সেই যে আমার নানা রঙের দিনগুলি

Sat, Apr 7, 2018 5:31 PM

সেই যে আমার নানা রঙের দিনগুলি

(ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দল। দেশের রাজনীতিকে উল্টোমুখো করে দেওয়ার প্রক্রিয়ার প্রতিরোধ হিসেবেই জন্ম নিয়েছিলো সংগঠনটি। না, রাজনৈতিক দল হিসেবে নয়, সংস্কৃতি দিয়ে দেশ এবং রাজনীতিকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পথে ধরে রাখার প্রত্যয় নিয়ে এই সংগঠনের যাত্রা। তার পর তো ইতিহাস। স্বৈরাচারী এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে তো এই সংগঠনটি হয়ে উঠেছিলো অপরিহার্য্য শক্তি।

সেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দলকে যারা গড়ে তুলেছেন, বিভিন্ন সময়ে এই সংগঠনটির সাথে সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে ছিলেন, তাদের ভাবনাগুলো, স্মৃতিকথাগুলোকে গ্রন্থিত করার উদ্যোগ নিয়েছেন সংগঠনের পক্ষে  আহমেদ হোসেন। টরন্টোতে বসবাসরত সাংস্কৃতিক সংগঠক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দলের প্রতিষ্ঠালগ্নের উদ্যোগের সাথে ছিলেন, এখনো চেতনায় সেই স্পিরিটকেই ধারন করেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দল নিয়ে বিভিন্নজনের স্মৃতিগাঁথাগুলো গ্রন্থিত হয়ে পাঠকের হাতে যাবার আগে সেগুলো ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশ করবে নতুনদেশ । আপনাদের মতামতকেও আমরাও সাদরে গ্রহন করবো। বিভাগীয় সম্পাদক, নতুনদেশ।)

বিপা চৌধুরী : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আমার অহংকার । তবে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড -এ পড়াশুনা করার স্বপ্ন আমার কোন দিনও ছিল না। উচ্চ মাধ্যমিকে ফলাফল আশানুরূপ না হওয়ায় বিজ্ঞান বিভাগ ছেড়ে ইতিহাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে গাঁটছড়া বাঁধা। এখানে পড়ার সুবাদে আমি অংশীদার হতে পেরেছি আশির দশকের সাংস্কৃতিক আন্দোলনের পুরোধা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দলের।

আমি বেড়ে উঠেছিলাম বিক্রমপুরের মুন্সিগঞ্জের সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলে।ছোটবেলা থেকেই বির্তক,গান,কবিতা পাঠ,অনুষ্ঠান উপস্থাপণা ইত্যাদি নিয়ে মশগুল থেকেছি। মুন্সিগঞ্জের সুজনী কচিকাঁচার মেলা,ঘাস-ফুল-নদী সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সাথে নিবিড়ভাবে জড়িত ছিলাম।এহেন মানুষ ঢাকা এসে বেকার বসে থাকা সম্ভব ছিল না। যথাসময়ে ছায়ানটে ভর্তি হলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস শুরু হল, ইতিহাসের তথ্য-বিবরণ কিছুই মাথায় ঢুকছে না।বন্ধুদের সাথে ইতিউতি ঘুরে বেড়াই।একদিন টিএসসিতে চা খেতে যাবার পথে প্রবেশ মুখে দেখলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দলে নূতন সদস্য নেয়ার বিজ্ঞপ্তি। মনটা নেচে উঠল, এতদিন মনে মনে যা খুঁজেছি এবার তার সন্ধান পেয়ে গিয়েছি বলে মনে হল। আগ-পিছ না ভেবেই আমি দু'টি বিষয়ে আবেদন করলাম। যথাসময়ে আমার সাক্ষাৎকার নেয়া হল, আমি সংগীত আর কবিতা আবৃত্তি দু'টোতেই জায়গা পেয়ে গেলাম। আমাকে আর পায় কে? বিভাগে ক্লাস শেষ করেই ছুটতাম টিএসসি-র দোতালায় নিদ্দিষ্ট কক্ষে মহড়ায় অংশ নিতে। এক ধরনের নেশায় পেয়ে বসেছিল। দলের প্রাণ লিয়াকত আলী লাকী ভাই আমাদের নূতন নূতন গান শিখাতেন।এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু গানের প্রথম কলি হল- প্রানে প্রান মিল করে দাও..., অধিকার কে কাকে দেয়...,মোরা যাত্রী একই তরণীর..., একদিন স্বপ্নের ভোর আসবে..

এরকম আরো অনেক উদ্দীপনাময়ী গান। সত্যিই কী আনন্দময় ছিল সেই দিনগুলি।মহড়া আর অনুষ্ঠান করতে করতে কখন যে আমরা প্রাণের বন্ধনে জড়িয়ে গিয়েছিলাম টের পাইনি। সেই বিনি সুতোর টান এখন পরিণত বয়সে এসে আরো শক্ত হচ্ছে।

আমি সংগীত ও আবৃত্তি দুটো বিভাগে স্থান পেলেও দলে বেশী সময় দিতে পারতাম না বলে সংগীত বিভাগের সাথেই থেকেছি। মনে পড়ছে, ২১শে ফেব্রুয়ারী খুব ভোরে আমরা টিএসসি-র সামনে জড়ো হতাম। গলায় হারমোনিয়াম ঝুলিয়ে লেমন ভাই, শ্যামলদা শুরু করতেন "মা গো ভাবনা কেন? আমরা তোমার শান্তি প্রিয় শান্ত ছেলে..."আমরা সবাই একসাথে গাইতে গাইতে শহীদ মিনারে পোঁছে যেতাম। আমরা একবার প্রভাত ফেরী থেকে ফিরে এসে বিদ্রোহী কবির সমাধির সিঁড়িতে বসে একটি দলীয় ছবি তুলেছিলাম। ছবিটা আমার কাছে অতি যত্নে সংরক্ষিত আছে। মাঝে মাঝে দেখে নষ্টালজিক হয়ে যাই। এছাড়াও আমরা বিজয় দিবস, স্বাধীনতা দিবসে দল বেঁধে বাসে চেপে সাভার স্মৃতিসৌধের সামনে গান গাইতে গিয়েছিলাম।

আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের পুরোটাই এরশাদের স্বৈরশাসনের মধ্যে কেটেছে, তাই শাসকের রক্ত চক্ষুকে উপেক্ষা করেই সাংস্কৃতিক আন্দোলনকে বেগবান করেছিলেন লাকী ভাই-এর নেতৃত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দল।এরশাদ যখন ছাত্র মিছিলে ট্রাক তুলে দিয়ে সেলিম-দেলোয়ারকে হত্যা করলো তার প্রতিবাদে সাংস্কৃতিক দল কালো ব্যাজ পরে রাস্তায় প্রতিবাদ মিছিলে নেমেছিল।

দলে থাকাকালীন আমার মধুর স্মৃতি হচ্ছে ময়মনসিংহ গীতিকা অবলম্বনে রচিত 'সোনাই-মাধব' গীতিনাট্যের সাথে থাকা। এর একটি চরিত্রে অভিনয় করতে যেয়ে বিরূপাক্ষ যেভাবে সবাইকে হাসিয়েছে তা ভাবলে এখনো হাসি চেপে রাখা দায়। এর নায়িকা সোনাই-এর গানগুলো গেয়েছিলেন বেলী আপা, উনার কন্ঠে"নিশি রাইত ঘন আন্ধার আসমানে নাই তারা..."গানটিতে তিনি সোনাই-এর মর্মযাতনা নিঁখুতভাবে ফুটিয়ে তুলেছিলেন। এখনো উনার কন্ঠ কানে লেগে আছে।

সাংস্কৃতিক দলের সাথে আমার যে আত্মিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল তা আমি নিরবচ্ছিন্নভাবে ধরে রাখতে পারিনি। কারণ আমি মিরপুর থেকে যাতায়াত করে ক্লাস করতাম। দলের মহড়াগুলো বিকেলে চলতো আর অনুষ্ঠানগুলোর বেশীরভাগ সন্ধ্যায় হতো। তাই প্রবল ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও সব অনুষ্ঠানে আমি অংশ নিতে পারতাম না। এজন্যে আমি তখন অনেক মনোকষ্টে থেকেছি। মনে পড়ছে আমরা একবার বিটিভি-র নাচের অনুষ্ঠানে নেপথ্যে গান গেয়েছিলাম,তখন স্বনামধন্য লায়লা হাসান আপার ব্যবহারে মুগ্ধ হয়েছি।আর একবার নাচ শিখাতে এসেছিলেন শুক্লাদি-কমলদা দম্পতি। উনাদের নিষ্ঠা দেখে অবাক হয়েছি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের পাট চুকেছে ত্রিশ বছর হতে চললো। জীবনের স্রোতে ভেসে আমরা এখন নানাদিকে সঞ্চরণশীল। কিন্তু কোথায় যেন বেঁধে আছে বিনিসুতোঁর বাঁধন। তাই অনেক বছর পর যখন টিভির স্ক্রলে দেখলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দলের সদস্যদের পুনর্মিলনী হবে, সাথে সাথে মনটা খুশিতে নেচে উঠলো। সামলু ভাই-এর সাথে যোগাযোগ করে আমি অনুষ্ঠানে চলে গেলাম। অনুষ্ঠানে অংশ নিতে পেরে আমার যে কী আনন্দ হয়েছ তা ভাষায় প্রকাশ করতে পারবো না। দলের কান্ডারী লাকী ভাই আমাদের সমবেতভাবে গাওয়াতেন "প্রানে প্রান মিল করে দাও,মিল করে দাও.."সেই প্রানের মিলন এই পরিণত বয়সে এসে আমাকে আপ্লুত করছে। হিরা,অসি এ দুজনকে আমি এই অনুষ্ঠানে এসে আবিষ্কার করলাম। এত আন্তরিক আর বন্ধুবৎসলল যা আমাকে দারূণভাবে অভিভূত করেছে। অনেক বছর পর ফিরে পেয়েছি সদাহাস্যময় রহিম ভাইকে যিনি দলের দপ্তরটি শক্তহাতে আগলিয়ে রাখতেন। আরো ফিরে পেয়েছি প্রাণবন্ত আহমেদ, গানপাগল লেমন ভাই, নুকুদা, পিনুদা, নাহিদ আপা, পাপড়িদি, বেঞ্জু,লতাদি,চম্পা,সত্যেনদা, শ্যামলদা,সামলুভাইসহ আরো অনেককে। ইতোমধ্যে ফেইস বুকের কল্যানে হারিয়ে যাওয়া অনেকের সাথে যোগাযোগ হয়েছে।

 

দলের প্রতিটি সদস্য যদি হয় ফুল তবে লাকী ভাই হচ্ছেন সুঁতো। সেই আশির দশকে যে ভাবে মালা গেঁথেছিলেন, আমি চাই সে বাঁধন অটুট থাক আজীবন।

আরো পড়ুন: দলের নাম  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দল


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান