বীথির কাছে চিঠি- ৪৫

Mon, Mar 5, 2018 10:40 PM

বীথির কাছে চিঠি- ৪৫

লুনা শিরীন : কয়েকদিন আগে তোকে যে ইনেদের বাসার দুটো মাছের কথা বলেছিলাম, মনে আছে? লম্বা নীল ঝালড় ওয়ালা মাছ ? এই এক মিনিট আগেই  সেই মাছ –দুটো দেখছিলাম । কি যেনো ভাবতে ভা্বতে আবার গিয়ে দাড়ালাম জানালার সামনে।

সন্ধ্যা সাতটা – ইনেদ এখোনো আসেনি , সাগা গ্যাছে মুভি দেখতে, আমি বাসায় একা । কি করবো বল ? ইফতারি হতে আরো দুই ঘন্টা বাকী । নিজের জীবনের কথা ভাবলে নিজের কাছেই হাসি লাগে। ভাবি এই হাসিই কি কাল হোলো নাকি ? বলেছি তোকে বহুবার ,আমি ভরা পরিবারে বড় হয়েছি, সে কারনেই হয়তো আমি নিজের একান্ত জগত খুঁজতাম। যত বড় হয়েছি তত এই স্বভাব যেনো নিজের ভিতরে বেশী করে টের পেয়েছি। ছোট ঘটনা – তখন ক্লাস সেভেন বা এইটে পড়ি। কলাবাগানে একটা  চার বেডরুমের বাসায় থাকতাম আমরা। মামা/ খালা মিলিয়েই বাসা ভাড়া নেয়া  হয়েছিলো, একদম কোনার ঘরটা ছিলো  মিলন-মামার । মামা প্রায়ই নানা বাসায় রংপুরে যেতেন। একবার মামা বেশ কয়েকমাসের জন্য বেড়াতে যাবার পরে আমি মামার  ঘরে গিয়ে উঠি, বই খাতা / জামা /কাপড় সব নিয়ে ঐ ঘরে  দরজা লাগিয়ে বসে থাকতাম । যেন এটাই আমার জগত,মহা বিরক্ত হয়ে আম্মা  বাইরে  থেকে দরজায় তালা লাগিয়ে দিলেন,জানালা দিয়ে ভাত খেতে দিলেন, কয়েকদিন পরে আম্মার প্রচণ্ড বকা আর মার খেয়ে  সেই ভুত মাথা থেকে নামলো ।

এবার আসি বিশ্ববিদ্যালায়ে পড়ার সময়ের কথায়। জা;বি আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় , সবার নামেই হলে রুম থাকে, কিন্তু যাদের ঢাকায় বাসা থাকে , তারা হলে থাকে না, কিন্তু আমি তো হলে থাকার জন্য পাগলপাড়া। হলের ভিতরে নিজের সংসার গুছিয়ে বসেছি, আমার কোন বন্ধু যারা আমাকে মেয়েদের হল জীবনে কাছে থেকে দেখেছে ,এবং তারা কেউ যদি আজকের এই লেখা পড়ে শুধু তারাই জানবে যে নিজের  গোছানো  ঘরের প্রতি কি প্রবল টান আমার।

 হলে রান্না করতাম নিজেই,কোনদিন আমি ডাইনিং এ খেতাম না, কোনদিন না,আমার ঘরের ফ্লোর ফিনাইল দিয়ে মুছতাম, সারাক্ষণ ভাবতাম কবে নিরিবিলিতে আমার একটা ঘর হবে,সংসার হবে । হায়রে মানুষ – ওই যে  শুরুতে বলছিলাম ইনেদের বাসার কথা, একটু নিরিবিলি থাকার কথা, আজকে আমার জীবন জুড়ে পরম করুণাময় এত বেশী নীরবতা আর একাকীত্ব দিয়েছেন যে সেই ভার সইবার ক্ষমতা আমি হারিয়ে ফেলেছি। এই বয়সে শুধুই খুঁজি কে একটু কথা বলবে, কে একটু আন্তরিক সময় দেবে ? বীথি, ইফতারের আর মাত্র ৬ মিনিট বাকী আছে, আবার ফিরে লিখছি তোকে  ক্যামন ।

মাত্র ২৫ মিনিটে ইফতার,নামাজ সেরে আবার বসলাম। ইনেদের এই মাস্টার বেডরুমটা  ক্রমশ আমার  প্রিয় হয়ে  উঠছে। খুব তাড়া্তাড়ি যা ছেড়ে যেতে হবে তাই বুঝি জীবনের সব ভালোবাসার জায়গা দখল করে রাখে । যদিও ঘটনা –টা আমাদের অজান্তেই ঘটে কিন্তু সেই ক্ষত বয়ে বেড়াই আমরা জীবনভর । গতবছর এই সামারে আমি ছিলাম মনিকা পারকিন্সন্স এর বাসায়,৭৪ বছর বয়সী মনিকার বাসা আমার অফিস থেকে হাটা পথেই মাত্র ৭ মিনিট,কি অসীম ভালোবাসায় আর আনন্দে  গতবছর মনিকার বাসায় ছিলাম, অথচ মাত্র ১মাস ক্যন্সারে ভুগে মনিকা চলে গেলো।গোটা বাড়িতে তিনজন মানুষ  ছিলাম আমরা। মনিকা, আমি আর বিড়াল লাকী । একদিকে টেবিলে রাখা মনিকার বাইবেল তার পাশেই রাখা ছিলো আমার তসবি আর জায়নামাজ। আমি নামাজ পড়ি,একটু দূরে  মনিকা  বসে বাইবেল নিয়ে। জীবন কি অপার আর অসীম ,সবার জন্য জীবন যাপনের পথ খোলা বীথি, তোর আল্লাহ বল, ভগাবান বল, জিশাশ বল, সব সব কিছুর মুলে হচ্ছে বিশ্বাস ও ভালোবাসা । তোর উদ্দেশ্য  যদি ঠিক থাকে তবে অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জন হবেই,সুনার অর লেটার । কিন্তু আমরা খুব তাড়া করি এক জীবনে, তাই বুঝি কোন কিছুর নির্জাস ভোগ করতে পারি না কেউই –শুধুই বলি এখুনি চাই ,আমার এখুনি চাই, এই মুহুরতে চাই, শুধু লোভ আর তাড়া  --আমাদের টেনে নিয়ে যায় অন্ধকারের দিকে ,আমরা ভাবি আলো, কিন্তু  আসলে আলেয়া । বীথি –কাল ফিরবো নিজের বাসায়, আমার নিজের ভুবনে,যেখানে ফেরার জন্য উন্মুখ হয়ে থাকে আমার প্রান । আদর।

২৩/০৭/২০১৪

আরো পড়ুন: বীথির কাছে চিঠি- ৪৪


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান