তরুণদের আন্দোলনকে কখনো তুচ্ছ করতে নেই

Mon, Apr 9, 2018 12:44 PM

তরুণদের আন্দোলনকে কখনো তুচ্ছ করতে নেই

ইমিতিয়াজ মাহমুদ: প্রথমেই বলে নিই আমি কোটার পক্ষে। সরকারী চাকরী ব্যাপারটা কখনো আমার ইয়ের মধ্যে ছিল না সেজন্যে এইসব চাকরীতে কার জন্যে কতো পরিমাণ কোটা আছে সেটা আমি জানিনা। আমি শুধু জানি যে আদিবাসীদের জন্যে কোটা আছে, নারীদের জন্যে কোটা আছে, আর মুক্তিযোদ্ধাদের কোটা ছিল এটা এখন নাকি মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তান বা সন্তানের সন্তানদের জন্যে করা হয়েছে। জেলাভিত্তিক একটা কোটার কথা শুনেছি, সেটার যে কি রূপ সে আমি জানিনা।

 

কোটার যুক্তিটা বলি। এমনিতে কোটা ব্যাবস্থা তো আসলে একরকমের একটা বৈষম্য বটে। বৈষম্য কি অর্থে? যে একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য যাদের আছে ওদের জন্যে চাকুরীতে বা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার জন্যে বা এইরকম নানা ক্ষেত্রে সুযোগের নিশ্চয়তা করে রাখা। এতে করে অনেক সময়ে রকম হয় যে একজন প্রার্থী অপেক্ষাকৃত কম নম্বর পেয়েও কোটার সুযোগে বিশ্ববিদ্যালয়ে বা চাকরীতে ঢুকে পরে। কোটার বাইরে হয়তো ওর চেয়ে বেশি নম্বর পেয়েও বাদ পরে যাচ্ছে। বৈষম্য না?

 

বৈষম্য তো বটেই। কিন্তু সাধারণভাবে বৈষম্য নিষিদ্ধ হলেও এইধরনের বৈষম্য মোটামুটিভাবে পৃথিবীর সব দেশের সংবিধানেই অনুমোদিত। এইগুলিকে বলা যায় ইতিবাচক বৈষম্য বা ইতিবাচক পদক্ষেপ। ইংরেজিতে বলে Positive Discrimination বা Positive Action.

 

(২)

এইরকম বৈষম্য কেন করতে হয়? তার নানান কারণ আছে। মুল কারণটা হচ্ছে সাম্য। একটি রাষ্ট্রের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে একধরনের সাম্য আনার জন্যে এইরকম ইতিবাচক বৈষম্য করতে হয়। কোন কারণে একটি জনগোষ্ঠী একটি দেশের অন্যান্য জনগোষ্ঠীর চেয়ে একটু পিছিয়ে থাকতে পারে। শিক্ষার ক্ষেত্রে ও সরকারী নিয়োগের ক্ষেত্রে সেইসব জনগোষ্ঠীকে একটু বাড়তি সুযোগ দিলে ওরা অন্যদের সাথে খানিকটা সমতায় চলে আসতে পারে। এইজন্যে ওদের জন্যে এমনিতে সাধারণ প্রতিযোগিতামূলক ব্যাবস্থার মাঝেও কিছু আসন সংরক্ষণ করে রাখা হয়।

 

কোন কোন ক্ষেত্রে আবার আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার জন্যেও কোটা রাখা হতে পারে। আবার বিশেষ প্রতিভা যাদের আছে ওদের জন্যেও কোন কোন ক্ষেত্রে কোটার সুবিধা থাকে। যেমন খেলোয়াড় বয়া সঙ্গীতশিল্পী এদের জন্যে বিদেশী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া সোজা। আমাদের এখানেও একসময় বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে খেলোয়াড় কোটা ছিল, এখন আছে কিনা জানিনা।

 

কোটার সুবিধা যে সবসময় শুধু সংখ্যালঘুদের জন্যে রাখা হয় সেটা কিন্তু না। মালয়েশিয়ায় যেরকম ভূমিপুত্রদের জন্যে কোটাসহ নানাপ্রকার বিশেষ সুবিধা রাখা আছে। ভূমিপুত্ররা হচ্ছে সেখানে সংখ্যাগুরু, কিন্তু আয় উপার্জন চাকরী বাকরি শিক্ষা ইত্যাদি সব দিক দিয়েই ওরা সংখ্যালঘু চীনা আর ভারতীয়দের চেয়ে পিছনে। মালয়েশিয়ায় ওরা নানারকম আইন করে ভূমিপুত্রদের জন্যে এইরকম সব ইতিবাচক পদক্ষেপ নিয়েছে যাতে করে এথনিক মালয়িরা চীনা আর ভারতীয়দের পাশাপাশি উঠে আসতে পারে।

 

আর ভারতের অবস্থা তো খুবই জটিল আরকি। নানান জাতী গোষ্ঠী সম্প্রদায়ের জন্যে সংরক্ষিত আসনের নানারকম হিসাব। ওরা এটাকে বলে রিজার্ভেশন। এই নিয়ে ভারতে অসংখ্য মামলা হয়েছে। এখনো অনেক মামলা হচ্ছে, রায়ও হচ্ছে সুপ্রিম কোর্টে। এইসব রায়ে রিজার্ভেশনের সংখ্যা হার ইত্যাদি নিয়ে যেখানে যে কথাই বলা হোক, রিজার্ভেশনকে সাধারণভাবে কেউই অবৈধ বলেন না।

 

(৩)

আমাদের এখানে সরকারী চাকরীতে কোটা নিয়ে লোকজন যেসব অনুযোগ করছেন, বয়া আন্দোলন করছেন ওদের কি বক্তব্য আমি বিস্তারিত জানিনা। এমনিই শ্লোগান ধরনের যেসব কথা শুনি- নাতিপুতির কোটা চলবে না ইত্যাদি বা কোটা প্রথা সম্পূর্ণ বাতিল কর- সেগুলি আমার পছন্দ না। কেন পছন্দ না? কারণ, প্রথমত ঐ যে এতক্ষণ বলেছি কোটা থাকাটা অন্যায় কিছু না। কথা থাকতেই পারে, আর আমাদের এখানে কিছু কিছু কোটা থাকতেই হবে। দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে 'নাতিপুতি কোটা' যেভাবে আপনারা বলেন, সেটার মধ্যে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি একধরনের অবজ্ঞা আছে, এটা তো আমার ভালো লাগে না আরকি।

 

আমি কোটার পক্ষে। কিন্তু ঐ যে প্রথমেই বলেছি, কি কি কোটা কি হরে কোথায় আছে সেটার ডিটেইল আমি জানিনা। যারা আন্দোলন করছেন, আপনারা কি পুরো কোটা সিস্টেমের অবসান চাচ্ছেন নাকি সংখ্যা হার এইসব নিয়ে নিয়ে রিফর্ম বা সংস্কার চাচ্ছেন সেটাও জানিনা। যদি কোটা পদ্ধতি পুরা বাদ দিতে বলেন, তাইলে আমি তার পক্ষে নাই। রিফর্ম করতে চাইলে সেটা ভেঙে বলুন।

 

একটা কথা বলা দরকার, যারা কোটার সুবিধা পাচ্ছে মনে করবেন না যে ওদেরকে অন্যায় সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। মনে রাখবেন কোন না কোনভাবে ওদের সাথে বৈষম্য হয়েছে বা ওদের প্রতি অন্যায় করে আপনাকে সুবিধা দেওয়া হয়েছে বা আপনার জন্যে ওরা ত্যাগ করেছে আর ওদের এই ত্যাগের ফলেই আপনি নিজেকে অপেক্ষাকৃত মেধাবী স্থানে পেয়েছেন। কোটাটা দেওয়া হয় সাম্য নিশ্চিত করার জন্যে, বৈষম্যের জন্যে না। এইটা মনে রাখবেন। আর এইটা যদি না বুঝে থাকেন, তাইলে আপনি প্রজাতন্ত্রের সেবার জন্যে যোগ্য হলেন কি করে?

 

(৪)

কিন্তু যে কোন অবস্থাতেই আন্দোলনকারীদের উপর অত্যাচার করাটা সমর্থন করা যায়না। যারা আন্দোলন করছেন ওরা সরকারের কাছে একটা বার্তা পৌঁছাতে চাইছেন। সরকার সেই বার্তাটা গ্রহণ করবে আর সে অনুযায়ী ব্যাবস্থা নিবে। ওদের দাবী যে মানতেই হবে সেটা হয়তো নয়। কিন্তু ওদের দাবীর কথাটা শুনে সেটা নিয়ে সকলের সাথে আলোচনা করলে দোষের কি আছে? দাবী যদি ভুল হয়ে থাকে তাইলে আমরা সেটাই বলে দিতে পারি।

 

তরুণদের আন্দোলনকে কখনো তুচ্ছ করতে নেই। এটার ফল কখনো ভালো হয়না। যে দাবী নিয়ে ওরা আন্দোলন করছে, বুঝাই যাচ্ছে যে আমাদের ছাত্রছাত্রীদের একটা বড় অংশের মধ্যে তার পক্ষে একটা সমর্থন আছে। এটা হতেই পারে। যে ছেলেটা বা মেয়েটা কয়েকদিন পরে পাশ করবে, সরকারী চাকরির চেষ্টা করবে সে তো চাইতেই পারে যে সাধারণ নিয়মে মেধাভিত্তিক পরীক্ষা দিয়ে যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ হোক। দেশে কার্যকর গণতন্ত্র থাকলে এই ধরনের আন্দোলনে সরকার আন্দোলনকারীদের কথা তো শোনার কথা।

 

ওদের ক্ষোভটা যদি বিবেচনা করা না হয় তাইলে তো অসৎ লোকগুলি তার সুযোগ নিবেই। সেইটাই হয়েছে। নাইলে আনন্দ শোভাযাত্রার প্রস্তুতির উপর সাধারণ ছাত্ররা হামলা তো করার কথা না। ফেসবুকে দেখবেন যে কিছুসংখ্যক লোকজন কোটাকে উপলক্ষ করে সরকারকে আর সরকারের সাথে সাথে মুক্তিযুদ্ধ আর মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে আজেবাজে কথা বলছে। এদের জন্যে সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছেন কেন?


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান