাধীন সত্ত্বা, মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো, তাদের অবদানকে এরকম নির্মম ভাবে ভুলে যাওয়া যে কোন বিবেকবান মানুষের পক্ষেই মেনে নেওয়া কঠিন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও এর ব্যতিক্রম নন। তাই তাঁর এই ক্ষোভমিশ্রিত ঘোষণা।

প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণায় সবাই যখন হতাশ, এই ঘোষণা কিছুতেই রাষ্ট্রনায়কোচিত নয় বলে অনেকে যখন বিরামহীনভাবে  হাহাকার করছেন তখন আমার মনে হচ্ছে এই হাহাকারটা এখনকার মত তুলে রাখা ভালো। সম্মিলিত অকৃতজ্ঞতার যে সংস্কৃতি আজ লালন হচ্ছে তার ভবিষ্যৎ বিস্ফোরণ দেখার সময় জমানো হাহাকারটা কাজে দেবে।

এই ক’দিনে দেখেছি মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের পরিবারবর্গ নিয়ে কী নির্মম রসিকতা করা হয়েছে। মতিয়া চৌধুরীর বক্তব্যের খণ্ডিত অংশকে ব্যবহার করে পুরো আন্দোলনে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী একটা মনোভাব দাঁড় করানোর চেষ্টা চলেছে। অথচ বেশ ক’জন  মুক্তিযোদ্ধা ইতোমধ্যে মুক্তিযোদ্ধা এবং তাদের পরিবারের জন্য বরাদ্দ কোটা তুলে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। কিন্তু এসব কথা শোনার বা এ নিয়ে ভাববার সময় কারো নেই। সকল পক্ষকে প্রাপ্য সম্মান দিয়েও যে অধিকার আদায় করা যায় তা যেন সবাই ভুলে বসে আছে।

বুঝতে পারি, বিশাল জনসংখ্যার চাপে অতিষ্ট, মুক্ত বাজার অর্থনীতির দেশে এক অসীম অস্থিরতার সৃষ্টি হয়েছে। অনিয়ম আর অরাজকতায় ভরা এই ছোট্ট ভূখণ্ডে সবাই যার যার মত করে ভবিষ্যৎ গুছিয়ে নিতে চাইছে, সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার জন্য অবিরাম ছুটছে। এই অস্থির সময়ে অন্যকে কেবলই প্রতিপক্ষ মনে হয়, পারস্পারিক শ্রদ্ধার জায়গা ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসে। এই আন্দোলনেও তার প্রকট প্রকাশ হয়েছে।     

কোটা সংস্কার আন্দোলনের আপাত সমাপ্তি ঘটেছে। পুরো বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে ভাবার এখনই সময়। এই যে লাখো ‘মেধাবী’ তরুণ এরা আমাদেরই ভাই-বোন, আত্মীয়-পরিজন। এরা অমিত শক্তিধর। কেউ চাইলেই তাদেরকে অগ্রাহ্য করতে পারবেনা। কিন্তু এদেরকে কে বোঝাবে যে পূর্ব-পুরুষের কথা ভুলতে নেই, ইতিহাস, জাতীয় সংগ্রাম, আর এর নায়কদেরকে অবজ্ঞা করতে নেই। এদেরকে কে ডেকে বলবে, নত হও, কৃতজ্ঞ হও, সাফল্য, সে এমনিতেই আসবে।

‘মেধাবী’ তারুণ্যসহ সকলকে নববর্ষের শুভেচ্ছা।

সকলের মাঝে শুভবুদ্ধির উদয় হোক।         


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান