বীথির কাছে চিঠি-৪৭

Tue, Apr 10, 2018 5:51 PM

বীথির কাছে চিঠি-৪৭

লুনা শিরীন : একটা চিঠি যখন আমি পোস্ট দেই তখন বেশ কিছু আলোচনার জন্ম হয়,সেই সুত্র ধরেই নতুন নতুন আলোচনা আসে,আমি পাঠকের মন্তব্য খুউব মন দিয়ে পড়ি। যেহেতু এটা অনেকটা ওপেন ফোরাম, অনেকের সাথেই  আমার কমবেশি কথা হয়। এই যেমন ধর  শেষ চিঠির জারা, ও বলে—লুনা আপা, আমাদের সবার জীবনেই কিন্তু চ্যালেজ্ঞ আছে, সেটা থাকবেই, কিন্তু সমাজ কিন্তু আগাচ্ছে,এই ভাঙচুড়ের ভিতর দিয়ে  আমরা কিন্তু শিখছি , ভুল না হলে শিখবো  কোত্থেকে বলেন ? আপনার লেখায় আরো সাহসী কিছু উদাহরণ শুনতে চাই,আমি জানতে চাই শত প্রতিকুলতার ভিতরেও সামনে পথ আছে ।

বীথি –এইটুকু বলে জারা কিন্তু সেদিন আর ২০ মিনিট গাড়ি চালালো, পিছনে বসা জারার  ৫ বছরের মেয়ে দিয়া, জারা নিজেই কিন্তু একা নারী –মাত্র ৩৪ বছর বয়সে জারা সে সময় অতিক্রম করেছে,সেটা কিন্তু আমি তোকে বললাম  না বীথি – এমন হাজারো না বলা কথা বলতে না পারার কষ্ট নিয়েই কিন্তু আমি প্রতিটা লেখা লিখতে বসি এবং শেষ করি।  আমি কি নিজের জীবনের কথা বলেছি বীথি তোকে কোনদিন ? এই আমিও হয়তো অনেকগুলো জারা, দের সম্বনয় ? কি করে সেই গল্প লেখা যায় ?

শোন তাহলে  নিশাত এর কথা। আমার সাথে  পরিচয় হোয়েছে মাত্র ১৫ দিন আগে, যতবার একজন নতুন মানুষকে আমি দেখি , আমার সামনে আরো একটা নতুন জীবন খুলে যায় । ৩৯ বছর বয়সী নিশাত জেনেশুনেই একজন বিবাহিত লোককে বিয়ে করে, যার আগের পক্ষের বউ বাচ্চা আছে , নিশাত  সংসার চেয়েছিলো, নিজের মতো করে বাচার জন্য, তাই  নিজেই প্রিঞ্চিপল এ্যাপ্লিকেন্ট হয়ে কানাডায় এপ্লাই করে । স্বামীকে নিয়ে কানাডার  পিয়ারসন এয়ারপোর্টে আসার পরে, ই্যমিগ্রেশন কানাডা বেকে বসে, তারা জানায় কানাডায় দুই বঊ এলাঊড না,এয়ারপোর্ট থেকে ফেরত  পাঠায় নিশাতের স্বামী বেলালকে। এর পর শুরু হয় নিশাত এর  জীবন । টরোন্টো শহরে  সিকিউরিটি গার্ড এর  কাজ করে , আরো দেড় বছর পরে , আবার দেশে গিয়ে সেই বেলাল কে আগের বউ এর সাথে  ডিভোর্স করিয়ে  আবার বিয়ে করে নিশাত । এবার সব অরিজিন্যাল কাগজ নিয়ে এপ্লাই করে স্বামীর জন্য । টরোন্টো ফিরে এসে আরো ৪/৫ বছর নৈশ প্রহরীর কাজ করার পরে বেলাল কানাডা আসার অনুমুতি পায়, ভেবে দেখিস  বীথি ঘটনার ধারাবাহিকতা।শেষ লক্ষ্য অর্জন হয়  নিশাতের, বেলাল আসে ,এবং নিশাত যৌথ জীবন শুরু করে । এটা বেলাল জন্য  শুধু নয়, ছেলে / মেয়ে সবার জন্যই সত্য যে কানাডা শহরে  ঢোকার সাথে সাথেই কেউ কাজ পাবে না। বেলালকে বসে থাকতে হয় আরো ৩/৪ মাস। বেলাল-কে সাপোর্ট করে নিশাত । একদিন কাজে গ্যাছে নিশাত , ফোন আসে বাঙ্গালী পাড়ার এক মানি এক্সচেঞ্জ এর দোকান থেকে – নিশাত কে জানানো হয় তার  স্বামী  বেলাল, লুকিয়ে আগের ডিভোর্সি বউ বাচ্চাকে নিশাতের এই রক্ত পানি  করা  টাকা পাঠাচ্ছে । যেখানে রাতের  আওয়ারে  ডিউটি করার জন্য নিশাত এখোনো একরাত বাসায় থাকার অবসর  পায়নি –মুহুরতেই অন্ধকার হয়ে উঠে নিশাতের পৃথিবী । কি বলবি তুই বেলাল কে ? কোন ভাষায় কথা বললে বেলাল –কে সঠিক ভাবে কথা বলা  বা ওকে উপযুক্ত শাস্তি দেয়া যায় ?  নিজের জীবনের ৬ বছরের স্বপ্ন,কষ্ট,আশা, আনন্দ –সব কিছুকে হারিয়ে নিশাত এখন  পরিচিত সবাইকে বলে—আমার আত্মহত্যা করতে ইচ্ছা হয়, আমি আর এক মুহূর্ত বাচতে   চাই না।

কিন্তু এখানে বাঁচা মরার প্রশ্ন না বীথি – এটা ইমিগ্রেশন কানাডা – ওরা এক চুল এপাশ /ওপাশ করবে না। নিশাত  নিজের দায়িত্বে বেলাল কে স্পন্সর করে এনেছে, নিশাতকে এই দায় টানতে হবে আরো দশ বছর । আমি তোকে বলেছি বীথি নানান লেখায় –আমি নিজে দোভাষীর কাজ করি, অনেকদিন এমন অনেক কল এ্যাটেন্ড – করেছি ,যেখানে বাঙ্গালী মহিলারা ফোন ধরেই বলে—আপা ,আমার স্বামী আবার বাংলাদেশে গিয়ে বিয়ে করেছে ,আমার স্বামীরে  আমি পুলিশে দিতে  চাই আপা । লিগ্যাল এইড কানাডা অফিস জানিয়ে দেয় খুব পষ্ট করে --  এটা বাংলাদেশ এর আইন এল্যাউ করে  তাই সে বাংলাদেশে করেছে এখানে আমাদের কিছুই  করার নেই। কথা আর আগায় না । ফোনের  অপর  প্রান্তে আমি ফোন রেখে অনেক অনেকদিন বোবা সময় কাটিয়েছি, ভেবেছি – মানুষ কি  শুধুই অসহায়ত্তের সাথেই  বোঝাপড়া করবে ,নাকি নতুন কোন  পথ বের হবে ?

 ইদানিং দেখি বেশ কিছু সাহসী মানুষ বলেন – আর বাংলাদেশ থেকে জীবন সঙ্গী খুঁজবো না,অনেক দেখলাম, সবার ধান্ধাই যদি হয় বিদেশ আসা  তাহলে আর সঙ্গী হবে কবে ? আমি আরো ভাবি --  বিশ্বাসহীনতাই যদি আমাকে তাড়িয়ে নেয় সারাক্ষণ – তাহলে সেটা –কানাডাই কি আমেরিকাই কি ? ভুত তো আসলে আমার মনে । বীথি – আর বেশী জালাবো না তোকে,কথা দিচ্ছি ,আর মাত্র ৩ টা চিঠি লিখবো তোকে। যদিও লক্ষ্য লক্ষ্য না বলা কথা রয়ে গেলো আমার  মনের গভীরে। নিশাত  বেচে থেকেই একদিন  বুক ভরে নিশ্বাস নেবে এই  শুভকামনা রইলো । আদর তোকে ।

২৭/০৭/২০১৪

 আরো পড়ুন: বীথির কাছে চিঠি-৪


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান