বীথির কাছে চিঠি-৪৬

Sun, Mar 18, 2018 2:28 PM

বীথির কাছে চিঠি-৪৬

লুনা শিরীন: পর পর তিনটা ঘটনা,এই সময়ের আধুনিক মেয়ে জারা,গতকাল আমাকে ওর বাসায় নিয়ে গিয়েছিলো , ইফতার খাওয়াবে। গাড়িতে উঠেই আমাকে বলে, লুনা আপা শোনেন – আপনার জানার পরিধি বাড়ান, বুঝে দেখার চেষ্টা করেন,ছেলেরাও ভিক্টিম হয় মেয়েদের দিয়ে। হ্যা অফকোর্স মেয়েরা বেশী হয় কারন মেয়েরা এখনো অনেক ঝুঁকিপূর্ণ জায়গায় আছে, তাই মেয়েদের  ভিক্টিম হবার  সংখ্যা  বেশী তো বটেই কিন্তু মেয়েরাও আজকাল কম যায় না । আমার গাড়িতে বসে আছেন,কোন মন্তব্য করবেন না,চুপচাপ ঘটনা শোনেন ।

ঘটনা এক – হাসান আমার  ক্লাসমেট ছেলে । আমরা সবাই প্রাইভেট  বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে ক্যারিয়ার করেছি। হাসান বিয়ে করে ঢাকার মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়েকে, শিক্ষিত সুন্দরী মেয়ে । হাসান কানাডায়  পড়তে আসার কারনেই ওর কানাডার পি আর ( পার্মানেন্ট রেসিডেন্সি ) ছিলোবাংলাদেশে গিয়ে হাসান দেখেশুনে পারিবারিক ভাবেই বিয়ে করে । যেহেতু দুই পরিবারই সচ্ছল,তাই সংসারের সব জিনিস গুছিয়ে নিয়ে এসে টরোন্টোতে সংসার শুরু করে। ঝামেলা বিহীন ,পরিপাটি নিপাট সংসার । মাত্র দেড় বছরের মাথায় ওয়ান ফাইন ইভনিং – এ হাসান অফিস থেকে এসে দ্যাখে তার ছোট এপার্টমেন্ট ফাকা । ফাকা মানে একদম ফাকা শুন্য,এমনকি শাশুড়ি রান্না করার জন্য ছেলের বঊকে যে খুন্তি-টা দিয়েছিলো সেটাও নেই।  একটা সাদা কাগজে মেয়েটা লিখেছে ওর কানাডা আসার দরকার ছিলো, ও অন্য একটা  ছেলেকে  দীর্ঘদিন ভালোবাসে, এখন সে তাকেই কানাডায়  নিয়ে আসবে ।  হাসানের পাশেই দ্যাখে, ডিভোর্সের সাইন করা পেপার । আপনার কাছে যা বললাম – কোথাও কোন বাড়তি কথা নেই লুনা আপা,আপনি বলেন তো হাসানের অপরাধ কোথায় ?

ঘটনা দুই – এই ছেলের নাম  নিলয় , আমার এক কাজিন এর ক্লাসমেট – এটাও সেটেল ম্যারেজ। ছেলে পড়াশুনা করে ভালো জব করে, ঢাকায় থাকে, ডিপ্লোমা পাস করা সাধারন মধ্যবিত্ত পরিবারে বিয়ে হয় নিলয়ের। বাবা / মা শখ করেই ছেলের বিয়ে দেয় । বিয়ের রাতেই ছেলেটা জানতে পারে মেয়ের বাম পায়ে্র নিচের অংশ ফলস, হাঁটু থেকে নীচের পা পুরোটাই নেই , মেয়ে অনেক ছোটবেলায় পা হারিয়েছে ।  আপনি বলেন – এটা কি গোপন করার মতো কো্ন তথ্য ? যদি প্রেমের বিয়ে হতো,যদি নিলয় বলতো হ্যা আমি জানতাম, আমি ইচ্ছে করেই বলিনি, সেটা কিন্তু একদম আলাদা কথা আপা, কিন্তু মাথায় রাখবেন এটা সেটেল ম্যারেজ । আপনার লেখা পড়লে , বুঝতে পারি , সৎ মানুষ , ভালো মানুষ , ন্যায় / অন্যায় বোধ এর একটা টানা-পোড়েন আছে আমার মনোজগতে , কিন্তু এটা কিসের সততা ? জেনেবুঝে  মেয়ের বাবা / মা যখন এমন কাজ করে আপনার কি মনে হয় এটা সততার  উধাহারন ? জারা,র চোখমুখ শক্ত হতে দেখি আমি।

ঘটনা তিন – এটা আমাদের পাড়ার ছেলে,অনেক আগেই আর্মিতে গিয়ে ক্যারিয়ার করেছে। আমাদের অনেক আগেই জব হয়েছে , সংসার শুরু করেছে ছেলের, নাম রাসেলমেয়ে পছন্দ করেই বিয়ে করেছে , যদিও পারিবারিকভাবেই বিয়ে হয়েছে, কিন্তু ওদের ও অল্প সল্প পছন্দ ছিলো । যাক—বিয়ে হয়েছে,কিন্তু মাত্র ১৫ দিনের মাথায় রাসেলের কাছে চিঠি আসে – ওর বউ নাকি অন্য কারো বউ । রাসেল প্রথমে গা করেনি, ভেবেছে,অতি সুন্দরী বঊ তাই কেউ পিছু লেগেছে কিন্তু কেচো খুড়তে সাপ বের হয়, এর পরে রাসেলের কাছে মেয়ের সাইন করা কাবিন নামার কপি আসে। দুই  পরিবারের কথা চাপাচাপিতে বেড়িয়ে আসে, মেয়ে আসলেই অন্য ছেলেকে ভালোবেসে বিয়ে করেছে বছর দেড়েক আগে, কিন্তু পরিবার মানবে না তাই আবার বিয়ে করতে বাধ্য হয়েছে এখন তো আগের বিয়েও লিগ্যাল না, রাসেলের বিয়েও লিগ্যাল না। আপনিই বলেন – রাসেল কি করে এই ঝড় সামলাবে ? রাসেল ছেলে মানুষ হলেও কিন্তু ভালোবাসতে জানে , রাসেল কতটা  ভালোবেসেছিলো সেটা কিন্তু আমরা দেখেছি , এখন বলেন – এই দায়িত্বহীন  মেয়ের এই ঘটনার দায় বাকী জীবন রাসেলকে বহন  করতে হবে কিনা ? আপনি কোথায় বসে লেখালেখি করেন, বুঝতে পারেন ? শেষ দিকে জারা আমাকে রীতিমতো  শাসায়

বীথি—উপরের এই তিন ঘটনার পরিণতি –ই কিন্তু শুন্য,মানে কেউ কারো  সঙ্গী  হয়নি শেষ অব্ধি। কিন্তু  একজন আরেকজনের পথকে , জীবনকে নিঃসন্দেহে এলোমেলো করেছে , এখানে সবচেয়ে বড় ক্ষতি হচ্ছে –সবার  বিশ্বাস  প্রবলভাবে  নাড়া খেয়েছে । মানুষ মরে যাবার আগে যে কোনভাবে বেচে থাকবে , কারন বেচে  থাকাটাই সত্য , কিন্তু যে বেচে থাকার জন্য আজন্ম মরে যাবার চেয়েও বেশী কষ্ট ভোগ করতে হয় সেটা থেকে মুক্তি কি ? প্রথম ঘটনায়- হাসানের বঊ যখন তার  কাঙ্খিত  প্রেমিক নিয়ে কানাডায়  এনে সংসার করবে , হাসানের কেনা জিনিস দিয়েই জীবনযাপন  করবে অন্য একজন স্বামীর সাথে , তখন নিশ্চয় ওরা দুইজন-ই  জানবে –হাসানের সাথে যে  অন্যায় করা হয়েছে সেটা ক্ষমাহীন ? অন্যদিকে , মেয়েটি তো প্রতারক,যে একবার প্রতারক সে কি অজন্ম প্রতারক না ? নাকি ওদের কিছুই মনে হবে না—এটা শুধু আমার –ই ভাবনা ?

নিলয়ের বউ কি সারাজীবন নিজের শূন্য পায়ের দিকে তাকিয়ে কেঁদে উঠবে না, ওর কি মনে হবে না –এই মিথ্যাচারিতার কোন দরকার ছিলো না,মিথ্যা দিয়ে যে জীবন চলে না সেটা কি মেয়েটার বাবা /মায়ের একবারো  মনে হবে না ?

আর শেষ ঘটনায় ? মেয়েটা দুইবার বিয়ে করলো ঠিকই কিন্তু সেই যদি সেটেল  হবার  জন্যই বিয়ে করা,সেটা কি হোলো ওর জীবনে ? ওর ও তো বয়স হবে,একদিন শরীরের টান টান উত্তেজনা শেষ হবে,সেদিনো হয়তো মেয়েটা বেচে থাকবে অতীত ওকে  মৃত্যু যন্ত্রনা দেবে,সেদিন কি উত্তর পাবে নিজের কাছে ? জারা , নিলয় ,রাসেল, হাসান এরা সব আমার চেয়ে ১২/১৫ বছরের ছোট , তুই সেদিন আমাকে ফোনে বললি –এই সব পরকীয়া , অন্যায় , বাটপারি দিয়ে  নাকি ছেয়ে  গ্যাছে গোটা দেশ। উত্তাপ বিদেশেও  ছড়িয়েছে নানান ফরমেটে –বিয়ে , ডলার এর লেনদেন , লং  ডিস্টেন্স রিলেশন , বন্ধুত , এইসব দিয়ে এই ১৭ হাজার মাইল দুরে বসে বাংলাদেশকে আমরাও কিন্তু দেখতে পাই –বেশ ভালো দেখতে পাই – কিন্তু দিনশেষে কি হিসেব মেলে ? রাতের অন্ধকারে ঘুম ভেঙ্গে গেলে কি নিজেকে চিনতে পারি আমরা ? আহমদ ছফার সাক্ষাৎকার পড়ছি এখন – ছফাভাই বলেছেন –মানুষের করনীয় তিনটা  কাজ – প্রথমত – সৎ হবার চেষ্টা করা , দ্বিতীয়ত --- সৎ হবার চেষ্টা করা , তৃতীয়ত --  সৎ হবার চেষ্টা করা।  আদর তোকে ।

২৫ /০৭/২০১৪

আরো পড়ুন: বীথির কাছে চিঠি-৪৫


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান