জাহরানের মৃত্যু এবং কিছু ভাবনা

Mon, Apr 9, 2018 1:39 PM

জাহরানের মৃত্যু এবং কিছু ভাবনা

নাসরিন শাপলা: তিন তিনটি দিন পার হয়ে গেলো, জাহরান চলে গেছে। জাহরান; মাত্র ৪ বছর বয়সী টরন্টো প্রবাসী বাংলাদেশি পরিবারের সন্তান। নোরো ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে কেউ কিছু বোঝার আগেই সব শেষ হয়ে গেলো। ব্যক্তিগতভাবে পরিবারটিকে চিনি না, তবে জাহরানের মামা মামুন্ কায়সার ভাই আমাদের বাংলাদেশি কমিউনিটির খুব পরিচিত এবং প্রিয় মুখ। কোন যোগসূত্র না থাকলেও,জাহরানের মিষ্টি মুখটাই রাতের ঘুমে কেড়ে নেবার জন্য যথেষ্ট।

গত বছর থেকে কিছু অসময়ের মৃত্যু এবং অপমৃত্যু বাংলাদেশি কমিউনিটিকে মানসিকভাবে দারুন অস্থির করে রেখেছে। তবে জাহরানের এই অকাল মৃত্যুর সাথে হাসপাতালের অবহেলার অভিযোগ উঠেছে, যদিও এটার প্রকৃত সত্যতা এখনো জানা যায়নি। অনেকে আবার একধাপ এগিয়ে 'রেসিজম' বলেও বিষয়টিকে অবিহিত করছেন।

জাহরানকে তার বাবা-মা যেই হাসপাতালটির ইমার্জেন্সীতে সাহায্যের জন্য নিয়ে গিয়েছিলো, সেটার নাম 'হসপিটাল ফর সিক কিডস"-পৃথিবীর বিখ্যাত শিশু হাসপাতালগুলোর অন্যতম। এই হাসপাতালে আমার ছোট মেয়ের কয়েকমাস বয়সের একটি টেস্টের জন্য যাওয়া ছাড়া, এদের সার্ভিসের ব্যাপারে আমার ব্যক্তিগত কোন অভিজ্ঞতা নেই। তবে আমার বোনের ছেলে আর বেশ কয়েকজন বন্ধুর বাচ্চাকে এই হাসপাতালে অনেকটা সময় চিকিৎসা নিতে হয়েছে। তাদেরকে আমি খুব কাছে থেকে দেখেছি। যতবারই এই হাসপাতালে আমি যাই, এদের স্টাফদের ব্যবহারে আমার কাছে মনে হয়, এরা বোধহয় মনুষ্যরুপী অ্যাঞ্জেল। পেশার জন্য মমতা না থাকলে, শুধুমাত্র ট্রেনিং মানুষকে এভাবে সেবা দিতে উদ্বুদ্ধ করতে পারেনা।

 

আমি এই হাসপাতালে মিরাকলও হতে দেখেছি। আমাদের এক পরিচিত বাচ্চা একবার কোমায় ছিলো বেশ কয়েকমাস, এক পর্যায়ে তাকে ক্লিনিক্যালি ডেড ঘোষনা করা হয়েছিলো। মিরাকুলাসলি বাচ্চাটা ফিরে এসেছে, এখন সম্পুর্ন স্বাভাবিক জীবন যাপন করছে। বাচ্চাটিকে যখন আমি দেখতে যাই হাসপাতালে, ও তখন কোমায়। মা বাচ্চার এই অবস্থা দেখার মতো মানসিক শক্তি সঞ্চয় করতে পারছেনা বলে, বাচ্চার কাছে যাচ্ছেন না। আমি যখন বাচ্চাটার কাছে গেলাম, পাশে বসা নার্স আমাকে জিজ্ঞাসা করলো আমি মা কি না? আমি ফ্যামিলি ফ্রেন্ড জানাতেই, নার্স আমাকে অনুরোধ করলো, 'প্লীজ তুমি মাকে একটু বোঝাও, ওর এখানে বাচ্চার কাছে আসাটা খুব জরুরী।" আমি পরিস্থিতি বুঝিয়ে বলতেই নার্স আমাকে বললো, 'আমি বুঝতে পারছি। তবে কি জানো, আমি একবার প্রায় তিনমাস কোমায় ছিলাম। আমার মা তখন আমাকে আমার প্রিয় রাইমগুলো পড়ে শোনাতো। সেই কোমার সময়টার কথা আমি কিছুই মনে করতে পারিনা, শুধু আমার মায়ের কন্ঠ মনে করতে পারি। আমার বিশ্বাস আমার মায়ের কন্ঠ আমাকে কোমা থেকে ফিরে আসতে সাহায্য করেছে। এরপরই আমি নার্স হবো বলে ঠি করেছিলাম"। আমি ঘোরের মধ্যে যখন রুম থেকে বের হয়ে আসছি, দেখি কি পরম মমতায় নার্সটি বাচ্চাটার পোষাক পাল্টে দিচ্ছে।

 

তারপরও, এর মাঝেও ভুল হয়। যদি সত্যিই ভুল হয়ে থাকে, তবে সেটার সুষ্ঠ তদন্তও হওয়া দরকার। তবে এরপর আমি যে কথাগুলো বলবো, অনুগ্রহ করে কেউ সেগুলোকে ব্যক্তিগতভাবে নেবেন না। এগুলো শুধুই আমার ব্যক্তিগত অবজার্ভেশন এবং আমাদের বাংলাদেশি কমিউনিটিকে সাহায্য করার চেষ্টা।

 

এদেশে যেসব বাংলাদেশিরা ইমিগ্রেন্ট হিসেবে আসেন, তারা সবাই কাজ চালানোর মতো ইংলিশ জানেন। তবে ইংলিশে কথা বলার দক্ষতা অনেকেরই থাকে না, আর মেডিক্যাল টার্মগুলো তো অজানা থাকারই কথা। আমি নিজেই অনেকদিন 'ঝি ঝি' ধরার ইংলিশ হাতড়ে বেড়িয়েছি। এইসব ক্ষেত্রে রোগী আর ডাক্তারের মাঝে একটা কমুউনিকেশনের সমস্যা হয়, যেটা ডাক্তারের রোগ নির্ধারনের ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি করতে পারে। পরিস্থিতি এমন হলে ভালো ইংলিশ জানে এমন কাউকে সাথে নিন আর সেটাও সম্ভব না হলে 'ইন্টারপ্রেটর' এর জন্য আবেদন করুন। এখানে দোভাষীর সার্ভিস কিন্তু একদম ফ্রী। আর এইসব ট্রেইন্ড দোভাষীদেরকে মেডিকেল টার্মগুলোও জানতে হয়। ফলে আপনার সমস্যাগুলো ডাক্তারকে বুঝিয়ে বলতে বা ডাক্তারের পরামর্শ আপনাকে বুঝিয়ে বলতে এরা পারদর্শী।

 

আমার দ্বিতীয় পরামর্শ হলো ডাক্তারের কাছে যাবার আগে একটু গুছিয়ে, আর সম্ভব হলে একটু হোম ওয়ার্ক করে যান। গুছিয়ে মানে, আপনার সমস্যাগুলো দেখা দেবার প্রকৃত তারিখ ( ৩/৪ দিন বা প্রায় ১ সপ্তাহ না বলে স্পেসিফিকেলি ৭দিন বা ১০ দিন) বলুন। এটার সাথে রিলেটেড সম্ভাব্য অন্যান্য তারিখগুলোও মাথায় রাখুন। যেমন আপনি কোথায় বেড়াতে গিয়েছিলেন, তারপর থেকে সমস্যাগুলো শুরু হয়েছে। জায়গা ভেদে ভিন্ন টাইপের ভাইরাস ব্যাক্টেরিয়ার সঙ্ক্রমণ হতে পারে বিধায়, আপনার এই তথ্যগুলো ডাক্তারকে ডায়াগনোসিসে সাহায্য করবে। আপনার রোগের ব্যাপারে ফ্যামিলি হিষ্ট্রি থাকলে সেটা নিজে থেকে ডাক্তারকে জানিয়ে দিন। ডাক্তারের কাছে আপনার কি কি জানবার আছে, সেটা নোট করে নিন যাতে কিছু বাদ না যায়।

 

আর হোম ওয়ার্কের বিষয়টা হলো আপনার সিমটম ধরে একটু ইন্টারনেটে সার্চ করুন। এতে ছোটখাটো হোম রেমিডির খোঁজ পেয়ে যেতে পারেন। আমার নিজের ক্ষেত্রে এমন অনেক উদাহরণ আছে, একটা শেয়ার করি। আমার বা বাচ্চাদের জ্বর হলে, ডাক্তারের কাছে যাবার আগে অন্তত তিনদিন আমি অপেক্ষা করি আর সাথে প্রয়োজন অনুযায়ী আইব্রোপ্রোফেন বা অ্যাসিটোমেনোফেন চলে। জ্বরের তীব্রতার চার্ট আমার কাছে থাকে। গলা ব্যাথা থাকলে গার্গল, রুমে হিউমিডিফায়ার ব্যবহার -এগুলো খুব সাধারন কিছু স্টেপ আমি ফলো করি।

 

আমার অভিজ্ঞতা বলে, জ্বরের প্রথম দুইদিনের মধ্যে ডাক্তারের কাছে গেলে ডাক্তার আপনাকে টাইলেনল বা অ্যাডভিল দিয়ে ভালো না হলে আরো দুইদিন পরে আসতে বলবে। আর তিনদিন পরে গেলে আর অন্য কোন কম্পলিকেশন না থাকলে উপরের স্টেপগুলো দিয়ে বাসায় পাঠিয়ে দেবে। যদি আপনি স্টেপগুলো আগেই ফলো করে যান তবে জোর সম্ভাবনা ডাক্তার আপনার চিকিৎসা পরের স্টেপে নিয়ে যাবেন। ইনফর্মড এবং সচেতন রোগীর সাথে  ডিল করতে ডাক্তাররাও পছন্দ করেন।

 

আর ডাক্তার এবং ডাক্তারের অফিসের ফ্রন্ট ডেস্কের মানুষগুলোর সাথে ভালো ব্যবহার করুন। এদেশে সার্ভিসটা সব সময়ই দ্বিপাক্ষিক। এরা মানুষের সাথে যথেষ্ট সহনশীলতা দেখায়, তবুও সেটারও তো একটা মাত্রা আছে। আমাদের বাংলাদেশি অনেক মানুষকে আমি ফ্রন্ট ডেস্কের মানুষদের সাথে অনেক দূর্ব্যবহার করতে দেখেছি বলেই বিষয়টি এখানে উল্লেখ করলাম। আমার ফ্যামিলি ডাক্তার ম্যাটারনিটি লীভে থাকায় গতদিন আমাকে দেখলো কিংস্টন উইনিভার্সিটি থেকে একদম নতুন পাশ করা একজন জিপি। আমি এতো বাচ্চা মেয়ে দেখে ভিতরে ভিতরে একটু দমে গেলেও তা মোটেও প্রকাশ করিনি। কিন্তু মেয়েটার সাথে কিছুক্ষন কথা বলার পরেই আমি দারুন ইম্প্রেসড। তার ডায়াগনোসিসও ছিলো একদম পারফেক্ট। পরের ভিসিটে আমার ইম্প্রেসড হবার ব্যাপারটি মেয়েটিকে জানালাম, ফলাফল রুম ছাড়ার আগে এক বিশাল হাগ।

 

এরপরেও এদেশে দূর্ঘটনা হয়, কখনো কখনো নেগ্লিজেন্সের মতো ঘটনাও ঘটে। তবে বিষয়টিকে রেসিজম এটা ভাবার আগে আমাদেরই আরেকটু Soul searching এর প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি। রেসিষ্ট বলে যদি আঙ্গুল তুলি, সেটা আমাদের দিকেই ঘুরে আসবে জানি। বাঙালী রেষ্টুরেন্টগুলোতে যান, টেবিলে টেবিলে রাজা-উজিড় মারার গল্প চলছে। খেয়াল করলে দেখবেন, অধিকাংশ বাঙ্গালীই যখন এদেশীদের সাথে তাদের কথোপকথন বাংলায় বর্ননা করেন, 'You'এর অনুবাদ করেন, 'তুই' বলে। ব্যাপারটা এরকম যে, আরে, আমি তো এদের এক পয়সারও পাত্তা দেইনা। ব্যাপারটা যে আমার কাছে এতো ডিসরেসপেক্টফুল মনে হয় যে, আমার সামনে যতোবার এমন ঘটনা ঘটে, ততবার আমি ভিতরে ভিতরে কুঁকড়ে যাই।

 

তাই রেসিজমের বিষয়টি পাশে সরিয়ে রেখে না হয় আমরা নেগলিজেন্সের দিকেই আমাদের দৃষ্টি সরাই। অন্যের ভূলের কারনে যে কোন দূর্ঘটনা নিয়ে প্রতিবাদ বা নালিশ করবার আগে, আমরা আমাদের অংশটুকু সঠিকভাবে করেছিলাম কি না সেটা আগে নিশ্চিত করি। এতে দূর্ঘটনা রোধের পাশাপাশি আমাদের প্রতিবাদ না কমপ্লেইনের ক্রেডিবিলিটি বাড়বে বই কমাবে না।


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান